তারিখটি ৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৩। জার্মান সাবমেরিন ইউ-১৮০’তে জার্মানির কিল বন্দর থেকে সাবমেরিনে জাপানের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিলেন দুই ভারতীয়— সুভাষচন্দ্র বসু ও আবিদ হাসান সাফরানি। ২৮ এপ্রিল ১৯৪৩, মাদাগাস্কারের কাছে গভীর সমুদ্রে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা ওই জার্মান সাবমেরিন থেকে গিয়ে ওঠেন জাপানের আই-২৯ সাবমেরিনে। জাপানের সাবাং বন্দরে তাঁরা পৌঁছন ওই বছরের ৬ মে। এর পর জাপানে নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক হওয়া এবং ভারতে আজাদ হিন্দ ফৌজের ব্রিটিশ-বিরোধী আক্রমণ ও তার ফলশ্রুতি বহু আলোচিত। কিন্তু জার্মানিতে নেতাজির প্রস্তুত করা বাহিনীর বা পরবর্তী সময়ে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (আইএনএ)-র ব্রিটিশ-বিরোধী যুদ্ধ ও সেই প্রসঙ্গে আবিদ হাসানের ভূমিকা অনেকটাই অগোচরে রয়ে গেছে। অকৃতদার এই দেশপ্রেমিকের পরিবারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত নথি ও ডায়েরির উপর ভিত্তি করে প্রকাশিত হয়েছে গ্রন্থ, ‘আবিদ হাসান সাফরানি— নেতাজি’স কমরেড-ইন-আর্মস’।
জয়নুল আবদিন হাসান, সাধারণ ভাবে যিনি আবিদ হাসান নামে পরিচিত, জন্মগ্রহণ করেছিলেন হায়দরাবাদে, ১৯১১ সালের ১১ এপ্রিল। পরে নিজের নামের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন ‘সাফরানি’ শব্দটি, যার উৎস হিন্দুধর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গেরুয়া বা ‘স্যাফরন’ রং, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। তাঁর পিতা ছিলেন তহসিলদার আমির হাসান, মাতা ফখরুল হাজিয়া বেগম। প্রতিবেশীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সরোজিনী চট্টোপাধ্যায় (পরে যিনি সরোজিনী নায়ডু নামে পরিচিত হবেন), তাঁর সঙ্গে ফখরুল হাজিয়া বেগমের গভীর সখ্য ছিল। মায়ের তীব্র ব্রিটিশ-বিরোধী মনোভাব ও কার্যকলাপের প্রভাব পড়েছিল তাঁর সন্তানদের উপর। আবিদ, তাঁর আরও দুই ভাই বদরুল ও জাফরের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন গান্ধীর সাবরমতী আশ্রমে। গান্ধীর ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ পত্রিকা সম্পাদনার কাজও করেছিলেন বদরুল।
১৯৩৫ সালে আবিদ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যান বার্লিন। সমসাময়িক কালে অনেকেই ইংল্যান্ডে নয়, উচ্চশিক্ষার জন্যে যেতেন জার্মানি। ১৯৩৬ সালে আবিদ হাসানের সঙ্গে সেখানেই পরিচয় হয় সুভাষচন্দ্র বসুর। সুভাষের ডাকে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেন। সুভাষ আবার ১৯৪১ সালে বার্লিনে পৌঁছলে জার্মানদের সহযোগিতায় জার্মানির হাতে বন্দি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ভারতীয় সদস্যদের নিয়ে সুভাষচন্দ্র তৈরি করেছিলেন ‘দ্য ইন্ডিয়ান লিজিয়ন’ নামে এক বাহিনী, আবিদ হাসানের পরামর্শে প্রবাসী ভারতীয় ছাত্রদেরও স্থান দিয়েছিলেন বাহিনীতে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতি দায়বদ্ধ ও বাহিনীর ঐক্যের প্রতি সমর্পিত ছিলেন হাসান। কলকাতার নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো কর্তৃক প্রকাশিত জার্নাল ‘দি ওরাকল’-এ ছাপা হয় আবিদ হাসান সাফরানির সাক্ষাৎকার। তা থেকে জানা যায়, সেনাদের জন্যে একটি কিচেন তৈরি, এবং জার্মানিতে সৈন্যদের খাবারের জন্যে ‘হালাল’ ও ‘ঝটকা’ এই দুই রকমের মাংসের পৃথকীকরণের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিভাজন বন্ধ করতে নির্দেশ দেন নেতাজি। আবিদ হাসান উদ্যোগ করে শুরু করিয়েছিলেন একটি জায়গা থেকে খাদ্য বিতরণ এবং কখনও ‘হালাল’, কখনও আবার ‘ঝটকা’র মাংসের টুকরোর মাপ বড় করা, যার ফলে স্বাভাবিক ভাবেই সৈন্যরা আর ওই পৃথকীকরণকে গুরুত্ব না দিয়ে বড় টুকরো পছন্দ করতে শুরু করেন। খাদ্যের ক্ষেত্রে সৈন্যদের ধর্মীয় বিভাজন বন্ধ হয়।
বাহিনীতে বিভিন্ন ধর্মের সেনারা সম্প্রীতির স্বার্থে ঠিক করেন ‘মালিক’ বা ‘লর্ড’-এর উদ্দেশে সাধারণ প্রার্থনা জানাবেন। আবিদ হাসান ছিলেন এ বিষয়ে বিশেষ উৎসাহী। কিন্তু নেতাজি হাসানকে বলেন, ধর্মের নামে সবাইকে একত্রিত করলে, ধর্মের দোহাই দিয়েই তাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকবে। ব্যক্তিগত ধর্ম ও জাতীয়তাবোধকে মেলাতে চাননি নেতাজি।
সেনা ব্যারাকে হাসানের ঘরে থাকতেন তিন জন শিখ, দুই জন মুসলমান এবং এক জন হিন্দু। বাহিনীর মধ্যে সমস্ত ধর্মের মানুষ সাধারণ শুভেচ্ছাবার্তা হিসেবে কী শব্দবন্ধ ব্যবহার করতে পারে, তা ভাবতে শুরু করেন হাসান। প্রথমে ভেবেছিলেন ‘হ্যালো’ সম্বোধন করা যেতে পারে। নেতাজি শোনামাত্রই তা নস্যাৎ করেন। এর পর রাজপুত সেনাদের ব্যবহৃত সম্বোধন ‘জয় রামজি কি’ হাসানের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। এর থেকেই তাঁর চিন্তায় আসে ‘জয় হিন্দুস্থান কি’ এবং তার পর ‘জয় হিন্দ কি’ আর সব শেষে ‘জয় হিন্দ’। তাঁর এই উদ্ভাবন নেতাজির সম্মতি ও প্রশংসা পেয়েছিল। সেনাদের মধ্যে গৃহীত হয়েছিল এই সম্বোধন।
হাসান এবং তাঁর সঙ্গীরা অনুভব করেছিলেন, স্বাধীন ভারতের থাকবে নিজস্ব সরকার ও সেনাবাহিনী। সেই জন্যে প্রয়োজন জাতীয় সঙ্গীতের। আলোচনায় আসে ‘বন্দে মাতরম্’ বা ‘সারে জাঁহাসে আচ্ছা’-র মতো সঙ্গীত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্থির হয় ‘জনগণমন অধিনায়ক জয় হে’-র হিন্দি তর্জমা করা হবে। নেতাজির নির্দেশে আবিদ হাসান ও আজাদ হিন্দ রেডিয়োর লেখিকা মুমতাজ হোসেন এই কাজে উদ্যোগী হন। ক্যাপ্টেন রাম সিং ঠাকুরীর সামরিক সুর-সহ রচিত হয় ‘শুভ সুখ চৈন কি বরখা বরষে’। গানটি আজাদ হিন্দ সরকারের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হয়।
সাবমেরিনে প্রায় তিন মাস বিপদসঙ্কুল সফর করার সময় নানা রকম কাজে ব্যস্ত ছিলেন নেতাজি ও আবিদ হাসান। ‘দ্য ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল’-এর রিভিশনের কাজ এই সময় শেষ করেন নেতাজি, সেই সঙ্গে তৈরি করেছিলেন ভবিষ্যতে প্রদত্ত বিভিন্ন ভাষণের খসড়া। এই সময় রোজ টাইপরাইটার নিয়ে বসে, কখনও বা শ্রুতিলিখন নিয়ে নেতাজির লেখার কাজে যোগ্য সহযোগিতা করেছিলেন হাসান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী তোজোর সঙ্গে দেখা হলে কেমন কথোপকথন হতে পারে, তারও মহড়া দিতেন নেতাজি ও হাসান। এই সময় হাসান নিজেকে তোজো হিসেবে কল্পনা করে নেতাজিকে দুরূহ প্রশ্ন করতেন। অনেক সময় তোজোর ভূমিকা নিতেন নেতাজি নিজেই, আর সুভাষচন্দ্র হতেন হাসান।
জাপানে পৌঁছনোর পর চিন-জাপান যুদ্ধের আবহে হাসানের উপর নেতাজি দায়িত্ব দিয়েছিলেন চিনে গিয়ে চিয়াং কাই শেক-এর সঙ্গে দেখা করে অনুরোধ করতে, যাতে তিনি ‘এশীয় সংহতি’র কথা বিবেচনা করে জাপানের সঙ্গে একটা সমঝোতায় আসেন। বিপদের ঝুঁকি নিয়ে গোপনীয়তার সঙ্গে নানকিং-এ গিয়ে হাসান দেখাও করেন চিয়াং কাই শেক-এর সঙ্গে, কিন্তু চিয়াং কাই শেক হাসানের প্রস্তাবে রাজি হননি।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় আইএনএ-র গান্ধী রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে লড়াই করেছিলেন আবিদ হাসান। তাঁর লেখা ‘দ্য মেন ফ্রম ইম্ফল’-এর ছত্রে ছত্রে আছে ইম্ফল থেকে পশ্চাদপসরণের সময় আইএনএ-র অবর্ণনীয় কষ্ট। আবিদ হাসানের ব্যক্তিগত নথি অনুযায়ী, ১৯৪৫ সালের ১৭ অগস্ট নেতাজির সঙ্গে ওঁর শেষ দেখা সায়গনে, যখন নেতাজি হবিবুর রহমান ও জাপানের সামরিক অফিসারদের সঙ্গে বিমানে চেপে বসেন টোকিয়োর উদ্দেশে। প্রবাসী ভারতীয়দের দান করা সোনা ও বহুমূল্য ধনরত্ন-ভর্তি দু’টি ট্রাঙ্ক নেতাজির বিমানে অন্যদের সঙ্গে দায়িত্ব নিয়ে পৌঁছে দেন আবিদ হাসানই, যা ছিল ভবিষ্যৎ আন্দোলনের জন্যে প্রয়োজনীয় রসদ। নেতাজির সঙ্গে তাঁর শেষ দেখার আশি বছর পূর্ণ হয়েছে গত বছরের ১৭ অগস্ট।
ব্রিটিশদের সঙ্গে যুদ্ধে আইএনএ পরাজিত হওয়ার পর অন্যান্য সৈন্যদের সঙ্গে আবিদ হাসানও বন্দি হন। পরে সিঙ্গাপুর জেল থেকে ছাড়া পেলে ফিরে আসেন জন্মস্থান হায়দরাবাদে। স্বাধীনতা-পরবর্তী কালে জওহরলাল নেহরু যখন প্রধানমন্ত্রী, আবিদ হাসান সাফরানি আইএফএস অফিসার হিসেবে কাজ শুরু করেন। বিদেশ দফতরের পদস্থ আধিকারিক হিসেবে তিনি কাজ করেন মিশর, চিন, সুইৎজ়ারল্যান্ড, ইরাক-সহ বিভিন্ন দেশের ভারতীয় দূতাবাসে। শেষ কার্যভার ছিল ডেনমার্কে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে। ভারতের কনসাল জেনারেল হিসেবে ১৯৬০ সালে দামাস্কাস বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত তাঁর ভাষণে বোঝা যায়— সাম্য, ন্যায়, স্বাধীনতা ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শ ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যের অঙ্গ বলে তিনি মনে করতেন।
১৯৬৯-এ অবসর নিয়ে ফিরে আসেন হায়দরাবাদে। খুব সাধারণ ভাবে অতিবাহিত করেন বাকি জীবন। আজীবন দেশসেবক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রবক্তা মানুষটি প্রয়াত হন ১৯৮৪ সালের ৪ মে।
তথ্যসূত্র: দ্য ওরাকল (জার্নাল), জানুয়ারি, ১৯৮৪ (ষষ্ঠ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা); হিজ় ম্যাজেস্টি’জ় অপোনেন্ট: সুভাষচন্দ্র বোস অ্যান্ড ইন্ডিয়া’জ় স্ট্রাগল এগেনস্ট এম্পায়ার— সুগত বসু (২০১১); প্রবন্ধ সংগ্রহ (১৯৫১-২০২০)— কৃষ্ণা বসু (গ্রন্থনা ও সম্পাদনা সুমন্ত্র বসু, ২০২১); ‘আবিদ হাসান সাফরানি—নেতাজি’স কমরেড-ইন-আর্মস’— ইস্মত মেহদি ও শেহবাজ সাফরানি সঙ্কলিত (২০২৩) এবং প্রতিবেদককে দেওয়া ইস্মত মেহদির সাক্ষাৎকার
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)