Advertisement
২৫ জুলাই ২০২৪
পুজোর গল্প
Durga Puja 2022

হান্স

স্বপ্নের মধ্যে পাশ ফিরলাম আমি। ঘুমের মধ্যে যেন বুঝলাম, অঝোর বৃষ্টিতে সব ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। যেন বুঝলাম, কে যেন কোথাও খুব কষ্ট পেয়েছে আজ।

ছবি: অমিতাভ চন্দ্র

ছবি: অমিতাভ চন্দ্র

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
কলকাতা শেষ আপডেট: ০২ অক্টোবর ২০২২ ০৯:১৭
Share: Save:

ঘণ্টা দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “আবার ঢপ মারছিস? তোর হাত ধরেছে? অমন প্রিটি জিন্টার মতো মেয়ে তোর হাত ধরবে? কেন রে! ওর বাড়িতে হ্যান্ডেল কম পড়েছে?”

“আরে তা কেন?” হংসল মাথা নাড়ল, “আমি ওকে নিয়ে গিয়েছিলাম না নদী-বাঁধ দেখাতে? কী পিছল কী পিছল! পড়েই যেত আমার হাত না ধরলে!” হংসল আবার বলল, “আমি শিয়োর ও আমায় ভালবাসে!”

“লেও!” ঘণ্টা আবার তেড়ে উঠল, “শালা, কেউ হাত ধরলেই তোকে ভালবাসে? পাড়ায় যে বলাই শাঁখারি আসে, সে তো মেয়েদের হাত ধরে শাঁখা পরাচ্ছে গত চল্লিশ বছর! তা হলে কি ওকেও মা-মাসিরা ভালবাসে? এই বুলু, তুই এ সব আটভাট বসে শুনছিস? তোর কাজ নেই? চল!”

ঘণ্টা আমায় ধাক্কা দিল। আমিও আর দেরি না করে উঠে পড়লাম। মেঘ করেছে বেশ। আমাদের বাড়ি এই ভ্রমরকুঞ্জর অন্য দিকে। যা দেখছি তাতে মনে হচ্ছে ভালই ঢালবে। বৃষ্টি শুরুর আগে আমায় বাড়ি ফিরতে হবে। পুজোর ক’দিন পরে আমার বেরোনো। ভিজে-ফিজে জ্বর বাধালে আর দেখতে হবে না, বাবা পাসপোর্ট ছাড়াই পিটিয়ে আমেরিকা পাঠিয়ে দেবে!

হ্যাঁ, পুজোর ক’দিন পরেই আমি হায়ার স্টাডিজ়ের জন্য বাইরে চলে যাচ্ছি। আবার কবে এ দিকে আসব কে জানে! সে দিক থেকে দেখতে গেলে এটাই আমার আপাতত এই দেশে শেষ পুজো!

আমাকে উঠতে দেখে মালতী বলে উঠল, “বুলুদা চললে?”

আমি দেখলাম প্যান্ডেলের উপরে উঠেছে মালতী! মেয়েটা তো আচ্ছা গেছো! দেখ না দেখ এটা ওটা বেয়ে উঠে পড়ে!

আমি বললাম, “প্যান্ডেলে উঠে কী করছিস? দোকানে যাবি না!”

মালতী বলল, “বড়দাদু হংসলকে বলেছে ভাল করে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দিতে। বৃষ্টি হলে যাতে প্রতিমার ক্ষতি না হয়! তাই ত্রিপলটা ঠিক আছে কি না দেখছিলাম!”

আমি বললাম, “সেটা ডেকরেটরদের কাজ। হংসল সুপারভাইজ় করছে। ও বুঝবে। তুই নাম। শেষে পুজোর দিনে হাত পা ভেঙে বসে থাকবি না কি? নাম বলছি!”

মালতী বলল, “দেখো, তোমার কত খেয়াল আমার দিকে। কিন্তু ওই হংসল! ওর কি একটুও খেয়াল আছে? আমি যেন মানুষ নই!”

ঘণ্টা বলল, “ও তো এখন বলাই শাঁখারি! তোর দিকে খেয়াল থাকবে কী করে? শালা আর ছেলে পাসনি প্রেমে পড়ার! ভাল ভাল মেয়েগুলোকে দেখেছি সব সময় আলতু-ফালতু ছেলেদেরপ্রেমে পড়ে!”

“তা হলে তোর প্রেমে কেউ পড়ল না কেন!” হংসল রাগের গলায় বলল, “তুই যা তো! আমাদের কাজ করতে দে! যা!”

ঘণ্টা বিরক্ত হয়ে আমায় বলল, “কত্ত কাজের ছেলে! রাজপ্রাসাদ বানাচ্ছে! শৃণ্বন্তি আসার পর থেকেই দেখছি সারা ক্ষণ ছোঁকছোঁক করছিস! এ দিকে মালতী তোকে যে ভালবাসে তার কোনওদাম নেই, না!”

“কার সঙ্গে কার তু...” কথাটা আচমকা ব্রেক কষে থামিয়ে দিয়ে হংসল যেন খেয়াল করল কী বাজে কথা বলতে যাচ্ছিল! ও এ বার বিরক্ত হয়ে বলল, “তোরা যা তো! আমার কাজ আছে। পরশু ষষ্ঠী। এখনও অনেক কাজ বাকি!”

আমি ঘণ্টার সাইকেলে উঠলাম। দেখলাম প্যান্ডেলের ওপর থেকে ম্লান মুখে হংসলের দিকে তাকিয়ে আছে মালতী।

*****

আমি যে সময়ের কথা বলছি সেটা দু’হাজার সাল। নতুন সহস্রাব্দের পৃথিবী তখনও এখনকার মতো স্মার্টফোন আর ডেট-মেট-সেপারেট-এর ত্রিকোণে আবদ্ধ হয়ে পড়েনি।

আমার বাবার বদলির চাকরির সূত্রে আমরা ভ্রমরকুঞ্জ নামক এই মফস্সলে এসেছিলাম। তখন সদ্য মাধ্যমিক পাশ করেছি। এখানে এসে হরিনারায়ণ হাইস্কুলে ক্লাস ইলেভেনে সায়েন্স নিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম আমি। আর তখন থেকেই ঘণ্টা আর হংসল আমার বন্ধু! ঘণ্টার ভাল নাম সুপ্রভ। কিন্তু ঘণ্টাটাই প্রচারিত।

হংসলের বাবা, মানে গোপালকাকু, মল্লিকদের এই বড় জমিদারবাড়ির কেয়ারটেকার। মল্লিকরা পুজোর সময় এখানে আসে। তার পর পুজো শেষ হলে অস্ট্রেলিয়া ফিরে যায়। সারা বছর তখন গোপালকাকু বাড়িটার রক্ষণাবেক্ষণ করে। গোপালকাকু নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ। স্টেশনের কাছে একটা চায়ের দোকান চালায়। বাড়িতে নানা টানাটানি লেগেই আছে। তাই হংসলও টুকটাক কাজকম্ম করে।

এই যে মল্লিকরা পুজোয় এসেছে, ওরা বলেছে ডেকরেটর্সরা তো প্যান্ডেল বানাচ্ছে, কিন্তু হংসল যেন সবটা নজরে রাখে।

মল্লিকদের আগে ঠাকুরদালান ছিল। কিন্তু বড় বাড়িটা ওরা বিক্রি করে দিয়েছে। সেটার একটা দিক ভাঙা চলছে এখন। বুড়োদাদুর ইচ্ছে অন্তত শেষ বারের মতো পুজোটা হোক। বুড়োদাদু, মানে রাধারমণ মল্লিকের বয়স প্রায় পঁচানব্বই। কোন দিন কী হয়ে যায়! তাই বাড়ির কেউ আপত্তি করেনি। বাড়ির থেকে একটু দূরে স্বামীজি সঙ্ঘের মাঠে এ বার প্যান্ডেল হয়েছে মল্লিকবাড়ির পুজোর।

আর এই যে মল্লিকরা অস্ট্রেলিয়া থেকে এ বার এসেছে, ওদের সঙ্গেই এসেছে শৃণ্বন্তি। মানে আমাদের গল্পের প্রিটি জিন্টা। মেয়েটা ওদের কেমন যেন আত্মীয়। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, দু’হাজার সালের সেই সময়ে প্রিটি জিন্টা খুব নামকরা স্টার ছিলেন। তাই যে কোনও সুন্দরী, এক গালে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মতো টোল পড়া মেয়েকেই বলা হত, “ওই দেখ, প্রিটি জিন্টা!”

আর এই প্রিটি আসার পর থেকেই হংসলের এই মেয়েটির প্রতি প্রীতি উছলে উঠছে!

“এই শালা, কী করছিস রে?” ঘণ্টার গলা পেলাম আমি। দেখলাম ওর সঙ্গে মালতীও আছে।

আমি বললাম, “এই পাঠকদের একটু গল্পের ব্যাকগ্রাউন্ড দিচ্ছিলাম!”

“পাঠকদের মানে? কাকে?” ঘণ্টা এক পাক ঘুরে চারিদিকে কাউকে দেখতে না পেয়ে আমার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল।

আমি বললাম, “ও বুঝবি না তুই। ফোর্থ ওয়াল ব্রেক! বাদ দে! কী বলবি?”

“ফাঁকা মাঠের মধ্যে একা একা দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করছিস! তার কেটে গিয়েছে? এ সব জানলে কিন্তু ভিসা বাতিল হয়ে যাবে তোর! কী করছিস সত্যি করে বল!”

আমি বললাম, “না এমনি। চলে যাব তো! তাই একা একটু ঘুরছিলাম। শেষ বারের মতো...”

“রাখ তো শেষ বার! এখানে মালতী কেঁদে কেঁদে চার মিলিমিটার বেঁটে হয়ে গেল!”

আমি এ বার দেখলাম, সত্যিই মালতীর মুখচোখ কেমন যেন হয়ে আছে।

মেয়েটা খুব ভাল। তার সঙ্গে খালি গলায় কী সুন্দর গান করে। এ দিকে শেখেনি কিন্তু কোনও দিন! বেশ গরিব বাড়ির মেয়ে মালতী। বাবা চটকলে চাকরি করত। এখন সেই চটকল বন্ধ বলে মালতীকে শ্রীকৃষ্ণ বস্ত্রালয়ে সেলস গার্লের কাজ নিতে হয়েছে। ওর বাবা একটা ছোট্ট পানের গুমটি দিয়েছে। তাতে কী করে যে ওদের সংসার চলে কে জানে!

আমি মালতীকে বললাম, “কী হয়েছে?”

মালতী বলল, “হংসল আমাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। আজ পঞ্চমী। আমি মল্লিকদের বাড়িতে গিয়েছিলাম আমাদের দোকানের মন্টুদার সঙ্গে মল্লিকদের কাজের লোকেদের জামাকাপড় পৌঁছে দিতে। গিয়ে দেখি হংসল ওই মেয়েটার পায়ে আলতা পরিয়ে দিচ্ছে! ভাবো এক বার! আমি ডাকলাম। আমায় বলে কি না আমি ওর স্ট্যান্ডার্ডের নই! লোকজনের সামনে যেন ওকে না ডাকি! সবার সামনে অমন বলল জানো!”

কথা শেষ করে মালতী আবার কাঁদতে শুরু করল!

আমি কী করব বুঝতে পারলাম না। হংসল এটা কী বলেছে! আমি ভাবতেই পারছি না! অমানুষ হয়ে গেল না কি ছেলেটা?

মালতী ওড়না দিয়ে চোখের জল মুছে বলল, “আমারই দোষ! সেই কবে হংসলের অমন সুন্দর চোখ দেখে ওর প্রেমে পড়েছিলাম। সেটাই ভুল হয়েছে আমার। দেখো, মেয়েটা বিদেশ থেকে এসেছে। বড়লোকের আদুরে মেয়ে। মোমের মতো চেহারা। সবার সঙ্গে হেসে কথা বলে। ওর সঙ্গেও বলছে! তার মানে ওকে পাত্তা দেবে না কি? ও ভুলে গেল গত বার ডেঙ্গুতে সারা রাত জেগে কে ওকে জলপট্টি দিয়েছিল? মা কত বকল রাতে ওদের বাড়িতে থাকলাম বলে। আমি গা-ই করলাম না। ভুলে গিয়েছে প্রতি বার পুজোতে কে জামা কিনে দেয় ওকে? এ বারও তো কিনেছি। কিন্তু বলেছে নেবে না। আমি ভেবেছি এমনি বলছে। কিন্তু আজ সবার সামনে...”

মালতী আবার কাঁদতে শুরু করল। কেউ কান্নাকাটি করলে আমার একদম ভাল লাগে না জানেন! কাল ষষ্ঠী। আর আজ মেয়েটা এমন করছে! বাবা বলে, “পূজা-কাটাইল্যার দিনে অমন কাঁদতে নেই!”

প্লিজ়, আমায় এই ‘কাটাইল্যা’ মানে কী, জিজ্ঞেস করবেন না। আমি জানি না। আমরা বাঙাল। মানে আমার ঠাকুরদা ছেচল্লিশে চলে এসেছিল এখানে। বাবা এ দিকের হলেও মেঘনাপারের প্রভাব থেকে গিয়েছে ভাষায়। তাই কথার মাঝে বাবা এমন সব বাঙাল-টার্ম গুঁজে দেয় যে আমিও মানে বুঝি না!

কিন্তু কথাটা সত্যি। পুজোর দিনে কেউ কাঁদে!

আমি বললাম, “দেখ, এ বার হয়তো এখানে আমার লাস্ট পুজো। জানি না আর এখানে আসতে পারব কি না। প্লিজ় তোরা এমন করিস না! মেয়েটা দু’দিনের জন্য এসেছে, চলে যাবে। হংসল লাইনে চলে আসবে! আর কী সারা ক্ষণ প্রেম নিয়ে প্যানপ্যানানি করিস? অন্য কাজ নেই?”

মালতী কিছু বলার আগেই ঘণ্টা লাফিয়ে পড়ে বলল, “মারব শালা! এই বয়সে প্রেম নিয়ে সমস্যায় থাকবে না তো কি সত্তর বছরে থাকবে?”

মালতী নিজের মনে বলে, “জানো, সারা দিন ওই প্যান্ডেল নিয়ে পড়ে আছে। মল্লিকদের বাড়ির কেউ যায়ও না। দেখে মনে হচ্ছে সব দায় হংসলের। বলে, শৃণ্বন্তি প্রথম পুজো দেখবে, ওর একটা দায়িত্ব আছে না!”

“আর পুজো! কাল থেকে যা মেঘ করছে! হাওয়া অফিস বলছে হেবি ঢালবে!” আমি বললাম।

“কিচ্ছু ঢালবে না! ওরা যা বলে উল্টোটা হয়!” ঘণ্টা নিশ্চিন্ত ভাবে বলল। তার পর মালতীকে বলল, “তুই দোকানে যা। কান্নাকাটি করিস না! ভাল করে পুজো কাটা।”

মালতী যাওয়ার আগে আমায় বলল, “তুমি একটু হংসলকে বুঝিয়ো প্লিজ়!”

*****

এই পৃথিবীতে কেউ কিছু বোঝে না। সবাই নিজের মর্জিতেই চলে। সবার কাছে সে নিজেই প্রায়োরিটি। তাই হংসলও আমার কথা শোনেনি। বরং বলেছে, “বেশি জ্ঞান দিতে আসিস না বুলু। আমি বুঝব আমার লাইফে কী করব!”

তাই আমিও ভেবেছি, কেন ফালতু ব্যাটারি খরচ করতে যাব! আমি আর আছিই বা ক’দিন! চলে তো যাব। কোথায় শিকাগো আর কোথায় ভ্রমরকুঞ্জ! আপনারাই বলুন, কেউ সাধ করে গাল পেতে চড় খায়! হংসল থাকুক ওর প্রিটি জিন্টাকে নিয়ে।

তাই আর কথা না বাড়িয়ে বাড়ি ফিরে এসেছি।

রাতে খেতে বসেছি যখন, টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হল।

মা বলল, “শনিবারের বৃষ্টি, দেখ কত দিনে ছাড়ে! আকাশের যা অবস্থা!”

রাতে খাওয়ার পরে শুতে যাওয়ার সময় দেখলাম বৃষ্টির ঝাপটা বাড়ল। বাড়ির পাশের পুকুরে, টিভিতে কানেকশন চলে যাওয়ার পরে সাদাকালো ছবির সঙ্গে যেমন ঘিসঘিসে শব্দ শোনা যায়, সে রকম শব্দ বাড়তে লাগল।

আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। শেষ রাতে ভীষণ শব্দে বাজ পড়ল। আমি আবছায়া ঘুম ভেঙে দেখলাম, প্রচণ্ড বৃষ্টিতে হংসল নৌকো চালিয়ে কোথায় যেন চলে যাচ্ছে! আর এক কোমর জলে দাঁড়িয়ে মালতী ওকে ডাকছে! স্বপ্নের মধ্যে পাশ ফিরলাম আমি। ঘুমের মধ্যে যেন বুঝলাম, অঝোর বৃষ্টিতে সব ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। যেন বুঝলাম, কে যেন কোথাও খুব কষ্ট পেয়েছে আজ।

সকালে ঘুম ভাঙল মায়ের ডাকে। মায়ের গলায় উদ্বেগ আর উত্তেজনা। ঘুমচোখে ব্যাপারটা বুঝতে সময় লাগল। দেখলাম মায়ের পাশে ঘণ্টাওদাঁড়িয়ে আছে।

“কী ব্যাপার?” আমি জোর করে নিজেকে সজাগ করলাম এ বার।

ঘণ্টা বলল, “বিশাল অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। হংসল সিরিয়াস চোট পেয়েছে! চল এক্ষুনি। ওকে জেলা হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছে সবাই!”

আমি দ্রুত ফ্রেশ হয়ে ঘণ্টার সঙ্গে বেরোলাম। দেখলাম আকাশ এখনও কালো হয়ে আছে। তবে বৃষ্টিটা কমেছে। আর আমাদের ভ্রমরকুঞ্জের জায়গায় জায়গায় জল দাঁড়িয়ে গিয়েছে। রাতের ঝড়ে বেশ কিছু গাছপালাও ভেঙে পড়েছে।

হাসপাতালে পৌঁছে দেখলাম মল্লিকদের বড় ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে হংসলের বাবা, কাকা আর মালতী। মালতী তো কেঁদে কেঁদে লাল করে ফেলেছে চোখ।

কী করে কী হল বুঝলাম এ বার। কাল সারা রাত খুব ঝড়বৃষ্টি হয়েছে। প্যান্ডেলের একটা দিক দিয়ে ত্রিপল ছিঁড়ে গিয়ে জল পড়ছিল হুড়হুড় করে। আর তখন প্যান্ডেল আর ঠাকুর বাঁচাতে একটা মইতে উঠে সারা রাত দু’ হাত দিয়ে টিন চেপে ধরে সেই জল আটকাচ্ছিল হংসল!

ভাবুন, সারা রাত!

তার পর শেষ রাতে আচমকা ঝড়-জলের তোড় বাড়ে। আর ঝড়ে পাশের একটা আমগাছ ভেঙে পড়ে প্যান্ডেলের ওই জায়গায়। হংসল বাঁশ-খুঁটি-মই নিয়ে গাছের ডালের নীচে চাপা পড়ে যায়!

আমার মনে হল, সারা রাত ওই ভাবে জল আটকানোর চেষ্টা করেছিল কেন হংসল?

*****

মল্লিকদের পুজো প্যান্ডেলের একটা দিক ড্যামেজ হলেও, আশ্চর্য ভাবে প্রতিমার কোনও ক্ষতি হয়নি। তাই পুজো হয়েছে। তবে সারা পুজো জুড়েই বৃষ্টি। যদিও আমার, ঘণ্টার বা মালতীর পুজো ছিল না এই বছর। আমাদের পুরো সময়টা হাসপাতালেই কেটে গিয়েছে।

তাই পুজো কখন এল আর কখন চলে গেল, বুঝতেই পারিনি। এক দিন বড় দিঘির দিকে যাওয়া ঢাকের শব্দ পেয়ে বুঝেছিলাম যে, প্রতিমা নিরঞ্জন হবে। বুঝেছিলাম আজ বিজয়াদশমী।

হংসলের জ্ঞান এল বিজয়ার চার দিনের পর, ভোরবেলা। সে দিনই বিকেলে আমার চলে যাওয়া।

আমি সকালেই গেলাম ওর সঙ্গে দেখা করতে। দেখলাম, হংসল শুয়ে আছে। মাথায়, চোখে ব্যান্ডেজ। কোমর থেকে নীচের দিকে প্লাস্টার।

আমি গিয়েছি বুঝে খুব মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করল, “পুজো শেষ?”

আমি বললাম, “হ্যাঁ।”

“আর... শৃণ্বন্তি?”

বললাম, “ওরা সবাই একাদশীর দিনইচলে গিয়েছে।”

“এসেছিল আমায় দেখতে?” ব্যান্ডেজ বাঁধা চোখ নিয়ে সামান্য নড়ল হংসল। গলায় আশার ছোট্ট প্রজাপতি।

আমি চোয়াল শক্ত করে ভাবলাম সত্যিটা বলে দিই। বলে দিই, এক দিনও আসেনি। পাত্তাও দেয়নি! ও আনন্দেই ছিল! কিন্তু জীবনে সবাইকে সব জায়গায় সত্যি বলতে নেই। সব সময় সত্যি বলা মনুষ্যত্ব নয়।

তাই বললাম, “এসেছিল বেশ কয়েক বার। কিন্তু তোর জ্ঞান ছিল না তো। চলে যাওয়ার আগেও অনেক বার জিজ্ঞেস করেছে তোর কথা!”

এত যন্ত্রণার মধ্যেও হংসল হাসল। বলল, “চোখে একটা সমস্যা হচ্ছে জানিস। ব্যান্ডেজ করে রেখেছে। সারা শরীরে অনেক আঘাত। শহর থেকে বড় ডাক্তার আনাবে মল্লিকরা।”

আমি বললাম, “কেউ এমন করে! মানুষের জীবন বড়, না প্যান্ডেল?”

হংসল আবছা গলায় বলল, “ভালবাসা! ভালবাসা সবচেয়ে বড়! ও এসেছে পুজো দেখবে বলে। প্যান্ডেল ভেসে দিতে যেতে পারি?”

“নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কেউ এমন করেছে কোনও দিন?”

“করেছে, করেছে।” হংসল বলল।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কে করেছে?”

হংসল আবারও কষ্ট করে হাসল সামান্য। তার পর বলল, “হান্স!”

বাইশ বছর পর। ২০২২।

“হান্স কে বাবা?” মুন আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।

ভ্রমরকুঞ্জের মেলার মাঠের পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে আমি তাকালাম ওর দিকে। মুনের মুখে আগ্রহ। এত ক্ষণ গল্প বলছিলাম ওকে। কিন্তু এখানে এসে আটকে গিয়েছে সেই গল্প!

আমি বললাম, “নেদারল্যান্ডসের একটা বাচ্চা ছেলে হান্স। হান্স ব্রিঙ্কার। ওদের গ্রামে একটা বাঁধে ফাটল ধরেছিল। সেই ফাটল দিয়ে জল ঢুকে গোটা গ্রাম ডুবিয়ে দিতে পারত। তাই হান্স সারা রাত ঠান্ডার মধ্যে সেই বাঁধের ছোট্ট ফাটলে আঙুল ঢুকিয়ে বাঁধটাকে ভাঙতে দেয়নি। গ্রামটাকে ভেসে যেতে দেয়নি!”

“এটা সত্যি?” মুন অবাক হল, “কেউ এমন করতে পারে?”

আমি হাসলাম। বললাম, “না, এটা গল্প। কিন্তু গল্প তো জীবন থেকেই নেওয়া হয় অনেক সময়। কে জানে হান্সের মতো সত্যিই কেউ ছিল কি না!”

মুন বলল, “ছিল তো। তোমার বন্ধু, হংসল!”

আমি হাসলাম আবার।

মুন জিজ্ঞেস করল, “ও এখন কোথায় আছে?”

আমি গাড়ির থেকে নেমে বললাম, “সেটা জানতেই তো আজ এই সপ্তমী পুজোর দিন ভ্রমরকুঞ্জে এলাম। নেমে আয়।”

বাইশ বছর পর আমি এলাম ভ্রমরকুঞ্জে। সেই বিদেশে যাওয়ার কিছু দিনের মধ্যে বাবা এখান থেকে আবার বদলি হয়ে যায়। ফলে আর কোনও দিন আমার ভ্রমরকুঞ্জে ফেরা হয়নি। যোগাযোগ ব্যবস্থাও এখনকার মতো ছিল না তখন। তাই খবরও সে ভাবে আর পাইনি। তার পর স্বার্থপর জীবনের চাপে ধীরে ধীরে ভুলেই গিয়েছিলাম সব।

তার পর এ বছর পুজোয় দেশে ফেরার পরে মহালয়ার দিনে সাংঘাতিক ঝড়বৃষ্টি হল। আমাদের কলকাতার বাড়ির সামনের একটা গাছ ভেঙে পড়ল পাড়ার প্যান্ডেলের খাঁচার ওপর। আর কেন জানি না এক লহমায় আমার মনে পড়ে গেল সব! ভাবলাম, যে গল্পটা আমি বাইশ বছর আগে ছেড়ে এসেছি সেটার শেষ জানতেই হবে।

ভ্রমরকুঞ্জের মেলার মাঠটা এখনও একই রকম আছে! আসার পথে জিজ্ঞেস করে জেনেছি এখানে হংসল নাকি দোকান দিয়েছে। নাম ‘হংসল রেস্টুরেন্ট’।

মুনকে নিয়ে মেলার মধ্যে একটু হাঁটতেই দেখতে পেলাম দোকানটা। ম্যারাপ বাঁধা অস্থায়ী দোকান। পুজোয় যেমন হয়। উপরে নাম লেখা।

এখন সকাল। তাই ভিড় নেই। এমন দোকানে সন্ধেবেলার দিকেই মূলত ভিড় হয়।

আমি গিয়ে দাঁড়ালাম দোকানের সামনে। দেখলাম কাউন্টারের পেছনে সামান্য মোটা চেহারার এক জন বসে আছে। চোখে সানগ্লাস। মাথার চুল কাঁচাপাকা। গালে দাড়ি।

আমি সামান্য শব্দ করে গলাখাঁকারি দিলাম।

লোকটা মুখ উপরের দিকে তুলে জিজ্ঞেস করল, “স্যর, কিছু অর্ডার করবেন?”

আমি হাসলাম, “স্যর কী রে? আমায় চিনতে পারছিস না? এতটা পাল্টে গিয়েছি?”

লোকটা থতমত খেয়ে গেল। সানগ্লাসের ও পারে কী যেন খুঁজল। তার পর উজ্জ্বল গলায় বলল, “বুলু তুই!”

এ বার হইহই করে ডাকল, “মালতী, মালতী দেখে যাও! তাড়াতাড়ি এসো, দেখো কে এসেছে!”

দোকানের লাগোয়া একটা ছোট্ট ঘরের মতো করা হয়েছে। বুঝলাম ওখানে রান্না হয়। মালতী আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এল সেই ঘর থেকে। আর তার পর আমায় দেখে থমকে দাঁড়াল! অস্ফুটে বলল, “বুলুদা! তুমি!”

পরের আধঘণ্টা কী করে যে কেটে গেল!ওরা কত কী যে জিজ্ঞেস করল আমায়। কত কথা বলল নিজেদের।

জানলাম, সেই দুর্ঘটনার পর থেকেই হংসল আর চোখে দেখতে পায় না। মাথায় লাগা আঘাতে অপটিক নার্ভ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। হংসল আর কাজকম্মও করতে পারে না। মালতীই হাল ধরেছে ওর জীবনের। সংসারের। হংসলের ভাইবোনকে পড়াশুনো শিখিয়েছে। নিজের পায়ে দাঁড় করিয়েছে। দিঘির পাড়ে ছোট একটা বাড়িও বানিয়েছে। এই মেলায় অস্থায়ী দোকান থাকলেও, বাস টার্মিনাসের কাছে বড় দোকান করেছে খাবারের। ভালই চলে ওদের। তবে সন্তান নেই। হয়নি।

আমি দেখলাম, হংসল মুনের মুখে হাত বুলিয়ে কী যেন দেখল। তার পর আমায় বলল, “ঠিক তোর মতো দেখতে হয়েছে, না?”

আমি অবাক হলাম, “কী করে বুঝলি?”

হংসল হাসল। বলল, “যখন চোখ ছিল, দেখতে পেতাম না। এখন পাই।”

দেখলাম মুন আর হংসল নিজেদের মধ্যে গল্প শুরু করল। মুন বলছে। হংসলও শুনছে আগ্রহ নিয়ে। ভাল লাগল আমার।

মালতী বলল, “খুব বাচ্চা ভালবাসে ও! নিজের নেই তো!”

আমি বললাম, “মুন এখন তেরো! বাচ্চাকই আর!”

মালতী হাসল। তার পর কেমন যেন হঠাৎ ম্লান হয়ে গেল ওর মুখ! বলল, “একটা কথা বলার ছিল তোমায়। সারা জীবন বুকের মধ্যে নিয়ে ঘুরেছি এটা। বলতে পারিনি কাউকে। তুমি এখানে থাকো না। তাই তোমায় বলে হালকা হতে চাই।”

“কী রে?” আমি অবাক হলাম।

“সেই যে রাতে দুর্ঘটনা হল, তার আগের সন্ধেবেলা আমি লুকিয়ে প্যান্ডেলের কাছে গিয়েছিলাম জানো। ওই মেয়েটার জন্য হংসলের এত ভালবাসা দেখে হিংসেয় জ্বলে পুড়ে যাচ্ছিলাম আমি! তাই ভেবেছিলাম বৃষ্টি নামবে তো, তার আগে ত্রিপল ছিঁড়ে প্যান্ডেলটার এমন ক্ষতি করে দেব যাতে পুজো ভেস্তে যায়! তাই সে দিন সন্ধেবেলা...”

“থাক মালতী, আর বলতে হবে না,” আমি থামালাম ওকে, “যা হয়ে গিয়েছে তা আর টেনে বার করিস না। বাদ দে।”

“না না বুলুদা, তুমি যা ভাবছ তা নয়! আমি কিছু করিনি! ভেবেছিলাম করব। কিন্তু বিশ্বাস করো কিচ্ছু করিনি। শেষ মুহূর্তে মনে হয়েছিল, হংসল কষ্ট পাবে! কী করে ওকে কষ্ট দেব! পরে যখন অ্যাক্সিডেন্ট হল আমি যে কী কষ্ট পেয়েছি! এখনও ওকে এই ভাবে দেখলে মনে হয় সবটা আমার জন্য হয়েছে! কী সুন্দর ছিল ওর চোখ দুটো! আর সেটাই... মা বলত মাঝে মাঝে আমাদের ইচ্ছে ফলে যায়! এটাও বোধহয় সেই ইচ্ছের ফল! বুলুদা, আমার জন্যই কি হংসলের এমন হল?”

আমি দেখলাম, মালতী কাঁদছে। সপ্তমীর সকালের রোদ্দুর এসে পড়েছে ওর ক্লান্ত মুখে। গালে সামান্য মেচেতার দাগ। চোখের কোণে ভাঁজ। সুন্দর মেয়েটার মুখে সময় কী ভাবে যে চিহ্ন রেখেছে!

আমি আলতো করে ওর মাথায় হাত দিলাম। বললাম, “তুই পাগলি! এ সব কখনও হয়? বোকা মেয়ে। জানিস হংসল আমায় বলেছিল, ও নাকি হান্স! কিন্তু ও হান্স নয়। নিজের জীবন দিয়ে তুই যে ভাবে ওর জীবন, ওর পরিবারের জীবনের ফাটল আটকালি, ওদের বাঁচালি, তুই-ই সত্যিকারের হান্স। এই পৃথিবীতে যারা এ ভাবে নিজের পরোয়া না করে অন্যের জীবন রক্ষা করে, তারা সব্বাই হান্স!”

মালতী ছলছলে চোখে তাকাল আমার দিকে।

আমি বললাম, “দেখ কী অপূর্ব সপ্তমীর সকাল! কী সুন্দর সোনার রোদ উঠেছে! আজ পুজো-কাটাইল্যার দিন! কত আনন্দ চার দিকে! আজ কাঁদতে নেই!”

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

অন্য বিষয়গুলি:

Durga Puja 2022 Smaranjit Chakraborty
সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:
Advertisement

Share this article

CLOSE