সাবর্ণস্যর ক্লাসে আসতেই কিরু বলল, নিলডাউন হব স্যর? একটু ঘাবড়ে গিয়ে সাবর্ণস্যর বললেন, কেন, নিলডাউন হবি কেন?
কিরু বলল, সময়ের মূল্য বুঝতে শিখেছি স্যর; অবিনাশস্যর শিখিয়েছেন। বলে কিরু আবৃত্তির ঢঙে বলতে লাগল— সময় বহিয়া যায়, নদীর স্রোতের প্রায়; যে জন বুঝে না তারে ধিক শত ধিক।
সাবর্ণস্যর খুব অবাক হয়ে বললেন, কিন্তু এর সঙ্গে নিলডাউনের কী সম্পর্ক; নিলডাউন হলে কি সময়কে বাঁধতে পারবি বাবা!
পারব স্যর। কিরু বলল, নিলডাউন হলে কেমন করে সময় বাঁচাব বুঝিয়ে বলি আপনাকে। আজ আমার পড়া হয়নি; কিন্তু স্যর আপনি বেছে বেছে ঠিক আমাকেই ধরবেন। বলবেন, বল কিরু, শিবাজি সম্পর্কে কী জানিস বল। শিবাজি সম্পর্কে আমি কিছু জানি না স্যর। লোকটা ভাল না মন্দ, কালো না ফরসা, টোটো চালাত না ফুটবল খেলত— কিছু জানা নেই আমার। আমি তাই উঠে দাঁড়িয়ে ঘাড় চুলকোতে থাকব। আপনি তখন বলবেন, পারলি না কিরু; আচ্ছা তোকে একটা সহজ প্রশ্ন ধরছি— সম্রাট আকবরের রাজ্য বিস্তার সম্পর্কে কী জানিস বল। এ বারেও আমি মাথা চুলকোতে থাকব। সত্যি বলতে কী, আকবর যখন সম্রাট তখন তো তিনি রাজ্য বিস্তার করবেনই; সেটাই তো তাঁর কাজ। গরুর কাজ যেমন দুধ দেওয়া, চোরের কাজ যেমন চুরি করা, আপনার কাজ যেমন বেছে বেছে কিরুকেই পড়া ধরা, সেই রকম রাজাদের কাজ রাজ্য বিস্তার করা। এই নিয়ে পাঁচ-সাত পাতা ধরে ভ্যাজানোর কিছু নেই স্যর। আমি মাথা চুলকোব আর আপনি বলবেন, চেষ্টা কর কিরু, চেষ্টা কর। কিন্তু চেষ্টা করে কি সব কিছু হয় স্যর বলুন! ছাগল কি স্যর চেষ্টা করে আকাশে উড়তে পারবে? মানুষ কি পারবে চেষ্টা করে ডিম পারতে! যতই চেষ্টা করুক কিছুতেই পারবে না। তাই চেষ্টা করেও আমি কিচ্ছু বলতে পারব না। আপনি তখন বলবেন, বাড়িতে কী করিস, বই কি খুলেও দেখিস না? আমি তখন এমন ভাবে মাথা নাড়ব যার অর্থ ‘হ্যাঁ’ ‘না’ দুটোই হয়। আপনি তখন বলবেন, নিলডাউন হ। তাই বলছিলাম স্যর, শেষ পর্যন্ত তো নিলডাউন হতেই হবে, শুধু শুধু সময় নষ্ট; আপনার আমার দু’জনেরই, তার চেয়ে এখনই হয়ে যাই স্যর।
একটু চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলেন সাবর্ণস্যর। যেন বুঝে উঠতে পারছেন না কী করবেন। আমাদের রাধানগর জনার্দন স্মৃতি বিদ্যানিকেতনে ইতিহাস পড়ান সাবর্ণস্যর। স্কুলে জয়েন করার পর যে কোনও অপরাধে কান মলে শাস্তি দিতেন স্যর। কিন্তু একটা অদ্ভুত স্বভাব ছিল স্যরের। কারও কান মলার পর পকেট থেকে রুমাল বের করে হাত মুছে নিতেন। ব্যাপারটায় ঘোর আপত্তি ছিল কিরুর। কান মলবেন মলুক, কিন্তু হাত মুছবেন কেন! এক দিন কিরু করল কী, স্যর ওর কান মলে হাত মোছার আগেই কিরু পকেট থেকে রুমাল বের করে কান মুছে নিল। তার পর কান মলা ছেড়েই দিলেন সাবর্ণস্যর, কিন্তু নতুন শাস্তি চালু করলেন— নিলডাউন। কম অপরাধে ক্লাসের মধ্যে নিলডাউন বেশি অপরাধে ক্লাসের বাইরে নিলডাউন। কিরুর অপরাধ কোন স্তরের সম্ভবত সেটাই ভাবছিলেন স্যর।
কিরু তাগাদা দিয়ে উঠল, স্যর সময় বহিয়া যাইতেছে নদীর স্রোতের প্রায়; বাইরে গিয়ে নিলডাউন হই স্যর?
স্যর বললেন, পড়া হয়নি তা হলে?
এক অক্ষরও হয়নি স্যর।
স্যর বললেন, ঠিক আছে, হ, কান ধরে হবি কিন্তু।
কিরু বলল, ঠিক আছে স্যর, কিন্তু কোথাও যদি চুলকোয় তা হলে কান ছেড়ে চুলকে নিতে পারব তো স্যর।
স্যর বললেন, না; চুলকোলে আমাকে ডাকবি, আমি চুলকে দেব।
ঠিক আছে স্যর। বলেই লাফ দিয়ে বাইরে চলে গেল কিরু। বারান্দায় কান ধরে নিলডাউন হল।
স্যর পড়া ধরতে লাগলেন আমাদের। আর ধরতে ধরতেই মাঝে মাঝে চিৎকার করছিলেন, কিরু।
উত্তর আসছিল, হ্যাঁ স্যর!
ধরে আছিস তো?
হ্যাঁ স্যর।
চুলকোচ্ছে?
না স্যর।
চুলকলে বলবি কিন্তু।
বলব স্যর।
একটু পরে কিরু হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, দুয়ো হোঃ!
স্যর উঁকি দিয়ে বললেন, কিরু দুয়ো দিচ্ছিস কাকে? আমাকে নাকি!
কিরু বলল, না স্যর, ভো-কাট্টা, চাঁদিয়াল ঘুড়িটা এই মাত্র কেটে গেল স্যর। দুয়ো হো-ও-ও-ও!
স্যর বললেন, হতচ্ছাড়া; বাইরে গিয়ে তুই ঘুড়ির প্যাঁচ দেখছিস!
কিরু বলল, আমার কী দোষ স্যর! আপনি তো কান ধরতে বলেছেন; চোখ বন্ধ করতে তো বলেননি।
স্যর বললেন, চাঁদিয়াল ঘুড়িটা কার?
মুখুজ্জে বাড়ির ছোট ছেলের স্যর। কাল স্যর ও আমার দুটো ঘুড়ি কেটে দিয়েছে। সেই জন্যে দুয়ো দিচ্ছি স্যর। দুয়ো হো-ও-ও ভো-কাট্টা!
কার ঘুড়ি বললি! মুখুজ্জে বাড়ির ছোট ছেলের। ও তো আমার ছেলের তিনটে ঘুড়ি কেটে দিয়েছে কাল! বলেই, তিন লাফে বাইরে চলে গেলেন সাবর্ণস্যর। কিরুর সঙ্গে চিৎকার করতে লাগলেন— দুয়ো হো-ও-ও ভো-কাট্টা!
পাশের টেন-বি-তে ক্লাস নিচ্ছিলেন অঙ্কের দোদুলস্যর! চিৎকার শুনে তিনি বাইরে এসে বললেন, আরে, ওই চাঁদিয়াল আমার বড় ভাইপোর চারটে ঘুড়ি কেটে দিয়েছে কাল; বেচারির কী কান্না! বেশ হয়েছে কেটে গেছে।
বলে, তিনিও চিৎকার করে উঠলেন, দুয়ো হো-ও-ও ভো-কাট্টা...।
তিন জনের চিৎকার শুনে হেডস্যর বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। বললেন, কী ব্যাপার, এত চিৎকার কেন!
দোদুলস্যর বললেন, কেটে গেছে স্যর!
সর্বনাশ, কার কাটল; কোথায়! হেডস্যর আঁতকে উঠলেন— খুব রক্ত বেরোচ্ছে নাকি; স্টিচ দিতে হবে তা হলে।
দোদুলস্যর বললেন, ঘুড়ি কেটে গেছে স্যর, ঘুড়ি।
ঘুড়ি, কার ঘুড়ি। হেডস্যর বললেন, কে ওড়াচ্ছে? স্কুলটা কি ঘুড়ি ওড়াবার জায়গা!
স্কুলের কেউ ওড়ায়নি স্যর। সাবর্ণস্যর বললেন, মুখুজ্জেদের ছোট ছেলে ওড়াচ্ছিল; চাঁদিয়াল ঘুড়ি, সেই ঘুড়ি কেটে গেছে, ওই-ই যে দেখুন ভেসে যাচ্ছে...।
হেডস্যর লাফিয়ে উঠলেন— চাঁদিয়াল ঘুড়ি! বেশ হয়েছে; আমার নাতির পাঁচটা ঘুড়ি কেটে দিয়েছে ওটা! বেচারি, কাল রাতে ভাল করে খেতে পারেনি।
বলে, হেডস্যরও হাততালি দিয়ে বলে উঠলেন— দুয়ো হো-ও-ও ভো-কাট্টা...।
হেডস্যরকে হাততালি দিয়ে চিৎকার করতে দেখে পিলপিল করে সব ক্লাস থেকে ছেলেরা বেরিয়ে পড়ল। সবাই চিৎকার করছে, দুয়ো হো-ও-ও-ও ভো-কাট্টা!
কিরু হঠাৎ নিলডাউন থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হেডস্যরের সামনে চলে এল। বলল, একটা কথা বলব স্যর?
হেডস্যর চিৎকার থামিয়ে বললেন, কী কথা?
স্যর, কিরু মাথা চুলকোতে চুলকোতে বলল, চাঁদিয়ালটা যখন কেটেই গেছে তখন হাফ ছুটি দিয়ে দিন আজ।
স্যর বললেন, বলছিস...।