হাজার কোটির সম্পত্তি, পাক জঙ্গিদের মদত এবং অস্ত্রপাচারে অভিযুক্ত! ধুরন্ধর-আবহে আবার চর্চায় উত্তরপ্রদেশের প্রয়াত বিধায়ক-সাংসদ
কে ছিলেন অতীক? ১৯৬২ সালের ১০ অগস্ট তৎকালীন ইলাহাবাদের (বর্তমানে প্রয়াগরাজ) পার্শ্ববর্তী কাসারি মাসারি গ্রামের সামান্য টাঙাওয়ালা হাজি ফিরোজ় অহমদের পরিবারে জন্ম অতীকের।
ভারতে এখন চলছে ধুরন্ধর-ঝড়। সিনেমার দ্বিতীয় ভাগ ‘ধুরন্ধর দ্য রিভেঞ্জ’ বা ‘ধুরন্ধর ২’ মুক্তি পাওয়ার পর থেকে দেশ জুড়ে প্রেক্ষাগৃহে উপচে পড়ছে ভিড়। মুক্তির এক সপ্তাহের মধ্যেই হাজার কোটির ব্যবসা করে ফেলেছে সিনেমাটি। দেশ এখন মেতে রণবীর সিংহ অভিনীত হামজ়া আলি মজারি ওরফে জসকীরত সিংহ রঙ্গী চরিত্রে।
‘ধুরন্ধর ২’ দর্শকমহলে বিপুল প্রশংসা কুড়োচ্ছে। ছবিটির জাঁকজমকপূর্ণ এবং মারকাটারি দৃশ্য দর্শককে মুগ্ধ করেছে। বিতর্কের মুখেও পড়েছে ছবিটি। রণবীর সিংহ, সঞ্জয় দত্ত, আর মাধবনের ছবিটিকে ‘প্রোপাগান্ডা’ হিসাবে দাগিয়েছেন অনেকে। সমাজমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার ঢেউ উঠেছে।
সমালোচনা শুরু হয়েছে সিনেমায় দেখানো অতীফ আহমদ নামের চরিত্রটিকে নিয়েও। অভিনেতা সালিম সিদ্দিকি অভিনীত ওই চরিত্রটিকে উত্তরপ্রদেশের এক জন গ্যাংস্টার হিসাবে দেখানো হয়েছে, যিনি ওতপ্রোত ভাবে জড়িত রাজনীতির সঙ্গেও। অদ্ভুত ভাবে, ওই চরিত্রের চেহারা-বেশভূষার সঙ্গে মিল রয়েছে উত্তরপ্রদেশের কুখ্যাত গ্যাংস্টার তথা অধুনপ্রয়াত রাজনীতিবিদ অতীক অহমদের। অনেকের দাবি, চরিত্রটি অতীকের আদলেই তৈরি। অনেকের আবার দাবি, অতীককেই তুলে ধরা হয়েছে সিনেমায়। কিন্তু নাম বদলে দেওয়া হয়েছে আইনি জটিলতা এড়াতে।
২০২৩ সালে পুলিশের সামনেই খুন হন গ্যাংস্টার তথা লোকসভার প্রাক্তন সাংসদ অতীক অহমদ। শারীরিক পরীক্ষা করতে অতীক এবং তাঁর ভাই আশরফকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল প্রয়াগরাজ মেডিক্যাল কলেজে। তখনই তাঁদের দু’জনকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে মাথায় গুলি করে খুন করা হয়। সেই ঘটনায় সানি, অরুণ এবং লবলেশ নামে তিন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অতীকের এই হত্যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল দেশ জুড়ে।
‘ধুরন্ধর ২’ মুক্তির পর এখন অনেকেই দাবি তুলছেন, ছবিতে অতীককে ভুল ভাবে উপস্থাপিত করা হয়েছে। সিনেমায় দেখানো হয়েছে অতীকের আদলে তৈরি অতীফ চরিত্রটি পাকিস্তানের জঙ্গিদের সঙ্গে মিলে ভারতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিলেন। তাঁর হাত ধরে জাল নোট ঢুকত দেশে। বিরোধী দলের নেতারা এবং অতীকের পরিবারও জানিয়েছে, ছবিটিতে তথ্য বিকৃত করা হয়েছে এবং কোনও প্রমাণ ছাড়াই গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। এর ফলে সমাজমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহল পর্যন্ত সিনেমাটি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুন:
যদিও উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন ডিজিপি বিক্রম সিংহ এবং জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন ডিজিপি এসপি বৈদ্য ‘ধুরন্ধর ২’-এর সমর্থনেই কথা বলেছেন। দুই পুলিশকর্তার দাবি, ১৫০টিরও বেশি মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন অতীক। একটি বড় অপরাধচক্র চালাতেন। ফলে ছবিতে অতীকের অপরাধজগৎ এবং তাঁর নেটওয়ার্কের ওপর যা দেখানো হয়েছে, তা সত্য। ওই দুই পুলিশকর্তার দাবি, ছবিতে কোনও কিছুই অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয়নি। বরং, বাস্তব ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। তাঁরা আরও জানিয়েছেন যে, অতীক জেলে থাকা অবস্থাতেও নেটওয়ার্ক পরিচালনা অব্যাহত রেখেছিলেন তিনি।
বিক্রম সিংহের দাবি, অতীকের গ্যাং ‘আইএস-২৭৭’ নামেও পরিচিত ছিল। তিনি দাবি করেছেন যে, পাকিস্তান থেকে ড্রোনের মাধ্যমে অস্ত্র সরবরাহ করার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অতীক। সেই সব অস্ত্রের মধ্যে ছিল একে-৪৭, পিস্তল এবং আরডিএক্স। তিনি আইএসআই এবং লশকর-ই-তৈবার সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতেন বলে অভিযোগ। যদিও এই সমস্ত দাবি বিতর্কিত এবং আদালতে সম্পূর্ণ ভাবে প্রমাণিত হয়নি।
ছবিতে দেখানো হয়েছে যে, জেলের ভিতরে রাজার হালে থাকতেন অতীকের আদলে তৈরি চরিত্র এবং তাঁর ভাই। বিশেষ সুবিধা পেতেন। বিরিয়ানি খেতে দেওয়া হত। অতীকের ক্ষেত্রেও সে সব ঘটনা সত্যি বলে দাবি উঠেছিল।
কিন্তু কে ছিলেন এই অতীক? ১৯৬২ সালের ১০ অগস্ট তৎকালীন ইলাহাবাদের (বর্তমানে প্রয়াগরাজ) পার্শ্ববর্তী কাসারি মাসারি গ্রামের সামান্য টাঙাওয়ালা হাজি ফিরোজ় অহমদের পরিবারে জন্ম অতীকের।
আরও পড়ুন:
অতীকের বাবা টাঙা চালাতেন। সেই অর্থে কোনও মতে চলত সংসার। মুসলিম গাদ্দি সম্প্রদায়ের প্রাচীন পেশা গো-পালন। কিন্তু অতীকের অভাবের বাড়িতে গরু ছিল না। সংসার টানতে হাজি ফিরোজ় অহমদ টাঙা টানতেন। জীবিকার প্রয়োজনেই হাজি ফিরোজ় পরিবারকে নিয়ে উঠে আসেন ইলাহাবাদের চাকিয়ায়।
ছোটবেলা থেকে দারিদ্রকে খুব কাছ থেকে দেখা অতীক একটা জিনিস বুঝে গিয়েছিলেন, অভাবের সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য আনতে প্রয়োজন টাকা, প্রচুর টাকা। তাই শুরু থেকেই অঢেল অর্থ উপার্জন করে সংসারের অভাব মেটানো ছিল অতীকের মূল লক্ষ্য। কবে যে সেই লক্ষ্য পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা পেরিয়ে মানুষ খুনে পৌঁছে গেল, তার সুলুকসন্ধান অতীকেরও হয়তো অজানা ছিল।
অতীকের বয়স তখন মাত্র ১৭। অপরাধে হাতেখড়ি সেই কাঁচা বয়সেই। তৎকালীন ইলাহাবাদের খুলদাবাদ থানায় অতীকের নামে প্রথম খুনের মামলা নথিভুক্ত হয়। সেই শুরু। তার পর থেকে পুলিশের খাতায় অন্তত ১০০ বার নাম উঠেছে হাজি ফিরোজ়ের ছেলের। কখনও অভিযোগ অপহরণের, কখনও খুনের, আবার কখনও দলবল নিয়ে ডাকাতির।
এই সময় অতীকের ‘হিম্মতে’ মুগ্ধ হন তৎকালীন ইলাহাবাদের ‘বেতাজ বাদশা’ চাঁদবাবা। অতীক চাঁদবাবার শরণে আসেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলেন, উত্তরপ্রদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে মাফিয়ারাজের রমরমার সেই শুরু। এরই মধ্যে চাঁদবাবা খুন হয়ে যান। পুরো সাম্রাজ্য হাতে চলে আসে অতীকের। চাকিয়া ছাড়িয়ে গোটা ইলাহাবাদে অতীক-রাজেরও সেই শুরু।
অতীক বুঝতে পারেন, সরাসরি রাজনীতির হাত মাথায় না থাকলে দাপট ধরে রাখা অসম্ভব। অতএব, পুরোদমে রাজনীতিতেও নেমে পড়েন। ১৯৮৯ সালে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তিনি। নির্দল প্রার্থী হিসাবে ইলাহাবাদ পশ্চিম আসনে জিতে বিধায়ক হন। ১৯৯১ এবং ১৯৯৩ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনেও তাঁর আসনটি ধরে রাখেন অতীক।
১৯৯৬ সালে মুলায়ম সিংহ যাদবের দল এসপি অতীককে আপন করে নেয়। ইলাহাবাদ পশ্চিম থেকে আবার জেতেন অতীক। তবে এ বার এসপির সাইকেল প্রতীকে। ২০০২ সালেও অতীক এই কেন্দ্র থেকে জিতেছিলেন। সে বার তিনি ছিলেন এনডিএ শরিক আপনা দলের প্রার্থী।
২০০৪ সালে আসে সেই মুহূর্ত। যখন নেতাজি (মুলায়ম সেই নামেই পরিচিত) অতীককে ফুলপুর থেকে লোকসভা ভোটে লড়ার টিকিট দেন। যে ফুলপুরে একসময় সাংসদ ছিলেন জওহরলাল নেহরু, বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত, জ্ঞানেশ্বর মিশ্রের মতো রাজনীতিবিদেরা। ফুলপুরে জয় অতীককে যেমন বহু দূর বিস্তৃত পরিচিতি এনে দিয়েছিল, তেমনই ফুলপুরে জয়ের পরেই সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যারও সূত্রপাত গ্যাংস্টার থেকে নেতা হওয়া অতীকের জীবনে।
ফুলপুরে জয়ের পর অতীক ইলাহাবাদ পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ইস্তফা দেন। উপনির্বাচনে এসপির প্রতীকে দাঁড়ান অতীকের ভাই আশরাফ। উল্টো দিকে মায়াবতীর বিএসপির রাজু পাল। রাজু হারিয়ে দেন অতীকের ভাই আশরাফকে।
শুধু ফুলপুর থেকে জয়ই নয়, অতীকের জীবনে রয়েছে আরও বড় বড় রাজনৈতিক-চমক। ২০১৯ সালে অতীক নির্দল প্রার্থী হিসাবে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে, বারাণসী কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। প্রত্যাশিত ভাবেই জিততে পারেননি। মাত্র ৮৩৩টি ভোট পেয়েছিলেন। যদিও প্রচারের আলো কিছুটা কেড়ে নেন তিনি। ২০২১ সালে মজলিস-ই ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (মিম) দলে যোগ দিয়েছিলেন অতীক।
জীবদ্দশায় একাধিক বার জেলে গিয়েছিলেন অতীক। ২০১২ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে জেল থেকে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন তিনি। ২০০৫ সালে রাজু পাল হত্যাকাণ্ডের এক সাক্ষীকে অপহরণের অভিযোগ ওঠে অতীকের বিরুদ্ধে। এর জন্য ২০১৯ সালে দোষী সাব্যস্ত হন তিনি। তার পর থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত জেলেই ছিলেন তিনি। তবে অভিযোগ, জেল থেকেই নাকি পরিচালনা করতেন তাঁর অন্ধকার সাম্রাজ্য।
২০২৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারির স্থানীয় আদালতে একটি মামলার শুনানিতে গিয়েছিলেন উমেশ পাল নামে এক ব্যক্তি। সেখান থেকে গাড়ি চেপে বাড়ির সামনে পৌঁছোতেই তাঁকে গুলি করে খুন করার অভিযোগ ওঠে অতীক গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে। বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি, তার পর বোমাবাজি করে পালায় দুষ্কৃতীরা। উমেশ পাল হত্যার পর ২৫ ফেব্রুয়ারি এফআইআর দায়ের করেন তাঁর স্ত্রী। সেই ঘটনায় মূল অভিযুক্ত ছিলেন অতীক-পুত্র আসাদ অহমদ।
অতীকের তৃতীয় সন্তান আসাদ-সহ পাঁচ শুটারের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আড়াই লক্ষ টাকা করে পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ। এর পর অতীকের স্ত্রী শায়িস্তার বিরুদ্ধেও পুরস্কার ঘোষণা করা হয় প্রশাসনের তরফে। সে বছরের ১৩ মার্চ অতীকের পুত্র আসাদ-সহ পাঁচ শুটারের বিরুদ্ধে পুরস্কারের অর্থ বাড়িয়ে পাঁচ লক্ষ টাকা করা হয়।
এর ঠিক এক মাস পর ১৩ এপ্রিল পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয় আসাদের। তাঁর এক সঙ্গী গুলামেরও মৃত্যু হয় একই ঘটনায়। জেলে বসে ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন অতীক। আসাদের শেষকৃত্যে যাওয়ার আর্জি জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তা মঞ্জুর করা হয়নি।
সে সময় গুজরাতের সাবরমতী জেল থেকে তাঁকে উত্তরপ্রদেশের জেলে আনার বিষয় নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে আদালতে আর্জি জানান অতীক। তাঁকে ‘এনকাউন্টার’ করা হতে পারে, এমন আশঙ্কার কথাও বলেছিলেন প্রাক্তন সাংসদ এবং বিধায়ক অতীক। শুধু আদালতে নয়, জেলের বাইরেও সাংবাদিকদের অতীক বলেছিলেন, “হত্যা, হত্যা, হত্যা। ওদের (সরকার) পুরো পরিকল্পনা আমার জানা আছে। আমাকে খুন করতে চায় ওরা।”
এর পর ১৫ এপ্রিল আদালতের নির্দেশে স্বাস্থ্যপরীক্ষার জন্য যাওয়ার পথে তিন জন বন্দুকধারীর হাতে নিহত হন অতীক এবং তাঁর ভাই আশরফ। পুলিশের সামনে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে তাঁদের মুখে গুলি করা হয়। মৃত্যু হয় দু’জনেরই। একই সঙ্গে শেষ হয় উত্তরপ্রদেশের রাজনীতির এক অন্ধকারময় অধ্যায়ের।
অপরাধ সাম্রাজ্যের পাশাপাশি অতীকের আর্থিক সাম্রাজ্যও ফুলেফেঁপে উঠেছিল। পুলিশ সূত্রে খবর, অতীকের সম্পত্তির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা। তাঁর মৃত্যুর পর উত্তরপ্রদেশ সরকার দাবি করেছিল যে, অতীকের ১১৬৯ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।