বাবুকাকার দোকান থেকে ফিরে জিরোচ্ছে মা। বিনা ভূমিকায় সায়ন বলে, “সাড়ে সাতশো টাকা লাগবে। জোগাড় করে রাখো। পরের সোমবার স্কুলে যাওয়ার আগে দিলেই হবে। স্কলারশিপের টাকা এলে দিয়ে দেব।”
মাসের বেশির ভাগ দিনই মায়ের হাত খালি থাকে। দিন সাতেক আগে থেকে আর্জি পেশ না-করলে টাকা মেলে না। অবশ্য আগাম জানিয়েও অনেক সময় মেলে না।
সিলিং ফ্যানটা বিগড়েছে। ক্যাঁচকোঁচ শব্দই করছে শুধু। কৃপণ মুঠি ফাঁক করে যেটুকু হাওয়া ছাড়ছে, এই গরমে যথেষ্ট নয়। ইলেকট্রিক মিস্ত্রিকে ডাকলেই রেস্ত খসবে।
শাড়ির আঁচল দিয়ে বাতাস করতে-করতে সায়নের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকায় মা। বলে, “এত টাকা কোথা থেকে দেব? বেতনের পুরোটা তো তোর বাপ ঝেড়ে দিল! দুর্গা ভান্ডার-এর সরকারি টাকা দিয়ে সংসার চলছে। পরের মাসে বেতন পেলে তোর টাকা আমি সরিয়ে রাখব না-হয়। তত দিন অপেক্ষা কর।”
পরের মাস মানে আরও পনেরো-কুড়ি দিন। নাহ! টাকাটা তার সামনের সপ্তাহেই চাই। তবে, মায়ের উপর জোর খাটিয়ে আদায় করা যাবে না। মায়ের তহবিল সত্যিই শূন্য। সকাল থেকে দোকানে হেল্পারি করে গরমে-রোদে তেতে-পুড়ে এসেছে। একটু বিশ্রাম করে দুপুরের রান্না বসাবে। ঘাম-জবজবে মুখের দিকে তাকিয়ে মাকে আর ঘাঁটায় না সায়ন।
মা স্নানঘরের দিকে পা বাড়ানোর আগে বলে, “বই কিনবি তো? বন্ধুদের বই থেকে পড়ার ছবি তুলে চালিয়ে নে ক’টা দিন, বাবুসোনা…”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি দেখছি,” বলে সায়ন। সিলেবাসের পড়াশোনার জন্য বইয়ের প্রয়োজন নেই এখন। গ্রীষ্মের ছুটি শেষ হচ্ছে শনিবার। আর রবিবার তানিশার জন্মদিন। সোমবার স্কুলে গিয়েই তানিশার হাতে জন্মদিনের গিফ্ট তুলে দিতে হবে।
নান্টিই এখন ওর একমাত্র ভরসার খুঁটি। নান্টির পকেট কাঁচা টাকার খনি। হাত ঢোকালেই বড় নোট বেরিয়ে আসে একটা-দুটো! গার্লফ্রেন্ডকে প্রায়ই কিছু-না-কিছু উপহার দিচ্ছে। কেতার ড্রেস, বিদেশি পারফিউম, মুক্তোর গয়না, স্মার্টফোন…
নান্টির নম্বরে ডায়াল করে সায়ন।
ছুটির পর রাজবাড়ির ভাঙা ঘাটে বসে আছে সায়ন আর তানিশা। দিঘি ছুঁয়ে আসা বাতাসে বার বার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে তানিশার চুল। বাঁ হাত দিয়ে চুল ঠিক করছে সে। আড়চোখে দৃশ্যটা দেখছিল সায়ন।
“লজ্জা পাচ্ছিস কেন? ভাল করে দেখ...” বলে ওর দিকে ঘুরে বসে তানিশা। চোখে চোখ পড়তেই রক্ত চলকে ওঠে। দিঘির বুড়ি কাতলাটা সায়নের বুকের মধ্যেই ঘাই মারে। চোখ নামিয়ে নেয় সে।
সায়নের থুতনি ধরে তোলে তানিশা। হেসে বলে, “আগেকার পুরনো সিনেমায় ফুলশয্যার রাতে এই ভাবে নতুন বৌয়ের লজ্জা ভাঙাত বর। সময় বদলাচ্ছে…”
এত সুন্দর কী করে হতে পারে একটা মেয়ে! এই মেয়ে চাইলে বোধ হয় নিজের হৃৎপিণ্ডও উপড়ে দেওয়া যায়। আড়ষ্ট অবস্থাটা কাটানোর জন্য প্রসঙ্গ বদলাতে চায় সে। বলে, “জন্মদিন কেমন গেল?”
তানিশা হাততালি দিয়ে বলে, “বেস্ট। তুই এলে আরও ভাল হত… বেস্টেস্ট! কিন্তু, কী করব! এখন আমি একেবারে রিস্ক নিতে চাই না।”
জন্মদিন বড় করেই হয়েছে। ক্লাসের অনেকে আমন্ত্রিত ছিল। কিন্তু ওকে ডাকেনি তানিশা। ওয়টস্যাপে কান্নাভেজা গলায় ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছিল, “কেকের প্রথম স্লাইসটা তোকেই খাওয়াতে চাই। কিন্তু তুই এত কাছে থাকলে আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারব না। আমার চোখে-মুখে চেঞ্জ আসবেই। আর বাবা সেটা ধরে ফেলবে ঠিক। বাবা প্রচণ্ড ধূর্ত। এমনি-এমনি পর পর চার বার কাউন্সিলার হয়নি! এক বার যদি সন্দেহ হয়, তোর পিছনে লোক লাগাবে। ফালতু ঝামেলা হবে। সময় হোক, আমি তোর কথা জানাব বাবাকে।”
মেয়ে পড়াশোনার বয়সে প্রেম করছে। বাবার রাগ হতেই পারে। তাই অনুষ্ঠানে ডাক না-পেয়ে সায়ন মনখারাপ করেনি বিশেষ।
“আর যে বলছিলি, কাকু এ বার বড়সড় একটা গিফ্ট দিতে পারেন… কী দিলেন কাকু?” সে জিজ্ঞেস করে।
“উঃ! তুই ভাবতে পারবি না! আমি নিজেই এতটা আশা করিনি… দাঁড়া, দাঁড়া চোখ বন্ধ কর!”
কৌতূহল চেপে নির্দেশ পালন করে সায়ন। জিনিসটা কী হতে পারে, সে ব্যাপারে কোনও ধারণা নেই ওর। বাবার থেকে উপহারপ্রাপ্তির ঘোষণা করতে গিয়েই মেয়েটার মধ্যে যে পরিমাণ চাঞ্চল্য ও উৎফুল্লতা দেখা যাচ্ছে, সেই ওজনের তলায় ওর ক্ষুদ্র উপহার পিষে যাবে না তো?
“চোখ খোল এ বার,” তানিশার কথা শুনে চোখ খুলেই আবার বন্ধ করতে বাধ্য হয় সে। অস্তগামী সূর্যের দুর্বল কিরণই মেয়েটার আঙুলে ধাক্কা খেয়ে ঝলসে দিচ্ছিল ওর চোখ।
“হিরে!” ফিসফিস করে তানিশা।
সায়ন এ বার ধীরে-ধীরে চোখ খুলে দেখে, প্রেয়সীর বাঁ-হাতের অনামিকা আঁকড়ে বসে আছে একটা হিরের আংটি!
“জ়িরো পয়েন্ট ওয়ান ক্যারেট। রিংটা পিয়োর গোল্ড। বাবা বলেছে, পরে বিয়ের সময় আসল হিরের নেকলেস গড়িয়ে দেবে…”
কথাগুলো কানে ঢুকছিল না সায়নের। হিরের গোলাকৃতি টুকরোটা রানির মতো মাথা তুলে রয়েছে। তানিশা এ দিক-ও দিক আঙুল নাড়িয়ে সূর্যের আলো নিয়ন্ত্রণ করছে।
“বাড়ির বাইরে পরে বেরোতে বারণ করেছে বাবা। তোকে দেখাব বলেই লুকিয়ে এনেছি! বল, কেমন?”
সায়ন কোনও মতে বলে, “ভাল। খুবই ভাল…”
বিহ্বল দশাটা কিছুতেই কাটছে না। ওর বাড়িতে সাত দিনে সাড়ে সাতশো টাকা পাওয়া যাচ্ছিল না, আর তানিশা এই দুর্মূল্য রত্নটা আঙুলে নিয়ে ঘুরছে? কত দাম এটার? বাড়ি গিয়ে গুগলে দেখতে হবে। তবে, দাম যতই হোক, এর পরে কি আর ধারের টাকায় কেনা নিজের দীনহীন জিনিসটা বড় মুখ করে দেওয়া যায়? উপহারটা হিরের আংটির পাশে মুখ তুলে দাঁড়াতে পারবে নাকি! আর উপহারের লজ্জা তো উপহারদাতারও লজ্জা।
“বাবা হিরে দেবে জানলে, আমি ফোন চাইতাম...” তানিশা বলে চলে, “এটা ভাল, কিন্তু সঙ্গে নিয়ে বেরোতে পারব না। এই দামে স্ন্যাপড্রাগন এইট এস ফোর্থ জেনারেশনের ফোন হয়ে যেত, ভাল কোম্পানির…”
আরও কয়েক বার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে আংটিটা ব্যাগে চালান দেয় তানিশা। সায়ন উদ্ভ্রান্তের মতো সে দিকে তাকিয়ে থাকে।
রাতে শুধু ভাত ফুটিয়েছে মা। ‘কাশ্মীরি মাটন’ মেখে সায়নের সঙ্গে খেতে বসেছে। মাটনের গন্ধ বোধ হয় পুরো পাড়ার বাতাসে মিশে গিয়েছিল। বাবা পাশের ঘর থেকে টলতে-টলতে বেরিয়ে আসে। মায়ের উদ্দেশে স্খলিতকণ্ঠে বলে, “ওরে শালা! মা-ব্যাটা মিলে খাসি সাঁটাচ্ছে! এ দিকে আমি মাল খেতে চাইলে, ট্যাঁক গলে ফুটো পয়সাও বেরোয় না… বল কুত্তি, এই খাসি এল কোত্থেকে? খাসির দাম জানিস? বাবুর দোকানে হেল্পারি করতে যাস, নাকি গতর বেচতে?”
সায়ন পাত ছেড়ে লাফিয়ে উঠে এক সঙ্গে কয়েক টুকরো মাংস বাবার মুখে ঠেসে ধরে। বাবা একটু থতমত খায়। পরক্ষণে সামলেও নেয়। মুখ থেকে টুকরোগুলো বের করে হাতে নিয়ে ছেলের গালে চকাস করে চুমু খায় একটা। বলে, “থ্যাঙ্ক ইউ ব্রো! মালের সঙ্গে ঝক্কাস জমবে। খুব জমেগা রং, জব মিলেঙ্গে তিন ইয়ার… ম্যায়, মাল অওর খাসি কা মাংস…”
“কাল তো খাওয়াতে পারিনি! এটাই সেরা আইটেম… টেস্ট করে বলিস কেমন হয়েছে,” বলে অ্যালুমিনিয়াম-ফয়েলটা ওর হাতে বিকেলে গুঁজে দিয়েছিল তানিশা। সেই মাটনের একটা টুকরোও চাখার সুযোগ হল না।
হাত-মুখ ধুয়ে খাটে শরীর ছেড়ে দেয় সায়ন। রগের শিরা দপদপ করছে। পড়ার টেবিলে ওর মতোই অপ্রয়োজনীয়, অকর্মণ্য হয়ে পড়ে আছে ‘দশটি প্রেমের উপন্যাস’। যে উপহার তানিশাকে অন্য কেউ দেবে না, সাধ্যের বাজেটের মধ্যে, সেটাই দেওয়ার কথা ভেবেছিল সায়ন। স্কুলের সুদীপ্ত স্যর এক বার বলেছিলেন, “বই এমন একটা উপহার, যা পেয়ে লোকে এর অর্থমূল্য বিচার করে না। কিন্তু অন্য যা-ই দিস না কেন, লোকে দাম দেখবে।”
এখন মনে হচ্ছে, হিরের দ্যুতির কাছে বাকি সব ফিকে! বিকেলের সেই চোখ-ধাঁধানো আলোই ওকে আগাপাশতলা ঝাঁকিয়ে দিয়েছে। এক লহমায় সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে নগ্ন সত্যিটাকে। তানিশারা তারার দেশের মানুষ। ওদের মতো গরিবদের দূর থেকেই নক্ষত্র দেখার নিয়ম।
ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার মতো প্রতিভা নেই সায়নের। আর্টস বিভাগে পড়ছে। আর মাত্র দুটো সিমেস্টার। তার পর ভবিষ্যৎ কী? চাকরির পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা? সে তো দীর্ঘ অনিশ্চয়তার রাস্তা… তানিশার ওকে বাবার থেকে লুকিয়ে রাখার কারণটা এ বার পরিষ্কার। পাঁড় মাতাল অত্যাচারী বাপের এক হতদরিদ্র সন্তান, যার ভবিষ্যতের কোনও ঠিকঠিকানা নেই, যে ছেলে কোনও দিনই ওদের আর্থিক, সামাজিক প্রতিপত্তির উঁচু স্তরের ধারেকাছেও আসতে পারবে না, মেয়ের প্রেমিক হিসেবে তার পরিচয় পেয়ে বাবার রক্তচাপ ঊর্ধ্বগামী হওয়াটাই স্বাভাবিক।
বিদায় নেওয়ার আগে তানিশা মুখ নিচু করে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করেছিল, “আমার বার্থডে গিফ্ট কই?”
হীনম্মন্যতায় মাটিতে মিশে যাচ্ছিল সায়ন। “ভূগোল টিউশন আছে,” বলে হাঁটা লাগিয়েছিল।
তানিশা নিজের মুখে বড় ফোনের কথা বলেছে। সেখানে অন্য কোনও উপহার পাত্তা পাবে কি? গুগল, বিভিন্ন শপিং অ্যাপ ঘেঁটে সায়ন বুঝেছে, হিরের আংটির সমতুল্য ফোন চল্লিশ হাজারের নীচে হবে না।
নান্টি প্রায়ই বলে, “পড়াশোনা করে আমাদের কপালে কী জুটবে? ওই দশ-বারো হাজার টাকার বেসরকারি মজদুরি। ভাল কথা বলি শোন, প্রকাশদার সঙ্গে কাজ কর। তিন-চার বছরে লাখ পাঁচেক জমে যাবে। তখন নিজের ব্যবসা করিস।… হাতে টাকা না-থাকলে কেউ পাত্তা দেয় না রে! বস্তির এক কোণে কেন্নোর মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে থাকবি। এই যে গার্লফ্রেন্ডদের নিয়ে আমাদের এত স্বপ্ন, এরাই লাথ মেরে পালাবে। এখন জওয়ানির পুড়কিতে ‘ভালবাসি ‘ভালবাসি’ বলছে, বিয়ের বয়স হোক, এদের আসল রূপ দেখবি…”
প্রকাশদার কাছ থেকে নান্টি প্রতি সপ্তাহে একটা করে কার্ডবোর্ডের ছোট বাক্স নিয়ে আসে। টেপ দিয়ে মজবুত করে আঁটা বাক্সগুলো খুলে দেখার নিয়ম নেই। স্কুলের ইউনিফর্ম পরে, স্কুলব্যাগের মধ্যে সেই বাক্স পুরে বাসে-ট্রেনে করে নান্টি দূরদূরান্তে চলে যায়। ঠিকানা অনুযায়ী বাক্সের ডেলিভারি করে আসে। ডেলিভারি-পিছু কড়কড়ে চার হাজার টাকা।
“বাক্সের ভিতর নিশ্চয়ই কিছু বেআইনি মাল থাকে। নইলে এত লুকোছাপা কিসের? তবে, সারা জীবন এই হারামির কাজ করব না। ব্যবসার ক্যাপিটাল জমে গেলেই বন্ধ।”
আধো ঘুম, আধো জাগরণের মধ্যে নান্টির কথাগুলো পাশের কাঁচা নর্দমার গন্ধের সঙ্গে ঘুরেফিরে আসতে থাকে। টাকা চাই! প্রচুর টাকা! সারা রাত ছটফট করে সায়ন।
পরদিন স্কুলে গিয়ে সায়ন দেখে, জবাফুলের মতো চোখ আর ফোলা মুখ নিয়ে তানিশা বসে আছে ক্লাসে। সারা রাত কেঁদেছে বোধ হয়। চোখে চোখ পড়তেই ওর মনে হয়, কান্নার একটা দমক তানিশার গলা পেরিয়ে উঠে আসতে চাইছে। মেয়েটার দিকে বেশি ক্ষণ তাকিয়ে থাকলে বোধ হয় কেঁদেই ফেলবে। তাড়াতাড়ি অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় সে।
সায়ন ঠিক করেছিল, আজ থেকে মেয়েটাকে একটু-একটু করে এড়িয়ে চলবে। কিন্তু, বিপদ কিছু একটা ঘটেছে। কৌতূহল হচ্ছে প্রচণ্ড।
ছুটির পর ক্লাসরুম ফাঁকা হতে দু’জনে এক সঙ্গে বেরোয়। চোখের জল আটকে রাখতে পারে না তানিশা। নাক টেনে বলে, “কাল সন্ধেয় বায়োলজি টিউশন থেকে ফেরার পথে আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে রে!”
‘সর্বনাশ’ শুনে সায়নের পেটের ভিতরে গুড়গুড় করে ওঠে। প্রশ্ন না-করে পাশাপাশি হাঁটতে থাকে সে। তানিশা নিজেই বলবে।
“পুরনো সিনেমা হলের দিকটা তো জানিস, সন্ধের পর কেমন ফাঁকা হয়ে যায়! কাল যখন ফিরছি, তিনটে ছেলে আমার পথ আটকে দাঁড়াল। প্রত্যেকের মুখেই সার্জিক্যাল মাস্ক। আমি স্কুটির মুখ ঘুরিয়ে ম্যামের বাড়ি ফিরে যাব কি না ভাবছি, ওদের এক জন এসে স্কুটির চাবি কেড়ে নিল, আর বাকিরা আমার মুখ বেঁধে ঝোপের দিকে টেনে নিয়ে গেল,” রুমাল দিয়ে চোখ-নাক মুছতে-মুছতে তিন বারের চেষ্টায় কথাগুলো বলে তানিশা।
সায়ন এ বার ভয় পায়। আজকাল সংবাদমাধ্যমে রোজ মেয়েদের উপর দলবদ্ধ নির্যাতনের গাদা-গাদা খবর বেরোয়। থমকে যায় সে।
তানিশা ওর দিকে তাকিয়ে বলে, “না না, খারাপ কিছু নয়। ওরা আমার মোবাইল কেড়ে নিয়েছে… আর হিরের আংটিটাও… দিঘির পাশে বসে তোকে যখন দেখাচ্ছিলাম, ওদের কারও চোখে পড়েছিল বোধ হয়। আমি ওখান থেকে সরাসরি টিউশনে গেছি। ফলো করছিল নিশ্চয়ই।”
ভয় ও শঙ্কার দুরুদুরু মেঘ কেটে গেছে। রাতের ঘূর্ণিঝড়ের পর আবহাওয়া রোদ-ঝলমলে। স্বস্তির নিরীহ ঢেউয়েরা ছড়িয়ে পড়ছে বেলাভূমিতে। সমুদ্রসৈকতে পাগলের মতো দৌড়তে-দৌড়তে কে যেন চিৎকার করে চলেছে, ‘বেশ হয়েছে! বেশ হয়েছে!’
নিজেই অবাক হয় সায়ন। প্রেমিকার ক্ষতির কথা শুনে ওর এত আনন্দ হচ্ছে কেন?
“মাকে বলেছি। বাবাকে কিছুতেই বলতে পারব না রে। চামড়া তুলে নেবে। বাবার রাগ তো জানিস না…”
আবার ডুকরে ওঠে তানিশা। বাবার থেকে খবরটা লুকিয়ে রাখার মানে হল, পুলিশেও অভিযোগ জানানো হবে না। চোর ধরা পড়বে না কখনও। হিরের আংটিটা অদূর ভবিষ্যতে মেয়েটার আঙুলে ওঠার কোনও সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ, ভিলেন খতম! সায়নের ঘুম পাচ্ছে। বাড়ি গিয়ে একটা লম্বা আরামের ঘুম দেবে সে। ওরকম একটা দুর্যোগপূর্ণ বিনিদ্র রাত কাটানোর পরে এই ঘুম ওর প্রাপ্য। বিছানা আর বালিশ পেলে স্কুলের করিডরেই ঘুমিয়ে পড়ত।
উল্টো দিক থেকে আসছিলেন আহমেদ স্যর। সায়নকে বলেন, “মেয়েটা কাঁদছে কেন? এর পিছনে তোর হাত নেই তো, হারামজাদা?”
উল্লাসটাকে চাপা দিয়ে সে বলে, “ওর বাবা সকালে প্রচুর মেরেছেন। মেরে পিঠ ফাটিয়ে দিয়েছেন। বাঘের মতো ডোরাকাটা দাগ বসে গেছে। পড়াশোনা করে না। টাকার শ্রাদ্ধ!”
“ও। না-পড়লেই বা কী? ওর বাবার কী টাকার অভাব!” বলে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যান স্যর।
তানিশার মাথায় হাত বুলিয়ে সায়ন বলে, “স্যর কী বললেন শুনলি তো? এমন কিছু টাকার ক্ষতি হয়নি। বিয়ের সময় হিরের নেকলেস তো পাচ্ছিসই। কাঁদিস না… তোর জন্মদিনের গিফ্ট কবে দেব, জানতে চাইছিলি না? কালই পাবি। আজ ফেলে এসেছি… ভুল করে…”
তানিশার কান্নার স্রোত থেমেছে। সে চোখ মুছে শুধু বলে, “আচ্ছা।”
উপহার তো জড়বস্তু। তার কি হীনম্মন্যতা থাকে? যত হীনম্মন্যতা কি উপহারদাতারই? ভাবনার জটিলতা মাথা থেকে জোর করে সরিয়ে দেয় সায়ন। আজ বাড়ি ফিরেই সোনালি কাগজে মুড়ে ফেলতে হবে ‘দশটি প্রেমের উপন্যাস’।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)