ম্যাচ শেষে ক্যামেরা যখন ইডেনের ড্রেসিং রুম ধরল, তখন সঞ্জু স্যামসন ব্যাটে চুমু খাচ্ছেন। ওই একটা চুমুই বুঝিয়ে দিল বুকের ভিতর কী বড় পাথর জমে ছিল।
পরের দৃশ্যে দেখা গেল হার্দিক পাণ্ড্য থেকে শুরু করে অক্ষর পটেল, অভিষেক শর্মা এবং সব শেষে অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব সঞ্জুকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। আরও এক বার বোঝা গেল সঞ্জুর বুকের পাথরটা কত বড় ছিল।
তার আগে ঠান্ডা মাথায় ভারতকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তুলে দিয়েছেন সঞ্জু। ৩ রানের জন্য শতরান পূর্ণ করতে পারেননি। তবু তাঁর মধ্যে কোনও আক্ষেপ দেখা যায়নি! বরং দলকে জয় এনে দেওয়ার তৃপ্তি ধরা পড়েছে তাঁর মুখে। রোমারিও শেফার্ডকে শেষ ওভারের দ্বিতীয় বলে চার মারার পরই পিচে বসে পড়েন সঞ্জু। ঈশ্বরকে প্রণাম করেন। ৫০ বলের অপরাজিত ইনিংসেই যেন সব অবজ্ঞার জবাব দিলেন। খেলার শেষে বলেও দিলেন, এটাই তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা দিন।
ইডেনের সাজঘরে ব্যাটে চুম্বন সঞ্জু স্যামসনের। ছবি: সংগৃহীত।
বিশ্বকাপের আগে নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি সিরিজ়ে রান পাচ্ছিলেন না। বিশ্বকাপের শুরুতে তাঁর উপর ভরসা রাখতে পারেননি গৌতম গম্ভীরেরা। অভিষেকের অফ ফর্ম আবার সঞ্জুর কথা ভাবতে বাধ্য করে গম্ভীর-সূর্যদের।
খেলা শেষ হওয়ার পর স্ত্রীকে ভিডিয়ো কল সঞ্জু স্যামসনের। ছবি: সংগৃহীত।
হতাশ করলেন না সঞ্জু। নিজেকে উজাড় করে দিলেন বিশ্বকাপের ‘কোয়ার্টার ফাইনালে’। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের কাছে হারলেই বিশ্বকাপ থেকে পিছলে যেত ভারত। সঞ্জু পিছলে যেতে দিলেন না। দলের ইনিংসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ২২ গজের এক প্রান্ত আঁকড়ে রাখলেন। সংযত থাকলেন প্রতিটি বলে। বুঝে খেললেন। ব্যক্তিগত কীর্তির জন্য তাড়াহুড়ো করেননি। দলের স্বার্থকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। সতীর্থ, সাপোর্ট স্টাফেরা যখন তাঁকে অভিনন্দন, আদরে ভরিয়ে দিচ্ছিলেন, তখনও সঞ্জু ছিলেন সংযত। আবেগ, উচ্ছ্বাস সব নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তবে খেলা শেষ হওয়ার পর স্ত্রীকে ভিডিয়ো কল করেন। সুখ-দুঃখের সঙ্গীর সঙ্গে ভাগ করে নিতে চেয়েছেন জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। আবেগ।
গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দলেও ছিলেন সঞ্জু। একটি ম্যাচও খেলার সুযোগ পাননি। ক্রিকেটজীবনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপেও প্রথম একাদশে সুযোগ পাচ্ছিলেন না। সুযোগ পেয়েছেন গম্ভীরের ভরসার ওপেনিং জুটি ম্যাচের পর ম্যাচ ব্যর্থ হওয়ার পর। তার পর এমন ইনিংস। যে ইনিংস শুধু তাঁর স্বপ্নই পূরণ করল না, ভারতীয় দলকেও বাড়তি অক্সিজেন দিল সেমিফাইনালের আগে।
ম্যাচের সেরা ক্রিকেটারের পুরস্কার নেওয়ার পর সঞ্জু বললেন, ‘‘দীর্ঘ দিন ধরে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট খেলছি। ১০-১২ বছর ধরে আইপিএল খেলছি। দেশের হয়েও প্রায় ১০ বছর খেলছি। বিরাট কোহলি, মহেন্দ্র সিংহ ধোনিদের কাছে অনেক কিছু শিখেছি। সেটা আমাকে সাহায্য করেছে। অভিজ্ঞতা বাড়িয়েছে। ওরা কী ভাবে খেলত, পরিস্থিতি অনুযায়ী কী ভাবে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করত সেগুলো দেখেছি।’’ রবিবারের ইনিংস নিয়ে বললেন, ‘‘আগের দিন আমরা আগে ব্যাট করেছিলাম। বড় রান তোলার লক্ষ্য ছিল। প্রথম থেকেই মারতে হয়েছিল। ও রকম ভাবে খেলতে হলে আউট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ দিন তেমন ছিল না। জানতাম, কত রান করতে হবে। সেই মতো খেলার চেষ্টা করেছি। একটা একটা করে বল নিয়ে ভেবেছি। বলের মান বুঝে খেলার চেষ্টা করেছি। আমার মনে হচ্ছে না বিশেষ কিছু করেছি। তবে এটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা দিন।’’
আরও পড়ুন:
সঞ্জু আরও বলেছেন, ‘‘যে দিন থেকে ক্রিকেট খেলতে শুরু করেছি, সে দিন থেকেই দেশের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখেছি। এমনই একটা ইনিংসের জন্য এক দিন অপেক্ষা করেছিলাম। আমার ক্রিকেটজীবনের যাত্রাটা দারুণ। নানা উত্থান-পতন রয়েছে। একটা সময় নিজের উপরই একটা অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। ভাবতাম আমি কি পারব? ঈশ্বরে অনেক ধন্যবাদ আমাকে আশীর্বাদ করার জন্য।’’