ইরানের কাছে মার খাচ্ছে আমেরিকা? না কি নিজেদের রণতরীতে আগুন ধরিয়েছেন ‘হতাশ’ মার্কিন সেনারা? রহস্যের নাম জেরাল্ড ফোর্ড
কিন্তু গত ১২ মার্চ সৌদি আরব উপকূলের অদূরে লোহিত সাগরে হঠাৎই অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয় ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড। সেন্টিকম একটি বিবৃতিতে বলেছে, ‘‘এই অগ্নিকাণ্ড যুদ্ধজনিত নয়।’’ জাহাজের প্রধান ‘লন্ড্রি স্পেস’ থেকেই নাকি আগুনের সূত্রপাত।
ভূমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরীয় এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের মুখে পড়া মার্কিন নৌসেনার বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডকে গ্রিসের বন্দরকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পেন্টাগন। পশ্চিম এশিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টিকম) নির্দেশ মেনে যুদ্ধজাহাজটি ইতিমধ্যেই ‘সংঘাত-ক্ষেত্র’ থেকে গ্রিসের পথে রওনা দিয়েছে বলে খবর।
২০২২ সালে ভার্জিনিয়ায় মার্কিন নৌবাহিনীর ঘাঁটি থেকে সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছিল বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড। আটলান্টিক মহাসাগরে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট ‘নেটো’র স্ট্রাইক কোরের অংশ হিসাবে কাজ করেছে এই রণতরী। ভেনেজ়ুয়েলায় মার্কিন সেনার সাম্প্রতিক অভিযানেও এই যুদ্ধজাহাজটি ব্যবহার করেছিল পেন্টাগন।
এর পর ফেব্রুয়ারিতে ভূমধ্যসাগরের অভিমুখে রওনা দিয়েছিল মার্কিন রণতরীটি। ইরানের বিরুদ্ধে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র গোড়া থেকেই অংশ নিয়েছিল মার্কিন নৌসেনার সবচেয়ে দামি বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড।
কিন্তু গত ১২ মার্চ সৌদি আরব উপকূলের অদূরে লোহিত সাগরে হঠাৎই অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয় ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড। সেন্টিকম একটি বিবৃতিতে বলেছে, ‘‘এই অগ্নিকাণ্ড যুদ্ধজনিত নয়।’’ জাহাজের প্রধান ‘লন্ড্রি স্পেস’ থেকেই নাকি আগুনের সূত্রপাত।
অগ্নিকাণ্ডে জাহাজের প্রপালশন প্ল্যান্টের (যান্ত্রিক পরিচালন ব্যবস্থা) কোনও ক্ষতি হয়নি বলে জানিয়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছিল, ‘‘বিমানবাহী রণতরীটি পুরোপুরি কার্যকর রয়েছে।’’ কিন্তু পরে মার্কিন নৌসেনার এক কর্তা জানান, যুদ্ধজাহাজটিকে মেরামতির জন্য সাময়িক ভাবে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের সৌদা উপকূলে পাঠানো হচ্ছে। সৌদা বে-তে আমেরিকার একটি নৌঘাঁটি রয়েছে।
আরও পড়ুন:
কিন্তু সত্যিই কি প্রধান ‘লন্ড্রি স্পেস’ থেকে আগুন ধরেছিল মার্কিন নৌসেনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিমানবাহী রণতরীতে? তা নিয়ে উঠছে নানাবিধ প্রশ্ন। বিষয়টি নিয়ে নাকি তদন্ত শুরু করেছে মার্কিন নৌবাহিনীও। ইচ্ছাকৃত ভাবে আগুন ধরানো হয়েছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
ঠিক কী ঘটেছিল রণতরীটিতে? মার্কিন নৌবাহিনীর বিবৃতি অনুযায়ী, লন্ড্রি বিভাগের একটি ড্রায়ারের ভেন্ট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। সেই আগুন ধীরে ধীরে ভেন্টিলেশন সিস্টেমের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আগুন দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলছিল, যা সম্পূর্ণ রূপে নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যায়।
আগুন অবশেষে নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও রণতরীর বেশ কিছু অংশ ক্ষতির মুখে পড়ে। আহত হন দু’জন নাবিক। যদিও তাঁদের অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল বলে জানা গিয়েছে। যদিও নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, রণতরীটির যান্ত্রিক পরিচালন ব্যবস্থা এবং মূল যুদ্ধ সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
এর পরেই রণতরীটি মেরামতির জন্য গ্রিসে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় পেন্টাগন। সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ন’মাস সমুদ্রে এবং ইরান সংঘাতের জন্য লোহিত সাগরে মোতায়েন থাকার পর, রণতরীটি এখন গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। অগ্নিকাণ্ড নিয়ে শুরু হয়েছে তদন্তও। সমুদ্রে দীর্ঘ সময় ধরে মোতায়েন থাকার কারণে রণতরীটির রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যাগুলি অগ্নিকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
পাশাপাশি খবর, মার্কিন নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের অনেকের সন্দেহ যে রণতরীর কর্মীদেরই একাংশ ওই অগ্নিকাণ্ডের জন্য দায়ী। সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল বিজ়নেস টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেরাল্ড আর ফোর্ডে আগুন লাগার ঘটনায় নাবিকদের ইচ্ছাকৃত বা অবহেলামূলক কোনও ভূমিকা ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখছেন কর্মকর্তারা।
নাবিকদের উপর অভ্যন্তরীণ চাপ ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের কর্মীরা অনেক দিন ধরেই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছিলেন। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের আবহে আমেরিকার বিমানবাহী ওই রণতরীতে পাঁচ হাজারেরও বেশি নৌসেনা ছিলেন। কিন্তু সে তুলনায় শৌচালয় হাতেগোনা। ফলে শৌচাগারের বাইরে লম্বা লাইন থাকছিল বেশির ভাগ সময়। মাঝেমধ্যে নৌসেনাদের ৪০-৪৫ মিনিট ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছিল।
ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১,১০,০০০ কোটি টাকার এই রণতরীর শৌচাগার সমস্যাটি কেবল সাধারণ ‘ব্লক’ নয়, বরং গভীর নকশাগত ও ইঞ্জিনিয়ারিং ত্রুটি বলেও চিহ্নিত হয়। ২০২০ সালে এই ত্রুটি ধরা পড়ে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে মোতায়েন থাকার কারণে সমস্যা প্রকট হয়। মূলত জাহাজে প্রচলিত ব্যবস্থার বদলে এর পয়ঃপ্রণালীতে ‘ভ্যাকুয়াম’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এর পাইপগুলি অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ। ৪৬০০ নাবিকের দৈনিক বর্জ্য বহনের ক্ষমতা এই পাইপলাইনের নেই। তার ওপর সমুদ্রের নোনা জলের প্রভাবে পাইপের ভিতরে ক্যালশিয়াম জমে নিকাশি পথ আরও সরু হয়ে যাচ্ছিল।
রণতরীটি ১০টি ভ্যাকুয়াম জ়োনে বিভক্ত। একটি শৌচাগারের ভাল্ভ বা সেন্সর বিকল হলে পুরো জ়োনের নিকাশি ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঝেমধ্যেই ‘অ্যাসিড ফ্লাশ’ করতে হচ্ছিল, যার প্রতি বারে খরচ পড়ে ৪ লক্ষ ডলার (প্রায় ৩ কোটি ৬৪ লক্ষ টাকা)। এবং এটা নৌসেনা ঘাঁটিতে নোঙর না করে করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া প্রতি দিন অন্তত এক বার প্রকৌশলীদের হাতে-কলমে পাইপ পরিষ্কার করতে হচ্ছিল। পেন্টাগন দাবি করেছিল, এই সমস্যা যুদ্ধ-প্রস্তুতিতে সরাসরি প্রভাব না ফেললেও দীর্ঘ মেয়াদে নাবিকদের সমস্যা তৈরি করবে। ফলে জেরাল্ড আর ফোর্ডে শৌচাগার সংক্রান্ত সমস্যা অনেক দিন ধরেই সহ্য করছিলেন নাবিকেরা।
এমনটাও মনে করা হচ্ছে, সমুদ্রে দীর্ঘ দিন কাটানোর পর জেরাল্ড আর ফোর্ডের নৌসেনা এবং অন্য কর্মীদের মনোবল ভেঙে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে। এমনকি, কেউ কেউ নাকি নৌবাহিনী পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভাবছিলেন। ফলে সন্দেহ করা হচ্ছে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দীর্ঘ দিন রণতরীতে আটকে পড়ার কারণে নাবিকদের মধ্যে হতাশা এবং ক্ষোভের জন্ম নিয়েছিল। আর সে কারণেই তাঁরা বিক্ষুদ্ধ হয়ে আগুন ধরিয়ে দেন রণতরীটিতে।
এই সন্দেহ যেমন পশ্চিম এশিয়ায় মোতায়েন থাকা মার্কিন বাহিনীর মনোবল এবং অভিযানগত চাপ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, তেমনই অনেকে আবার প্রশ্ন তুলেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়েও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে মার্কিন রণতরী জেরাল্ড আর ফোর্ড। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিজেদের সেই ব্যর্থতার কথা ঢাকতেই লন্ড্রি বিভাগ থেকে আগুন ধরার তত্ত্ব খাড়া করতে চাইছে পেন্টাগন। নাবিকদের দিকেও দায় চাপানোর চেষ্টা চলছে। অন্তত তেমনটাই মনে করছেন যুদ্ধ বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
অন্য দিকে, বৃহস্পতিবার পশ্চিম এশিয়ার একটি অজ্ঞাত মার্কিন ঘাঁটিতে একটি আমেরিকার বায়ুসেনার এফ-৩৫এ বিমান জরুরি অবতরণ করা নিয়েও বিবিধ জল্পনা ছড়িয়েছে। এফ-৩৫এ লাইটনিং ২ হল মার্কিন বিমানবাহিনীর সবচেয়ে দামি বিমান। স্টেলথ বিমানটি এমন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি যে তা শত্রুদের রাডারে ধরা পড়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।
তা সত্ত্বেও, বৃহস্পতিবার এফ-৩৫এ বিমান জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয় বলে নিশ্চিত করেছে পেন্টাগন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স জানিয়েছেন, এফ-৩৫এ বিমানটি ইরানের আকাশে অভিযান চালানোর সময় পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। যদিও বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করেছে এবং চালকের অবস্থা স্থিতিশীল বলে দাবি করেছে তারা।
অন্য দিকে, ইরানের সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)’-র দাবি, তাদের তরফেই আঘাত হানা হয়েছে আমেরিকার সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমানটিতে। ইরানের সামরিক বাহিনীর দাবি, তাদের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র এফ-৩৫ বিমানটির বাম পাশে আঘাত হানে। ইরানের গোলাবর্ষণে বিমানটি অবতরণ করতে বাধ্য হয়েছিল কি না বা ইরান কোনও বিশেষ যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করে যুদ্ধবিমানটিকে নামিয়েছিল কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে আমেরিকা জানিয়েছে, ইরানের দাবি তদন্ত করে দেখছে তারা।
ফলে জল্পনা ছড়িয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে জল এবং আকাশ— উভয় জায়গাতেই ইরানের হাতে মার খাচ্ছে আমেরিকা। জেরাল্ড আর ফোর্ডে আগুন এবং এফ-৩৫ বিমানের জরুরি অবতরণ, তারই নিদর্শন বলেও মনে করেছেন কেউ কেউ।