Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১২ অগস্ট ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

নবাব প্রাসাদের পাথর থেকে শ্রীশ্যামসুন্দর

কৃষ্ণ বিগ্রহ তৈরি ও প্রতিষ্ঠার দৈবাদেশ পেয়েছিলেন বীরভদ্র গোস্বামী। তাঁর পাথর উদ্ধারের কাহিনি আজ কিংবদন্তি। খড়দহের শ্যামসুন্দর একা নন। একই প

অরুণাভ দত্ত
০৮ মার্চ ২০২০ ০০:০৬
Save
Something isn't right! Please refresh.
Popup Close

শ্রীচৈতন্যের আমলে বাংলা মুসলমান শাসকের অধীন। এক দিকে ব্রাহ্মণদের অহঙ্কার, অন্য দিকে নিচু জাতির দুরবস্থা দেখে ব্যাকুল হয়েছিলেন শ্রীচৈতন্য। তাঁর সহজ সরল নামে-প্রেমে ভেসে গেলেন ব্রাহ্মণ থেকে চণ্ডাল। নিমাই পণ্ডিতের ভগবৎ নাম-গানে মুগ্ধ হলেন কাজীসাহেবও। শোনা যায়, নীলাচলে যবন হরিদাস ঠাকুরের প্রাণহীন দেহও কোলে তুলে নিয়েছিলেন মহাপ্রভু। মহাপ্রভু অপ্রকট হওয়ার পর তাঁর ধর্মভেদ অস্বীকার করার আদর্শ ফের বাঁচিয়ে তুলেছিলেন শ্রীগৌরাঙ্গের অন্যতম প্রধান পার্ষদ, শ্রীনিত্যানন্দের অষ্টম পুত্র বীরভদ্র গোস্বামী।

বহু কাল আগের খড়দহ এখন লোকমুখে খড়দা। নাট্যকার ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের জন্মভূমি এবং রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য স্থান। বিপ্রদাস পিপিলাইয়ের ‘মনসা বিজয়’ কাব্য এবং রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু রচনায় পাওয়া যায় খড়দহের উল্লেখ। তবে শ্রীপাট খড়দার খ্যাতি প্রধানত শ্রীশ্রীরাধা-শ্যামসুন্দর জীউয়ের মন্দিরের জন্যই। এই ঐতিহাসিক রাধা-শ্যামসুন্দর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করেই ঘটেছিল সেই ধর্মবিপ্লব। শ্রীরাধা-শ্যামসুন্দর জীউয়ের মন্দির স্থানীয় বাসিন্দাদের মুখে হয়ে গিয়েছে ‘শ্যামের বাড়ি’। শ্রীশ্যামসুন্দরের মন্দিরের নিকটে কুঞ্জবাটী। মহাপ্রভুর কাছ থেকে সমগ্র বাংলায় হরিনাম প্রচারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে সূর্যদাস সরখেলের দুই কন্যার পাণিগ্রহণ করেন নিত্যানন্দ। তার পর কুঞ্জবাটীতেই সংসার। এখানেই বীরভদ্র গোস্বামীর জন্ম।

বলা হয়, চৈতন্যদেব ও নিত্যানন্দ অপ্রকট হওয়ার পর বীরভদ্র দৈবাদেশ পান, মালদহের নবাবের রাজপ্রাসাদের তোরণে রয়েছে একটি কালো পাথর। কিংবদন্তি অনুসারে, ওই পাথরটিকে রাজা পরীক্ষিৎ ওই তোরণে স্থাপন করেন। তার পর যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের সময়ে শ্রীকৃষ্ণ ওই পাথরটির উপর দাঁড়িয়ে যজ্ঞে আগত ব্রাহ্মণদের পা ধুইয়ে দেন। বীরভদ্রের প্রতি দৈবাদেশ, সেই পাথর থেকে কৃষ্ণ বিগ্রহ তৈরি করিয়ে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

Advertisement

এই উদ্দেশ্যে বীরভদ্র সপার্ষদ নামসঙ্কীর্তন করতে করতে হাজির হলেন তখনকার মালদহে। অনেকের মতে, তখন গৌড়ের নবাব সোলেমান খাঁ। মালদহের নবাব সংবাদ পেয়ে বীরভদ্রকে বন্দি করলেন এবং ষড়যন্ত্র করলেন, গোমাংস খাইয়ে বীরভদ্রের জাত নষ্ট করা হবে। বীরভদ্রের এই অভিযানে আছে অলৌকিক দৈব মহিমার অনুষঙ্গ। রাজসভায় বীরভদ্রের সামনে ঢাকা দেওয়া একটি খাবারের থালা আনা হয়। ঢাকনা সরানো হলে দেখা গেল, গোমাংসের বদলে থালায় রয়েছে পুষ্পমাল্য। নবাব দমলেন না। সুরার পাত্র আনিয়ে বীরভদ্রকে পান করতে বললেন। এ বারেও দেখা যায়, সুরার বদলে পাত্রে রয়েছে দুধ। কাণ্ড দেখে নবাব ভয় পেলেন। তিনি বীরভদ্রের কাছে ক্ষমা চাইলেন। অনুরোধ করলেন, বীরভদ্র যদি তাঁর দৈব ক্ষমতার সাহায্যে নবাবের রুগ্ণ জামাইকে সুস্থ করে তোলেন। বীরভদ্র শর্ত দেন, জামাইয়ের সুস্থ শরীরের বিনিময়ে তিনি নিয়ে যাবেন রাজপ্রাসাদের তোরণে রক্ষিত বিশেষ কষ্টিপাথরটি। নবাব সম্মতি দিলেন। কিন্তু বুঝতে পারলেন না, বীরভদ্র কী উপায়ে পাথরটি খুলে নেবেন? বীরভদ্রের নির্দেশে সুরার পাত্রের দুধটি জামাইকে পান করানো হয়। বীরভদ্রের অলৌকিক শক্তির জোরেই হোক বা ভাগ্যবলে হোক, নবাবের জামাই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। অপর দিকে আচমকাই আকাশ জুড়ে খেলে যায় তীব্র বিদ্যুতের ঝলক। সঙ্গে প্রচণ্ড বজ্রপাত। সবাই অবাক হয়ে দেখলেন, বজ্রের আঘাতে তোরণ থেকে খুলে পড়েছে বিরাট এক কষ্টিপাথরের খণ্ড।

তোরণের কষ্টিপাথরটি কেমন করে মালদহ থেকে খড়দহে এল, সে সম্পর্কেও প্রচলিত অলৌকিক কাহিনি। জনশ্রুতি, বীরভদ্র কষ্টিপাথরটি ভাল করে খড়ে জড়িয়ে মালদহের গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘প্রভু, তুমি খড়দহে যাও!’ আবার কারও মতে, বীরভদ্র গোস্বামী বাঁশের মাচায় খড়ের আবরণ দিয়ে পাথরটি জলপথে ভাসিয়ে খড়দহে পাঠিয়েছিলেন। বলা হয়, পাথরটি জলে ভাসতে ভাসতে গঙ্গাতীরবর্তী আকনার একটি স্নানের ঘাটে এসে আটকে যায়। ঘাটে স্নানরত বালকের দল পাথরটিকে খেলার ছলে ঠেলে দিতেই পাথর আবার ভাসতে ভাসতে এসে পৌঁছয় খড়দার ঘাটে। এখন এই ঘাটের নামই শ্যামসুন্দর ঘাট। বীরভদ্র খড়দহে পৌঁছে পাথরটিকে উদ্ধার করেন এবং ভাস্করকে ধ্যানে দেখতে পাওয়া কৃষ্ণ বিগ্রহের বিবরণ দিয়ে মূর্তি গড়তে বলেন। ওই কষ্টিপাথর থেকে তিনটি কৃষ্ণ বিগ্রহ তৈরি হয়। এই তিন বিগ্রহের মধ্যে বীরভদ্র ধ্যানে দেখা সত্য, শিব ও সুন্দরের প্রকাশ দেখেন শ্যামসুন্দর বিগ্রহে। অন্য দুই বিগ্রহের একটি পাঠানো হয় আকনায় রুদ্র পণ্ডিতের কাছে। পণ্ডিত বিগ্রহকে বল্লভ জীউ নামে প্রতিষ্ঠা করেন। দেবতার নামে আকনার নতুন নাম হয় বল্লভপুর। বীরভদ্র তৃতীয় বিগ্রহের নাম রাখেন ‘নন্দদুলাল’। নন্দদুলালকে বীরভদ্র পাঠান স্বামীবনে (সাঁইবোনা) লক্ষণ পণ্ডিতের কাছে।

৯৭৭ বঙ্গাব্দের মাঘী পূর্ণিমায় অদ্বৈত আচার্যের জ্যেষ্ঠ পুত্র অচ্যুতানন্দ গোস্বামী শ্যামসুন্দরকে কুঞ্জবাটীতে প্রতিষ্ঠা করেন। পরে নিত্যানন্দের সহধর্মিণী জাহ্নবা দেবীর ইচ্ছেয় শ্রীশ্যামসুন্দরের বামে অষ্টধাতুর রাধিকা মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

পরে কুঞ্জবাটীতে বিগ্রহসেবার যথেষ্ট জায়গার অভাব দেখা দিলে চারশো বছরেরও বেশি আগে নির্মিত হয় বর্তমান শ্যামসুন্দর মন্দির। বর্তমানে কুঞ্জবাটীতে নিতাই-গৌর এবং বীরভদ্র গোস্বামীর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত। তিন কৃষ্ণ বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা নিয়ে দ্বিমত থাকলেও, এ কথা অস্বীকার করবার উপায় নেই, বীরভদ্র গোস্বামীর আন্তরিক প্রচেষ্টায় সে যুগে নবাবগৃহের পাথর থেকেই হিন্দুদের পরম আরাধ্য ঈশ্বর প্রকট হয়েছিলেন। বর্তমান সময়ে ধর্মীয় মেরুকরণ বড় প্রবল। ঈশ্বর তাঁর এই অবস্থিতি দিয়ে যেন বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি নিজে জাত-পাত মানেন না।

বলা হয়, নবাব প্রাসাদের সেই পাথর থেকে তৈরি তিন কৃষ্ণমূর্তিতে তিন রকম রূপ প্রকাশ পেয়েছে। বল্লভ জীউ বিগ্র‌হে তিনি রাধারানির প্রেমাস্পদ, নন্দদুলাল বিগ্রহে প্রকাশ পেয়েছে গোপালসুলভ বাৎসল্য এবং শ্যামসুন্দর বিগ্রহে তিনি স্বয়ং পরমেশ্বর। মাঘী পূর্ণিমায় এই তিন বিগ্রহ দর্শনের জন্য অনেক ভক্ত দর্শনার্থী জড়ো হন।

শ্যামসুন্দর মন্দিরের গঠনশৈলী অভিনব। নাটমন্দিরের শেষ প্রান্ত থেকে মন্দিরটি দেখতে পালকির মতো। গর্ভগৃহে রুপোর সিংহাসনে অষ্টধাতুর শ্রীমতী ও শিলাময় অনন্তদেবের সঙ্গে রয়েছেন শ্রীশ্যামসুন্দর। হাতে মুরলী। প্রসন্ন গম্ভীর শান্ত মুখ। আয়ত চোখ। কথামৃতকার মহেন্দ্রনাথ গুপ্তের সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ খড়দহে এসে শ্যামসুন্দর দর্শন করেছেন। এসেছেন শ্রীমা সারদামণিও। শ্রীশ্রীমা পরবর্তী কালে ভক্তদেরও বলেছেন, ‘‘ঠাকুর বলতেন, ‘দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী, কালীঘাটের কালী আর খড়দার শ্যামসুন্দর— এঁরা জীবন্ত, হেঁটে চলে বেড়ান, কথা কন, ভক্তের কাছে

খেতে চান।’ ’’

শুধু ধর্মীয় বিভেদই নয়, শ্রীশ্যামসুন্দর মন্দির মুছে দিয়েছে হিন্দু ধর্মের অভ্যন্তরীণ বিভেদরেখাও। এই মন্দির বৈষ্ণব, শৈব ও শাক্ত ধর্মের মিলনক্ষেত্র। এখানে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে পূজিত হন দশমহাবিদ্যার তৃতীয় মহাবিদ্যা ত্রিপুরাসুন্দরী এবং নীলকণ্ঠ শিব। নিত্যানন্দ কুঞ্জবাটীতে দুর্গাপুজোরও প্রচলন করেছিলেন। আবার শ্রীকৃষ্ণ শ্রীরাধিকাকে কলঙ্ক থেকে বাঁচাতে বৃন্দাবনে কালী রূপ ধারণ করেছিলেন। তাই দীপান্বিতা অমাবস্যায় শ্যামকে ‘শ্যামা’রূপে আরাধনা করা হয়। দোল এবং রাস উৎসবে খড়দা যেন গুপ্ত বৃন্দাবন। এই দু’দিন বিগ্রহকে চতুর্দোলায় চাপিয়ে দোলমঞ্চ ও রাসমঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়। রাসের শেষ দিনে মন্দিরে ‘খিচুড়ি লুট’ উৎসবের সবচেয়ে জনপ্রিয় আমোদ। শ্রীরাধা-শ্যামকে নিবেদিত খিচুড়ি ভক্তেরা লুট করে নিয়ে যান। মন্দির সংলগ্ন পথের ধারে দাঁড়িয়ে অগণিত নর-নারী লুণ্ঠিত খিচুড়ির কণা আস্বাদ করে আনন্দে মেতে ওঠেন। মন্দির চত্বর ও সংলগ্ন পথ-প্রান্তরের প্রতিটি ধূলিকণাও তখন শ্যামময়।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement