১৭ বছরে নজিরবিহীন পতন সোনায়, বিনিয়োগের ‘সুবর্ণসুযোগ’ কি হাতছাড়া করা অনুচিত? কী বলছেন বিশেষজ্ঞেরা?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার কমানোর আশা ম্লান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সোনার ভবিষ্যৎ নিয়ে আবারও দোলাচল শুরু হয়েছে। ডলারের সূচক শক্তিশালী হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ১৭ বছরের মধ্যে নজিরবিহীন দামের পতন দেখা গিয়েছে সোনায়।
দামের পতনের নিরিখে ১৭ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে সোনার দর। মার্চের আগে সোনার দামে এমন বিরাট পতন লক্ষ্য করেননি বিনিয়োগকারীরা। ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ মাসিক পতন হয়েছে হলুদ ধাতুর দরে। ২০২৬ সালের মার্চের শেষ নাগাদ বিশ্ববাজারে সোনার দামে যে নজিরবিহীন পতন দেখা গিয়েছে তা ২০০৮ সালের অক্টোবরের পর আর দেখা যায়নি। এটি সোনার জন্য সবচেয়ে খারাপ মাস হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে বিশ্ববাজারে।
পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত প্রশমন হবে খুব তাড়াতাড়ি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সহযোগীদের জানিয়েছেন যে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান শেষ করতে ইচ্ছুক। এর পরেই এশিয়ার বেশ কয়েকটি অঞ্চলের লেনদেনের শুরুতে সোনার দাম বাড়তে শুরু করে। মার্কিন সোনার ফিউচার প্রতি আউন্সে ১.৫ শতাংশ বেড়ে ৪,৫৭৮.৮৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এপ্রিল ডেলিভারির জন্য দাম ১.২ শতাংশ বেড়ে ৪,৬১১.৩০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধ শেষ হবে এই আশায় মঙ্গলবার সোনার দাম বাড়লেও, বিনিয়োগকারীদের আশায় জল ঢেলে দিয়েছে মার্কিন সরকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার কমানোর আশা ম্লান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সোনার ভবিষ্যৎ নিয়ে আবারও দোলাচল শুরু হয়েছে।
সাধারণত মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মার্কিন ফেডারেল রিজ়ার্ভ সুদের হার বাড়ায়। বিনিয়োগকারীরা আশা করেছিলেন ২০২৬-এর শুরুতে ফেড রিজ়ার্ভ সুদের হার কমাতে শুরু করবে। কিন্তু বর্তমানে ইরান-মার্কিন উত্তেজনার কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি আবার বেড়েছে। আর্থিক বিশেষজ্ঞেরা সুদের হার কমানোর যে কোনও সম্ভাবনাকে প্রায় পুরোপুরি বাতিল করে দিয়েছেন। কারণ জ্বালানির উচ্চ মূল্য সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে তোলার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
ফলে ফেড রিজ়ার্ভ সুদের হার কমানোর বদলে তা বজায় রাখার বা বাড়ানোর সঙ্কেত মিলেছে। সোনা সাধারণত কম সুদের হারের পরিবেশে লাভজনক বিনিয়োগ বলে ধরা হয়। বর্তমানে সোনার মতো নন ইল্ড বা সুদবিহীন সম্পদের আকর্ষণ কমে গিয়েছে। যুদ্ধের কারণে বিনিয়োগকারীরা ডলারকে তাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসাবে বেছে নিচ্ছেন।
আরও পড়ুন:
আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম গত বছর ৬০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে সোনার দাম আকাশচুম্বী হয়ে রেকর্ড উচ্চতায় চলে গিয়েছিল। সোনার দাম আউন্সপ্রতি পাঁচ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়। এর পর থেকে সোনার দাম আউন্সপ্রতি পাঁচ হাজার ডলারের কাছাকাছিই ঘোরাফেরা করেছে। তার পরে যুদ্ধের জিগিরে হু-হু করে পড়তে থাকে কাঞ্চনমূল্য।
যুদ্ধের উত্তেজনা বাড়ার পর যখন দাম আর বিশেষ বাড়ছিল না, তখন তাবড় তাবড় বিনিয়োগকারী তাঁদের জমানো সোনা বিক্রি করে মুনাফা তুলে নিতে শুরু করেন। সোনা বেচে দেওয়ার হিড়িকে দাম পড়তে শুরু করে কাঞ্চন ধাতুর। বিশ্ববাজারের ‘সবচেয়ে নিরাপদ’ বলে ধরা হয় যাকে, তার মূল্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিনিয়োগকারীরা সোনার পরিবর্তে ডলারকেই আবার বিনিয়োগের নিরাপদ আশ্রয় হিসাবে বেছে নিচ্ছেন। ডলারের সূচক শক্তিশালী হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনা ডলারে কেনাবেচা হয়। তাই ডলারের দাম বাড়লে অন্যান্য দেশের ক্রেতাদের জন্য সোনা ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। ফলে সোনার চাহিদায় ভাটা পড়েছে বিশ্ব জুড়ে।
২০২৫ সালে সোনা প্রায় ৬৫ শতাংশ লাভ দিয়েছিল। ফলে বর্তমান পতনটিকে অনেক বিশেষজ্ঞ ‘প্রফিট বুকিং’ বা একটি স্বাভাবিক সংশোধন হিসাবে দেখছেন। বিশ্বের তাবড় সোনা সঞ্চয়কারী দেশগুলিও নিজেদের সঞ্চিত সোনা বিক্রি করে দেশীয় মুদ্রা আয় করার চেষ্টা করছে। সবচেয়ে বেশি সোনা রয়েছে এমন ১০টি দেশের মধ্যে রয়েছে রাশিয়া ও তুরস্ক। রাশিয়া এবং তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক আন্তর্জাতিক বাজারে কয়েক টন সোনা বিক্রি করেছে।
আরও পড়ুন:
রাশিয়া গত কয়েক বছর ধরে তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজ়ার্ভে প্রচুর সোনা জমিয়েছিল। তবে বর্তমান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধের ব্যয়ভার সামলাতে তারা এখন সেই সোনা নগদ মূল্যে বিক্রি করছে। বিশেষ করে রুবলের (রাশিয়ার মুদ্রা) মান ধরে রাখতে এবং জরুরি আমদানি ব্যয় মেটাতে মস্কো কয়েক টন সোনা বাজারে ছেড়েছে। বিশ্ববাজারে সোনার দাম যথেষ্ট বেশি (কিছু ক্ষেত্রে ৫,০০০ ডলার প্রতি আউন্স বা তার বেশি)। উচ্চ মূল্যের সুযোগ নিয়ে সোনা বিক্রি করে বেশি অর্থ পাওয়ার চেষ্টা করছে রাশিয়া।
দু’মাসে মোট ১৪ টন সোনা বিক্রি করেছে পুতিনের দেশ। আড়াই দশক আগে ২০০২ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের পর দু’মাসে রেকর্ড সোনা বিক্রির ঘটনা ঘটে রাশিয়ায়। এক দফায় ৫৮ টন হলুদ ধাতু বেচে দেয় মস্কো। গোটা বিশ্বে সোনা জমানোর নিরিখে পঞ্চম স্থানে রয়েছে রাশিয়া। ২৩২৬ টন সোনা মজুত রয়েছে মস্কোর হাতে। তবে গত দু’মাসে যে রেকর্ড পরিমাণ সোনার বাট তারা বিক্রি করেছে তেমনটি ২০০২ সালের পর আর ঘটেনি।
একই পথে হেঁটেছে তুরস্ক। তুরস্কে বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক তাদের স্থানীয় বাজারে সোনার চাহিদা মেটাতে এবং লিরার (তুরস্কের মুদ্রা) পতন ঠেকাতে বিপুল পরিমাণ সোনা বিক্রি করেছে। যখন সাধারণ মানুষ মুদ্রাস্ফীতির ভয়ে সোনা কিনতে শুরু করে, তখন বাজারে সোনার সরবরাহ ঠিক রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ককে তাদের রিজ়ার্ভ থেকে সোনা ছাড়তে হয়।
অস্থির ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেকেই আশা করেছিলেন মূল্যবান ধাতুর দাম চড়চড় করে বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে ঠিক উল্টো। বিশ্ববাজারে সোনার দাম প্রতি আউন্স ৪,৫০০ ডলারের নীচে নেমে আসার অন্যতম কারণ যুদ্ধ বলে মনে করছেন অনেকেই। যুদ্ধের ডামাডোলের পরিস্থিতিতে সোনায় বিনিয়োগ কি যুক্তিযুক্ত?
আর্থিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই ভাবে দাম অনেক দিন কমতে থাকবে এমনটা ভাবার কারণ নেই। প্রফিট বুকিংয়ের হিড়িক কমলে খুব তাড়াতাড়ি সোনার দাম আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। সেই কারণেই বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, যাঁরা সোনায় বিনিয়োগ করেন তাঁরা এখন সোনা কিনে রাখলে আগামী দিনে ভাল দাম পেতে পারেন।
বিশ্ব জুড়ে রাজনৈতিক অস্থির পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে সোনার চাহিদা কম থাকার কারণে দাম কমছে। যাঁরা খুব দ্রুত লাভের আশা করছেন, তাঁদের জন্য এই সময়টা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তেলের দাম এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বাজারে অস্থিরতা বজায় থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞেরা এটাও মনে করছেন, দুই ধাতুর দাম অতিরিক্ত দ্রুত গতিতে চড়েছিল। ফলে এই বুদ্বুদ ফাটা স্বাভাবিক। ঠিক যে ভাবে শেয়ারবাজার অনেকটা উপরে ওঠার পরে লগ্নিকারীদের মুনাফা তুলে নেওয়ার কারণে বিভিন্ন শেয়ারের দর কিছুটা নেমে আসে। এতে বাজারে ভারসাম্য ফেরে। শেয়ারবাজারে ধস নামলে অনেক সময় বিনিয়োগকারীরা তাদের লোকসান সামাল দিতে বা নগদের প্রয়োজনে সোনা বিক্রি করে দেন। বর্তমানের অস্থির বাজারেও সেই প্রবণতা দেখা গিয়েছে।
জেপি মরগ্যান এবং গোল্ডম্যান স্যাকসের মতো আর্থিক সংস্থাগুলির পূর্বাভাস, ২০২৬-এর শেষে বা ২০২৭-এর শুরুতে সোনার দাম প্রতি আউন্স ৫,০০০ থেকে ৫,৪০০ ডলারে পৌঁছোতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলোর সোনা কেনার প্রবণতা এখনও অব্যাহত রয়েছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে দাম বাড়াতে সাহায্য করবে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য এই দামের পতন একটি ভাল সুযোগ বলে মনে করছে সংস্থাগুলি।