যুদ্ধের চাপে অর্থনীতির কোমর ভাঙছে মস্কোর, ‘ঘরের লক্ষ্মী’ বিক্রি করে ভরাডুবি সামলানোর মরিয়া চেষ্টায় পুতিনের দেশ!
২৫ বছরে প্রথম। সামরিক ব্যয় মাত্রাছাড়া হয়ে ওঠায় বাধ্য হয়ে রাশিয়া তাদের নিরাপদ সঞ্চয়ে হাত দিয়েছে। বিপুল সামরিক ব্যয়ের কারণে কোষাগারে ঘাটতি বাড়তেই তিল তিল করে জমানো সঞ্চয়ে হাত পড়েছে।
২০২২ সাল থেকে যুদ্ধের ময়দানে সমানে লড়ে চলেছে ইউক্রেন ও রাশিয়া। ইউক্রেনের উপরে রাশিয়ার আক্রমণের পর চার বছর কেটে গিয়েছে। কিভে আক্রমণ করতেই মস্কোর উপর বিপুল পরিমাণে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয় আমেরিকা-সহ পশ্চিমি দুনিয়া। তাতে আমেরিকা-সহ ইউরোপের বহু দেশই মনে করছিল যু্দ্ধের খরচ সামলাতে নাভিশ্বাস উঠবে ক্রেমলিনের।
নিষেধাজ্ঞার চ্যালে়ঞ্জকে দক্ষ হাতে সামলেছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও তাঁর সরকারের অর্থনীতিবিদেরা। মন্দার জালে জড়িয়ে না পড়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই অর্থাগমের রাস্তা বার করে নেয় পুতিনের দেশ। তবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়েছে রাশিয়া। দীর্ঘমেয়াদি এই সমরাভিযানের জন্য রাশিয়ার কোষাগারে থেকে জলের মতো খরচ হয়েছে রুবল।
রাশিয়ার বাজেটের একটি বড় অংশ এখন প্রতিরক্ষা এবং যুদ্ধের ক্ষেত্রে ব্যয় হচ্ছে। তাই চার বছরে এই প্রথম বার মস্কোর রাজকোষে টান পড়ার খবর প্রকাশ্যে এসেছে। সামরিক ব্যয় মাত্রাছাড়া হয়ে ওঠায় রাশিয়া বাধ্য হয়ে তাদের নিরাপদ সঞ্চয়ে হাত দিয়েছে, গত ২৫ বছরে যা প্রথম। ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য রাশিয়া কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের মাধ্যমে বাজারে সোনা বিক্রি করতে শুরু করেছে।
বার্লিনের একটি সংবাদমাধ্যম ‘বিএনই ইন্টেলিনিউজ়ের’ একটি প্রতিবেদন অনুসারে, পুতিনের সরকার ব্যাঙ্ক অফ রাশিয়ার ভল্ট থেকে জানুয়ারিতে ৩ লক্ষ আউন্স এবং ফেব্রুয়ারিতে আরও ২ লক্ষ আউন্স সোনা বিক্রি করেছে। সূত্রের খবর বিশাল বাজেট ঘাটতি মেটাতে রাশিয়া তাদের ন্যাশনাল ওয়েল্থ ফান্ড বা জাতীয় সম্পদ তহবিল থেকে সোনা বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সোনা ও বৈদেশিক মুদ্রার সম্মিলিত বিক্রির পরিমাণ ১৫ লক্ষ কোটি রুবল বা ১৫ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম দু’মাসেই প্রায় ৩.৫ লক্ষ কোটি রুবল বা ৩৫ হাজার কোটি ডলার মূল্যের হলুদ ধাতুর সঞ্চয় বিক্রি করেছে মস্কো।
আরও পড়ুন:
গোটা বিশ্বে সোনা জমানোর নিরিখে পঞ্চম স্থানে রয়েছে রাশিয়া। ২৩২৬ টন সোনা মজুত রয়েছে মস্কোর হাতে। তবে গত দু’মাসে যে রেকর্ড পরিমাণ সোনার বাট তারা বিক্রি করেছে তেমনটি ২০০২ সালের পর আর ঘটেনি। সোনা বিক্রির কারণে দেশটির মোট সোনার পরিমাণ ৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
এর আগে মস্কোর সঞ্চিত সোনা মূলত অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের কাছে হস্তান্তরিত হত। এখন সরাসরি বাজারে সোনার বাট বিক্রি করছে ব্যাঙ্ক অফ রাশিয়া। দু’মাসে মোট ১৪ টন সোনা বিক্রি করেছে পুতিনের দেশ। আড়াই দশক আগে ২০০২ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের পর দু’মাসে রেকর্ড সোনা বিক্রির ঘটনা ঘটে রাশিয়ায়। এক দফায় ৫৮ টন হলুদ ধাতু বেচে দেয় মস্কো।
মস্কোর উপর একের পর এক বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক অবরোধের তরঙ্গ আছড়ে পড়তেই পশ্চিমি দেশগুলি মনে করেছিল এই ধাক্কায় রাশিয়ার অর্থনীতি দ্রুত দুমড়ে যাবে। ২০২২ সালে রুশ অর্থনীতিতে ২.১ শতাংশ পতন দেখা গিয়েছিল। পশ্চিমের দেশগুলির সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও, ২০২৪ সালে রাশিয়ার জিডিপি ৪.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে দাবি করেছিল দেশটির সরকার। এই বৃদ্ধির হার অনেক পশ্চিমি দেশের তুলনায় বেশি। এর আগে ২০২৩ সালেও রুশ অর্থনীতি ৩.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
২০২৫ সাল থেকে রাশিয়ার অর্থনীতির চাকা উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করেছে। বিপুল সামরিক ব্যয়ের কারণে কোষাগারে থাকা সোনায় হাত পড়েছে। রিজ়ার্ভ ব্যবস্থাপনা কৌশলেও একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে পূর্ব ইউরোপের দেশটি।
আরও পড়ুন:
সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে উদ্ধৃত আর্থিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষে সে দেশের জিডিপিতে ২.৬ শতাংশ বাজেট ঘাটতি লক্ষ করা গিয়েছে, প্রাথমিক অনুমানের চেয়ে যা ০.৫ শতাংশ বেশি। বেশ কিছু অর্থনীতিবিদের মতে, রুশ অর্থনীতির জিডিপির ঘাটতি ৩.৪ শতাংশের এর কাছাকাছি হতে পারে। কারণ বেশ কিছু আর্থিক প্রকল্প ২০২৬ সাল পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে।
চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে তেলের দাম কমে যাওয়া এবং কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণেও বাজেটের চাপ ফাঁসের মতো চেপে বসছে রাশিয়ার গলায়। আগে রাশিয়ার তেল-গ্যাস থেকে প্রচুর আয় হত যা এখন কমে ২০ শতাংশের কাছাকাছি নেমে এসেছে।
২০১৪ সালে ক্রাইমিয়া অধিগ্রহণের পর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এবং ২০২২ সালে ইউক্রেনের সঙ্গে সংঘাত বৃদ্ধির পর ডলার নির্ভরতা কমাতে সোনা সঞ্চয়ে মনোযোগী হয়ে উঠেছিল রাশিয়া। বর্তমানে বিশ্ববাজারে সোনার দাম যথেষ্ট বেশি (কিছু ক্ষেত্রে ৫,০০০ ডলার প্রতি আউন্স বা তার বেশি)। উচ্চ মূল্যের সুযোগ নিয়ে সোনা বিক্রি করে বেশি অর্থ পাওয়ার চেষ্টা করছে রাশিয়া।
রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী, এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশটির আন্তর্জাতিক রিজ়ার্ভ বা বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়ের পরিমাণ ৮০ হাজার ৯০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে। শুধুমাত্র সঞ্চয় করা হলুদ ধাতুর মূল্যই প্রায় ৩৮ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। এ ছাড়াও এই সম্পদের মধ্যে রয়েছে ৩০ হাজার কোটি ডলারের ‘ফ্রিজ়’ হওয়া সম্পদ। পশ্চিমি বিশ্বের দেশগুলির নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে এই সম্পদ ব্যবহার করতে পারছে না মস্কো।
রাশিয়ায় যে মহামন্দার ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে, তা গত বছরই কবুল করে নিয়েছিলেন অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রী ম্যাক্সিম রেশেতনিকভ। আর্থিক মন্দা আগামী দিনে আরও জাঁকিয়ে বসতে পারে সাবেক সোভিয়েত দেশে। বৃদ্ধির সমস্ত সূচকই নিম্নমুখী। ধীরে ধীরে মন্দার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। এই নিয়ে প্রেসিডেন্ট পুতিনকেও সতর্ক করেছেন রেশেতনিকভ।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় প্রতিরক্ষাখাতে ব্যয় বৃদ্ধি করে রাশিয়া। এই যুদ্ধ গোটা বিশ্ববাজারেই এক বিশাল অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। রাশিয়ার সামরিক-কেন্দ্রিক অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ার ফলে অসামরিক খাতে তীব্র মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। শিল্পক্ষেত্রে ভর্তুকি কমছে
২০২২ সাল থেকে সামরিক ব্যয়ের ফলে উদ্ভূত ঘাটতি সামাল দিতে রুশ অর্থ মন্ত্রণালয় একাধিক তহবিল উৎসের উপর নির্ভর করে। এর মধ্যে জাতীয় কল্যাণ তহবিল থেকে টাকা তুলে ঘাটতি মেটাতে হয়েছে। সেখানে এখনও প্রায় চার লক্ষ কোটি রুবল রয়েছে। রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রকের দাবি, চলতি বছর জিডিপির আনুমানিক তিন থেকে চার শতাংশ ঘাটতি মেটানোর জন্য যথেষ্ট।
অর্থনীতির ভাঁড়ে মা ভবানী হওয়া ঠেকাতে পুতিনের সরকার অভ্যন্তরীণ ওএফজেড ট্রেজ়ারি বন্ড বাজারে নিয়ে আসছে। এটি একটি রুবল-নির্ধারিত বন্ড। নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া আন্তর্জাতিক বাজারে এই বন্ড বিক্রি করতে পারছে না। তাই, তারা এখন দেশীয় ব্যাঙ্ক, বিনিয়োগকারী এবং জনসাধারণের কাছে বন্ড বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ ধার করছে। দেশীয় মুদ্রাকে বাজারে খাটানোর একটি মোক্ষম উপায় হল এই বন্ড, যা দেশটিকে ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে সাহায্য করবে বলে মত রুশ অর্থনীতিবিদদের।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে বাজারের অস্থিরতা বন্ধ করতে সুদের হার বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করেছিল রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। কিন্তু ওই বছরের এপ্রিলেই তা ১৭ শতাংশে নেমে আসে। যুদ্ধের খরচ লাগামছাড়া হতে দু’বছরের মাথায় ২০২৪ সালে ফের তা বৃদ্ধি করে মস্কো। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের সুদ হঠাৎ করে বেড়ে দাঁড়ায় ২১ শতাংশ। যুদ্ধের জন্য প্রতিরক্ষা খাতে সরকারের মোটা টাকা খরচ হওয়ায় এই পদক্ষেপ করা ছাড়া অন্য রাস্তা ছিল না পুতিনের।
বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলিকে বাদ দিলে রাশিয়ার অন্য শিল্পক্ষেত্রগুলি নিষেধাজ্ঞার কারণে সে ভাবে ব্যবসা করতে পারছে না। সেই কারণেই দেশ জুড়ে তৈরি হচ্ছে আর্থিক স্থবিরতা। সোনা বিক্রি, তহবিলের সঞ্চয় ব্যবহার, দেশীয় মুদ্রায় ধার নেওয়া এবং কর বৃদ্ধির মাধ্যমে যুদ্ধের ব্যয় চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে মস্কো। ২০২২ সাল থেকে চলা যুদ্ধের মাঝে কিছু সময়ের জন্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হলেও, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের খরচ, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কতটা মোকাবিলা করতে পারবে মস্কো, সেটাই দেখার।