E-Paper

দেখা হবে

শিলিগুড়ির এ জমিও ছিল রামপ্রিয় সান্যালের। চা-বাগানের ডাক্তার রামপ্রিয় সান্যালকে মনোতোষ বকুলডাঙার বাড়িতে খুব কমই দেখেছে।

বিপুল দাস

শেষ আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৪৬
ছবি: কুনাল বর্মণ।

ছবি: কুনাল বর্মণ।

পূর্বানুবৃত্তি: গাড়ি আটকানোর সময় সিরাজুল যা বলেছিল, তা মিলে গেছিল। এক বার টাকা চেয়ে পেয়ে গেলে তোলাবাজরা বারবার চাইবে। এবার বিভু সমাদ্দারের সঙ্গে দেখা করতে এল বিভূতি লস্কর আর তার শাগরেদ তারক। তারককে দিয়ে নানা প্রচ্ছন্ন হুমকি দেওয়ার পর আসল কথায় এল বিভূতি। তাদের দুশো মোটরবাইক নিয়ে দেড়শো কিলোমিটার র‌্যালির পরিকল্পনা। র‌্যালি শেষ হবে সারদাপল্লির মাঠে, তার পর সেখানে জনসভা। সেই অনুষ্ঠানে বিভুর জন্য ধার্য হয়েছে দুটো গাড়ি আর পঞ্চাশ হাজার টাকা। চাহিদাটা অনেকটাই বেশি মনে হল বিভুর। দুটো গাড়ি দিতে তার আপত্তি নেই, কিন্তু পঞ্চাশটাকে সে পঁচিশ করতে বলে। বিভূতি আর তারকও ছাড়ার পাত্র নয়। তারা খালি হাতেই উঠল। তবে আভাসে বুঝিয়ে দিয়ে গেল যে, কাজটা বিভু ভাল করল না। বিভুর মনে তখন নানা আশঙ্কার দোলাচল। তার ব্যবসার সাদা-কালো দিকগুলো কি জেনে গেল বিভূতিরা!

শিলিগুড়ি নিয়ে এ-সব স্মৃতিচারণ মনোতোষ অনেক শুনেছে। সে যখন স্কুলে ঢোকে, পণ্ডিতমশাই তখন রিটায়ারমেন্টের মুখে। তিনি বেশ খেলিয়ে শীতের গল্প বলতেন। একটাই অসুবিধে ছিল। পান খেতেন খুব। গল্প বলার সময় সুপুরির কুচিগুলো ছিটকে বেরোত। মনোতোষের মনে হত, কিছু গল্প তাঁর নিজ কলের সুতায় প্রস্তুত। বলতে বলতে হঁশ থাকত না। তার কাছে অর্বাচীন ছোঁড়ার দল পুরনো শিলিগুড়ির গল্প শুনতে চাইছে, এতেই তাঁর ঘাড়ে রোঁয়া গজিয়ে যেত। পিছিয়ে যেতে যেতে তিনি তাঁর জন্মের আগে দেখা শীতের গল্পও বলে ফেলতেন। এক বার নাকি মহানন্দার ও-পার থেকে, এখন যেখানে মেডিক্যাল কলেজ, সেখান থেকে ঠান্ডায় কাবু এই ইয়া কেঁদো এক বাঘ এসে মিলনপল্লির রূপেশ বর্মণের গোয়ালঘরে এসে দুটো গরুর মাঝে ঘুমিয়েছিল। রসিক পণ্ডিতমশাইয়ের নিজস্ব সংযোজন ছিল, “যুবতী গাই, তার একটা ওম আছে না। কোথায় লাগে ভুটিয়াদের কম্বল।”

“তার পর?” সকলে বিস্মিত।

“তাই তো বলি, মিলনপল্লিতে হঠাৎ গোবাঘা এল কোথা থেকে। পরে গোয়ালঘরে বাঘের কথাটা মনে পড়ল। আরে, এতে আর আশ্চর্য হওয়ার কী আছে। শরীরধর্ম বলেও তো একটা কথা আছে।”

অল্পবয়সিরা মুচকি হেসে সরে পড়েছিল। লাইফ সায়েন্সের টিচার মনোতোষ ধাপ্পাটা ধরে ফেলে। কিন্তু ধাপ্পা হলেও পণ্ডিতমশাইয়ের বলার ভঙ্গি বড় চমৎকার ছিল। হাত-পা খেলিয়ে, চোখ ছোট-বড় করে নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলতেন।

বিছানা ছাড়তেই কেঁপে উঠল মনোতোষ। তাড়াতাড়ি গরম চাদরটাই ভাল করে গায়ে জড়িয়ে নিল। দেওয়ালঘড়িতে দেখল আটটা বাজে। আজ একটু দেরি হল ঘুম ভাঙতে। হালকা ঘুমের ভিতরেও আজ রবিবার— সেই বোধ জেগে ছিল হয়তো। কাজের দিদির জন্য অপেক্ষা করে লাভ নেই। নিজেই এক কাপ চা বানিয়ে আগে খেতে হবে। শিবুকাকাদের বাড়ি ছেড়ে এ বাড়িতে আসার পর থেকেই মামণি এখানে কাজ করছে। কথা কম বলে। প্রায় নিঃশব্দেই সব কাজ পরিষ্কার করে সারে। সন্ধে নাগাদ বাড়ি ফিরে যায়। কাজে আসতে না পারলে মনোতোষকে হোটেল থেকে রুটি-তরকারি এনে খেতে হয়। তাতে অসুবিধে নেই, বরং একটু স্বাদ পাল্টানো হয়।

শিলিগুড়ির এ জমিও ছিল রামপ্রিয় সান্যালের। চা-বাগানের ডাক্তার রামপ্রিয় সান্যালকে মনোতোষ বকুলডাঙার বাড়িতে খুব কমই দেখেছে। তাঁর জীবনের বেশির ভাগ সময় বাগানেই কেটে গেছে। বাড়িতে কোনও ক্রিয়াকর্ম বা উৎসব থাকলে আসতেন। পলাশগুড়িতে তাঁকে নিয়ে একটা চাপা গুঞ্জন ছিল। একটু বড় হওয়ার পর মনোতোষ জানতে পেরেছিল, চা-বাগানে এক নেপালি মহিলাকে নিয়ে তাঁর দ্বিতীয় সংসার রয়েছে।

তাঁর ছিল অসম্ভব গান শোনার নেশা। এ-বাড়ি থেকে গ্রামোফোন আর গাদা গাদা রেকর্ড, সব বাগানে তাঁর নিউ গ্রাহাম চা-বাগানের কোয়ার্টারে নিয়ে গিয়েছিলেন। কম্পাউন্ডার জীবনের কাছে একটু একটু গল্প শুনতে পেত মনোতোষ। কোনও কোনও চাঁদনি রাতে নাকি তাঁর বাংলোর সামনের লনে তিনি গ্রামোফোনে পুরনো দিনের গান চালিয়ে বৌ মহামায়াকে নাচতে বলেন। তাঁর বৌ মহুয়াফুলের মালা বানিয়ে খোঁপায় সাজায়। তখন পুরো উঠোন জুড়ে মহুয়ার মাতাল গন্ধে বাতাস ভরে ওঠে। ডাক্তারবাবু প্রথমে গুনগুন করে, পরে গলা ছেড়ে গেয়ে ওঠেন ‘পগ ঘুঙ্‌রু বাঁধ মীরা নাচি রে...’

তার পর চাঁদ আরও একটু উপরে উঠে এলে ডাক্তারবাবুও তাঁর বৌয়ের হাত ধরে নাচেন। শেষে মহুয়ার গন্ধে মাতাল মত্ত হাতির মতো মহামায়া ছেত্রীকে কোলে তুলে ঘরে ঢুকে পড়েন।

পরদিন সকালে জীবন একেবারে পাল্টি খেয়ে যেত। সে নাকি এ-সব গল্প বলতেই পারে না। ডাক্তারবাবু তো আটটার ভিতরেই খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েন। হঠাৎ কোনও দিন ক্লাবে গিয়ে এক হাত ব্রিজ খেলেন। কাল রাতে সে হয়তো একটু মস্তিতে ছিল, কী বলতে কী বলে ফেলেছে। কিংবা হয়তো সে কোনও দিন এ রকম স্বপ্ন দেখেছিল। মহুয়া ফুলের গন্ধে হাতি আসে, আর কে না জানে নিউ গ্রাহাম চা-বাগানের ডাক্তারবাবুর বাড়ির হাতায় কতকালের পুরনো সেই মহুয়া গাছের কথা।

এ জমির কথা ডাক্তারবাবুর মনেই ছিল না। তখন হিলকার্ট রোডের উপর দিয়ে টয়ট্রেনের লাইন, হাসমি চকের উল্টো দিকে ছিল রোড স্টেশন। সেখান থেকে ট্রেন যেত কালিম্পং-এর গেইলিখোলা পর্যন্ত। মহানন্দার জল টলটলে সবুজ, কলেজমাঠ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা পরিষ্কার দেখা যেত। বাবুপাড়া, মহানন্দাপাড়া, হাকিমপাড়া আর রেলবাবুদের কিছু কোয়ার্টার— এই তো ছিল শিলিগুড়ি। জমিখোর লোক কম ছিল, ফ্ল্যাট, এগরোল— এ-সব তখনও কেউ শোনেনি। শিলিগুড়ির ডাক্তার ভবেশ চ্যাটার্জি তার বন্ধু সান্যালডাক্তারকে জমিটা গছিয়েছিল। ছ’শো টাকায় মজুমদার কলোনিতে এক বিঘা জমি কিনে রেখেছিলেন রামপ্রিয় সান্যাল। ব্যস, ওই কেনা পর্যন্তই। ভুলেই গিয়েছিলেন তার জমির কথা। পরে খবর পেলেন, সে জমির অর্ধেকটা দখল হয়ে গেছে। কম্পাউন্ডার জীবন আর শিবুকে পাঠিয়েছিলেন জমির খোঁজখবর নিতে। দখলদারের পিছনে নেতার মদত ছিল। তাদের হটিয়ে দিয়ে বাকি জমিতে তাড়াতাড়ি পাঁচিল তুলে দিয়েছিলেন। হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করার পর মনোতোষ শিলিগুড়ি কলেজে ভর্তি হল। ডাক্তারবাবু প্রিয়তোষ লাহিড়ীকে প্রস্তাব দিয়েছিল শিলিগুড়ির ওই জমিতে একটা ঘর তুলে মন্টুকে নিয়ে থাকতে। মন্টুর কলেজে আসা-যাওয়ার সুবিধে, উপরন্তু জমিরও দেখাশোনার একটা ব্যবস্থা হল। অন্য কেউ এসে গেঁড়ে বসতে পারবে না। পলাশগুড়ি ছেড়ে এখানে কোনও মতে একটা মাথা গোঁজার মতো ব্যবস্থা করে নিয়েছিল মনোতোষের বাবা, প্রিয়তোষ লাহিড়ি। পরে সেটা পাকা দালান করা হয়েছিল। নতুন মানুষজন এখন আর সেই মজুমদার কলোনি খুঁজে পাবে না। তার নাম অবধি পাল্টে গেছে।

মুখে ব্রাশ নিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল মনোতোষ। এখনও ভাল করে কুয়াশা কাটেনি। গতকালের চেয়ে আজ কুয়াশা একটু বেশি ঘন। বেলা না বাড়লে সূর্যের মুখ আজ দেখা যাবে না। আজ তার নিপুর সঙ্গে জমি দেখতে যাওয়ার কথা। চুমুকপুর এখনও তেমন জমে ওঠেনি, কিন্তু লোকজন আস্তে আস্তে ওদিকেও জমি কিনে রাখতে শুরু করেছে। বোর্ড অফিসের পাশ দিয়ে পলাশগুড়ির সঙ্গে কানেক্টিং রাস্তার কাজ কমপ্লিট হতেই চুমুকপুরের দিকে মানুষজনের নজর পড়েছে। এ জায়গা যে খুব তাড়াতাড়ি জমজমাট হয়ে উঠবে, সবার আগে জমির দালালরা গন্ধ পেয়ে গেছে। ওদিকে কোনও নতুন লোক দেখলেই দশ জন এগিয়ে আসে। জানতে চায় জমির খোঁজ করছে কি না। আরও জানা যায় যে, মাটি হল খাঁটি। এখন একটু মাটি ধরে রাখতে পারলে সেই মাটিতে সোনা ফলবে। মনোতোষের স্কুলের ক্লার্ক নিপু মণ্ডল সে রকমই বলেছিল।

“মাস্টারমশাই, এই বেলা কিছু মাটি ধরে রাখুন। এর পরে কিন্তু এক ছটাক মাটিও কোথাও পাবেন না। কোথা থেকে যে এত মানুষ আসছে শিলিগুড়িতে! এক দিন মাছ আর আনাজপাতির বড় আড়তে গিয়ে দেখবেন, বাপ রে, যেন ট্রাকভর্তি রাক্ষসের খাবার নামছে। শালা, এক দিনেই সাবাড়। পরদিন আবার আসছে। সবার মনের ইচ্ছে শিলিগুড়িতে এক টুকরো মাটি ধরে রাখবে। কী ছিল শহরটা, আর কী হয়ে গেল। আমি অবশ্য তখন ছোট, তবু, বিশ্বাস করুন আমার চোখের সামনেই এনজেপি দাঁড়াল। ছিল ফুলেশ্বরী নদীর চর, আমরা পিকনিক করতে গিয়ে বুনোকুল খেতাম। আর ফুলবাড়ি, এর মধ্যে গেছেন ওদিকে? এশিয়ান হাইওয়ে কমপ্লিট হয়ে গেছে। সোজা নেপাল থেকে ফুলবাড়ি বর্ডার হয়ে বাংলাদেশ। পারাপার শুরু হয়ে গেছে। ইমিগ্রেশন অফিস চালু হয়ে গেছে। আমার স্কুলের বন্ধু ছিল নজরুল। ফুলবাড়ি থেকে সাইকেল চালিয়ে আসত। নজরুল, সিরাজুল— দু’ভাই। তখন দিনের বেলায় পথের উপর দিয়ে শেয়াল পারাপার করত। বিনিময় করে ও-পারে চলে গেল। ধানী জমি ছিল কয়েক একর, বাস্তুভিটেও বেশ বড়। এখন যদি থাকত, কোটিপতি হয়ে যেত।”

‘কিছু মাটি ধরে রাখুন’ শুনে প্রথমে মনোতোষ বুঝতে পারেনি। কথা একটু এগোতেই বুঝেছে নৃপেন মণ্ডল জমির কথা বলতে চাইছে। করিতকর্মা ছেলে। এদিকে স্কুলের ক্লার্ক, ওদিকে বিমা কোম্পানির দালালি, সেদিকে আবার জমির দালালিও চালাচ্ছে। ঘুঘুডাঙায় তিনতলা বাড়ি, স্কুলেরই দু’জন টিচার ভাড়া থাকে দোতলায়। নীচের তলায় বন্ধন ব্যাঙ্কের অফিস, প্লাস ওষুধের দোকানের ভাড়া। একটাই তার মনোবেদনা। পর পর তিনটি মেয়ে। যদিও সে নিশ্চিত ছিল শেষ বার ছেলের মুখ দেখার ব্যাপারে। অনেক হিসাব কষে, তিথিনক্ষত্রের বিচার করে সে এগিয়েছিল। কী আর করা যাবে, বৌ তাকে ছেলে দিতে পারল না! তা বলে তো আর বৌকে ত্যাগ করা যায় না। মনোতোষ জানে, নিপু মণ্ডলকে এক্স-ওয়াই ক্রোমোজ়োমের ব্যাপার বুঝিয়ে লাভ নেই। কমার্স গ্র্যাজুয়েট নৃপেনের মাথার উপর দিয়ে যাবে। কে জানে বৌকে দু’-চার ঘা দেয় কি না!

“কী হলে কী হত, সে কথা ভেবে কোনও লাভ নেই নিপু। শুধু আফসোস বাড়ে। আমি স্কুলে জয়েন করার পর দুলাল দাস আমাকে সাধাসাধি করছে শ্রীপুরে জমি নেওয়ার জন্য। তখন টাকা ছিল না। টাকাও হয়তো ধারদেনা করে জোগাড় হয়ে যেত। আসলে আমার তেমন চাড় ছিল না। জমিজমার ব্যাপার চিরকালই আমার কাছে কেমন জটিল ব্যাপার মনে হয়েছে। স্ট্যাম্প পেপারের উপর একটা অশোকস্তম্ভের ছাপ থাকে না, ওটা দেখলেই আমার ভয় করে। আর আজ, আমার সাহসই নেই ওখানে গিয়ে জমির দর শোনার। স্ট্রোক হয়ে যাবে। তবে, তুমি কিন্তু আর বেলতলায় যেয়ো না। বরং মেয়ে তিনটেকে ভাল করে মানুষ করো। লেখাপড়া শেখাও। এক সময় ওরাই তোমাকে দেখবে। তোমার একটা গেঞ্জি মেঝেয় পড়ে থাকলে তোমার ছেলে খেয়ালই করবে না, হয়তো সেটা মাড়িয়েই ঘরে ঢুকবে। আর মেয়ে হলে সেটা কুড়িয়ে কেচে শুকিয়ে আলনায় তুলে রাখবে।”

“বুঝি স্যর। তবে ওই যে, নরকের ভয়, পূর্বপুরুষকে কে জলদান করবে! জানি, কী হলে কী হত সে কথা ভেবে লাভ নেই। বরং চলুন সামনের রোববারে আপনাকে একটা জমি দেখিয়ে আনি। আমার ভায়রা ওদের বন্ধুরা মিলে কো-অপারেটিভ করে ওখানে জমি নিচ্ছে। শেষ মুহূর্তে এক জন সরে গেছে। বৌয়ের ট্রিটমেন্ট, মুম্বই যেতে হবে, অনেক টাকার ধাক্কা। বেচারির মনও ভাল নেই। কী আর করার আছে । বুঝতেই তো পারছেন। ভায়রা বলছিল আমার চেনা জেনুইন কোনও ভদ্রলোক থাকলে ওরা মেম্বার করে নেবে। আমি শুনেই আপনার কথা ভেবেছি। সাধা লক্ষ্মী পায়ে ঠেলবেন না স্যর। অন্তত পোজিশনটা দেখে আসুন। আপনি ওদের গ্রুপে থাকলে আমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারি।”

মনোতোষের স্কুটারের পিছনে নিপু বসে আছে। জুত করে বসার জন্য মাঝে মাঝেই নড়েচড়ে উঠছে। মনোতোষের ব্যালান্স টলে যাচ্ছিল। অনেকটা চওড়া মসৃণ রাস্তা, তাই সামলে নিচ্ছিল সে। গ্রামের দিকের সরু লিক হলে আছাড় খেতে হত। ছোট কেউ হলে ধমক দিত মনোতোষ। নিপু ছোট ছেলে নয়। বয়সে তার সমান, কি একটু সিনিয়রও হতে পারে। ভাগ্যিস এই নতুন রাস্তায় গাড়িঘোড়া চলাচল এখনও তেমন শুরু হয়নি! না হলে রিস্ক ছিল।

শহরের দিকে কুয়াশা হালকা হয়ে গেছে, কিন্তু এদিকটায় ফাঁকা বলে কুয়াশা এখনও ঘন হয়ে আছে। একটু আগেও পথের দু’পাশে দু’চারটে ঘরবাড়ি, দোকানপাট দেখা যাচ্ছিল। সারি সারি গুটখা আর পানমশলার প্যাকেট ঝুলছে। আর এ রকম প্রত্যেকটা দোকানের সামনেই প্লাস্টিকের বোতলে পেট্রল রয়েছে। নতুন পথে এখনও কোনও পাম্প চালু হয়নি। মনোতোষ প্রথমে বুঝতে পারেনি, ভেবেছিল মদ হতে পারে। একটু বাদেই দেখল, পথের দু’ধার দিয়ে শালসেগুনের সারি। সেগুলো ক্রমশ ঘন অরণ্যে পাল্টে যাচ্ছিল। মনোতোষ বুঝতে পারছিল, ওরা বৈকুণ্ঠপুর ফরেস্ট লাগোয়া বনবস্তির পাশ দিয়ে যাচ্ছে। কী যে হল মনোতোষের, আস্তে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ল একটা শিমুল গাছের পাশে। সময় হয়নি, তবু কত লাল ফুল ফুটেআছে গাছ জুড়ে।

আকাশের দিকে তাকাল মনোতোষ। কুয়াশামোড়া ধূসর আকাশ জুড়ে মনখারাপের ম্লান আলো। ওই ধূসর পর্দার আড়ালে সুয্যিঠাকুর যে ঠিক কোথায় আছেন, কেউ জানে না। তাঁর আলো ওপার থেকে সমান ভাবে ছড়িয়ে আছে সারা আকাশে। যেন লক্ষ ওয়াটের একটা বাল্বের উপর সাদা কাগজ জড়িয়ে সাদা চাদরের পিছনে রেখেছে কেউ।

“স্যর, টয়লেট করবেন? ওই ঝোপের ওদিকটায় যেতে পারেন। এখানে আর কে দেখবে।”

“নিপু, বৌটার কি ক্যান্সার?”

একটা টিয়াপাখি ট্যাঁ ট্যাঁ করে ডেকে উঠল কোথাও। স্কুটার স্ট্যান্ড করে নেমে দাঁড়াল মনোতোষ। তার এখন ভীষণ সিগারেটের তেষ্টা পাচ্ছিল। একটা বিড়ি হলেও তার চলত। সিগারেটের নেশা তার নেই। কে জানে কেন, হঠাৎ সিগারেটের পিপাসা পেল তার! রাস্তার পাশে ঘাসের উপর বসল মনোতোষ। বৈকুণ্ঠপুর ফরেস্টের প্রাচীন শাল-শিমুল-জারুল-সেগুনের জমাট সঙ্ঘের দিকে অপলক তাকিয়ে রইল সে। বৌটা কি জানত তার বর এখানে জমি কিনবে! মাটির মায়া কি তাকেও জড়িয়ে ধরেছিল! সে কি নতুন বাড়ির স্বপ্ন দেখেছিল! মনে মনে জানালা-দরজার পর্দা, বারান্দায় ফুলের টব সাজিয়েছিল! সে কি ডিং-ডং ডোরবেলের কথা ভেবেছিল, না কি পাখির ডাক!

“এসব তো বোঝাই যায়। টাটায় যেতে হবে শুনলেই আজকাল সবাই বুঝে যায় কেস জন্ডিস।”

“নিপু, তোমার কাছে বিড়ি-সিগারেট কিছু আছে নাকি? থাকলে দাও না। আরে আমার ওসব প্রেজুডিস নেই। আমার কলেজের স্যর, প্রফেসর বোস, আমাকে সিগারেট ধরিয়ে দেন। তুমিও ধরাও, আমাকেও একটা দাও। জমিটা অ্যাকচুয়ালি কোথায় বলো তো? ফরেস্টের ভিতরে নাকি?”

“আর একটু এগোলেই ফরেস্ট শেষ। একটা দু’টো করে ঘরবাড়ি ... সে দেখতেই পাবেন। আরে, দেখুন স্যার ময়ূর। ওই যে, গাছের নিচু ডালে বসে আছে। নড়বেন না মাস্টারমশাই, উড়ে যাবে।”

ক্রমশ

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Novel Novel

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy