Advertisement
E-Paper

তিনি থেকেও নেই, না থেকেও আছেন

লালগড়ের জঙ্গলে বাঘ নিয়ে সরকারের ঘুম নেই। তবু এই বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলের বাসিন্দা আদিবাসীদের কাছে বাঘের  উপস্থিতি যেন নিজেদের হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ারই শামিল।লালগড়ের জঙ্গলে বাঘ নিয়ে সরকারের ঘুম নেই। তবু এই বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলের বাসিন্দা আদিবাসীদের কাছে বাঘের  উপস্থিতি যেন নিজেদের হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ারই শামিল।

রাহুল রায়

শেষ আপডেট: ২৫ মার্চ ২০১৮ ০০:০০
ছবি সৌজন্য: বন দফতর

ছবি সৌজন্য: বন দফতর

আমতলির বাঁকে খর্বুটে কালভার্টটা পার হলেই চোখে পড়ছে, জঙ্গলের ছায়াচ্ছন্নতা পিঠে নিয়ে গুড়গুড় করে এগিয়ে চলা লজঝ়ড়ে একটা পিক-আপ ভ্যান। চৈত্র-সকালের ফুরফুরে হাওয়া-টাওয়ার রেয়াত না করে আপাদমস্তক কাচ তোলা গাড়িটার। ভেতর থেকে গলা খাঁকারি দিয়ে নাগাড়ে হেঁকে চলেছে ছেলেটি— ‘‘শুনো শুনো শুনো... মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের সট-কাট কইরত্যে বনের পথে হাঁটা চইলবেক নাই, উ পথে বাঘ আছে... ইটো সরকারি নির্দেশ, অমান্য করা যাবেক নাই...’’

জঙ্গলের গুঁড়ি-মারা পথ ধরে সরকার বাহাদুরের সেই অমোঘ নির্দেশ পাড়ি দিয়েছে লালগড় থেকে সারেঙ্গা। সারাটা দিন গ্রামের মোরাম রাস্তা ঠেঙিয়ে, কখনও শিবথানের চৌমাথায়, কখনও বা স্কুলের দোরগোড়ায় অনর্গল হাঁক-হাঁকারির পরে বেলা ফিকে হয়ে আসতেই, তল্পি গুটিয়ে সরকারি পিক-আপ ভ্যান ফিরে যাচ্ছে বিডিও অফিসের নিশ্চিন্ত ঘেরাটোপে।

তার পর, গাঁ-গঞ্জ, শুখা নালা, শাল-মহুয়ার জঙ্গল আবার তলিয়ে যাচ্ছে ঝিঁঝিঁ ডাকা অনন্ত রাতের কোলে। জঙ্গলমহল জানে, এই সব রাতে, তিনি থেকেও নেই, কিংবা হয়তো না থেকেও আছেন!

‘‘লিশ্চয় আছেন,’’ লালগড় প্রাথমিক স্কুলের টিচার-ইন-চার্জ অশোক দাস চায়ের ভাঁড়টা ঠকাস করে টেবিলের উপরে নামিয়ে রেখে একটা লম্বা শ্বাস নিচ্ছেন। তার পর বলছেন, ‘‘কলকাতার চিড়িয়াখানায় তারে এক বার দেখেছিলাম... তার পর এই সে দিন, মর্নিংওয়াকের পথে... কী চাহনি মশাই!’’ লালগড় থেকে আমতলির বনপথ ধরে কিলোমিটার তিনেক হেঁটে খানিক ঝরা শিমুল কুড়িয়ে বাড়ি ফিরে এক কাপ চা নিয়ে বসেন অশোকবাবু। গত সাড়ে সতেরো বছর ধরে সেই চেনা রুটিনে তেমন ছেদ পড়েনি। কিন্তু এ বছর ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে সেই ভোরের হাঁটা বন্ধ হয়ে গিয়েছে তাঁর। বাঘের রাস্তা-পারাপার দেখে অশোকবাবুর মনে হয়েছিল, ‘রাজা যে পথে যায় সে পথে কি চলাফেরা ঠিক!’

লালগড়ের বনে যে বাঘ রয়েছে, খবরটা তিনিই প্রথম দিয়েছিলেন। লাল মাটির ঘন ধুলোয় পায়ের ছাপ দেখা যাচ্ছিল দিন কয়েক ধরেই, অশোকবাবু চাক্ষুষ করায় সেই সন্দেহ মুছে জঙ্গলে বাঘের আনাগোনায় শেষতক সিলমোহর দিয়েছিল বন দফতর। বসেছিল লুকনো ক্যামেরা। আর দিন দুয়েকের মধ্যেই ধরা পড়েছিল, লালগড়ের নয়া আতঙ্কের দুলকি চালে বন-ভ্রমণের ছবি।

ঘরবন্দি: চরতে যাওয়া আর নয়। ঘরের উঠোনেই বাঁধা রয়েছে ছাগলের পাল

অশোকবাবু যদি প্রথম হন, তা হলে দ্বিতীয় অবশ্যই পোডিয়া গ্রামের বিশ্বনাথ মান্ডি। তাঁর অভিজ্ঞতা বলছে, ‘‘ভোরবেলা, মাঠ (প্রাত্যঃকৃত্য) সেরে পুকুরপাড়ে এসেছি, ও বাবা! দেখি ও পারে তিনি দাঁড়িয়ে, সটান আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে!’’ বাঘের সেই নিশ্চল দৃষ্টি চোখ মুদলেই দেখতে পাচ্ছেন বিশ্বনাথ। নিঃসন্তান আদিবাসী মানুষটা তাঁর পেয়ারের মোরগটাকে পায়ে দড়ি পরিয়ে সেই থেকে ঘরের উঠোনে বেঁধে রেখেছেন। পাছে বাঘ তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়!

‘‘তা নিলে নিবেক,’’ তাঁর গোবর-নিকানো উঠোন জুড়ে ডজন দুয়েক নানা বয়সি মুরগির হুটোপাটি, হরিণটুলির গাঁওবুড়া (সাঁওতালি সমাজের সরপঞ্চ) যুগল হেমব্রম বলছিলেন, ‘‘জঙ্গলমহলে এক বার ইলে কি ফিরা যায়! ই হল বাঘের আদি ঠাঁই... উয়ারে কি খেদানো যাবেক? বাঘ ই জঙ্গলের প্রেমে পইড়ছ্যা গো!’’ সেই প্রেমের ক্ষুধায় কয়েকটা গরু-ছাগল কিংবা খানকয়েক হাঁস-মুরগি কিঞ্চিৎ কম পড়লে ক্ষতি কি! বৃদ্ধ যুগল এমনই মনে করছেন।

আদিবাসী সমাজের সেই ভয় আর ভক্তির মধ্যে, ভালবাসার মতোই বড় নরম হয়ে পড়ে আছে বসন্তের জঙ্গল। নতুন পাতায় ঢাকা শালের ডালে ডালে টিয়ার ঝাঁক, অগুনতি বুলবুলির উচ্ছলতা। বনপথে হাঁটলে জড়িয়ে ধরছে খাঁটি সবুজ রঙের ছায়া। সেই অপার জঙ্গলের দিগন্তে ডুব দেওয়া সূর্যের দিকে গড় করেন যুগল। তার পর বিড়বিড় করে অস্ফুট আদিবাসী মন্ত্রে বলেন— ঘরের মানুষ ঘরে ফিরেছে, তার হাত ধরেই জঙ্গলমহলে ফিরবে অপার সমৃদ্ধি।

পুণ্যাপানি গ্রামের হীতেন হেমব্রমের বয়স হয়েছে। তবে, এখনও পুরনো জঙ্গলমহলের সেই অগম্য বনটুলির কথা ভাসা-ভাসা মনে আছে
তাঁর। শিকার উৎসবে পিঠে তির-ধনুক ঝুলিয়ে বনশুয়োর আর খরগোশের আশায় জঙ্গলে পা দিয়ে বাঘের মুখোমুখি যে হননি এমন তো নয়। পড়শি গ্রামের গাঁওবুড়া যুগলের কথাটা একটু ভেঙে বুঝিয়ে দিচ্ছেন তিনি, ‘‘বনে বাঘ থাইকল্যে বন বাঁইচবেক, ই তো সহুজ কথা!’’ আর জঙ্গল তার ভরা চেহারা ফিরে পেলে রুখুশুখু এই দেশ ফের ভাসবে আবাদি জ্যোৎস্নায়।

তাঁর সুপক্ব চুলে এলোমেলো বিলি কেটে হীতেন সেই আবাদি মাঠের স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান— হোক না ঈষৎ লালচে, নাহয় একটু পুরুষ্টু, মাঠের পর মাঠ জুড়ে সেই লালি ধান বুনেছেন তিনি। সুবর্ণরেখার নালা উজিয়ে বন্যার মতো জল ভিজিয়ে দিচ্ছে তাঁর ধানি মাঠ। শীতের শশা-লাউ-সরষের ফলনে বন্যা বয়েছে আবাদে। পঞ্চাশের দশকেও এমন ছবি আবছা মনে আছে তাঁর। তবে, বন বদলে যেতে শুরু করেছিল তার পরেই, শাল-পিয়ালের জঙ্গল মুছে বসত গড়ে উঠতে শুরু করল অনর্গল গাছ-পতনের শব্দের ভিতর। হীতেন বলছেন, ‘‘করাতের কোপে ঝুপ ঝুপ পইড়ত্যা থাকল শাল-মহুয়া, সে শব্দে কান পাতা বড় কষ্ট বাবু!’’ আর জঙ্গল থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকল বাঘের সাম্রাজ্য, বন পতনের সেই শব্দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হারিয়ে গেল জঙ্গলমহলের যেটুকু আবাদি জমি টিকে ছিল তার সিংহভাগ।

লালগড় থেকে সারেঙ্গা, শালবনি থেকে সিমলাপাল— বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল জুড়ে আদিবাসী সমাজ তাই বাঘের প্রত্যাবর্তনে যেন হারানো সুপবনের স্বপ্ন দেখছে।

দিন কয়েকের ছুটি কাটাতে, না পাকাপাকি— জানা নেই কারও, তবে, বিস্তৃত শাল-মহুয়ার জঙ্গলে বাঘ ফিরেছে স্পষ্ট হতেই, গ্রামীণ বিশ্বাস আর আদিবাসী সমাজের অন্তরালে হারিয়ে যাওয়া শার্দুল-কথা যেন নতুন করে গাঁ-বসতের উঠোনে ছড়িয়ে পড়েছে। আদিবাসী সমাজের বৈঠক থেকে ছেলে-ঘুমোনো ছড়ায় আবার শুরু হয়েছে ‘তাড়ুপ’-এর (সাঁওতালি ভাষায় বাঘ) আনাগোনা।

পোডিয়া গ্রামের মা, অলি বাস্কে তাঁর বছর পাঁচেকের ছেলেকে পইপই করে সাবধান করছেন, ‘‘বিররে তাড়ুপ মেনায়া!’’ (মনে রাখিস, বনে বাঘ আছে)। আর, আমডাঙা গ্রামের মানুষ দশ ক্রোশ পথ ভেঙে জানগুরুর থান থেকে নিয়ে এসেছেন মন্ত্রপূত জল। রাতে নিতান্ত প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে পা দিলে বাঘের খপ্পরে যাতে পড়তে না হয়, সেই জন্য ঢাউস কোকাকোলার বোতলে ভরা সেই মন্ত্রসিদ্ধ জল বিকেল ফুরিয়ে আসতেই গ্রামের চৌহদ্দিতে ছিটিয়ে দিচ্ছে গাঁওবুড়া। গ্রামের সিধু মান্ডি বলছেন, ‘‘জল পইড়্যা গেছে, রাতের বেলা বাঘ আর এ মুড়ো হবেক নাই।’’

তবে, গ্রামের সখেন মুর্মুর সে সবে ডর নেই। পেশায় তিনি যে ঘটক! বাঘের সঙ্গে তাঁর নিদারুণ সখ্যের গল্পটা শোনাচ্ছেন বাঁকুড়ার সনগিরি হেমব্রম— সাঁওতালি সমাজে গ্রাম ঘুরে পাত্র-পাত্রীর চার হাত এক করে দেওয়াই কাজ দুর্গা হারামের (ঘটক)। আর সে কাজ করতে গিয়েই এক দিন বনের রাস্তায় তার সঙ্গে তাড়ুপের অকস্মাৎ মোলাকাত। গোঁফে তা দিয়ে মিষ্টি আবদার জানিয়ে বসেছিল বাঘমামা, তার জন্যও জোগাড় করে দিতে হবে সুন্দরী বাঘিনি। বেগতিক দেখে পালাবার পথ খুঁজছিলেন দুর্গা হারাম। হঠাৎ সে পথে এক দল ব্যাপারিকে দেখে বুদ্ধি গেল খুলে। তাদের কাছ থেকে একটা বস্তা চেয়ে নিয়ে বাঘের উপর নির্দেশ বর্তালেন তিনি, ‘‘এর মধ্যে ঢুকে পড়ো, পাত্রী পাবে অচিরেই।’’ বাধ্য ছেলের মতো বাঘ সে কথা মানতেই বস্তার মুখ আঁটোসাঁটো বন্ধ করে দুর্গা তাকে ভাসিয়ে দিল নদীতে। আর ভাগ্যের এমন ফের, সেই ভাসমান বস্তাবন্দি বাঘ গিয়ে ঠেকল এমন এক পাথরে, যার উপরে বসে ছিল এক বিয়ে-পাগল বাঘিনি। বস্তা খুলে বাঘ দেখে আনন্দে আটখানা সে। বাঘেরও আনন্দ আর ধরে না। দিন কয়েক পরে শুয়োর-হরিণের মাংস এনে বাঘ দিয়ে গেল দুর্গা হারামের দোরগোড়ায়। আর বাঘের কাছ থেকে পরিত্রাণ পেতে চেয়ে পুরস্কৃত হয়ে বনের পথে অপার নিশ্চিন্তি ফিরে পেল দুর্গা হারাম। পুরনো উপকথায় বুক বেঁধে সখেন মুর্মু এখনও তাই বনপথেই দিব্যি পাড়ি দিচ্ছেন সারেঙ্গা থেকে লালগড়। বলছেন, ‘‘আমি তো গেরামের দুর্গা হারাম বটি!’’

সিমলাপালের জঙ্গুলে রাস্তাটা যেখানে বেমক্কা বাঁক নিয়ে নেঘাচর গ্রামের দিকে গড়িয়ে গেছে, সেখানেই মালতী কিস্কুর সঙ্গে দেখা। বাঘের ভয়ে, দিন দশেক ঘরে বেঁধে রাখার পরে, প্রায়-উপোসি ছাগলগুলো নিয়ে একটু চরাতে বেরিয়েছেন। বিকেল ফুরিয়ে আসছে দ্রুত, সোল্লাসে বাসায় ফিরছে পাখপাখালি। এলোমেলো ছড়িয়ে যাওয়া ছাগলের পালকে জড়ো করার ফাঁকে মালতী বলছেন, ‘‘ডর লাগে ঠিকোই, তবে, তাড়ুপ তো মুদের ভগবানও বটিস!’’ ছোটবেলায় ঠাকুমার কাছে শোনা গল্পটা, তাঁর কোঁচড়ে জমিয়ে রাখা শুকনো ডুমুরের মতো উজাড় করে দিচ্ছেন মাঝবয়সি মহিলা— তিন তিনটে গ্রাম পেরিয়ে নদী থেকে জল নিয়ে গ্রামে ফিরছিলেন বৃদ্ধা। জঙ্গলের বাঁকে বাঘ দেখে ভয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিলেন, মাথা থেকে মাটির কলসি গিয়েছিল খসে। রোদ্দুর মাথায় নিয়ে কোনওক্রমে জোগাড় করা কষ্টের জলে পথ গেল ভেসে। মালতীর শোনা সাঁওতালি উপকথা বলছে, ‘‘সঙ্গে সঙ্গে বনের তাড়ুপ ভগবানের রূপ ধরল। নিমেষে মাটির কলস ভরে উঠল টলটলে জলে।’’ তবে কি জঙ্গলমহলের ছায়ায় ছায়ায় হারিয়ে থাকা বাঘ, নিছক ব্যাঘ্র-দেবতা রহস্য?

নতুনডিহি গ্রামের অবসর নেওয়া স্কুলশিক্ষক গোরাচাঁদ মুর্মু মনে করিয়ে দিচ্ছেন তাঁর সাক্ষাৎ ব্যাঘ্র-ভূতের অভিজ্ঞতাটা। ‘‘সে বড় ঘন বন ছিল বটে নতুনডিহিতে,’’ তাঁর গলায় হারানো দিনের ছমছমে স্মৃতি টাটকা হয়ে উঠছে। ফেউ-ডাকা রাতে বাপ-ঠাকুরদা মনে করিয়ে দিতেন, ‘‘হুই দেখ বাঘ বিরাইলো!’’ তবে, বাড়ির অশান্তির জেরে গলায় ফাঁস দিয়ে কাকিমা যে দিন আত্মঘাতী হলেন, সেই বিকেলেই তিনি দেখেছিলেন অপদেবতার সেই ব্যাঘ্র-রূপ। গোরাচাঁদ বলছেন, ‘‘অগ্রহায়ণ মাস, বিকেল ফুরিয়ে এসেছে। নদীর পাড়ে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি আমরা, অদূরেই পুড়ছে কাকিমার দেহ। আর সেই ধোঁয়ার কুণ্ডলী থেকেই সবাই দেখল, বাঘ বেরিয়ে হাঁকাড়ি পেরে চলে গেল বনের দিকে।’’ অপদেবতার আড়ালে বাঘের এমন নিশ্চুপ চলাফেরাও জঙ্গলমহলের আনাচ-কানাচের উপকথায় রয়ে গিয়েছে বিস্তর।

গাঁওবুড়া: যুগল হেমব্রম

ভূত আর ভগবানের অস্পষ্ট বনপথে, তার চরণচিহ্নটুকু রেখে বাঘ ফের হারিয়ে গিয়েছে। লালগড় থেকে তারাবিল, আমতলি থেকে লক্ষ্মণপুর— অজস্র ছোট ছোট আদিবাসী বসত তার ডোরাকাটা ছায়ায় বিকেল ফুরোলেই এখন দরমার বেড়ায় খেটো বাঁশের খিল তুলছে। দিনভর চরে বেড়ানো ছাগল-গরু-মুরগি বাঁধা পড়েছে ঘরের উঠোনে। শিরা-উপশিরার মতো জঙ্গল জুড়ে ছড়িয়ে থাকা পায়ে-হাঁটা পথে চলাচল গিয়েছে থমকে।

কোনাবালি গ্রামের মণি কিস্কু বলছেন, ‘‘মুদের বুনে (আমাদের জঙ্গলে) রাজা ফিরেছে, আমরা পাতা কুড়াতে গেলে উনি যদি রাগ করেন!’’ কচি শালপাতা রইল গাছেই, তাঁর ঘরের দাওয়ায় সার দিয়ে বেঁধে রাখা খান দশেক ছাগলের সামনে এক হাঁড়ি মাড় রেখে স্বপ্না সোরেন বিড়বিড় করছে, ‘‘এখন পাতা খেয়ে কাম নাই, মাড়টুকুনই খাইত্যে হবেক!’’ ঝিটকার পথে গমগম করা ‘মা কালী ভাতের হোটেল’-এ মাঝদুপুরেই ভাতের হাঁড়ি মেজে ফেলার ফাঁকে কালীচরণ বাগদি বলছেন, ‘‘বিক্রিবাটা না হয় কমই হল, বনে বাঘ এসেছে, এ কী কম সম্মান!’’ কইমা কলেজের সামনে ফ্যালফ্যাল করে ঝুলছে পূর্ত বিভাগের বোর্ডটা, ‘মেন অ্যাট ওয়ার্ক’, বাঘের হাঁকাড়ি শোনার পরে কবেই থমকে গিয়েছে পিচ রাস্তার কাজ।

লাল মাটি আর শাল-পিয়ালের মায়ায় বাঁধা পড়েছে বাঘ, শুকনো পাতা মাড়িয়ে নিঃশব্দে সে পেরিয়ে যাচ্ছে টাঁড়, জঙ্গল, ক্যানাল পাড়... তার পর, কেউ জানে না, তিনি থেকেও হারিয়ে থাকবেন, নাকি না-থেকেও রয়ে যাবেন বনের গপ্প কথায়।

ছবি: সৌমেশ্বর মণ্ডল

Royal Bengal Tiger Lalgarh Fear Trap Bait Maoist Belt
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy