E-Paper

কাগজের বই থেকে পর্দার বই

প্রথমে তালপাতা, ভূর্জপত্রে হাতে লেখা হত বই। তার পর কাঠ কিংবা ধাতুর ব্লকের সাহায্যে মুদ্রণ। নানা ধাপ পেরিয়ে এসেছে আজকের ই-বই। কিন্তু ই-বই কি কোনও দিন কাগজের বইয়ের মতো হবে? কম্পিউটার, ট্যাব বা মোবাইলে বেশি ক্ষণ তাকিয়ে থাকলে চোখ জ্বালা করে, ঘাড় টনটন করে। বিছানায় শুয়ে, গাড়িতে বসে ইচ্ছেমতো ছাপা বই পড়া যায়। এমন ঘনিষ্ঠতা কি ই-বইয়ের সঙ্গে সম্ভব? 

তৃষ্ণা বসাক

শেষ আপডেট: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:১৩

স্ববিরোধী এক কৌতুক

এ সমস্তই শুরু হয়েছিল এক দশকেরও আগে, কোনও এক কলকাতা বইমেলায়, যে বার প্রথম স্টল দিয়েছিল একটি অনলাইন পত্রিকা। কলকাতা অবাক হয়ে দেখেছিল বইমেলায় একটা গোটা স্টল, যেখানে কোন বই বা পত্রপত্রিকা কিছুই নেই, মানে মুদ্রিত বইপত্র, যাদের মেরুদণ্ড বা স্পাইন থাকে, তেমন কিছু নেই। ভীষণ কৌতূহল নিয়ে লোকজন ঢুকছিল সেই স্টলে, আর বেরিয়ে আসছিল কোনও বই দেখতে না পেয়ে, আর আসার সময় তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল একটা সুদৃশ্য পেজমার্ক।

পেজমার্ক। আমরা যারা পাঠ্যবইয়ের আড়ালে অপাঠ্য বই পড়ার নিষিদ্ধ আনন্দ পেতে পেতে বড় হয়েছি, বুকের উপর বই রেখে ঘুমিয়ে পড়েছি অনেক অলস মধ্যাহ্নে, বিকেলের শেষ আলোয় আবছা হয়ে আসা অক্ষরগুলো মরিয়ার মতো আঁকড়ে পৌঁছতে চেয়েছি চৈতন্যের অনাবিষ্কৃত পারে, তাদের বড় কাছের শব্দ এই পেজমার্ক। হাতের কাছে কিছু না জুটলে ট্রেনের টিকিট, চিরুনি, দেশলাই কাঠি, চুলের ক্লিপ— কত অদ্ভুত জিনিস বইয়ের ফাঁকে গুঁজে রাখে মানুষ।

পড়া আর না-পড়া অংশের মাঝখানের ওই বিভাজিকাটি তখন শুধু পেজমার্ক নয়, এক টুকরো জীবন, যাতে লেগে থাকে গেরস্থালির তেল-হলুদের ছোপছাপ। না, সে সব যা-ইচ্ছে-তাই পেজমার্ক নয়, একটি কেতাদুরস্ত সুদৃশ্য যথার্থ পেজমার্কের কথাই বলছি, বইয়ের সঙ্গে যেগুলো পেতে ভাল লাগে। পুজোসংখ্যার সঙ্গেও ঘরে আসে যারা। দাঁতের মাজন, মাথার তেল কিংবা নন-স্টিকি বাসন ফুঁড়ে জেগে থাকে আমাদের প্রিয় পুজোবার্ষিকীগুলোর মেরুদণ্ড, পরের পুজো আসা পর্যন্ত।

বই বা পুজোসংখ্যার ফাঁকে ফাঁকে রেশমি সুতোয় বাঁধা পেজমার্ক— এতে তো কোনও চেতনাগত, অভ্যাসগত ধাক্কা নেই। এই বই তো এমন ভাবেই পড়তে হয়। কিন্তু অন্য বই? যে সব বইয়ের আগেও একটা হ্রস্ব-ই জুড়ে গেছে, সেই ই-বইয়ের কথাই বলছি। একটু ধোপদুরস্ত ভাষায় বৈদ্যুতিন বই। সেই সব বই ও সাময়িকী যাঁরা তৈরি করেন, তাঁরা যখন প্রীতি উপহার হিসেবে হাতে ধরিয়ে দেন একটা সুদৃশ্য পেজমার্ক, তখন এই স্ব-বিরোধিতার অভিঘাত কেমন যেন বিমূঢ় করে দেয়। পেজমার্ক ধরে রাখার মতো স্পাইন বা মেরুদণ্ড যে ই-বইয়ের নেই! তবু এই কৌতুকপ্রদ ঘটনাটি ঘটেছিল এক বইমেলায়।

বই নিয়ে আমাদের মাথাব্যথার শেষ নেই। দৃশ্যশ্রাব্য থেকে বৈদ্যুতিন মাধ্যম— কোনও না কোনও প্রতিপক্ষ খাড়া করে চলি আমরা। ‘বই থাকবে তো?’— এই আতঙ্ক আমাদের বরাবরের সঙ্গী, যার বিস্ফোরণ ঘটে ফি-বছর বইমেলায়। ‘বইয়ের দিন কি শেষ হইয়া গিয়াছে?’ জাতীয় উদ্বেগ, আশঙ্কা একেবারে গণ-হিস্টিরিয়ার রূপ নেয়। যদিও পণ্ডিতরা বলেন, এ আশঙ্কা অমূলক। যুগটা কনভার্জেন্স-এর। ঝোড়ো হাওয়া আর পোড়ো বাড়ির মতোই মিলে যাচ্ছে নতুন ও পুরনো মাধ্যম কোনও না কোনও বিন্দুতে। কোথাও বা স্বকীয়তায় উজ্জ্বল থেকে তাদের সমান্তরাল সহাবস্থান।

রচনা লেখো

এই হিস্টিরিয়ার শুরু আমাদের শৈশবে, যখন ফি-বছর রচনা আসত ‘বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ’? একটু উঁচু ক্লাসে সেটা বদলে গেল ‘টেলিভিশন আশীর্বাদ না অভিশাপ’? তার পর আসতে শুরু করল ‘কম্পিউটার আশীর্বাদ না অভিশাপ’? এতে আমাদের বিশেষ কোনও অসুবিধে হচ্ছিল না। একই কথা নাম বদলে বদলে লিখে আসতাম। সেই কেতকী কুশারী ডাইসনের ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’-র সিলেটি রেস্তরাঁয় যেমন একটা মৌল ঝোল থাকত। বাড়তি ঝাল দিলে সেটাই হয়ে যেত মাদ্রাজি কারি, ঝালের বদলে টমেটো দিলে কাশ্মীরি কারি, ঝালটা মেরে দিলে ভুনা গোস্ত, শাকপাতার কুচি মেশালে সাগ গোস্ত!

বুঝে গেছিলাম, যে কোনও নতুন প্রযুক্তিকেই সন্দেহের চোখে দেখতে হবে, এবং এটা বোধহয় আমাদের জিন মানচিত্রেই লেখা হয়ে গেছে এত দিনে। শতকের পর শতক ধরে রেল, মোটরগাড়ি, এরোপ্লেন, কম্পিউটার থেকে প্রতিষেধক ওষুধ— প্রতিটি আবিষ্কারকেই আমরা নস্যাৎ করতে চেয়েছি।

আমাদের অবস্থা যেন গিরিবালা দেবীর উপন্যাস ‘রায়বাড়ি’র ঠাকুমার মতো, যিনি দেশলাই কাঠি ধরাতে ভয় পেয়েছিলেন। কিংবা ইসমত চুঘতাই-এর ‘মৌলবী সাহেবের অসুখ’ গল্পের মৌলবাইনের মতো, যিনি অক্সিজেন সিলিন্ডার দেখে ভেবেছিলেন, এ জিনিস তাঁকে বিধবা করেই ছাড়বে।

“এমারজেন্সির কথা ভেবে এক সিলিন্ডার অক্সিজেন আনিয়ে নেওয়া হল। সিলিন্ডার দেখে মৌলবাইনের পিলে চমকে উঠল। এত বড় বোমার মতো দেখতে সিলিন্ডার, মৌলবাইনের নিজের আশু বৈধব্য সম্পর্কে আর কোন সন্দেহই রইল না। তবু তিনি তক্ষুনি এটি ব্যবহারের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করলেন... ‘সর্বনাশ হবে। হায় কেয়ামতের আর বাকি কী থাকবে, যদি এই বোমা ওঁকে ছোঁয়’।”

এই কলকাতাতেই বিদ্যুৎ সহজে নিতে চাননি গৃহস্থেরা। এক সময় গঙ্গাজলে ছাপা গীতা সাগ্রহে সংগ্রহ করতেন ধর্মভীরুরা। বিজ্ঞাপন অবধি দেওয়া হত ‘এই কালিতে গঙ্গাজল ব্যবহার করা হইয়াছে’!

আমরা যত দিনে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেলাম, তত দিনে প্রতিপক্ষ বদলে গেছে। কম্পিউটার তত দিনে তত ভীতিপ্রদ নয়, বরং গেরস্থালির জিনিস, এক কুটিরশিল্প। তখন ইন্টারনেট, সাইবার স্পেস, ডিজিটাল মিডিয়া, মোবাইল ফোন— এ সবের বিরুদ্ধে কোমর বাঁধা হল। ‘ভাইসব এদের জন্যেই আমাদের বই পড়ার অভ্যেস কমে যাচ্ছে’—সুরটা এই। তার পর আস্তে আস্তে যুদ্ধটা ‘বই বনাম ই-বই’ হয়ে গেল! রচনা লিখে নম্বর পাওয়ার বয়স নেই আর, সভা-সমিতিতে ভাষণ দেওয়ার শুরু। আজকাল আবার বলতে হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে।

‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি লেখকের মৃত্যু ডেকে আনবে?’— এই জাতীয় একটা আলোচনা রাখতে পারলে আয়োজক ভি খুশ, দর্শক ভি খুশ।

খাড়া আছি সারাদিন হুঁশিয়ার পাহারা,

দেখে নেব রোজ রোজ খেয়ে যায় কাহারা।

কিন্তু সদর জায়গায় লাঠি হাতে দাঁড়ালেও খিড়কির দুয়ারে এক জন নিঃশব্দে কখন এসে দাঁড়িয়েছে, আমরা কেউই খেয়াল করিনি। অনেকটা বাড়ির উৎসব অনুষ্ঠানে, পাড়ার চটপটে ছেলেটির মতো, সব কাজে ডাকতেই হাজির। সে এসে প্রকাশক এবং লেখকদের অনেক সুরাহা করে দিয়েছে, যার নাম পিওডি। প্রিন্ট অন ডিমান্ড। সেই দিনরাত এক করে খাটা, বাড়ির লোকের কাজ অর্ধেক করে দেওয়া ছেলেটি যখন বিয়ের কনেকে নিয়েই ভেগে যায়, তখন যেমন সবার টনক নড়ে, অদূর ভবিষ্যতে তেমন কোনও সর্বনাশ যে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে না— তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে কোথায়?

কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে, সব হারাতে হারাতে লেখকের আর নতুন করে হারানোর আছেটা কী?

কেন, অমরত্বের সাধ?

মসি আর কাগজে অর্বাচীন কালখণ্ড

অষ্টম-নবম শতকের মিথিলার মৈথিলী পণ্ডিত বাচস্পতির সময়েও দেখা গেছে, রাজ্য আক্রান্ত হলে সবার আগে লুট হয় পুস্তকাগার। তাই পুঁথির সুরক্ষা নিয়ে বরাবরই পণ্ডিতদের মাথাব্যথা ছিল। বাচস্পতির শ্যালক সনাতনের কাছে দূর-দূর গ্রাম থেকে জ্ঞানপিপাসুরা আসত অনুলিখনের জন্যে। পুঁথি অনুলিখনের কেন্দ্র গ্রামটি নানা বৃত্তির রাস্তাও খুলে দিয়েছিল। ভোজপত্র আর তাড়পত্র শোধনের কেন্দ্র ছিল, পুস্তকের উপরে নীচে থাকা পটরা বা পাটি তৈরি করা কামারদের গ্রামই বসে গেছিল। পাটি পুস্তককে রক্ষা করে, কামারের বৌ তাতে ধরে ধরে নানা কারুকার্য করে তাকে সুন্দর করে তুলত। বাইরে থেকে এসে বিদ্বানরা এই পুস্তক নিয়ে যাওয়ার জন্য বাক্স বানাতে দিত।

বহিঃশত্রুর আক্রমণের সময় ধন-সম্পত্তি, অন্ন, মাটি এমনকি নারীও লুট হচ্ছিল, কিন্তু পুস্তক লুটের কথা আগে শোনা যায়নি। পুস্তক যখন থেকে শ্রুতিলিখন হতে শুরু করল, তখন থেকেই ভয়ের শুরু। অগ্নিভয়, জলভয়, উই আর ইঁদুরের উৎপাতের ভয়। মসি আর কাগজে অর্বাচীন কালখণ্ডের জ্ঞান যদি বেঁধে রাখতে হয়, তবে তার সুরক্ষার ব্যবস্থা করা জরুরি, লুটের সময় প্রতিরোধ করতে গেলে মৃত্যুও ঘটতে পারে। তা হলে কি লেখার জন্মলগ্নেই দোষ? রাজার পুস্তকালয় পর্যন্ত সুরক্ষিত নয়। যদি বিধর্মী বা অন্য মতাবলম্বী রাজার হাতে পরাজয় ঘটে, তো সবার আগে সে বিজিত রাজার পুস্তকালয় জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয়। জ্ঞান বিলুপ্ত করে দিলে মানুষ নিজেই প্রজা হয়ে যাবে। কারণ জ্ঞান কারও প্রজা নয়। প্রাজ্ঞ মানুষের পরামর্শে সনাতন স্থির করেছিল ঘরের ভিতর গর্ত করে পুঁথি রাখবে।

ঘরের ভিতর গর্ত খোঁড়া হল, তাতে নিমপাতা শুকিয়ে রাখা হল। নিমকাঠের পেটিকায় গন্ধকখণ্ড রাখা হল। তার মধ্যে সাবধানে পাণ্ডুলিপি রাখা হল। দুর্ভেদ্য পেটিকা। উপরেও নিমপাতা ছড়ানো, আর গর্ত বুজিয়ে উপর থেকে লেপা-পোঁছা করে সমান করে দেওয়া হয়েছিল চরম গোপনীয়তার সঙ্গে।

এত কষ্টে সংরক্ষিত পুঁথির সম্মান কতখানি ছিল, তা বোঝাতে একটি ঘটনাই যথেষ্ট। বাচস্পতির বিখ্যাত পুঁথি ব্রহ্মসূত্রের শঙ্করভাষ্যের টীকা লিখতে সময় লেগেছিল আঠারো বছর। রাজা নৃগ বাচস্পতিকে রাজসভায় সাদরে নিয়ে যাবার জন্যে একটি অলঙ্কৃত শিবিকা পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু পণ্ডিত বাচস্পতি বললেন, “আমি শিবিকায় যাব না।”

“তা হলে কি শিবিকা খালি যাবে?”

“তা কেন? শিবিকায় পুস্তক যাবে।”

এর সঙ্গে তুলনীয় ঘটনা, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘নিঃসঙ্গতার শতবর্ষ’ (অনুবাদক তরুণকুমার ঘটক) উপন্যাসের গ্রাম মাকোন্দো ধ্বংস হওয়ার মুখে প্রাজ্ঞ কাতালান তিন ট্রাঙ্ক ভর্তি বই নিয়ে দেশে ফিরছেন। বইগুলো সঙ্গে নিয়ে যেতে চাইলে ট্রেনের ইনস্পেক্টর বাধা দেয়। তখন কাতালান বলেন— “যখন মানুষ যায় প্রথম শ্রেণিতে, আর বই যায় তৃতীয় শ্রেণিতে, তখনই পৃথিবী রসাতলে যায়।”

এই গ্রামে বার্সেলোনা থেকে এসে এক জন বইয়ের দোকান দিয়েছিলেন। তাঁর আড্ডার সঙ্গীদের এক জন পকেটে তাঁর পাণ্ডুলিপির কয়েকটা পাতা নিয়ে কিশোরীদের পতিতালয়ে গেলে সেখানে পাতাগুলো হারিয়ে যায়। কাতালান সে কথা শুনে হাসতে হাসতে বলেছিলেন— “সাহিত্যের ভবিষ্যৎ বেশ্যালয়ে হারিয়ে যাওয়া।”

কাঠখোদাই থেকে কম্পিউটার

মুখের ভাষা যখন লিখিত রূপ পেল, তখন মানুষ বুঝতে পারল এর শক্তি। কোনও জায়গায় মানুষ পৌঁছতে না পারলেও তার লেখা পৌঁছে যায়, মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকে পাথর, তালপাতা বা কাগজে লেখা তার অক্ষর। লেখ্য ভাষার এই সর্বত্রগামিতা আর চিরজীবিতার শক্তি উপলব্ধি করেই জন্ম হল একটি নতুন পেশার, ক্যালিগ্রাফি বা হস্তলিপিকরণ। হাতে লেখা বই নির্মাণ হতে লাগল। আর সে বই লেখা হত ভূর্জপত্র (যা আসলে ভোজপাতা গাছের ছাল), তালপাতা ও কাগজে। কবি রাজশেখর সব কবিদের উদ্দেশে জানিয়েছিলেন হাতের কাছে তালপাতা বা ভূর্জপত্র মজুত রাখতে। কাগজ এসেছে অনেক পরে। আস্তে আস্তে অবশ্য কাগজ হয়ে ওঠে প্রথম পছন্দ, বিশেষত উত্তর ভারতে। মোগল আমলে হাতে তৈরি কাগজ চরম উৎকর্ষ লাভ করে। ‘আফশানি’ কাগজে মেশানো হত সোনার গুঁড়ো ও সোনার সরু পাত। ঔরঙ্গাবাদ ও দৌলতাবাদে তৈরি হত ‘বাহাদুরখানি’, ‘মাধাগরি’ নামের নানা ধরনের কাগজ। ষোড়শ শতকে বাংলায় যে কাগজ তৈরি হত, তার প্রমাণ মুকুন্দরামের পঙ্‌ক্তি— ‘কাগজ কাটিয়া নাম ধরিল কাগজী’। কাগজ তৈরি ও ব্যবসা যারা করত তাদের বলা হত কাগজী।

চিত্রিত পুঁথিগুলি অত্যন্ত নয়নলোভন ছিল। তবে তা সীমাবদ্ধ ছিল ধনী, অভিজাত সমাজের গণ্ডিতে, সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ধীরে ধীরে হাতে লেখা পুঁথির অসুবিধের দিকগুলো সামনে এল। এক জন যতই পুঁথি নকল করুক, সবার কাছে পৌঁছনোর পক্ষে তা যথেষ্ট নয়। এক এক জনের হাতের অক্ষরও এক এক রকম। পড়তেও অনেক সময় অসুবিধে হয়। তাই অক্ষরগুলি এক রকম হবে আর এক সঙ্গে অনেক বই পাওয়া যাবে— এমন কিছু করার চেষ্টা থেকেই পাথরের ছাঁচ আর কাঠখোদাইয়ের আবিষ্কার হল। ক্রমে কাঠের জায়গায় এল ধাতুর ব্লক। বেশ চলছিল। কিন্তু কোথাও কোন অক্ষর ভুল হলে গোটা ব্লকটাই পাল্টাতে হয়। সময় নষ্ট তো বটেই, খরচও ঢের। যদি এক-একটা অক্ষর আলাদা আলাদা ভাবে ঢালাই করা যায়, তবে তো ভুল শুধরে নেওয়া যায় অনেক কম সময়ে ও কম খরচে। এই ভাবনা থেকেই আবিষ্কার মুভেবল টাইপ বা চলনক্ষম অক্ষরের। যার কৃতিত্বের দাবিদার এত দিন ছিলেন জার্মানির মেনজ় শহরের এক জন স্বর্ণকার— জোহান্স গুটেনবার্গ, সালটা ১৪৫০। মুদ্রণের জনক বলতে এত দিন এঁকেই আমরা জানতাম। যদিও এখন জানা যাচ্ছে, এর প্রায় বছর পঞ্চাশ আগে চিনের পি শেং বলে এক ব্যক্তি মুভেবল টাইপ আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। তবে তাঁর বানানো হরফ ছিল পোড়ামাটির তৈরি। এর দু’বছরের মাথায় কোরিয়ায় ব্রোঞ্জের হরফ তৈরি হল। গুটেনবার্গের তৈরি হরফ ছিল মিশ্র ধাতুর— টিন, অ্যান্টিমনি আর সিসা দিয়ে তৈরি। আগের বানানো হরফগুলি থেকে যা অনেক অনেক বেশি কাজের। বিল গেটস বলেছেন, “গুটেনবার্গ’স ইনভেনশন অব দ্য প্রিন্টিং প্রেস ব্রট অ্যাবাউট দ্য ফার্স্ট রিয়াল শিফ্ট ইন ডিস্ট্রিবিউশন ফ্রিকশন। ইট অ্যালাউড ইনফর্মেশন অন এনি সাবজেক্ট টু বি ডিস্ট্রিবিউটেড কুইকলি অ্যান্ড রিলেটিভলি চিপলি...”

মুদ্রণকে ভাগ করা যায় তিনটি ভাগে— প্রাক্ মুদ্রণ (প্রি প্রেস), যেখানে পাণ্ডুলিপি/ পরিকল্পনা থেকে অক্ষর বিন্যাস ও ছবি সংযোজন করে মুদ্রণযন্ত্রে ওঠার জন্য কপি প্রস্তুত করা হয়; মুদ্রণ (প্রেস) যেখানে মুদ্রণযন্ত্রে ছাপা হয় এবং উত্তর মুদ্রণ (পোস্ট প্রেস) এই পর্বে ছাপা হয়ে যাওয়ার পর প্রচ্ছদ লাগানো, বাঁধানো, ল্যামিনেশন ইত্যাদি হয়।

প্রাক্ মুদ্রণে হাতে সাজানো টাইপ থেকে হট মেটাল, মানে লাইনো, মোনো, তার পর কোল্ড কম্পোজ়িশন, ফোটো টাইপ সেটিং, ডেস্কটপ পাবলিশিং— দীর্ঘ রাস্তা। মুদ্রণও লেটারপ্রেস থেকে অফসেটেই থেমে নেই, তাতে জড়িয়ে গেছে কম্পিউটার, ইলেকট্রনিক্স ও টেলিকমিউনিকেশন। ফলে ছাপার গতি যেমন বেড়ে গেছে, তেমনি বেড়েছে তার সৌকর্য। আর এই সব অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে সংবাদপত্র শুধু আরও দৃষ্টিনন্দন হয়নি, অসাধ্যসাধনও করছে। যেমন ধরা যাক, স্যাটেলাইট মুদ্রণ পদ্ধতি। এখানে উপগ্রহের মাধ্যমে মুদ্রণযোগ্য তথ্য পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পাঠিয়ে একই জিনিস একই সময়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে ছাপা সম্ভব। এই ভাবেই দেশের বহু প্রথম সারির সংবাদপত্র প্রকাশিত হচ্ছে।

এ ছাড়া এসে গেছে কম্পিউটার টু প্লেট বা সিটিপি টেকনোলজি। এর ফলে কম্পিউটার থেকে তথ্য সরাসরি প্লেটে নেওয়া সম্ভব। ব্যবহার করা হচ্ছে সিপিসি বা কম্পিউটারাইজ়ড প্রসেস কন্ট্রোল, যেখানে রঙের তারতম্য, কালির পরিমাণ, সব কিছুই কম্পিউটারের সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই যে মুদ্রণ প্রযুক্তি ও কম্পিউটার প্রযুক্তির মেলবন্ধন, এই প্রবণতাকে বলে ‘কনভার্জেন্স’। সারা দুনিয়াতেই এখন এই কনভার্জেন্স-এর ঝোঁক। এই ধারাতেই এসেছে পিওডি বা প্রিন্ট অন ডিমান্ড। ১৯৯০ সালের শেষের দিকে এই প্রযুক্তির আবির্ভাব। হাজার হাজার বই ছাপার ঝুঁকি প্রচুর, টাকা আটকে থাকে, রাখতে জায়গা লাগে, আছে অগ্নিভয়, জলভয়, উইপোকা। তার চেয়ে এই ভাল, রেস্তরাঁর মতো সব অর্ধেক রান্না থাক, কেউ অর্ডার দিলেই সেটি পুরো রেঁধে গরম গরম পরিবেশন করা হবে।

সম্প্রতি বন্যায় কলেজ স্ট্রিটে নষ্ট হওয়া বইয়ের ক্ষতি এখনও সামলে উঠতে পারেননি ছোট প্রকাশকরা, প্রিন্ট অন ডিমান্ড সেখানে নিশ্চয়ই একটা দারুণ সমাধান। শুধু বই নয়, টি-শার্ট, কফি মাগ আরও বিচিত্র আকারে ও আধারে ছড়িয়ে পড়েছে এই প্রযুক্তি। সুইস আর্মি নাইফ মডেলের মতো এর অজস্র চমৎকারিত্ব, বহুমুখী ব্যবহার, সে একাই ঘুরিয়ে দিয়েছে প্রকাশনার বাজার। মুদ্রণ মাধ্যমের তুলনায় ডিজিটাল মাধ্যমের যে ‘ফ্রিকশনলেস ডিস্ট্রিবিউশন’-এর কথা বলেছিলেন বিল গেটস তাঁর ‘দ্য রোড অ্যাহেড’ বইতে।

প্রচলিত প্রকাশনের ডেলিভারি সিস্টেমে পদে পদে নানা বাধা। পাঠকের কাছে পৌঁছতে গেলে পেরোতে হয় সম্পাদনা, অক্ষরবিন্যাস, প্রাক-মুদ্রণ স্ক্যানিং, ইমেজ সেটিং, মুদ্রণ, বাঁধাই, ডিস্ট্রিবিউশন— নানা ধাপ। এর ফলে অনেক সময় নষ্ট হয়, দাম যায় বেড়ে। বৈদ্যুতিন প্রকাশনে থাকবে না এই সব ফ্রিকশন অব ডিস্ট্রিবিউশন, তথ্য পাওয়া যাবে অনেক সস্তায়, লেখকদের হাতে আসবে অধিকতর শক্তি— এমনটা দাবি বিল গেটসের। “দি ইনফরমেশন হাইওয়ে উইল বি লার্জলি ফ্রিকশন ফ্রি, ইট উইল এম্পাওয়ার মোর অথরস, বিকজ় ভেরি লিটল অব দ্য কাস্টমার্স ডলার্স উইল বি ইউজ়ড টু পে ফর ডিস্ট্রিবিউশন।”

আপাতভাবে মনে হয় পিওডি বুঝি সেই প্রতিপক্ষ অর্বাচীন ডিজিটাল মাধ্যমকে, অতি বৃদ্ধ প্রমাতামহী মুদ্রণ প্রযুক্তির মোক্ষম জবাব। এত দিনে মুদ্রণের ফ্রিকশন শেষ হল বুঝি।

মাধ্যমের নিজস্ব শক্তি

প্রতিটি মাধ্যমকেই নিজের নিহিত শক্তি চিনে নিয়ে ঠিক করতে হবে নিজস্ব ক্ষেত্র। তথ্যবণ্টনের তো আলাদা আলাদা মুখ আছে। এক এক মুখের এক এক স্বর। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ফোরক উন্নতি যখন আমাদের দিয়েছে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা, ব্যক্তিনিবিষ্ট পরিষেবা, তখন সেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক যাপনে আলাদা কণ্ঠস্বরের দাবি উঠতেই পারে, তার জন্যে পুরনো স্বরগুলি হারিয়ে যাবে কেন?

যে সব লেখক জুতোর সুকতলা খুইয়ে প্রকাশকের দরজা থেকে শুকনো মুখে ফেরেন প্রাপ্য রয়্যালটি না পেয়ে, তাঁরা আশান্বিত হয়েছিলেন এই ভেবে যে, এ বার থেকে নিজের মূল্য সরাসরি যাচাই করে নিতে পারবেন পাঠকের মুখোমুখি বসে, শুধু মাউসের একটা ক্লিক, ব্যস। এই মুক্ত মাধ্যমে নেই চিরাচরিত প্রকাশকের মিথ্যে অজুহাত, অরণ্য পোড়ানো কাগজে ছাপার অপরাধবোধ, কাগজ-কালির ক্রমবর্ধমান দাম, গুদামজাত হয়ে জলে, পোকায় নষ্ট হওয়ার ভয়। দ্বিমুখী, ইন্টারঅ্যাক্টিভ এই প্রকাশনে পাঠক হাইপারটেক্সটে ক্লিক করে পেতে পারেন বাড়তি অনেক তথ্য, অর্থাৎ এখানে বদলে যাচ্ছে পাঠের অভিজ্ঞতাই।

রক্ষণশীল পাঠক তবুও খুশি ছিলেন এই ভেবে যে, বৈদ্যুতিন মাধ্যম তো শুধু শুকনো তথ্য খোঁজাখুঁজির জন্য। অর্থাৎ নেহাতই দায়ে দরকারে ব্যবহার্য। কিন্তু যখন স্টিফেন কিং, মেরি হিগিন্স ক্লার্ক, ওয়াল্টার মোজেলের মতো বাঘা বাঘা লেখক তাঁদের নতুন বই বৈদ্যুতিন মাধ্যমেই প্রকাশ করতে শুরু করলেন, তখন বুক কেঁপে উঠল। এ বার কি তবে পাঠের আনন্দেও ভাগ বসাবে বৈদ্যুতিন প্রকাশন? ই-বুক কোনও দিন বইয়ের মতো হতে পারবে? কম্পিউটার পর্দা থেকে কিছু পড়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া প্রচুর, বেশি ক্ষণ তাকিয়ে থাকলে চোখ জ্বালা করে, ঘাড় টনটন করে। সবচেয়ে বড় কথা, ছাপার হরফের রেজ়োলিউশন বৈদ্যুতিন হরফের চেয়ে ঢের বেশি। বিছানায় শুয়ে, গাড়িতে যেতে যেতে ইচ্ছেমতো বই পড়া যায়। এ রকম ঘনিষ্ঠতা কি ই-বইয়ের সঙ্গে সম্ভব? যতই আধুনিক ই-বইয়ে পাতা ওল্টানোর শব্দ থাকুক।

বই পড়তে লাগে না কোনও বিদ্যুৎ-সংযোগ, মোডেম কিংবা টেলিফোন লাইন। আর পাঠের গভীরতা? যথার্থই বলেছেন বিখ্যাত শিল্প বিশেষজ্ঞ হাইনজ় বার্গহান্স, “ফরচুনেটলি ফর দ্য গ্রাফিক কমিউনিকেশন ইন্ডাস্ট্রি, পিপল এভরিহোয়্যার স্টিল ওয়ান্ট টু সি অ্যান্ড কিপ দা প্রিন্টেড ওয়ার্ড অ্যান্ড পেজ। দে হ্যাভ গেন্‌ড গ্রেটার ভ্যালু অ্যান্ড সেট টু রিটন অ্যান্ড এভার ইনক্রিজ় দিজ় ভ্যালুজ় ইন দি ইয়ারস টু কাম। আ রিয়ালাইজ়েশন হ্যাজ় কাম দ্যাট ইলেক্ট্রনিক ওয়ার্ডস সিম টু ল্যাক সাবস্ট্যান্স। ডিজিটাল ডেটা ক্যান নট গিভ দ্য পারমানেন্ট ইম্প্যাক্ট অব দ্য প্রিন্টেড ওয়ার্ড।”

পারমানেন্ট ইমপ্যাক্ট— এই শব্দজোড়ার মধ্যেই নিহিত আছে বইয়ের চরিত্র বিশিষ্ট। একটি বইয়ের দু’মলাটের মধ্যে লেখকের রচনা পায় স্থায়িত্ব, নিশ্চয়তা ও গৌরব। হাত দিয়ে ছোঁয়া, পাতা ওল্টানো, বইয়ের পাতায় লুকনো গোলাপ— বই হয়ে ওঠে নানা ব্যক্তিগত মুহূর্তের সঙ্গী। এমনটা কি কোনও দিন হয়ে উঠতে পারবে ই-বই? ই-বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবে যখন কাতর হচ্ছিলেন সবাই, যখন পিডিএফ-এর শনি বইবাজারের পিছু ছাড়ে না, জাল বইয়ের ব্যবসা যখন প্রকাশকের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে, তখন পিওডি-কে প্রকৃত বন্ধু বলে মনে হয়। কিন্তু সত্যিই কি তাই?

প্রযুক্তির নৈতিকতা

যে কোনও প্রযুক্তি যখন বাজারে আসে, তখন তাকে কী ভাবে ব্যবহার করব, কতটা নৈতিকতার সঙ্গে— সেটা স্থির করা খুবই জরুরি। না হলে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের জন্ম হয়। মানুষ অমরত্বের আশায় যে বই লেখে, যে বই লেখকের মৃত্যুর বহু বছর পরেও বেঁচে থাকে নতুন পাঠকের হাতে হঠাৎ আবিষ্কৃত হওয়ার জন্যে, এই চটজলদি প্রিন্ট অন ডিমান্ড কি সেই আশায় ছাই দিচ্ছে না? আমার মালয়ালি বন্ধু লেখক জানাচ্ছে, তার বই সাত হাজার কপি ছাপানো হয়। সে যখন আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমার বই কত ছাপানো হয়, আমি লজ্জায় পড়ে যাই। এখন বাংলা বাজারে তিনশো কপি ছাপাই খুব বেশি ধরা হয়। অথচ এই কলেজ স্ট্রিটই এক সময় মিনিমাম এগারোশো মুদ্রণ দেখেছে। বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে সার্বিক উদাসীনতা, আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অন্য মাধ্যমের রমরমা— শুধুই কি এগুলোই কারণ? এক-একটি বই প্রকাশক দশ-পনেরো কপি ছাপিয়েই ক্ষান্ত দেন। যে বই হাতে লেখক হাসি হাসি মুখে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দিচ্ছেন, সে বইটি পাঠক অবধি পৌছবে কি না, তা এক প্রহেলিকা। প্রকাশক-লেখকের প্রত্যাশিত সুস্থ, স্বচ্ছ, পেশাদার সম্পর্কের মধ্যে অনেক অদ্ভুত ও জটিল অঙ্ক ঢুকে পড়ে বইটির জীবন আরও বিপন্ন করে তোলে। প্রিন্ট অন ডিমান্ডের ফলে যে-হেতু বইটি না পাওয়া গেলে প্রকাশকের আর্থিক ঝুঁকি বা ক্ষতি প্রায় নেই, তাই তিনি হঠাৎই এক জন জ্যান্ত লেখককে এবং চালু বইকে ‘নেই’ করে দিতে পারেন ইচ্ছে হলেই। ফলে পরের মেলায় সেই বইটির আর দেখা মেলে না। অনেক সময় পাঠকের চাহিদা থাকলেও সে বইটি স্রেফ ভ্যানিশ হয়ে যায়। সে এমন ভ্যানিশ যে, কোনও হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বা বসন্তরঞ্জনের সাধ্যি নেই তাকে কোনও গোয়ালঘর বা রান্নাঘর থেকে উদ্ধার করে। প্রযুক্তির আস্তাকুঁড় এমন এক কৃষ্ণগহ্বর যে, তার থেকে লেখকের কোনও উদ্ধার নেই। জীবন এত ছোট কেনে? লেখকজীবন তো আরও ছোট, বইয়ের জীবনও।

অমরত্বের সাধ

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এক বাড়ির গোয়ালঘর থেকে চর্যাপদ পুঁথি আবিষ্কার করেন, যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসটাই বদলে দেয়। কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘শ্রীকৃষ্ণচরিতামৃত’ পুঁথিটি নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার অভিযান রীতিমতো একটা থ্রিলার।বৌদ্ধ পুঁথি রক্ষা করার জন্যও কত শ্রমণ জীবন বিপন্ন করেছেন।

পুঁথির যুগে একটি পুঁথি পাঠ করতে পারা বড় সহজ ছিল না। কত ক্রোশ ক্রোশ পথ হেঁটে বহু কষ্টে একটি পুঁথি পড়তে পেতেন কেউ কেউ। কোনও প্রিয় বইয়ের কাছে পৌঁছনো এত সহজ ছিল না একশো বছর আগেও। বিশেষ করে অন্তঃপুরে বই পাওয়া তো এক অসম্ভব ব্যাপার। আমরা জানি কী এক অলীক মুহূর্তে রাসসুন্দরীর কাছে উড়ে এসে পড়েছিল ‘শ্রীকৃষ্ণচরিতামৃত’-র ছেঁড়া পাতা, আর তাঁর ইচ্ছে হয়েছিল গোটা পুঁথিটি পড়ার। সেই তীব্র ইচ্ছে সম্বল করে রান্নাঘরের মেঝেতে কাঠকয়লা দিয়ে অক্ষর এঁকে এঁকে তিনি একার চেষ্টায় লিখতে পড়তে শিখলেন, আর ক্রমে লিখলেন বাংলার প্রথম আত্মজীবনী। মনে পড়ে, ‘সুবর্ণলতা’য় দেওয়ালের ফোকর দিয়ে এক অন্দর থেকে অন্য অন্দরে বই চালাচালির দৃশ্য। এ ভাবেই তো বিপ্লবের জন্ম হয়। আর শুধু বিপ্লব নয়, জরা আর মৃত্যুকেও চ্যালেঞ্জ ছোড়ে বই। সমীক্ষায় দেখা গেছে, নিয়মিত বই পাঠ করলে অ্যালঝাইমার’স এড়ানো যায়, আর কে ভুলতে পারে ঝুম্পা লাহিড়ীর ‘দ্য নেমসেক’ উপন্যাসে শুধু বই পড়ছিল বলেই ট্রেন-দুর্ঘটনায় অন্ধকার মাঠে ছিটকে পড়া অশোক রেসকিউ পার্টির নজরে পড়েছিল, তার প্রাণ বাঁচিয়েছিল তার পাশে পড়ে থাকা গোগোলের গল্পগ্রন্থটি!

মানুষের ভবিতব্য নাকি সংস্কৃত ভাষায় লিখে রেখে যান জিপসি মেলকিয়াদেস, এখন এ যুগে লেখকের ভবিষ্যৎ কোন ভাষায় লেখা হবে? তবে পিওডি যতই প্রকাশনার ঝুঁকি কমিয়ে দিক, এখনকার রামতারণ চাটুজ্জে অথররা কিন্তু সেকেন্ড এডিশনের এবং অমরত্বের স্বপ্ন দেখেই যাবেন।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

E-Books Books

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy