আস্তিনে লুকনো ক্ষেপণাস্ত্রে প্রবাল দ্বীপে হানা! ইরানের মতো বহু দেশের রয়েছে গোপন ‘তাস’? তালিকায় নাম ভারতেরও?
২,০০০ কিলোমিটারের বেশি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নেই বলে সরকারি ভাবে জানিয়েছিল ইরান। কিন্তু, যুদ্ধের সময় ৪,০০০ কিলোমিটার দূরে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে তেহরান। সাবেক পারস্যের কায়দায় গোপনে হাতিয়ারের শক্তি বাড়াচ্ছে কারা? তালিকায় নাম আছে ভারতেরও?
উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলির মধ্যে আর সীমাবদ্ধ থাকা নয়। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধকে এ বার ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় ছড়িয়ে দিচ্ছে ইরান! শনিবার, ২১ মার্চ সেখানকার প্রবাল দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় তেহরান। সংশ্লিষ্ট দ্বীপের ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিতে মোতায়েন আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রজন্মের ‘স্টেলথ’ শ্রেণির বোমারু বিমান ‘বি-২ স্পিরিট’। যদিও সেগুলির গায়ে আঁচড় লাগেনি বলে দাবি করেছে একাধিক পশ্চিমি গণমাধ্যম।
ইরানের আধা-সরকারি ‘মেহর নিউজ় এজেন্সি’ জানিয়েছে, দিয়েগো গার্সিয়া লক্ষ্য করে দু’টি মাঝারি পাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে মোজতবা খামেনেইয়ের নেতৃত্বাধীন ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে এই ঘটনাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তেহরানের গণমাধ্যমটি লিখেছে, ‘‘আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা শত্রুপক্ষের যাবতীয় কল্পনার বাইরে।’’ তাঁদের এ-হেন দাবি ঘিরে দুনিয়া জুড়ে শুরু হয়েছে হইচই।
সাবেক পারস্যের ‘মেহর নিউজ় এজেন্সি’র দেওয়া তথ্য বকলমে স্বীকার করেছে আমেরিকা। এই বিষয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের কাছে মুখ খুলেছেন মার্কিন প্রশাসনের দুই পদস্থ কর্তা। তাঁদের দাবি, একটি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথে ব্যর্থ হয়। দ্বিতীয়টিকে থামাতে এসএম-৩ নামের ইন্টারসেন্টর ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় মোতায়েন থাকা যুক্তরাষ্ট্রের একটি রণতরী। যদিও সরকারি ভাবে এই ইস্যুতে কোনও বিবৃতি দেয়নি ওয়াশিংটনের যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগন।
দিয়েগো গার্সিয়াকে লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিয়ে হইচইয়ের নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, কিছু দিন আগেই একটি সাক্ষাৎকারে তেহরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ‘‘আমাদের কাছে সর্বাধিক ২,০০০ কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র আছে।’’ সূত্রের খবর, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজ়রায়েলি গোয়েন্দা রিপোর্টেও হুবহু একই কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু, বাস্তবে প্রায় ৪,০০০ কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রে হামলা চালিয়েছে আইআরজিসি।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের অনুমান, গার্সিয়ায় মার্কিন ‘বি-২ স্পিরিট’ বোমারু বিমানের বহর ধ্বংস করতে সম্ভবত ‘খোররমশাহর-৪’ ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটি ব্যবহার করেছে ইরান। গত ৪ মার্চ শ্রীলঙ্কা উপকূলের কাছে ‘আইআরআইএস ডেনা’ নামের তেহরানের একটি রণতরীকে টর্পেডো ছুড়ে ধ্বংস করে যুক্তরাষ্ট্রের ডুবোজাহাজ ‘ইউএসএস শার্লট’। ওই ঘটনায় মৃত্যু হয় ৮৭ জন ইরানি নৌসৈনিকের। সূত্রের খবর, হামলার আগে লস অ্যাঞ্জেলেস ক্লাসের পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম ওই ডুবোজাহাজটিও মোতায়েন ছিল গার্সিয়ায়।
আরও পড়ুন:
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা মনে করেন, সেই কারণেই ভারতীয় মহাসাগরীয় ওই দ্বীপটিকে নিশানা করেছে আইআরজিসি। গোড়ার দিকে সেখানকার সামরিক ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে দিতে চাননি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টার্মার। কিন্তু, ওয়াশিংটনের ‘চাপে’ শেষ পর্যন্ত তাতে রাজি হন তিনি। সেই খবর প্রকাশ্যে আসতেই ইংরেজদের হুঁশিয়ারি দেন ইরানি বিদেশমন্ত্রী আরাঘচি। এক্স হ্যান্ডলের পোস্টে সংশ্লিষ্ট বিবাদ থেকে ব্রিটেনকে দূরে থাকতে বলে সুর চড়ান তিনি।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গার্সিয়াকাণ্ডে স্বাভাবিক ভাবেই সামনে চলে এসেছে একটি প্রশ্ন। সেটা হল, তবে কি কৌশলগত হাতিয়ারের ক্ষেত্রে তথ্য গোপন করছে বিশ্বের প্রতিটা দেশ? উদাহরণ হিসাবে ভারতের কথা বলা যেতে পারে। একাধিক গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার পাল্লার বিধ্বংসী পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে এ দেশের প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডিআরডিও (ডিফেন্স রিসার্চ ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজ়েশন)।
উল্লেখ্য, অগ্নি সিরিজ়ের ওই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লায় চলে আসবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও বিশাল অংশ। যদিও গত কয়েক বছরে সংশ্লিষ্ট ‘ব্রহ্মাস্ত্র’টি নিয়ে একাধিক বিস্ফোরক দাবি করেছে চিন ও পশ্চিমি দুনিয়ার একাধিক গণমাধ্যম। তাদের কথায়, অগ্নি-৬ আন্তঃমহাদেশীয় (ইন্টার কন্টিনেন্টাল) ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইতিমধ্যেই তৈরি করে ফেলেছে ডিআরডিও। ইচ্ছাকৃত ভাবে তার পরীক্ষা করা হচ্ছে না। কারণ, সে ক্ষেত্রে ‘নোটাম’ (নোটিস টু এয়ার মিশন্স) জারি করতে হবে দিল্লিকে। এর উপর ভিত্তি করে এর পাল্লার একটা আন্দাজ পেতে পারে শত্রুরা।
বর্তমানে ভারতীয় ফৌজের হাতে রয়েছে অগ্নি-৫ নামের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র। এর পাল্লার মধ্যে রয়েছে চিন, রাশিয়া-সহ গোটা এশিয়া মহাদেশ এবং ইউরোপের সিংহভাগ। অত্যন্ত গোপনে এর সফল পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ করে নয়াদিল্লি। তার পরেও অগ্নি-৫-এর পাল্লা নিয়ে ধোঁয়াশা থেকে গিয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের সূত্রকে উদ্ধৃত করে, বেশ কিছু গণমাধ্যম জানিয়েছে ৫,৮০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যে নিখুঁত হামলা চালাতে পারে সংশ্লিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র। যদিও চিনের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আরও পড়ুন:
বেজিঙের দাবি, অগ্নি-৫-এর পাল্লা কমিয়ে দেখাচ্ছে ভারত। ৫,৮০০ নয়, ৮০০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারে ওই পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র। ড্রাগনের সরকারি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় হামলা চালাতে পারবে অগ্নি-৫। তা সত্ত্বেও মার্কিন প্রশাসন এবং ইউরোপীয় দেশগুলি কেন পদক্ষেপ করছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে চিন। যদিও আন্তর্জাতিক মহলে তাদের অভিযোগ ধোপে টেকেনি। রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের একাধিক সদস্যই এ ব্যাপারে নয়াদিল্লির পাশে দাঁড়ায়।
একই কথা ‘হাইপারসনিক’ (শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ গতিশীল) ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সরকারি ভাবে এই ধরনের কোনও ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ হাতে থাকার কথা স্বীকার করেনি নয়াদিল্লি। কিন্তু, ২০২৪ সালের ১৬ নভেম্বর ওড়িশার এপিজে আব্দুল কালাম দ্বীপ থেকে একটি দূরপাল্লার রণতরী ধ্বংসকারী ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালায় ডিআরডিও। সূত্রের খবর, এর গতিবেগ ছিল ম্যাক ৫ প্লাস। যদিও এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি কেন্দ্র।
২০২০ সালে স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিনচালিত একটি হাইপারসনিক ভাসমান যানের সফল পরীক্ষা চালায় ডিআরডিও। গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) শেষের দিকে ‘ধ্বনি’ নামের এই শ্রেণির একটি হাতিয়ারের উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করেন এ দেশের প্রতিরক্ষা গবেষকেরা। কিন্তু পরে বাতিল হয় সেই সিদ্ধান্ত। সূত্রের খবর, শব্দের ছ’গুণ গতিতে ছুটে গিয়ে নিখুঁত নিশানায় আঘাত হানতে পারবে ‘ধ্বনি’। এর বিস্ফোরক বহনের ক্ষমতাও গোপন রেখেছে ডিআরডিও।
সম্প্রতি পাকিস্তানের অস্ত্রভান্ডার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মার্কিন প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ‘ইউনাইটেড স্টেটস ডিরেক্টর অফ ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স’-এর প্রধান তুলসী গাবার্ড সম্প্রতি একটি বিবৃতিতে বলেছেন, ‘‘ভবিষ্যতে ইসলামাবাদ তাদের দীর্ঘপাল্লার হাতিয়ার কর্মসূচিতে এমন একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা আইসিবিএম (ইন্টার-কন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল) অন্তর্ভুক্ত করতে পারে, যা আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম।’’
মার্কিন পার্লামেন্ট কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সেনেটে জমা করা গোয়েন্দা রিপোর্টে গাবার্ড দাবি করেছেন, গত বছর (২০২৫ সাল) ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ ভারতের হাতে মার খেয়ে চিনের সহযোগিতায় পরমাণু অস্ত্রভান্ডার বৃদ্ধির মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে পাকিস্তান। আণবিক হাতিয়ারের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে নজর দিয়েছে বেজিংও। পশ্চিমের প্রতিরক্ষা নজরদার সংস্থাগুলি মনে করে যে, ড্রাগনের কাছে বর্তমানে ৬০০ পরমাণু ওয়ারহেড রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে তা ১,০০০ ছাড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর পরমাণু অস্ত্রবহনে সক্ষম ‘৯এম৭৩০ বুরেভেস্টনিক’ (স্টর্ম পেট্রল) ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালায় মস্কো। ক্রেমলিনের দাবি, উৎক্ষেপণের পর ১৪ হাজার কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে ওই হাতিয়ার। এটি আকাশে ছিল অন্তত ১৫ ঘণ্টা! সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটি যাবতীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম) ভেদ করে আক্রমণ শানাতে পারবে বলে দাবি করেছে রাশিয়া।
ওই ঘটনার সাত দিনের মাথায় (পড়ুন ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর) একটি সামরিক হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে রীতিমতো বোমা ফাটান রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বলেন, ‘‘পরমাণু শক্তিচালিত সীমাহীন পাল্লার সামুদ্রিক ড্রোনের পরীক্ষায় ১০০ শতাংশ সাফল্য পেয়েছে মস্কো।’’ হাতিয়ারটির পোশাকি নাম ‘পোসাইডন’। একে আদপে একটি টর্পেডো বলে ব্যাখ্যা করছেন পশ্চিমি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা। এর দ্রুত উৎপাদনের নির্দেশ দিয়েছে ক্রেমলিন।
পুতিনের ওই মন্তব্যের জেরে ‘পোসাইডন’-এর পাল্লা নিয়ে তৈরি হয় ধোঁয়াশা। গাবার্ডের দফতর জানিয়েছে, অত্যন্ত গোপনে বিভিন্ন ধরনের হাতিয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি করছে রাশিয়া, চিন এবং উত্তর কোরিয়া বা ডিপিআরকে (ডেমোক্র্যাটিক পিপল্স রিপাবলিক অফ কোরিয়া)। ফলে আগামী দিনে যুদ্ধের ময়দানে চমকে দেওয়ার মতো অস্ত্র প্রকাশ্যে আসার আশঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দিচ্ছেন না সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
যদিও এগুলির উল্টো যুক্তিও রয়েছে। গত বছর (২০২৫ সাল) যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দিতে এক্স হ্যান্ডেলে একটি ভিডিয়ো পোস্ট করে আইআরজিসি। সেখানে দিয়েগো গার্সিয়ায় হামলা চালানোর সক্ষমতা আছে বলে জানিয়ে দেয় তেহরান। সেই হুঁশিয়ারিকে পাত্তা না দেওয়ার ফল ভুগছে আমেরিকা? এই প্রশ্নের জবাব দেবে সময়।