ভাই, বাবা খুঁজে নিয়ে আসেন গ্রাহক, পরিবারের সম্মতিতেই যৌনকর্মী হন মেয়েরা! ভারতে কোথায় রয়েছে এই প্রথা?
পারিবারিক সম্মতিতে এই সম্প্রদায়ের মেয়েদের যৌনবৃত্তিতে যোগ দেওয়া ব্যাপক ভাবে প্রচলিত। পরিবারের মেয়েরা অবিবাহিত থাকতে বাধ্য হন এবং ত্রিশের কোঠা পেরিয়েও তাঁরা এই পেশায় যুক্ত থাকেন।
পূর্বপুরুষের তৈরি করা নিয়ম। সেই নিয়মই পালন করে আসছেন বেদিয়া বা বেদে সম্প্রদায়ের মেয়েরা। পারিবারিক সম্মতিক্রমে যৌনপেশাকে বেছে নিতে হয় বেদিয়ার মেয়েদের। পিত্রালয়ে থাকতে হলে পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব তুলে নিতে হয় পরিবারের মেয়েদের। এমনটাই এই সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য।
বেদিয়া বা বেদেরা হল ভারতের একটি অন্যতম প্রান্তিক এবং ঐতিহাসিক ভাবে বঞ্চিত যাযাবর জাতি। মূলত মধ্য ও উত্তর ভারতে (যেমন মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ) দেখা মেলে এদের। কিছু সংখ্যক বেদিয়া বা বেদের সন্ধান মেলে ঝাড়খণ্ড এবং এই রাজ্যেও।
বেদিয়া শব্দটি মূলত হিন্দি শব্দ ‘বেহেরা’ থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়, যার অর্থ অরণ্যবাসী বা বনের বাসিন্দা। এই সম্প্রদায়ের মানুষদের স্থায়ী ঠিকানা বলে কিছু হয় না। তাঁবু বা নৌকায় জীবন অতিবাহিত করেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
পারিবারিক সম্মতিতে বেদিয়া সম্প্রদায়ের মেয়েদের যৌনপেশায় যোগ দেওয়া ব্যাপক ভাবে প্রচলিত। বেদিয়া পরিবারে জন্ম নেওয়া নারীরা বহু বছর অবিবাহিত থাকেন। মূলত পরিবারের অর্থনৈতিক চাহিদা মেটানোর জন্য তাঁরা দেহব্যবসায় লিপ্ত হন। এতে সামাজিক কোনও লজ্জা নেই।
বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, বেদিয়া উপজাতির বিরুদ্ধে প্রায়ই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠত। দেশে রাজতন্ত্রের অবসান এবং রাজ্যের আইন পরিবর্তনের পর, বেদিয়াদের বেঁচে থাকার আর কোনও উপায় ছিল না। বাধ্য হয়ে বেদিয়া মহিলারা যৌনপেশায় নিযুক্ত হন।
আরও পড়ুন:
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে বিদ্রোহী রাজারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাঁদের সেনাবাহিনীকে সাহায্য করার জন্য বেদিয়া সম্প্রদায়ের লোকদের হয় বার্তাবাহক অথবা গুপ্তচর হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। এর ফলে বিদ্রোহ শেষ হওয়ার পর তাঁদের অপরাধী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়।
যৌনপেশা ধীরে ধীরে এই প্রাচীন উপজাতিটির জীবিকার প্রধান উৎস হয়ে ওঠে। গোষ্ঠির মহিলারাই কিশোরীদের ভবিষ্যতে যৌনকর্মী হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ দেন। বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছোনোমাত্রই মেয়েদের এই পেশায় আনা হত। এই মেয়েরা শহরে এবং গ্রামে পেশাদার যৌনকর্মী হিসাবে কাজ করতে শুরু করেন। অবাক করার বিষয় হল তাঁদের বাবা এবং ভাইয়েরা মেয়েদের জন্য গ্রাহক খুঁজে আনার কাজ করতেন।
বেদিয়া সম্প্রদায় মধ্যপ্রদেশ এবং মধ্য ভারতের অনেক গ্রামে বাস করে। যে গ্রামগুলি শহরের কাছাকাছি, সেখানকার গ্রাহকদের পক্ষে নিয়মিত যৌনকর্মীদের কাছে যাওয়া সহজ হয়। যেগুলি দূরে, সেখান থেকে মাঝেমধ্যে বেদিয়া সমাজের যৌনকর্মীরাও চাহিদা অনুযায়ী গ্রাহকের কাছে যান।
বেদিয়া সম্প্রদায়ের পুরুষেরা অর্থনৈতিক ভাবে নির্ভর করেন মেয়েদের উপর। উপার্জন না করলেও বেদিয়া পুরুষদের বিয়েতে কোনও বাধা নেই। তবে বেদিয়া সম্প্রদায়ের বধূদের দেহব্যবসায় লিপ্ত হওয়ার কোনও নিয়ম নেই। পরিবারের দৈনন্দিন কাজকর্ম ও সন্তানদের দেখভাল করাই তাঁদের কাজ।
আরও পড়ুন:
বেদিয়া পরিবারের মেয়েরা বহু দিন অবিবাহিত থাকতে বাধ্য হন এবং ত্রিশের কোঠা পেরিয়েও তাঁরা যৌনপেশায় যুক্ত থাকেন। যে কোনও ধরনের প্রেমের সম্পর্ক কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ বেদিয়া সমাজে।
বেদিয়াদের সমাজ পুরুষ উপার্জনকারী, নারীরা গৃহকর্ত্রী, এই আদর্শ থেকে অনেকটাই ভিন্ন। বেদিয়াদের অর্থনীতি প্রায় অধিকাংশই মেয়েদের যৌনবৃত্তির উপর নির্ভরশীল। আর পরিবারের বধূরা দেন কায়িক শ্রম। দুই স্তরে নারীর শ্রম দ্বারা টিকে রয়েছে ভারতের প্রাচীন এই সম্প্রদায়টি। অন্য দিকে বেদিয়া পুরুষদের পরিবারের পরজীবী সদস্য বলে মনে করা হয়।
বয়ঃসন্ধিকালে পদার্পণের পর একটি সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই সম্প্রদায়ের মেয়েদের এই পেশায় দীক্ষিত করা হয়। সম্প্রদায়ের পুরুষেরা প্রায়ই বাইরে থেকে মেয়েদের বিয়ে করে আনেন, যাতে তাঁদের ঘরের মেয়েরা অবিবাহিত থেকে উপার্জনে সহায়তা করতে পারেন।
বেদিয়া সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা সুষ্ঠু ভাবে চালানোর দায়িত্ব থাকে মূলত পরিবারের বিবাহিত নারীদের (বধূদের) উপর। তাঁরা রান্না, ঘর পরিষ্কার এবং যৌথ পরিবারের সেবা করে পরিবারের ভিত্তি দৃঢ় ভাবে ধরে থাকেন। বাহ্যিক বা অর্থনৈতিক শ্রমের দায়িত্ব বর্তায় পরিবারের অবিবাহিত নারীদের (মেয়ে বা বোনদের) উপর। তাঁদের মূল কাজ হল দেহব্যবসার মাধ্যমে পরিবারের জন্য আয় নিশ্চিত করা। বেদিয়া অঞ্চলের এক জন যৌনকর্মী দিনে ১,২০০ থেকে ২,০০০ টাকা আয় করেন। এটি সরকার অনুমোদিত ১৪৯ টাকার মজুরির ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি।
পেশার কারণে বেদিয়া নারীদের প্রায়শই বাইরে বা অন্য শহরে পাড়ি জমাতে হয়। তাই তাঁদের সন্তানদের সুরক্ষার জন্য একটি চমৎকার অভ্যন্তরীণ সামাজিক নিরাপত্তা জাল তৈরি করা হয়েছে। অবিবাহিতা ননদ বা কন্যাদের সন্তানদের নিজের সন্তানের মতো পালন করে থাকেন বেদিয়া পরিবারের বধূরা। মামিমা বা দিদিমার কাছে বড় হয় পরিবারের মেয়ের সন্তান।
বেদিয়া সম্প্রদায়ের ভিতরের পারিবারিক ও শ্রম কাঠামোর অত্যন্ত নিখুঁত এবং বাস্তবসম্মত একটি সমাজতাত্ত্বিক দিক তুলে ধরেছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। গবেষকদের গবেষণায় এই সুনির্দিষ্ট পারিবারিক নকশাটি উঠে এসেছে। একে শ্রমের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খল বা একটি পারস্পরিক নির্ভরশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলা চলে।
ব্রিটিশ আমলে এই সম্প্রদায়কে ‘অপরাধী উপজাতি’ হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। যদিও স্বাধীনতার পর এই তকমা সরিয়ে নেওয়া হয়। তবুও দীর্ঘ দিনের সামাজিক কলঙ্ক ও বৈষম্যের কারণে মূলধারার সমাজ এবং কর্মসংস্থান থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন বেদিয়ারা।
বেদিয়া নারীদের এই পরিস্থিতি স্বেচ্ছাকৃত বিষয় নয়। বরং এটি একটি গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কটের ফল। চরম দারিদ্র এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে এই প্রথা দীর্ঘ দিন টিকে রয়েছে। এখনও প্রত্যন্ত গ্রামে বেদিয়া নারীরা পরিবারের চাপে এই পেশা বেছে নিতে বাধ্য হন।
বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ এবং অসরকারি সংগঠনের সহায়তায় এই সম্প্রদায়ের নতুন প্রজন্মকে শিক্ষার আলোয় আনা হচ্ছে। যুবতী ও শিশুদের এই চক্র থেকে বার করে এনে মূলধারার সমাজে পুনর্বাসিত করার চেষ্টা চলছে।