×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৪ মার্চ ২০২১ ই-পেপার

চুয়ান্ন

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
০৯ অগস্ট ২০২০ ০০:০৮
ছবি: অমিতাভ চন্দ্র

ছবি: অমিতাভ চন্দ্র

কোনও কথা না বলে ঘরে ঢুকে গিয়েছিল পুঁটি। আর আমি একা দাঁড়িয়ে ছিলাম। দেখছিলাম পাশের ঝাঁকড়া আম গাছে দুটো অদ্ভুত সুন্দর হলুদ পাখি কেমন ঠোঁটে ঠোঁট দিয়ে আদর করছে! আমার মনে পড়ে গিয়েছিল সেই স্কুল লাইফে, সন্ধের মুখে, বিদিশাদের বাড়ির ব্যালকনিটা! আমার মনে হয়েছিল, পুঁটির কি সে সব আর মনে আছে?

সে দিন আমি আর কথা না বাড়িয়ে চলে এসেছিলাম। আসার পথে কাকিমা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, এত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছি কেন। বলেছিলাম, একটা ফোন এসেছে। কাজ আছে।

আসলে আমার যে খারাপ লাগছিল খুব। কষ্ট হচ্ছিল। কেন হচ্ছিল? কিসের জন্য হচ্ছিল? না, আমি মনে আনতে চাইছিলাম না।

Advertisement

কাল আমি পুঁটির অফিসে ল্যান্ডলাইনে ফোন করে ওকে মনে করিয়ে দিয়েছিলাম এনার জিনিসগুলোর কথা। ও ছোট্ট করে বলেছিল, ‘‘কাল আসিস, এনে রাখব।’’

কেন, অফিসে কেন? বাড়িতে নয় কেন? আমি তো বাড়িতেই যাই। তা হলে? কিন্তু ল্যান্ডলাইনটা ও কেটে দিয়েছিল তত ক্ষণে।

ব্যাটার মাথার ঠিক নেই। আজকাল তো আকছার ব্রেক আপ হচ্ছে! লোকে কন্ট্রাসেপটিভ কিনছে লজেন্স কেনার মতো! দু’মিনিটের নুডলসের মতো এখন তো দু’মিনিটের প্রেম! সেখানে এই পুঁটিটা যে কোন ওয়ার্ম হোল দিয়ে এসে পৌঁছেছে এই সময়ের কলকাতায়, কে জানে!

আজ পুঁটি যেতে বলেছে অফিসে। কিন্তু এনেছে তো জিনিসগুলো? আমাকে বললেই পারে, আমিই ওর ঘর থেকে নিয়ে নিতাম। ওর ঘর আর জিনিসপত্তর এত দিন কোন এনা এসে গুছিয়ে দিয়েছে শুনি? আমি তো জানি ওর কোথায় কী থাকে! কিন্তু এখন ও যে মোডে আছে, সেখানে এ সব বললে যে কী রিঅ্যাক্ট করবে, কে জানে!

আমি মোবাইলটা বের করে রিজুর নাম্বারটা ডায়াল করলাম। এক ঘরেই তো বসে দুটো।

চার বার রিং হতেই ফোনটা ধরল রিজু। তার পর কেমন একটা উদ্বিগ্ন গলায় বলল, ‘‘তুইও খবর পেয়ে গিয়েছিস? আমরা নিয়ে যাচ্ছি মুকুন্দপুরের দিকে। তুই চলে আয়!’’

আমি যেন আচমকা গভীর গর্তে পড়ে গেলাম। কী বলছে রিজু? মুকুন্দপুর? সেখানে কী?

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘কী বলছিস?’’

রিজু ব্যস্ত গলায়, ‘‘কাকু, পুঁটির বাবা, পড়ে গিয়েছেন। অজ্ঞান। তুই চলে আয়। আমি ঠিকানা মেসেজ করছি। কুইক।’’ বলে কলটা কেটে দিল।

আমি ফোনটা হাতে করে দাঁড়িয়ে রইলাম বিধান সরণির রাস্তায়! পুঁটির বাবা অসুস্থ! আর পুঁটি? ও কী করছে? আমি যেন মনে মনে দেখতে পেলাম হলুদ পাঞ্জাবি পরা একটা ছেলে অসহায় ভাবে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। সহস্র বছর ধরে শুধু তাকিয়েই আছে গালে আবছা ক্লোরোফিল নিয়ে!

পুঁটি (দিন : আঠেরো)

খুব ভাল ফুটবল খেলত বাবা। কলকাতার ময়দানের বড় ক্লাবে খেলেছে দু’বছর। তার পর লেখাপড়ার জন্য আর খেলা চালাতে পারেনি। যাদবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং করে প্রথমে চাকরি করেছিল বরাউনি অয়েল রিফাইনারিতে। পরে কলকাতার একটা বড় ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম ‘বার্ড কোম্পানি’-তে। তার পর পারিবারিক ব্যবসা শুরু করে সবাই মিলে। নিজের ফিল্ডে খুব সফল বাবা। সবাই চেনে। সম্মানও করে।

বাবা চিরকাল চুপচাপ। গম্ভীর। জেঠু বা ছোটকা বাড়িতে থাকার সময় সারা ক্ষণ টুকটাক ইয়ার্কি ঠাট্টা করে, বাবা সে রকম নয়। তবে বাবাও যে খুব মজার কথা বলতে পারে, সেটা আমরা বহু বার দেখেছি।

সব কিছুই ঠিক আছে। শুধু একটাই সমস্যা বাবার। সিগারেট। এর আগেও বুকে কষ্ট হয়েছিল। ডাক্তার বলেছিল সিগারেট না খেতে। কয়েক দিন বন্ধ করে দিয়েও পরে আবার শুরু করেছে। সবাই নরম করে বারণ করে বাবাকে। বাবা পাত্তা দেয় না। শুধু তিতি কড়া ভাবে বলে। বকে। ঝগড়াও করে। কিন্তু তিতি তো আর সারা ক্ষণ বাবাকে পাহারা দিতে পারে না! বাবা সকালে লেকে হাঁটতে যায়। নিজে বাজার করতে পছন্দ করে। তার পর অফিসের সময় তো আছেই। সব কিছুর মাঝে টুকটাক করে কম সিগারেট খায় না।

আমার মনে হয়, যার শরীর তার নিজের হুঁশ না হলে তাকে কে বোঝাবে! এই যে শরীরটা এত খারাপ হল, সেটা তো এমনি এমনি নয়!

কয়েক দিন ধরেই অফিসে চাপা টেনশন চলছিল। হওয়া কাজ হাতের বাইরে চলে গিয়েছে দুটো। সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার জব। অবশেষে ধরা পড়েছে যে, অফিসেরই এক জন ছেলে সব কাজের প্রাইস বাইরে লিক করে দিচ্ছিল। বাবা এতে বেশ ভেঙে পড়েছিল ভিতরে ভিতরে। ছেলেটা নতুন হলেও বাবা খুব স্নেহ করত। সে এমন করতে পারে, কেউ বুঝতে পারেনি।

এই মনের উপর চাপ, অনিয়ম, বয়স, এই সব মিলিয়ে-মিশিয়েই বাবার বুকে একটা ধাক্কা লেগেছে। হার্ট অ্যাটাক।

এমন শব্দ করে নিজের চেম্বারে পড়ে গিয়েছিল বাবা, সবাই খুব ভয় পেয়েছিল। আমি শুধু যাইনি। কারণ তখন একা অফিসের ছাদে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম কেমন মেঘ ভেসে আসছে ওই গড়িয়াহাট আর গোলপার্কের মাঝের ‘মেঘমল্লার’ নামের বড় বাড়িটার মাথার উপর দিয়ে।

মেঘমল্লার! ওর পাশের রাস্তায় একটা অটো স্ট্যান্ড আছে। সেখান থেকে গড়িয়া যাওয়ার অটো ধরত এনা। আমি এগিয়ে দিয়ে আসতাম। লাইনে দাঁড়াতাম ওর সঙ্গে।

আমি ভাবছিলাম এনা তো মুখ মুছে, ‘কিছু হয়নি’ বলে চলে গেল। কিন্তু এই মেঘমল্লার, ওই লম্বা সিঁড়ির রেস্তরাঁ, ওই সাদার্ন অ্যাভিনিউ, রাসবিহারী মোড়, লেক মার্কেটের ফুলের দোকান... এ সব তো আর হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে না! এরা তো থেকে যাবেই আমাকে ঘুণপোকার মতো ভিতরে ভিতরে কুরে কুরে শেষ করে দেওয়ার জন্য। মাঝে মাঝে মনে হয়, এনা গেলই যখন, এই জায়গাগুলোকে কেন পোঁটলা করে নিজের সঙ্গে নিয়ে চলে গেল না!

সে দিনও ওই সব ভাবছিলাম ছাদে দাঁড়িয়ে। বার বার মনে হচ্ছিল, এনা এ ভাবে আমায় ভুলে গেল! এমন অবস্থা হল যে, সাবুকে দিয়ে জিনিসপত্র ফেরত চেয়ে পাঠাতে হল! আমাকে একটা ল্যান্ডলাইনে ফোন করতে কী অসুবিধে ছিল? আমায় বললে কি আমি ঘ্যানঘ্যান করতাম? ফিরে আসতে বলতাম? ও কী ভেবেছিল, আমি আর পাঁচটা ছেলের মতো ওর পায়ে পায়ে ঘুরতাম?

স্কুলের পরে ও তো আমার সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ারিং-এও ভর্তি হয়েছিল। আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে সেকেন্ড ইয়ারে কী হয়েছিল। ও শরীর খারাপের জন্য পরীক্ষা দিতে পারবে না বলে এক সেম পিছিয়ে গিয়েছিল। তার পর নিজেই বলেছিল, ‘‘দেখ, আমরা আলাদা হয়ে গেলাম যখন, আর যোগাযোগ রেখে কী হবে বল? তার চেয়ে আমাদের যোগাযোগ রাখার দরকার নেই। পুঁটি, তুই আর আমায় ফোন বা মেসেজ করিস না।’’

আমি অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম। এ কেমন কথা? কিন্তু আমি জানি, ‘না’ মানে ‘না’। ঘ্যানঘ্যান করা আমার ভাল লাগে না একটুও। তাই ও ‘না’ করেছিল বলে আমি এক বারও কিছু বলিনি। কিছু জানতে চাইনি। ঝগড়া করিনি। শুধু ‘ঠিক আছে’ বলে নামিয়ে রেখেছিলাম মোবাইল।

সে বারও আমি মোবাইল ব্যবহার করা ছেড়ে দিয়েছিলাম। ও মা, তিন সপ্তাহ পরে এক দিন আমার বাড়ির ল্যান্ডলাইনে ওর বাবাকে দিয়ে ফোন করিয়েছিল এনা!

কী ব্যাপার? না, ও খুব অসুস্থ। আমার কথা নাকি মনে পড়ছে! কিন্তু আমি

এত বাজে যে, ওকে ফোন করছি না!

ওর বাবা আমার মাকে এ সব বলেছিল ফোনে। বলেছিল, ‘‘লোহিত এলেই যেন ওকে ফোন করে!’’

আমি গিয়েছিলাম বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে কিছু নোট ফোটোকপি করব বলে। ফেরামাত্র মায়ের সে কী ঝাড়! একটা মেয়ে অসুখে পড়ে আছে। আমি খবর নিই না। আমি মানুষ নই। কত অসহায় হলে একটা মেয়ে তার বাবাকে দিয়ে ফোন করায়। আমাকে ঠিক মতো মানুষ করা যায়নি। এটসেট্রা এটসেট্রা।

আমি কিছুতেই বোঝাতে পারিনি যে, আমাকে স্পেসিফিক্যালি বলা হয়েছে যেন ফোন না করি। যেন যোগাযোগ না রাখি।

মায়ের ধমকে, আর সত্যি বলতে কী, আমারও তো ইচ্ছে ছিলই, সব মিলিয়ে আমি ফোন করেছিলাম এনাকে। আর তার পর সেখানেও কী ঝাড়! মানে কলকাতার সমস্ত ঝাড়বাতি থেকে বাতি খুলে ঝাড়গুলো আমার মাথায় ভেঙেছিল এনা! আমি বাজে ছেলে। ভালবাসি না। মিথ্যে বলি। কেয়ার করি না। ফোন করতে বারণ করলেই কি ফোন করতে নেই? আমাকে কিচ্ছু বলতেই দেয়নি মেয়েটা! শেষে আমাকে দিয়ে প্রমিস করিয়ে নিয়েছিল আর যেন এমন না করি!

আর প্রমিস! যে প্রমিস করিয়েছিল শেষে কি না সে নিজেই অমন করল! আবার! আর এ বারেরটা অন্য একটা ছেলের জন্য!

মাঝে অনেক বার আমার সঙ্গে ও ছোট ছোট ব্রেক আপ করেছে। কিন্তু সবটাই সপ্তাহখানেকের জন্য। মানে করেছে, আবার মিটেও গিয়েছে। কিন্তু এ বার ব্যাপারটাই অন্য।

মাঝে মাঝে আমার মনে হয় নিজেকে নিজেই এক দোকান জুতো দিয়ে পেটাই। কেন যে সেই সেকেন্ড ইয়ারে ওর কথা শুনে আবার যোগাযোগ শুরু করেছিলাম!

ছাদে দাঁড়িয়ে এ সব ভাবতে ভাবতেই একটা দৌড়ে আসা পায়ের শব্দ পেয়েছিলাম। আমি ঘুরে তাকিয়েছিলাম। দেখেছিলাম রিজু আসছে। ওর মুখচোখ লাল। হাঁপাচ্ছে।

ও এসেই চিৎকার করে বলেছিল, ‘‘শালা! কাকু ও দিকে পড়ে আছে আর তুমি এখানে দাঁড়িয়ে মেঘ ছিঁড়ছ? প্রেম? শালা, তোমার পিছনে দেব প্রেম! মোবাইল রেখে দিয়েছে বাড়িতে! মোবাইল ডিম পেড়ে তা দিয়ে আরও মোবাইল আনবে পৃথিবীতে! চল, নীচে চল! সবাই খুঁজছে তোকে। চল।’’

রিজু এত রেগে গিয়েছিল যে, ধাক্কা মেরেছিল আমায়। আমিও বুঝেছিলাম কিছু একটা হয়েছে।

জেঠু, ছোটকাকু, সুজয়দা, দেবুদা-সহ সবাই অ্যাম্বুল্যান্স ডেকেছিল। ভাগ্য ভাল পেয়েও গিয়েছিল পাঁচ মিনিটের মধ্যে। আমরা সবাই মুকুন্দপুরে বড় একটা হাসপাতালে গিয়েছিলাম বাবাকে নিয়ে।

জেঠুর এক বন্ধু সেখানকার ডাক্তার। বাবাকেও ভাল করে চেনে। সেখানেই আইসিসিইউ ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে বাবাকে। দু’দিন হল আজ নিয়ে।

সে দিন অ্যাম্বুল্যান্স করে যেতে যেতে রিজুর কাছে ফোন এসেছিল সাবুর। ওর কী দরকার না শুনে রিজু ওকেও আসতে বলেছিল হাসপাতালে। আমিও চাইছিলাম সাবু আসুক। কেন জানি না সাবু কাছে থাকলে আমি খুব সাহস পাই।

সাবু আজও এসেছে। উপরে গিয়েছে বাবাকে দেখতে। আমি নীচে আছি। মা, জেঠিমা আর কাকিমা এসেছে আজ। জেঠু আর ছোটকাই তো সব দেখছে। সবার মাঝে আমার নিজেকে কেমন যেন ভাগশেষের মতো বাড়তি মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে উটকো। সবাই আমায় ‘ও তুই কিছু ভাবিস না...’ বলে বেগুনভাজার মতো সরিয়ে রাখছে এক পাশে।

আরে, আমার বাবা, আমি ভাবব না? যে লোকটার পাশে না শুলে ছোটবেলায় ঘুম আসত না! যে লোকটার কাছ থেকে দূরে মামার বাড়িতে গেলে আমার জ্বর এসে যেত! যে লোকটা নিজের কথা না ভেবে এক বার সারা রাত জেগে ট্রেনের জেনারেল কামরায় দাঁড়িয়ে জলপাইগুড়িতে গিয়েছিল আমার শরীর খারাপ শুনে, তার কথা আমি ভাবব না! আমার জীবনের সুপারম্যান, ব্যাটম্যান, স্পাইডারম্যান আর অরণ্যদেব তো ওই একটাই লোক!

‘‘পুঁটি অফিস থেকে এসেছিস তো, কিছু খেয়েছিস?’’ জেঠিমা জিজ্ঞেস করল আমায়।

আমি মাথা নাড়লাম।

জেঠিমা বলল, ‘‘তুইও কি অসুখে পড়তে চাস? মাঝে দাড়ি কেটেছিলি, আবার রাখছিস। মাছওয়ালার মতো লাগছে তোকে। ক’দিন ধরেই দেখছি কেমন মুখ করে থাকিস। কী হয়েছে তোর? তার উপর সবুজের এই অবস্থা। তুই পড়ে গেলে কী হবে ভেবে দেখেছিস?’’

‘‘ও আমার কিছু হবে না,’’ আমি কোনও মতে বললাম জেঠিমাকে।

Advertisement