Advertisement
E-Paper

ছিল ভক্ষক, হল রক্ষক

ওড়িশার এক গ্রাম। মঙ্গলাজোড়ি। সেখানে বহু বছর পরিযায়ী পাখিদের মেরে খেত মানুষ। এখন তারাই পাখি দেখাবার গাইড।বরকুলের এক অটোওয়ালার কাছেই জায়গার নামটা জেনেছিলাম। মঙ্গলাজোড়ি। ওড়িশার চিল্কা লেকের একেবারে উত্তরে খুড়দা জেলার একটা ছোট গ্রাম। আসলে ইচ্ছে ছিল পাখি দেখার। সেই কারণেই ওড়িশার চিল্কায় যাওয়া। উঠেছিলাম ওড়িশা টুরিজমের বরকুল গেস্ট হাউসে। কিন্তু ওখানে গিয়ে শুনি, বিদেশ থেকে যে সব পাখিরা হাজার হাজার মাইল উড়ে এসে শীতকালটা এখানে কাটিয়ে যায়, খোদ সেইখানে মোটর-চালিত নৌকায় যাওয়া নিষেধ হয়ে গেছে।

বিনোদ ঘোষাল

শেষ আপডেট: ২৭ মার্চ ২০১৬ ০০:০৩

বরকুলের এক অটোওয়ালার কাছেই জায়গার নামটা জেনেছিলাম। মঙ্গলাজোড়ি। ওড়িশার চিল্কা লেকের একেবারে উত্তরে খুড়দা জেলার একটা ছোট গ্রাম। আসলে ইচ্ছে ছিল পাখি দেখার। সেই কারণেই ওড়িশার চিল্কায় যাওয়া। উঠেছিলাম ওড়িশা টুরিজমের বরকুল গেস্ট হাউসে। কিন্তু ওখানে গিয়ে শুনি, বিদেশ থেকে যে সব পাখিরা হাজার হাজার মাইল উড়ে এসে শীতকালটা এখানে কাটিয়ে যায়, খোদ সেইখানে মোটর-চালিত নৌকায় যাওয়া নিষেধ হয়ে গেছে। কারণ, মোটরের শব্দে পাখিরা বিরক্ত হয়। হক কথা। তাই পাখিদের বসতি যেখানে, তার এক কিলোমিটার আগে থেকেই ফিরে আসতে হয় দর্শকদের। মন খারাপ হয়ে গেল। যার জন্য আসা তাই-ই দেখতে পাব না। স্থানীয় এক অটোওয়ালা আমার আপশোস শুনে জানাল, মঙ্গলাজোড়ি চলে যান, যা চাইছেন পেয়ে যাবেন।

পর দিন ভোরবেলায় সূর্য ওঠার আগেই বরকুল থেকে অটোযাত্রা। অনেকটা পথ। তবে চমৎকার হাইওয়ে। কিন্তু অটো যখন হাইরোড ছেড়ে এক সময় কাঁচা রাস্তায় নামল তখন মনে হচ্ছিল, ছেড়ে দে মা, নেমে হেঁটে যাই। তবে পৌঁছলাম যখন, মনে হল, অন্য একটা গ্রহে চলে এসেছি। পৃথিবী এত চুপচাপ নাকি? কোনও চিৎকার নেই, কোলাহল নেই। শুধু লাল রঙের কাঁচা রাস্তার দু’পাশে বিস্তীর্ণ জলাভূমি, সেখানে ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েকটি ছোট নৌকা। আর অনেক, অনেক, অচেনা, নাম-না-জানা সব পাখি।

ওয়াচ টাওয়ারের সামনে অটো থামতে, অটোওয়ালা পরিচয় করিয়ে দিল নিকষ কালো এক মানুষের সঙ্গে। হলদেটে চোখ। মাথায় খুব ছোট ছোট চুল। পরিণত শালগাছের মতো চেহারা। ভাঙা হিন্দিতে কথা বলে। নাম সাধু বেহেরা। তিন ঘণ্টা তার নৌকায় থাকার জন্য আগে টাকা মিটিয়ে দিতে হল। তার পর নেমে পড়লাম ছোট্ট নৌকোটায়। বাঁশের লগি ঠলতে শুরু করল সাধু। অস্বস্তি হচ্ছিল এত নৈঃশব্দ্যে। নৌকার ছাউনিতে রাখা একটা ইংরেজিতে লেখা বার্ডস’ গাইডবুক। আর একটা বেশ দামি বাইনোকুলার। আমার হাতে ক্যামেরা। পকেটের মোবাইল সম্পর্কহীন। ভারী বাইনোকুলারটা আমাকে গলায় ঝুলিয়ে নিতে বলল সাধু।

কোথায় যাচ্ছি? বলল, কোনও গন্তব্য নেই। এই গুল্মে ভরা জলেই এলোমেলো তিন ঘণ্টা। নৌকো একটু এগোয়, একটু থামে। নৌকো পাড় থেকে একটু দূরে যেতেই আরও যেন পালটে গেল পরিবেশটা। এই পৃথিবীতে মানুষ না, শুধু পাখিরা থাকে। যে দিকে তাকাচ্ছি, শুধু পাখি আর পাখি। কত রকম, কত রং। পুরো হাঁ হয়ে গেলাম। কেউ উড়ছে, কেউ চুপ করে বসে রয়েছে, কেউ খাবার খোঁজায় ব্যস্ত। মাঝে মাঝে তাদের ডাকে নিস্তব্ধতা একটু চিরে চিরে যাচ্ছে। পর মুহূর্তে আবার জাঁকিয়ে বসছে সেই কান ফাটানো চুপচাপ।

সাদা কালো লাল হলুদ বাদামি— সব পাখির নাম আর বৈশিষ্ট্য আঙুল তুলে গড়গড় করে বলে যাচ্ছে সাধু, আর মাঝে মাঝেই আমাকে নির্দেশ দিচ্ছে, ‘উয়ো পক্ষী কা ফটো লিজিয়ে সার।’ অথবা ‘বাইনাকুলার লগাইয়ে, উসকো দেখিয়ে।’ নাম মনে রাখতে পারছিলাম না, রাখার প্রয়োজনও বোধ করিনি, ছবি তোলারও বিশেষ আগ্রহ ছিল না। আমার কাছে তাদের রূপই যথেষ্ট। কিন্তু একটা বিষয় খেয়াল করছিলাম, আমার দেখার থেকে ওর দেখানোর আগ্রহ অনেক বেশি। হয়তো কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম এক সময়, হিন্দিতে ধমক খেলাম সাধুর কাছে। আপনার ভাল লাগছে না স্যর?

হ্যাঁ লাগছে তো।

তা হলে মন দিয়ে দেখুন। অন্য দিকে মন দেবেন না। এটা পাখিদের দুনিয়া আছে স্যর। পুরা দুনিয়ায় এমন পাবেন না।

তুমি কবে থেকে এই কাজ করছ সাধু?

অনেক সাল হয়ে গেল স্যর।

কী ভাবে এলে এই কাজে?

লম্বা কহানি স্যর।

একটু শুনি।

আপনি সেলিম আলির নাম শুনেছেন তো স্যর?

হ্যাঁ অবশ্যই, বার্ডম্যান অব ইন্ডিয়া।

উনি বহু দিন আগে আমাদের এই গাঁওতে এসেছিলেন। আমি দেখিনি। আমার বাবা দেখেছিলেন। এক সময় আমাদের গাঁও থেকে দশ কিলোমিটার দূরে টাঙ্গিতে থাকতেন নন্দকিশোর ভুজবল। উনিও এক সময় এখানে আসতেন পক্ষী ‌মারতে। এক দিন হল কী, শিকার করতে এসে একটা পক্ষীর জাতিকে দেখতেই পেলেন না। খোঁজ নিয়ে জানলেন পুরো প্রজাতিটাই পোচারদের হাতে খুন হয়ে গেছে। উনি পক্ষী মারা ছেড়ে দিলেন। আমরা এই গ্রামের সকলে বহু দিন ধরে এই সব পক্ষীদের মেরে তাদের মাংস খেতাম আর বেশিটাই মার্কেটে বিক্রি করতাম। সিজনে ভাল দাম উঠত। তাই দিয়েই চলত আমাদের। সিজনে চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার রুপেয়াও কামিয়েছি।

কী ভাবে মারতে?

গুলি মেরে, ফাঁদ পেতে, জাল দিয়ে... আর... পয়জন দিয়ে। এক এক দিনে হাজার পক্ষীও মারা গেছে স্যর এই হাতে। বলে জলের মধ্যে থুতু ফেলল সাধু। এই ভাবেই চলছিল। এক দিন নন্দকিশোরজি আবার ফিরে এলেন আমাদের গাঁওতে। আমাদের পক্ষী মারা দেখে খুব খুব কষ্ট পেলেন। আমি তখন অনেক ছোট স্যর, কিন্তু মনে আছে আমাদের গ্রামের কেউ ওঁকে পসন্দ করত না। উনি সকলের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাতজোড় করে বলতেন এই ভাবে অতিথিদের না মারতে। পক্ষী হলেও অতিথি তো। কিন্তু পক্ষী না মারলে আমরা খাব কী? শেষে এক দিন উনি আমাদের সামনে বসে পড়ে বললেন, পক্ষী মারার আগে যেন আমরা ওঁকে নিকেশ করে দিই।

আমরা বললাম, আমাদের চলবে কী করে? উনিই উপায় বাতলালেন। বললেন, এই পক্ষীদের না মেরে যদি আমরা এদের গাইড হয়ে যাই, তা হলেও টাকা কামাতে পারব।

তার পর একটা একটা করে লোক ওঁর কথা শুনে কাজ করতে শুরু করল। ২০০০-এ ওঁর চেষ্টায় শুরু হল ‘মহাবীর পক্ষী সুরক্ষা সমিতি’। আমরা যারা এক দিন এই হাতে হাজার পক্ষী মেরেছি আমরাই হয়ে গেলাম পক্ষীর রাখওয়ালা। ভাবুন স্যর, পুরা গাঁও পোচার সে গাইড বন গয়া। বলে হেসে উঠল শালগাছের মতো লোকটা। পক্ষী মারনেওয়ালা সাধু বেহেরা অভি পক্ষী কা গাইড হো গয়া স্যর।

তুমি এত পাখি চেনো কী করে সাধু? বই পড়ে?

না স্যর। ইংরেজি পড়তে জানি না। দেখতে দেখতে চিনেছি। আমাদের মঙ্গলাজোড়িতে যেমন মাইগ্র্যান্ট পক্ষী আসে, তেমনি অনেক পক্ষী রেসিডেন্টও হয়ে গেছে। এক সময় এই দেশে এসেছিল, আর ফিরে যায়নি।

তোমাদের সংসার ঠিকঠাক চলে যায়, এই পাখি দেখিয়ে?

না, চলে না। এই নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত। তার পর যা হোক অন্য কিছু করে সংসার চালাই। কিন্তু তা বলে আর কোনও দিন এদের মারতে পারব না। কারণ, আমি এই পক্ষীদের সঙ্গে থাকতে থাকতে নিজেও একটা পক্ষী হয়ে গেছি স্যর। এদের কথাও আমি থোড়া বহুত বুঝতে পারি এখন।

binod.ghosal@gmail.com

Mangalajodi village Orissa birds
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy