এক, দুই, তিন...”
আর তার পরই হাতুড়ির আওয়াজ। প্রতি রবিবার, এখনও, এই আওয়াজ শোনা যায় এই কলকাতার বুকে। আজ বলে নয়, গত ছিয়াশি বছর ধরে এই শব্দপুঞ্জ ভেসে বেড়ায় কলকাতার রাসেল স্ট্রিটে।
কলকাতার প্রাণকেন্দ্র, ‘হোয়াইট টাউন’-এর মধ্যমণি, পার্ক স্ট্রিটের ঠিক পাশেই একটা শান্ত রাস্তা রাসেল স্ট্রিট। এই রাস্তাটি ধরে রেখেছে ঐতিহাসিক একটি জায়গা, এক টুকরো ইতিহাস। এখানে সময় ঠিক স্থির হয়ে নেই, বরং বলা ভাল, বয়ে যাচ্ছে উল্টো দিকে। বলছি ‘দ্য রাসেল এক্সচেঞ্জ’ অকশন হাউস-এর কথা, যা এই শহর বা এই দেশের নয়, সমগ্র এশিয়া মহাদেশের প্রাচীনতম নিলামঘরগুলির একটি।
কলকাতায় নিলামের ইতিহাস বেশ পুরনো। আঠারো শতকের শুরুতেই ইউরোপীয় ট্রেডিং ফার্ম ও ব্যক্তিগত এজেন্টরা আমদানিকৃত বিলাসপণ্য, প্ল্যান্টেশনের উদ্বৃত্ত সামগ্রী, জমিজমা ও ঔপনিবেশিক সম্পত্তির বিক্রি সংগঠিত করতে শুরু করেন। কোনও ইউরোপীয় অফিসার মারা গেলে বা দেশে ফিরে গেলে তাঁর সমস্ত পার্থিব বস্তু— আসবাব, ঘড়ি, পারস্য কার্পেট, অয়েল পোর্ট্রেট, ঘোড়া, বাসনপত্র— কিছুই বাদ যেত না নিলাম হওয়া থেকে।
আমরা যে নিলামঘরের কথা বলছি, সেই ২৪ রাসেল স্ট্রিটের ‘রাসেল এক্সচেঞ্জ’ নিলামঘরটির সূচনা ১৯৪০ সালে। এর বর্তমান মালিক তিন ভাইবোন—আনোয়ার সলিম, আরশাদ সলিম এবং সারফরাজ বেগম শামসি। এঁদের মধ্যে সলিম আমেরিকার প্রাক্তন বাসিন্দা এবং ব্যাঙ্কারও বটে, আর তাঁর বোন সারফরাজ বেগম শামসি ভারতের একমাত্র মহিলা নিলামকারী।
এঁদের পূর্বপুরুষ এই ব্যবসাটি কিনেছিলেন এক ইংরেজ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে। কালের অতল গর্ভে হারিয়ে গেছে সেই ইংরেজ ভদ্রলোকের পরিচয়, শুধু ইতিহাস মনে রেখেছে কেবল তাঁর নামটি— মিস্টার রাসেল। তবে সলিমের ঠাকুরদা আবদুল মাজিদের সঙ্গে ছিলেন আর এক জন অংশীদার। তাঁরা দু’জনে মিলে মালিকানা পান এই নিলামঘরটির। পরে সলিমের বাবা আবদুল সামাদ এই ব্যবসার দায়িত্ব পান উত্তরাধিকারসূত্রে, এবং অন্য অংশের মালিকানা পান অমৃত লালজি। সফল ভাবে দীর্ঘ সময় এই ব্যবসা চালানোর পর অমৃত লালজি তাঁর অংশ বিক্রি করে দেনসলিমের কাছে।
এ তো গেল হাতবদল বা মালিকানার কথা। রাসেল এক্সচেঞ্জ অকশন হাউসের বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ অন্য জায়গায়। তাদের সমসাময়িক কোনও নিলামঘরেরই আর কোনও অস্তিত্ব নেই। এক সময়ে কলকাতার নামী নিলামঘর ছিল পার্ক স্ট্রিটের ভিক্টর ব্রাদার্স— অভিজাতদের নিলামঘর। মিশন রো-তেও ছিল কলকাতার বহু নামী নিলামঘর— যেমন ম্যাকেঞ্জি লায়াল অ্যান্ড কোম্পানি। ম্যাকেঞ্জি লায়াল অ্যান্ড কোম্পানি ছিল ঔপনিবেশিক আমলের এক উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান। এদের মূল নিলামের বিষয়বস্তু ছিল আফিম, পাট, জামাকাপড় এবং সর্বোপরি এস্টেট লিকুইডেশন। এ ছাড়াও আরও কিছু নামকরা নিলামঘরের মধ্যে ছিল ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের স্টেনার অ্যান্ড কোং, রাসেল স্ট্রিটের ডালহৌসি এক্সচেঞ্জ, চৌরঙ্গীর চৌরঙ্গী সেলস ব্যুরো প্রাইভেট লিমিটেড— এগুলি সব একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। ১৯৮৫ থেকে ২০০৫— এই দু’দশকে তালাচাবি পড়েছে তাদের দরজায়, কিন্তু অতীতস্মৃতিকে বর্তমান সময়েও বয়ে বেড়াচ্ছে একমাত্র এইরাসেল এক্সচেঞ্জ।
প্রতি রবিবার এখানে জমে ওঠে বহুলপরিচিত নিলাম। কোনও বিশেষ বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না নিলামের জিনিসপত্র—ঔপনিবেশিক কলকাতা থেকে স্বাধীনতা-পরবর্তী কলকাতা— সবাই নিজের উপস্থিতি বজায় রাখে এই নিলামগুলোয়। পুরনো দিনের আসবাবপত্র, পুরনো গ্রামোফোন, রেকর্ড, বই বা ক্যামেরা, পুরনো ছবি বা কিউরিয়ো, লিথোগ্রাফ— বৈচিত্রের কোনও খামতি থাকে না। কলকাতার মানুষজনের একটা বড় অংশ এখনও মেহগনি কাঠের আসবাবপত্রে আগ্রহী। সুতরাং এগুলো বহুল পরিমাণে বিক্রি হয় নিলামঘরে। নিলামঘরে দেখা মেলে বিচিত্র ক্রেতাদেরও। কেউ হয়তো পোড়-খাওয়া সংগ্রাহক, আবার কেউ বা প্রথম বার নিলামঘরে পা দিয়েছেন, কেউ শুধুই দর্শক— কিন্তু উত্তেজনা আর রোমাঞ্চ সবারই সমান, আর লক্ষ্যও এক— অতীতের এক টুকরো নিজের করে নেওয়া, ইতিহাসের কোনও মুহূর্তের সাক্ষীকে ব্যক্তিগত সংগ্রহে রাখা।
বহু ছোট ছোট ঘটনা স্মৃতিতে ধরা আছে এই নিলামঘরের মালিকদের। প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী গণেশ পাইনের স্ত্রী এক বার তাঁর বেশ কিছু প্রায়-নতুন শাড়ি নিলামে তুলেছিলেন এখানে। এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক এক বার নিয়ে আসেন একগোছা বই, একটি বাদ দিয়ে বাকি সব বই বিক্রি হয়েছিল মাত্র ১৬৫ টাকায়, কেবল একটি বই বিক্রি হয় প্রায় কুড়ি হাজার টাকায়। বইটির নাম এখন আর তাঁদের মনে নেই, তবে বইটি ছিল খুব সম্ভবত প্রাচীন ও দুষ্প্রাপ্য লিথোগ্রাফ সম্বন্ধীয়।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতার ধরন বদলেছে। এক সময় এই নিলামঘরের প্রধান ক্রেতা ছিলেন ঔপনিবেশিক কলকাতার ব্রিটিশ নাগরিক, রাজপরিবার এবং সম্ভ্রান্ত অভিজাত শ্রেণির মানুষেরা। স্বাধীনতার পরে মূলত সমাজের উঁচুতলার ব্যক্তিবর্গ এবং ধনী সম্প্রদায়ের লোকজন, যার মধ্যে অগ্রগণ্য চলচ্চিত্রজগতের ব্যক্তিত্বরা— তাঁরা হয়ে ওঠেন নিয়মিত ক্রেতা। সেই সময় ভারতে ‘এক্সচেঞ্জ কন্ট্রোল’ থাকায় বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করা কঠিন ছিল। ফলে কনস্যুলেট, বিদেশি কর্মচারী বা ভারত ছেড়ে চলে যাওয়া কোনও ব্রিটিশ পরিবারের জিনিসপত্র নিলামে ওঠার আকর্ষণই ছিল আলাদা। এখন অবশ্য ডিজিটাল যুগ। সরাসরি জিনিসপত্র আসে, কিন্তু বিক্রেতারা অনেক সময়েই প্রথমে ছবি পাঠান ওয়টস্যাপে। ছবি দেখে সম্ভাব্য ন্যূনতম দাম জানানো হয়, তার পর নিলামে ঠিক হয় চূড়ান্ত মূল্য। তবে জিনিসের ধরনেও বদল এসেছে। বছর তিরিশ-চল্লিশ আগেও যে কোনও নিলামে দেখা যেত ল্যাজ়ারাস কোম্পানির আসবাবপত্র, পুরনো ইংরেজ আমলের টি-সেট কিংবা দামি ঐতিহ্যবাহী ঝাড়লণ্ঠন, বেলজিয়ামের ল্যাম্প শেড, ভেনিশিয়ান মিরর থেকে হাতির দাঁতের মোনোগ্রাম করা গ্রামোফোন। তবে ৭৫ বছর বা তারও বেশি পুরনো কোনও জিনিসের ব্যাপারে প্রয়োজনে প্রত্নতত্ত্ব দফতরে জানাতে হয়।
তখন নিলামঘরে দেখা যেত অনেক নামীদামি মানুষকে। সত্যজিৎ এবং বিজয়া রায়েরও অন্যতম প্রিয় জায়গা ছিল এটি। সত্যজিতের বহু চলচ্চিত্রের সেটের জন্য প্রয়োজনীয় এবং উপযোগী জিনিস তিনি এখান থেকে কিনতেন। শাবানা আজ়মি, জাভেদ আখতারও এক সময়ে নিয়মিত আসতেন। আসতেন মানেকা গান্ধী, সুচিত্রা সেনের মতো তারকারাও। ব্রিটিশ ডকুমেন্টারি ‘দি অকশন হাউস: আ টেল অব টু ব্রাদার্স’-এও এই নিলামঘরটিদেখানো হয়েছে।
এখনও নিলাম হয়, তবে সেই আগের জৌলুস আর নেই। প্রতি রবিবার এখানে প্রায় ৩০০-৪০০টির মতো জিনিসের নিলাম বসে। আগের দিন অর্থাৎ শনিবারে ছাপা ক্যাটালগ প্রকাশিত হয়। আগে বৃহস্পতিবারও নিলাম হত, এখন আর তা হয় না। অকশন হাউস কোনও বিজ্ঞাপন দেয় না। মানুষ নিজেরাই তাঁদের বিক্রয়যোগ্য জিনিস নিয়ে আসেন।
আজ কলকাতা আর আগের মতো ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে বসে নেই। তার সেই আগের রমরমাও অস্তমিত, ঠিক যেমন নিলামঘরের রমরমাও পড়তির পথে। তবু আজও কলকাতা আছে কলকাতাতেই। আজও অতীতের কদর করতে জানে এই শহর। তাই তো অসংখ্য স্মৃতি, ইতিহাস আর গল্পের ঝুলি আগলে নিয়ে পথ চলছে রাসেল এক্সচেঞ্জ অকশন হাউস।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)