ভারত মহাসাগর দখলে মরিয়া বেজিং, ‘বন্ধু দেশের’ যমজ দ্বীপে ২৩০০ কোটি টাকার গোপন ঘাঁটি গড়ে মাত দিচ্ছে নয়াদিল্লি?
ভারত জানিয়েছিল, মরিশাসের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সুসম্পর্ক বজায় রাখতে যমজ দ্বীপের অধিবাসীদের উন্নয়নের জন্য ২৫ কোটি ডলার বা ২৩০০ কোটি টাকার অর্থসাহায্য করা হবে। এই সংবাদ প্রচারিত হওয়ার পর থেকেই ভারত মহাসাগরে উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করে।
ভারত মহাসাগরের বুকে প্রায় অখ্যাত দ্বীপপুঞ্জ। পূর্ব আফ্রিকায় থাকা দু’টি ক্ষুদ্র দ্বীপ নিয়ে গঠিত দ্বীপপুঞ্জটি। যমজ দ্বীপের মালিকানা রয়েছে ভারত মহাসাগরের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের দ্বীপরাষ্ট্র মরিশাসের হাতে। ভৌগোলিক ভাবে মরিশাসের মূল ভূখণ্ড থেকে অনেকটাই দূরে থাকা দ্বীপপুঞ্জটির নাম অ্যাগালেগা।
দ্বীপপুঞ্জটি মূলত দু’টি প্রধান দ্বীপ নিয়ে গঠিত— উত্তর অ্যাগালেগা এবং দক্ষিণ অ্যাগালেগা। দ্বীপ দু’টিকে যুক্ত করেছে একটি সরু বালির রেখা বা স্যান্ডবার। মরিশাসের রাজধানী পোর্ট লুইসের উত্তর প্রান্ত থেকে অ্যাগালেগার দূরত্ব প্রায় ১,১০০ কিলোমিটার। আপাত শান্ত সেই দ্বীপ দু’টিকে নিয়েই উত্তেজনার ঢেউ উঠেছে ভারত মহাসাগরীয় এলাকায়।
ভারত মহাসাগরে চিনের দাপাদাপি বন্ধ করতে দক্ষিণে নিজেদের কৌশলগত উপস্থিতি আরও বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারত। সে কারণে ৩৫০ অধিবাসী নিয়ে গঠিত এই ছোট্ট ভূখণ্ডই নয়াদিল্লির সামরিক কৌশল বৃদ্ধির নতুন ঘাঁটি বলে পরিচিত হতে শুরু করেছে। ২০২৭ সালে মরিশাসের সরকারের কাছ থেকে এই দু’টি দ্বীপের লিজ় নেয় ভারত।
ভারত জানিয়েছিল, মরিশাসের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সুসম্পর্ক বজায় রাখতে অ্যাগালেগা ও তার অধিবাসীদের উন্নয়নের জন্য ২৫ কোটি ডলার বা ২৩০০ কোটি টাকা অর্থসাহায্য করা হবে। এই সংবাদ প্রচারিত হওয়ার পর থেকেই ভারত মহাসাগরে উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করে। নয়াদিল্লির এই বয়ানে সন্তুষ্ট হয়নি বিদেশের বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম।
আল জাজ়িরার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, অ্যাগালেগা দ্বীপে নয়াদিল্লি সামরিক ঘাঁটি তৈরির কাজ করছে। সেই প্রতিবেদনে উপগ্রহচিত্রের প্রমাণ-সহ আল জাজ়িরা দাবি করে যে, বিমানঘাঁটি ও বন্দর গড়ার মোড়কে সামরিক শক্তিকে জোরদার করার কৌশল নিয়েছে ভারত। যদিও ভারত ও মরিশাস গোড়া থেকেই এই দাবি নস্যাৎ করে এসেছে।
আরও পড়ুন:
দু’পক্ষই জানিয়েছে, ভারত-মরিশাস কৌশলগত প্রকল্পের অংশ হল নতুন এয়ারস্ট্রিপ এবং সেন্ট জেমস জেটি। এতে সামুদ্রিক নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটবে। ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং মরিশাসের প্রধানমন্ত্রী প্রভিন্দ জগন্নাথ যৌথ ভাবে উদ্বোধনও করেছেন নতুন পরিকাঠামো। তবে এই পরিকাঠামোগুলি অ্যাগালেগার অধিবাসীদের উন্নয়নের কোনও কাজেই ব্যবহার করা হবে না বলে আল জাজ়িরার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
অ্যাগালেগার যাত্রাপথ মোটেও মসৃণ নয়। দ্বীপটিতে কোনও নিয়মিত বাণিজ্যিক উড়ানের ব্যবস্থা নেই। সাধারণত মরিশাস থেকে জাহাজ বা বিশেষ সরকারি বিমানের মাধ্যমে এখানে যোগাযোগ রক্ষা করা হয়। সেই সমস্যাকে মাথায় রেখে দ্বীপটিতে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ একটি অত্যাধুনিক রানওয়ে তৈরি করা হয়েছে। এটি বড় আকারের সামরিক বা অসামরিক বিমান অবতরণে সক্ষম।
জাহাজ চলাচলের সুবিধার্থে সেন্ট জেমস জেটি নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে বড় জাহাজ এখন সরাসরি এখানে নোঙর করতে পারে। ভারত মহাসাগরের উপর এই ছোট্ট দ্বীপটিতে ভারতীয় কর্মীরা বেশ কিছু নির্মাণকার্যে হাত লাগিয়েছেন। পরিকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ চলছে। সেই কর্মকাণ্ড দেখে বিভিন্ন দেশের সামরিক কর্তাদের কপালে ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নয়াদিল্লি জানিয়েছে, এই পরিকাঠামো বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নৌ সম্পর্কের উন্নয়নে কাজে লাগবে।
ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় ভারতের নিরাপত্তা সংক্রান্ত নীতিকে মজুবত করবে এই পরিকাঠামো। সমুদ্রে নজরদারিতেও কাজে লাগবে। এ ছাড়াও আবাসন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং স্বাস্থ্যসেবার জন্য ছোটখাটো পরিকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সাহায্য করবে। কারণ দ্বীপের ৩৫০ জন বাসিন্দা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রধানত নারকেল চাষ ও মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন।
আরও পড়ুন:
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ়ের দাবি, ভারতের এই পরিকাঠামো নির্মাণের উদ্দেশ্য হল অ্যাগালেগাকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতের নজরদারি ঘাঁটি তৈরি। এতে উপকূলীয় রেডার নজরদারি ব্যবস্থা থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষক স্যামুয়েল ব্যাশফিল্ডের দাবি, উপগ্রহচিত্রে অ্যাগালেগায় তৈরি টারম্যাক অ্যাপ্রনের উপর ৬০ মিটার চওড়া দু’টি ইমারত দেখা গিয়েছে। সেটি ভারতীয় নৌবাহিনীর পি-৮আই বিমান রাখার হ্যাঙার হতে পারে।
পি-৮আই হল একটি বোয়িং ৭৩৭ বিমান। ডুবোজাহাজ খুঁজে বার করে আক্রমণ এবং সামুদ্রিক যোগাযোগ পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ ভাবে তৈরি করা হয়েছে এটিকে। স্যামুয়েলের দাবি, দ্বীপবাসীরা ইতিমধ্যেই বিমানঘাঁটিতে সেই বিমানটির ছবি তুলেছেন।
অ্যাগালেগা দ্বীপপুঞ্জ ভারত মহাসাগরের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত হওয়ায় এর ভৌগোলিক গুরুত্ব অপরিসীম। অ্যাগালেগার পূর্বে রয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি। দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের বুকে ছোট্ট এক প্রবালদ্বীপ— দিয়েগো গার্সিয়া। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে আমেরিকাকে নৌঘাঁটি তৈরির জন্য দিয়েগো গার্সিয়ার জমি লিজ় দেয় ব্রিটিশ সরকার। এই নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ৫০ বছরের চুক্তি হয়েছিল, যা সম্প্রতি আরও ২০ বছর বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে, ২০৩৬ পর্যন্ত সেখানে নৌবহর রেখে দিব্যি ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় নজরদারি চালাতে পারবে আমেরিকা।
অ্যাগালেগা দ্বীপপুঞ্জ ভারত মহাসাগরের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত হওয়ায় এর ভৌগোলিক গুরুত্ব অপরিসীম। অ্যাগালেগার পূর্বে রয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি। দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের বুকে ছোট্ট এক প্রবালদ্বীপ— দিয়েগো গার্সিয়া। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে আমেরিকাকে নৌঘাঁটি তৈরির জন্য দিয়েগো গার্সিয়ার জমি লিজ় দেয় ব্রিটিশ সরকার। এই নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ৫০ বছরের চুক্তি হয়েছিল, যা সম্প্রতি আরও ২০ বছর বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে, ২০৩৬ পর্যন্ত সেখানে নৌবহর রেখে দিব্যি ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় নজরদারি চালাতে পারবে আমেরিকা।
মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রে ভারতের কাছে তথ্য এসেছে সেশেলস-সহ ভারত মহাসাগরের বেশ কিছু দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি গড়ার জন্য সক্রিয়তা শুরু করেছে শি জিনপিং সরকার। মরিশাসের সঙ্গে জোরালো দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে একের পর এক পর্যটনকেন্দ্র স্থাপন করছে তারা। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা এবং কৌশলগত প্রশ্নে ভারত এবং চিনের মধ্যে আকচাআকচি ক্রমশ বাড়ছে। ভারত মহাসাগরে দু’পক্ষই নিজেদের প্রভাব ও উপস্থিতি বাড়াতে তৎপর। চিনকে পাল্টা দিতে স্বাভাবিক ভাবেই মরিশাসের আরও ‘কাছের লোক’ হয়ে উঠতে চাইছে নয়াদিল্লি।
মরিশাসের অ্যাগালেগা দ্বীপ দু’টির অবস্থান এমনই যে, সেখান দিয়ে বিশ্বের দুই তৃতীয়াংশ জ্বালানিবাহী জাহাজ যাতায়াত করে। পশ্চিম এশিয়া থেকে আসা তেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ট্রানজ়িট পয়েন্ট’ মরিশাসের দ্বীপ দু’টি। বেজিং এখানেও তার নৌবাহিনীর বহর গত কয়েক বছরে অনেকটা বাড়িয়েছে। দ্রুত আর্থিক বৃদ্ধির পথে ধাবমান চিন যে ভারত মহাসাগরে তার ডানা বিস্তার করতে চাইছে, সেটা ভারতের নজর এড়ায়নি। চিনের নৌযুদ্ধের পাল্টা হিসাবে এই দ্বীপ দু’টিতে ঘাঁটি তৈরি করতে চাইছে ভারত, দাবি আন্তর্জাতিক সামরিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের।
কূটনৈতিক সূত্রে খবর, চিন ‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ নীতির মাধ্যমে ভারতকে ঘিরে নজরদারি তৈরির কৌশল নিয়েছে। চিন তার জ্বালানি সরবরাহের পথ সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি ভারত মহাসাগরে ভারতীয় নৌসেনার প্রভাব ঠেকাতে সমুদ্রপথে ভারতকে ঘিরে ধরার এই কৌশল নিয়েছে। অ্যাগালেগা ভারতের ক্ষেত্রে ভারত মহাসাগরে এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ চোক পয়েন্ট ঠিক যেমনটি আন্দামান নিকোবরের নিকটস্থ মলাক্কা প্রণালী। দেশের প্রতিরক্ষা এবং সামরিক দিক থেকে কৌশলগত ভাবে মলাক্কা প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ। ভারত মহাসাগরে সারা বছর গড়ে প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার জাহাজ চলাচল করে। তার মধ্যে শুধু এই মলাক্কা প্রণালী দিয়েই যাতায়াত করে প্রায় ৭০ হাজার জাহাজ।
ফলে এই প্রণালীর উপর কড়া নজরদারি থাকে ভারতীয় সেনার। চিনের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ মলাক্কা প্রণালী। সে দেশের পশ্চিম উপকূল থেকে চিন সাগর, মলাক্কা প্রণালী ধরে ভারত মহাসাগর হয়ে আফ্রিকা উপকূল ও পশ্চিম এশিয়া, এমনকি সুয়েজ খাল ধরে ইউরোপে পৌঁছোনোরও সমুদ্রপথ এটি। মলাক্কা প্রণালীতে প্রভাব বাড়াতে মালয়েশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করতে সক্রিয় চিন।
মরিশাসের অ্যাগালেগায় ঘাঁটি তৈরি করে বেজিংকে বার্তা দিয়ে রাখতে চায় নয়াদিল্লি। ভারত মহাসাগরের বিশাল জলসীমায় আফ্রিকা থেকে আসা জাহাজ চলাচল নিরাপদ করতে এই চোক পয়েন্টটি ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর ৯০ শতাংশেরও বেশি আন্তর্জাতিক ডেটা ট্র্যাফিক সমুদ্রতলে থাকা অপটিক্যাল ফাইবার কেব্লের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। ভারত মহাসাগর দিয়ে যাওয়া এই কেব্লগুলি সারা বিশ্বে তথ্য সরবরাহের মেরুদণ্ড।
মরিশাসের সরকার-বিরোধী দলের একাংশের দাবি, মহাসাগরের তলদেশ দিয়ে আদানপ্রদান হওয়া চিনা সামরিক তথ্য কব্জা করতে চায় ভারত। তাই কেব্ল নেটওয়ার্কে চিনা আধিপত্য বন্ধ করে ভারতীয় সংস্থাকে বরাত দিতে মরিশাস সরকারকে চাপ দিচ্ছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা।
ভারতের বক্তব্য, তারা মরিশাসকে একটি বিশ্বস্ত ডিজিটাল অংশীদার হিসাবে গড়ে তুলতে চাইছে। মূল উদ্দেশ্য, ভারত মহাসাগরে থাকা অপটিক্যাল ফাইবার কেব্লগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে দেখা, সম্ভাব্য শত্রুপক্ষ (বিশেষ করে চিন) যেন সেখানে আড়ি পাততে না পারে। ভারত এখন আইটি সার্ভিস, সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ এবং তথ্যভান্ডারের মতো ক্ষেত্রে মরিশাস, সেশেলস বা মলদ্বীপকে সহায়তা করছে, যাতে দেশগুলি চিনের ওপর নির্ভরশীল না থাকে।
সামরিক ঘাঁটি তৈরি নিয়ে অ্যাগালেগার স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ালেও মরিশাস সরকার অবশ্য নয়াদিল্লিকেই সমর্থন করে আসছে। অ্যাগালেগার পরিকাঠামো ও সামরিক নজরদারির মাধ্যমে এক দিকে যেমন ভারত মহাসাগরে চিনের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি কৌশলকে রুখতে চায় ভারত, তেমনই প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গেও সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গভীর করতে চায়। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেকে একটি স্থিতিশীল শক্তি হিসাবে প্রমাণ করতে চায়।