Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২২ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

ঋত্বিককে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন উৎপল দত্ত

১১ জুন ২০১৬ ০০:০২

খুব অল্প বয়সেই গল্প লিখতে লিখতে একসময় তাঁর মনে হয়েছিল ‘‘গল্পটা inadequate।’’

সেই জন্য নাটকে চলে এসেছিলেন ঋত্বিক। বলছেন, ‘‘ভাবলাম গল্প ক’জন লোককে নাড়া দেয়, আর নাড়া দেয় অনেক গভীরে গিয়ে, কাজেই অনেক সময় লাগে পৌঁছতে। আমার তখন টগবগে রক্ত, immediate reaction চাই। সেই-সময়ে হল ‘নবান্ন’। ‘নবান্ন’ আমার সমস্ত জীবন-ধারা পাল্টে দিল।... আমি নাটকের দিকে ঝুঁকে পড়লাম!’’

আবার নাটক করতে করতেই তাঁর মনে হল, কয়েক হাজার নয়, লক্ষ মানুষের কাছে যেতে হবে। ‘‘এই ভাবে আমি সিনেমাতে এসেছি, সিনেমা করব বলে আসিনি। কাল যদি সিনেমার চেয়ে better medium বেরয় তাহলে সিনেমাকে লাথি মেরে আমি চলে যাব। I don’t love film. সিনেমার প্রেমে মশায় আমি পড়িনি।’’

Advertisement

কিন্তু নাটকই ছিল তাঁর সারা জীবনের পথের দাবি, বক্তব্য প্রকাশের জোরালো মাধ্যম!

‘নবান্ন’ দেখার পরেই ঋত্বিকের সঙ্গে যোগ বাড়ে প্রগেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের। সেখানে তখন চাঁদের হাট। শম্ভু মিত্র, বিজন ভট্টাচার্য, সুধী প্রধান, গোপাল হালদার প্রমুখ। সভাপতি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। সদস্য হয়ে গেলেন ঋত্বিক। কিন্তু এখানেও যেন স্বস্তি মিলছে না। এমন অস্থিরতাই যে তাঁকে সারাজীবন তাড়া করেছে। যার সমালোচনাও করেছেন তাঁর গণনাট্যের সহ-যোদ্ধারা।

ঋত্বিকের প্রথম দিকের নাট্য অভিনয় ‘চন্দ্রগুপ্ত।’ সেটা ১৯৩৬ সাল। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের এই নাটকে ঋত্বিক চাণক্যের ভূমিকায় অভিনয় করত রিচি-রোড, ম্যাডক্স স্কোয়ারে। সে সময় তাঁর অল্প বয়স। দাদা মণীশচন্দ্র কলকাতায় তাঁকে এনে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। তার পরে পরেই ঋত্বিকের নাটকে হাতেখড়ি।

যুদ্ধ শুরু হলে, রাজশাহী ফিরেও নাটক থেকে সরলেন না।

১৯৪২ সালে ঋত্বিক যখন ম্যাট্রিক দিয়ে ঝাড়খণ্ড কোলিয়ারিতে গেল দিদির বাড়ি, সেখানেই ফের অভিনয় করলেন। রবীন্দ্রনাথের ‘নটীর পূজা।’ সে কী উন্মাদনা! নিজেই নির্দেশনায় নামলেন এর পরে পরেই। পরের বছরই রাজশাহী পাবলিক লাইব্রেরিতে করলেন ‘অচলায়তন।’ একে একে ‘ডাকঘর’, ‘রাজা’, ‘ফাল্গুনী’, ‘বিসর্জন’, ‘পরিত্রাণ।’ কখনও অভিনয় করছেন, কখনও নির্দেশক। আবার কখনও মেতে উঠছেন নাটকের আবহ নিয়ে!

রবিঠাকুর থেকে বের হলেন ‘জাগরণ’ করতে গিয়ে।

সেটা ১৯৪৭। বহরমপুরে কৃষ্ণনাথ কলেজের পরীক্ষা দিতে গিয়ে ‘ক্রান্তি শিল্পী সঙ্ঘ’-এর সঙ্গে যোগাযোগ। ক্রান্তি শিল্পী সংঘের প্রযোজনাতেই ঋত্বিক জিন্নার চরিত্রে অভিনয় করেন। এই ৪৭-৪৮ থেকেই বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা। তখন নাটক নিয়ে খুব মেতেছেন। ‘বহুরূপী’ ১৯৪৮ সালে ‘নবান্ন’ নাটকের শো করে। শম্ভু মিত্রের নির্দেশনায় তাতেও অভিনয় করলেন ঋত্বিক। শম্ভু মিত্র- দয়াল ওটাউট, ঋত্বিক- রাজীব।

‘নবান্ন’ নাটকে সাফল্যের পরে ৪৯-এ গণনাট্যের নতুন নাটকে হাত দিলেন। ‘ঢেউ।’ নাটকে বৃদ্ধ কৃষকের ভূমিকায় নিজেই অভিনয় করলেন। প্রথম অভিনয় যাদবপুর কলেজের হস্টেলের ছাদে। পরের শো সেই রাতেই। সিটি কলেজে। সে দিন ঋত্বিক মেকআপ নিয়ে উৎপল দত্তের কাছে পয়সা চাইতে গেলেন।

তাড়িয়ে দিলেন উৎপল!

চিনতে পারেননি! অভিনেতা ঋত্বিকের পরের নাটক বিজন ভট্টাচার্যের নির্দেশনায় ‘নীলদর্পণ।’

‘জাগরণ’-এর জিন্না থেকে ‘বিসর্জন’-এর রঘুপতি, ‘ঢেউ’-এর বৃদ্ধ কৃষক, ‘নীলদর্পণ’-এ তাঁর অভিনয়, তাঁর নির্দেশনা ক্রমশ তাত ছড়াল শহরে।

কিন্তু কিছুতেই যেন শান্তি পান না ঋত্বিক। গল্প, নাটক, সিনেমা... কোথাও না! সারাক্ষণ অদ্ভুত এক ছটফটানি।

একটু একটু করে সেটাই কাল হল। দলে তাঁর শৃঙ্খলা নিয়েই প্রশ্ন উঠল। বিজন লিখছেন, ‘‘ওকে অনেকবার বোঝাবার চেষ্টা করেছি। বলেছি, ‘অ্যানার্কি’রও একটা ডিসিপ্লিন আছে। ... কিন্তু একটা ‘ডিমিনিক ক্রিমিন্যালিটি’, একটা ‘ম্যাসোকিজম’ ওকে পেয়ে বসেছিল!’ একই কথা বলেন তাপস সেনও। ‘‘ফেলে-আসা গ্রাম, নদী, আর্কিটাইপাল চরিত্র, এসব নিয়ে থিয়েটার হয় না।’’

ঋত্বিক বুঝতে পারেন না তাঁর দোষ কোথায়!

‘নাগরিক’ যন্ত্রণা যে তাঁকে স্বস্তিতে থাকতে দেয় না।

মনের মধ্যে ঘুরপাক খায় দেশভাগ, রাজনীতি, বিষণ্ণ দেশ-কালের ছবি। সেই ছবিতে নোঙরহীন চরিত্রের মিছিল। লিখতে বসলে, ছবির অবয়বের মিশে যায় মেলোড্রামা! পুরাণ থেকে কখনও গল্পের গায়ে এসে ঠেকে পুরাণ-কল্প। তাঁর সম্পর্কে তাঁরই সহ-যোদ্ধা উৎপল দত্ত বলছেন, ‘ঋত্বিক যখন থিয়েটার করত, তখনও ছবি করার কথাই ভাবত।’

সে সময় শহরে পর পর ৩১টা আত্মহত্যার ঘটনা ঘটল!

‘পিপলস এজ’ কাগজে রিপোর্ট করতে গিয়ে অস্থিরতা বাড়ল ঋত্বিকের। লিখলেন, বিষাদময় ‘জ্বালা।’ অনুপকুমার বিবেকানন্দ রোডের একটি ঘরে মহলার ব্যবস্থা করে দিলেন। আলো করলেন তাপস সেন। প্রম্পটার, মৃণাল সেন! কোথায় কোথায় সব অভিনয় হয়েছিল। লেকভিউ রোডে খোলা জায়গায়, ৪৬ ধর্মতলা স্ট্রিটে, হরিশ পার্কে!

রিহার্সাল হয়েছিল শোভা সেনের বাড়ি!

১৯৫১ সালে ঋত্বিক মেতে উঠলেন বন্ধু বিজনের ‘কলঙ্ক’ নাটক নিয়ে।

দুই গোরা সৈন্যের ভূমিকায় ঋত্বিক এবং উৎপল দত্ত। বিজন লিখছেন, ‘‘ঋত্বিকের মাতলামি আর উৎপলের বীভৎস উল্লাসে প্রথম দৃশ্যটাই একটা বীভৎস ক্রুঢ় রূপ নিত। তার মুখোমুখি দাঁড়াতেন প্রভাদেবী।’’ এর পরেই অভিনয় করলেন উৎপলের ‘ভাঙা বন্দর’-এ। গণনাট্যের মধ্য কলকাতা শাখার প্রযোজনায় সঙ্গীত করেছিলেন সলিল চৌধুরী। আর আবহ হেমাঙ্গ বিশ্বাস, অজিত বসু।

পার্টিতে ঋত্বিককে নিয়ে নানা বিরোধ থাকলেও যখন তিনি রস্ট্রামের সামনে দাঁড়ান, অন্য মানুষ।

১৯৫৫-তেই উৎপলের পরিচালনাতেই অভিনয় করলেন ‘বিসর্জন’ নাটকে।

আবার রঘুপতি। রস্ট্রামের উপর উঠতে উঠতে তাঁর অবিস্মরণীয় সেই অভিনয়, সংলাপের থ্রোয়িং মনে রেখেছে এ শহর! উৎপলের পরিচালনাতেই একবার ঘাটশিলায় সেই নাটক করতে গিয়ে নিদিষ্ট সময়ের আগে পর্দা ফেলে দিয়েছিল গণনাট্যের এক কমরেড। তাতে ঋত্বিেকর শেষ দৃশ্যটি অধুরা রয়ে যায়।

রেগে গেলেন। বেরিয়ে সেই কমরেডের গালে সপাটে চড়!

এ শহর মনে রেখেছে, ভোটের হাওয়ায় ভারতীয় গণনাট্যের জন্য ‘ইনস্পেক্টর জেনারেল’-এর অনুবাদ নাটক ‘অফিসার।’

এ নাটকে কোনও প্রস্তুতি ছাড়াই একটি চরিত্রে নেমেছিলেন ঋত্বিক। শোভা সেনের স্মৃতি বলছে, ‘‘প্র.না.বি-র অনুবাদ আমাদের মনে ধরল না। তখন ঋত্বিক এর নতুন নাট্যরূপ দিল। সেটি সকলেরই বেশ ভাল লাগল। আমার বাড়িতেই মহড়া শুরু হল জোর কদমে। প্রথমে কালী ব্যানার্জি করত অফিসারের ভূমিকাটি। কিন্তু বাইরের কোনও একটি জায়গায় কালী এসে পৌঁছলো না। তখন ঋত্বিক ওই সময় নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়ে পার্টটি করে সুষ্ঠুভাবে।’’

শহরের মনে আছে পথনাটিকা ‘ভোটের ভেট।’ ট্রাক ভাড়া করে তাতে অভিনয় করতেন উৎপল দত্ত, পানু পাল, শোভা সেনদের সঙ্গে এক বুড়ো কৃষকের ভূমিকায় ঋত্বিক। গোটা দিন শো। শহিদ মিনার থেকে কসবা-কৃষ্ণনগর, খাওয়া নেই, ঘুম নেই।

রাঙা টুকটুকে দিনের স্বপ্নে অক্লান্ত ছিল সেই পথ চলা!

যে কয়েকটি নাটকের জন্য ঋত্বিকের নাম নাট্য-আন্দোলনে চিরদিনের জায়গা করে নিয়েছে, তার একটি উদ্বাস্তু জীবন নিয়ে নাটক ‘দলিল।’ ১৯৫২ সালে নিজের লেখা সেই নাটকটি নিয়েই তিনি পাড়ি দিলেন গণনাট্যের কনফারেন্সে বোম্বে। কলকাতায় প্রথম অভিনয় হয় আমন্ত্রিত কয়েক জনের সামনে, ভূপতি নন্দীর বাড়ির ছাদে।

পরিচালনা ও প্রধান অভিনেতা ছিলেন ঋত্বিক নিজেই। বোম্বে ছাড়া ভদ্রেশ্বর, উত্তরপাড়া, বালিতে অভিনয় হয়। তাঁর ‘সাঁকো’, ‘স্ত্রীর পত্র’ খুবই চর্চিত প্রযোজনা। ১৯৬৯ সালে, প্রান্তবেলায়, যখন অসুস্থ, গোবরা মানসিক হাসপাতালে রয়েছেন, লিখলেন ‘সেই মেয়ে।’ নিজের নির্দেশনায় হাসপাতালের রোগী ও কর্মী-চিকিৎসকদের দিয়ে অভিনয়ও করালেন।

আর মৃত্যুর ঠিক আগের বছর করলেন ‘জ্বলন্ত।’

সারা জীবনে যখনই গল্প লিখতে লিখতে, ছবি করতে করতে থমকেছেন তিনি, নাটকই সেই খরার দিনে তাঁর বক্তব্য প্রকাশের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। সরে যেতে চেয়েছেন, পারেননি।

ঠোক্কর খেতে খেতেও টাল সামলে বার বার ভাঙা দেশ, উদ্বাস্তু জীবন আর কলোনির গল্পকে নিজের মতো করে বলেছেন মঞ্চের সংলাপে। তাঁর সুহৃদদেরই কেউ কেউ বলছেন, ‘হি ওয়াজ নেভার সিনসিয়ার টু দ্য থিয়েটার’, কিন্তু, শেষ পর্যন্ত গণনাট্য আন্দোলনের ইতিহাসে ঋত্বিকই জায়গা করে নিল অনেকখানি। শোভা সেন তাই তাঁকে বলছেন, ‘নাট্য-আন্দোলনের হোতা বা পুরোহিত!’

আরও পড়ুন

Advertisement