E-Paper

উপেক্ষিত সমস্যার বিমূর্ত প্রতিফলন

শিল্পীর সহমর্মিতায় তাঁর কাজগুলিতে যত্নে রচিত হয়েছে নাগরিক কাঠামোর দিনলিপি। প্রথমে আসা যাক বেশ কিছু ছোট আয়তনের কাজের প্রসঙ্গে।

শেষ আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৮:৩২
নিবিড়: চারুবাসনায় সুজাতা কর সাহার প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম

নিবিড়: চারুবাসনায় সুজাতা কর সাহার প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম

শিল্পের প্রাথমিক উপাদান রেখা, বর্ণ, টোন ও ফর্ম। এদের সমষ্টিতেই মূর্ত হয় চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার উৎকৃষ্ট শিল্প। আর এই সাঙ্কেতিক চিহ্নগুলিই ‘বিমূর্ত’। ইদানীং অনভিজ্ঞ শিল্পের হাতে এর প্রচলন এতটাই বেশি যে, প্রকৃত ‘বিমূর্ত’র সংজ্ঞা ক্রমশ ম্রিয়মাণ। তবুও তার মধ্যে কিছু কাজে উপলব্ধির ভাষা তৈরি হয়।

এ রকমই একজন বিমূর্ত কনটেম্পোরারি আর্টিস্ট সুজাতা কর সাহা। তিনি ক্যামেরার লেন্সবন্দি অভিজ্ঞতাকে অবচেতন আঙ্গিকে চিত্রিত করেন। তাঁর সিরিজ়টির নাম ‘মাইলস উইথ দ্য সাবকনশাস’। শিল্পীর অষ্টম একক প্রদর্শনী ‘গ্যালারি চারুবাসনা’য় সম্প্রতি আয়োজিত হয়েছিল। ৯২টি কাজের প্রদর্শন কৌতূহল তৈরি করে যথেষ্ট। বিশেষ করে রেখা ও বর্ণের যথাযথ সমীকরণের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া চোখ টানে এই প্রদর্শনীতে।

শিল্পীর সহমর্মিতায় তাঁর কাজগুলিতে যত্নে রচিত হয়েছে নাগরিক কাঠামোর দিনলিপি। প্রথমে আসা যাক বেশ কিছু ছোট আয়তনের কাজের প্রসঙ্গে। তার মধ্যে একটির নাম, ‘আ ডায়েরি অব কনভারসেশন উইথ সেল্ফ’। ফেব্রিয়ানো পেপারে রঙিন পেনসিল, প্যাস্টেল ও পেন অ্যান্ড ইঙ্ক মাধ্যমে করা কাজ। বিশেষ কোনও জায়গায় ফোকাস না করে বিষয়কে একটি তারে বাঁধার চেষ্টা করেছেন শিল্পী। যেমন, ত্রিভুজাকৃতির পাহাড় ও বৃক্ষের খণ্ড নিয়ে ‘২৯ নম্বর স্থানচিত্রটি’। হালকা ও দ্রুত রেখায় এই কাজটি সার্বিক রূপ নিলেও এক জর্জরিত অস্তিত্ব অনুভূত হয়। এ ভাবেই আত্মদর্শনের নিরিখে তৈরি হয় ৪,৬, ৫১ নম্বর ছবিগুলি।

কম বয়সে দেখা ‘দো বিঘা জমিন’ ছবিটি সুজাতার মনে গভীর ছায়া ফেলে গিয়েছে। আজও নিজেদের সামান্য জমি বাঁচানোর জন্য শহরে এসে মানুষ লড়াই করে চলে একই ভাবে। সেই নির্যাস নিয়ে নিজের ছবিতে আধুনিকীকরণের দৃষ্টান্ত রাখলেন শিল্পী। ছবির বিষয় মোটামুটি এ রকম— দু’টি পরিশ্রমী পা। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের এক বস্তি এলাকার বাড়ির লাগোয়া বারান্দা। তার শেডের তলায় শুয়ে ঘরহীন এক দিনমজুর, যার বুক, পিঠ আগলে আছে ফেলে আসা দেশ-ঘর। এ দিকে মেরুদণ্ড বেয়ে আশ্রয় নিয়েছে অগণিত শ্রান্ত মানুষ। এই দৈহিক প্রতীকে গড়ে উঠেছে গোটা একটি জীবন। শিরা-উপশিরা অনুযায়ী ফোটোগ্রাফির ছেঁড়া অংশে দেখা যায় ল্যান্ডস্কেপের কোলাজ। নিংড়ে নেওয়া চাপা অনুভবে মথিত হন দর্শক। আর একটি প্রায় সম-আবেগের প্রতিচ্ছবি ‘মাইন্ড ইন রাবলস’। উত্তর কলকাতার সিঁড়ি, দরজা, বারান্দা দেখাতে গিয়ে শিল্পী পেপারে সেঁটেছেন ফোটোগ্রাফের ছেঁড়া টুকরো। একজন পেশাদার ফোটোগ্রাফার হওয়ার সুবাদে, তোলা ছবি থেকে প্রিন্ট করে নেন শিল্পী। রিলিফের ধারণা আনতে লেয়ার বুঝে সেগুলি পেস্টিং করেন। ফলে বস্তুগত দূরত্ব সুন্দর ভাবে অভিযোজিত হয়।

মূল ড্রয়িং ও কোলাজ সম্বলিত তালিকায় ছিল ব্ল্যাক, ব্লু এবং পিঙ্কের নানা শেড। কম্পোজ়িশনের উপস্থাপনা যতটা জোরালো লাগে, রঙের ক্ষেত্রে পিঙ্কের তীব্র প্রয়োগ কোথাও তা বিচ্ছিন্ন করে। তবে ছেঁড়া অংশগুলি ক্ষত-বিক্ষত করে লাগানোয় জীবনের স্ট্রাগল আছড়ে পড়ে। এই কাজগুলির মধ্যে উল্লেখ করার মতো ছিল বেশ কয়েকটি। যেমন, ‘টেস্টিং টাইম’। এক মেশিনের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে একটি ক্ষতবিশিষ্ট হাত। সঙ্গে প্রকৃতিকে মিলিয়েছেন বাজপাখির আগ্রাসী ভূমিকায়। বেশির ভাগ ছবিতে ফল ও ফুল এসেছে নারী উপস্থিতির রূপক নিয়ে। এ ছাড়া লুপ্ত বনেদিয়ানার স্মৃতিতে মিশে গিয়েছে সমব্যথী ধূসর আবেগ। তার নাটকীয় আলোছায়ায় অন্দরমহল যেন ফিসফিসিয়ে ওঠে— ‘সহস্র স্নেহের বাহু দিয়ে, আঁধার পালিছে বুকে নিয়ে’। এ ভাবেই শহুরে অভিজ্ঞতার জটিলতাকে নিজের কাজে ধাপে ধাপে তুলে ধরেন শিল্পী।

কোনও প্রাথমিক পরিকল্পনা ছাড়াই সুজাতা তাঁর চিত্রপট নিয়ে এগোতে থাকেন। ধরা-ছাড়ার পরিমাপে না গিয়ে নিজের ছন্দে তাকে বয়ে যেতে দেন। প্রায় অবচেতন মন থেকে পুরো বিষয়টি পাকদণ্ডীর মতো রূপ নেয়। সাধারণত সংবেদনশীল শিল্পীদের মনে সামাজিক বৈষম্য নিদারুণ ভাবে নাড়া দিয়ে যায়। তাই ছবির ফর্ম আপনাআপনি সচল হতে থাকে। তারপর যে যে উপাদান নিয়ে ছবির ভাষা ফুটিয়ে তোলা যায়, সেই সাপোর্ট জড়ো করেন। কোনও কোনও ছবিতে প্রকৃতিকে সরাসরি না দেখিয়ে কাব্যিক ছায়ার মূর্ছনায় এনেছেন শিল্পী, যা তাঁর রচনার অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য। স্বকীয় সংহতির আরও তিনটি মজবুত দৃষ্টান্ত ছিল— ‘আর্চি প্রোটেকশন’, ‘বহুরূপী পোর্ট্রেটস’ এবং ‘কুমিং অব টাইমস’।

সুজাতা তাঁর কাজে মূলত তিনটি পর্বে দেখিয়েছেন উত্তর কলকাতার লুপ্তপ্রায় স্থাপত্য, দিনমজুরের অবস্থান ও নারীর আইডেন্টিটি। প্রতিটি বিষয়কে বাস্তবতার সঙ্গে তার অন্তর্নিহিত সাদৃশ্যে রূপ দেন আংশিক বিমূর্ত ও আংশিক প্রতীকের সাহায্যে। গাঠনিক ভারসাম্য রাখতে শিল্পীর বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ প্রশংসনীয়। সার্বিক ভাবে সমগ্র কাজের নিষ্ঠা ও সততাই সম্ভাবনা জাগায় শিল্পীর আগামী দিনের সাফল্যে।

পিয়ালী গঙ্গোপাধ্যায়

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Contemporary art

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy