একশো বছর আগে, ১৯২৬ সালের ৭ মে কলকাতায় রেবা দাশগুপ্তের জন্ম। এ বছর শতবর্ষ পূর্ণ করেছেন। ভারতীয় চিত্রকলায় নতুন চিত্রভাষার সংযোগ ঘটিয়েছেন তিনি, কিন্তু তাঁর সেই বিস্ময়কর ও বিপুল চিত্রপৃথিবীটি এখনও পূর্ণরূপে আবিষ্কৃত নয়। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে শুরু করেছে। বাবা কুলদাচরণ দাশগুপ্ত ছিলেন ডিস্ট্রিক্ট জজ। পরে হাই কোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হন। মা সুপ্রভা। রেবারা তিন ভাইবোন। ভাই অজিত তাঁর থেকে দু’বছরের, আর বোন মীরা তাঁর থেকে চার বছরের ছোট।
রেবা কোনও দিন স্কুলে যাননি। বাড়িতেই পড়াশোনা। বাড়িতে মায়ের বাংলা-ইংরেজি অনেক রকম বই ছিল, সেগুলোই পড়ার চেষ্টা করতেন। এ সম্পর্কে স্মৃতিকথায় তিনি লেখেন, “অল্প বুঝে অনেক না বুঝে নানারকম কল্পনা করে না-বোঝার ফাঁক পুরিয়ে নিতাম।” মা নিয়মিত পড়াতে বসতেন রেবা-কে, গল্প-কবিতা শোনাতেন অনেক, রবীন্দ্রনাথ ও বিদেশি কবিদের কবিতা শোনাতেন। কল্পনার দরজা-জানালাগুলো খুলে খুলে যেত আরও। ওই ছোটবেলাতেই অবিরাম সেই সব গল্প কবিতা শুনতে শুনতে ছবির জন্ম হত মনে, “সবুজ বনের ভিতর দিয়ে সাদা ঘোড়া ছুটে চলেছে; কালো বাঘ লাফিয়ে পড়ল। চিকচিকে সোনালি বালিতে সাদা হাঁসের দল; হঠাৎ ডানা মেলল নীল আকাশে।...”
বাবাও পড়াতে বসতেন বাড়িতে, শেক্সপিয়র মিল্টন থেকে পড়ে শোনাতেন, একই সঙ্গে সংস্কৃতের পাঠও দিতেন, সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মে ছড়া বেঁধে দিতেন— শিশুমনে মজা লাগত খুব। অঙ্কের পাঠও বাবা দিতেন, কিন্তু অঙ্কে ছিল রেবার প্রবল অনীহা। অঙ্ক করার বদলে অঙ্কের খাতায় ছবি এঁকে ভরিয়ে রাখতেন, বাবা রাগ করে সেই খাতা ছুড়ে ফেলে দিতেন মাঝে মাঝে। অগত্যা মা স্লেট আর রঙিন খড়ি কিনে দেন ছবি আঁকার জন্য। স্লেটে ছবি আঁকা বিষয়ে রেবার স্মৃতিচারণ, “... মুছতে গিয়ে রেখা বদলে রঙ ধ্যাবড়াতো। তার মধ্যে জলের রেখা দিয়ে আঁকবার চেষ্টা করতাম। ফলে যা আঁকছি তার চেয়ে অন্যরকম মনে হত।”
ছোটকাকার সঙ্গে পরিচয়সূত্রে বাড়িতে আসতেন শিল্পী প্রমোদকুমার চট্টোপাধ্যায়। রেবার মায়ের আগ্রহ ছিল তাঁর ছবির সম্পর্কে। মায়ের উৎসাহে রেবা তাঁর কাছে বাড়িতেই ছবি আঁকা শিখতে শুরু করলেন। প্রমোদকুমার কাজ করতেন ভারতীয় ধরন এবং বিদেশি ধাঁচ মিলিয়ে। তাঁর কাছেই রেবার জলরঙের শিক্ষা। ছাত্রীকে মাস্টারমশাই গাছপালা ফুল ফল জন্তুজানোয়ার আঁকতে বলতেন। দাশগুপ্ত-বাড়িতে অনেক পাখি ছিল। ফলে ছাত্রীর পাখি আঁকায় খুব আনন্দ, সেই আনন্দ কিছু দিন বাদে পরিণত হল আরও পাখি পোষায় এবং তার চেয়েও আরও আনন্দ অপেক্ষা করছিল রেবার জন্য, আঁকা থেকে পোষা, পোষা থেকে খাঁচা খুলে পাখিদের উড়িয়ে দেওয়ায়— “মনে পড়ে ছাই রং-এর জাভা স্প্যারোর ঝাঁক প্রথমে কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুল ভরা ডালে বসল; তারপর নীল-সাদা আকাশে উড়ে গেল,” স্মৃতিকথায় লেখেন রেবা। আর আমরা এক শিল্পীমনের আঘ্রাণ পাই, যিনি অর্গল থেকে অর্গলমুক্তির কথা বলেন। রেবার সারা জীবনের ছবি এ রকমই স্বাধীনতার বোধে জারিত, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অর্গলমুক্ত এক পৃথিবীর স্বপ্ন তিনি বুনে গেছেন চিত্রপটে, মাটির মূর্তিতে।
এ রকম এক সময়ে কাজের সূত্রে বাবা বদলি হলেন রাজশাহীতে। প্রমোদবাবুর কাছে চিত্রশিক্ষায় ছেদ পড়ল তাঁর, কিন্তু থামল না চিত্ররচনা। সকল কিছুর মাঝে চিত্রপটেই তাঁর মন বসে, “পদ্মার জল, নদীর চর, নৌকা চলা, জলে ভেজা পাখির ছানা, ঘরে ঢুকে থপ হয়ে বসে থাকা সোনা ব্যাং, ফণাধরা সাপের লড়াই যা কিছু দেখে অবাক লাগত আঁকতাম; যতটুকু পারি সেই বিদ্যা নিয়েই আঁকার চেষ্টা করতাম।” আর তারই মাঝে চলত পড়াশোনা। কেবলই দেখার চোখ প্রসারিত হচ্ছিল, অন্তর্লোকে প্রকৃতির ছায়া চিরস্থায়িত্বের আসন নিচ্ছিল যেন। রেবা হোরের ছবিতে স্মৃতির এক মস্ত দালান রয়েছে, তাঁর কাজে কত বার যে থপ হয়ে বসে থাকা সোনাব্যাং দেখা গেছে! মানুষের প্রতি, জলে ভেজা পাখির ছানার প্রতি, কুকুর বেড়াল হাঁস, জীবনের প্রতি তাদের সংগ্রাম, ভালবাসা, হেরে যাওয়া, দুঃখের প্রতি, তাদের বেদনা-আনন্দের সঙ্গে সারা জীবন একীভূত হয়ে থেকেছেন রেবা— তাঁর চিত্রপট যেন সেই শৈশব থেকেই তৈরি হয়ে উঠছিল নীরবে, যে চিত্রপট আগামী দিনে ধারণ করবে এক পৃথিবীর যাত্রাপথকে এবং তার সঙ্গে অন্বিত হয়ে থাকবে ব্যক্তি ও শিল্পীর জীবন ও অস্তিত্ব।
মাত্র তেরো বছর বয়সে, ১৯৩৯ সালে বাবা-মা-ভাইবোনেদের সঙ্গে তাঁর বিদেশযাত্রা। সেই সফরের কেন্দ্রে অবশ্যই পিতা কুলদাচরণ। দেশে ডিস্ট্রিক্ট জজ ছিলেন তিনি, লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়তে যান। ইংল্যান্ডে তাঁরা ছিলেন দশ-এগারো মাস, বাকি দু’মাস ফ্রান্স, ইটালি, সুইৎজ়ারল্যান্ড ঘুরে দেখা। এই সময়েই ইংল্যান্ডে যে বাড়িতে থাকতেন তাঁরা, সেখানে এক আধা-ফরাসি আধা-ইংরেজ মহিলা সপ্তাহে দু’দিন আসতেন রেবা ও তাঁর দুই ভাইবোনকে ইংরেজি ও ফরাসি ভাষা শেখাতে। বস্তুত বিদেশের এই দিনগুলি তাঁর দৃষ্টি ও বোধকে সম্প্রসারিত করে, ঐতিহ্য ও পরম্পরায় দৃঢ় ভাবে লগ্ন থেকেও দৃশ্যপৃথিবীর ভাষার উদার মনোভাব এই পর্বেই গ্রথিত হয়ে যায় রেবার অন্তর্লোকে।
দেশে ফিরে প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন রেবা, এবং সবাইকে আশ্চর্য করে প্রথম বিভাগে পাশ করে মেয়েদের তালিকায় প্রথম দিকে জায়গা করে নেন। এর পর আশুতোষ কলেজে ভর্তি হন। এই পর্বেই বিয়াল্লিশের আন্দোলন। বাবা সরকারি কর্মচারী হলেও পরিবারে জাতীয় আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি সংবেদনশীলতা ছিল। মা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নিরাপদ আশ্রয় দিতেন ও নানা ভাবে সাহায্য করতেন। মেজকাকা ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুর ভক্ত, বাবা ছিলেন কংগ্রেসপন্থী। দেশের টালমাটাল অবস্থা বাড়ির পরিবেশকেও উত্তাল করে তুলত। কলেজের দিনগুলিতে স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তেজনা, একই সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা এবং তেতাল্লিশের মন্বন্তরের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে গড়ে উঠছিল রেবা দাশগুপ্তের স্বতন্ত্র এক চরিত্র। সেই চরিত্রই পরবর্তী সময়ে বিস্তার লাভ করবে তাঁর শিল্পী চরিত্রে। ‘ফ্যান দাও’-এর আর্তনাদ, পথে পথে মৃত্যুদৃশ্য এবং একই সঙ্গে এমন দৃশ্যের বর্ণনাও পাই তাঁর বয়ানে— “ওই সব মৃত্যুর মতোই আমার মনে কেটে বসে আছে এক জন্মের দৃশ্য। কলেজ থেকে ফিরছিলাম। রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের কোনো এক জায়গায় পথের পাশে দুই-তিন জন মেয়ে আড়াআড়ি ভাবে জীর্ণ শাড়ি ধরে পর্দার মতো আড়াল করে দাঁড়িয়েছিল। যন্ত্রণার আওয়াজ আসছিল; কাছে গিয়ে দেখি পথের উপরই জন্ম নিচ্ছে এক শিশু। আমার তখন সতেরো-আঠারো বছর বয়স।... সমস্ত সত্তা শিউরে উঠেছিল, পথের ধুলোর উপর সেই শিশুর জন্ম রাজপথে মৃত্যুর মতোই ভয়ঙ্কর মনে হয়েছিল।”
ব্যক্তির জীবন ও অস্তিত্বের বিমূর্ত প্রতিফলন ঘটত তাঁর ছবিতে।
যুদ্ধ-মন্বন্তর সঙ্গে নিয়ে এসে পড়ে ছেচল্লিশের বীভৎস দাঙ্গা। এরই মধ্যে ১৯৪২ সালে ভাল ভাবে ম্যাট্রিক পাশ করার পর ১৯৪৪ সালে আই এ এবং ১৯৪৬ সালে অর্থনীতি নিয়ে বি এ পরীক্ষায় পাশ করেন রেবা। আই এ পরীক্ষায় অষ্টম হয়েছিলেন। বি এ পরীক্ষায় ফল খুব ভাল হয়নি, যা তাঁর পক্ষে ছিল শাপে বর। কারণ ফল ভাল হলে আর্ট কলেজে না ভর্তি হয়ে এম এ পড়তে হত।
বাবার সায় ছিল না, মা পাশে ছিলেন। রেবার মনের সঙ্গে নিবিড় যোগ ছিল তাঁর দাদামশাইয়ের, ছবির আঁকার বিষয় তাঁর একটি কথা আজীবন মনে রেখেছিলেন রেবা, “দিদি, যদি কিছু করতে চাও, তার জন্য দাম দিতেই হবে।” বস্তুত, দাম অর্থে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তিনি ছবি আঁকার জন্য। আর্ট কলেজে মাস্টারমশাই হিসেবে পেয়েছিলেন অতুল বসু, বসন্ত গঙ্গোপাধ্যায়, হরেন দাস, বলাই দাসদের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের। আর্ট কলেজে শিক্ষাগ্রহণকালে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যোগাযোগ এবং ১৯৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ পান। আর এই আর্ট কলেজই তাঁর আগামী জীবনের নিয়তি রচনা করছিল। তাঁদের পরের ক্লাসে পড়তেন সোমনাথ হোর, রেবা লিখছেন, “হাত খুব ভালো বলে নাম ছিল সকলের মধ্যে... লম্বা চুল রাখত কপালের উপর। তখনকার দিনের তুলনায় খুব সাদামাটা পোশাক আর খালি পায়ে আর্টস্কুলে আসত।...” এখানেই তিনি প্রত্যক্ষ করেন সোমনাথের চা-বাগানের ডায়েরি। এখানেই এক ট্রাম ধর্মঘট উপলক্ষে রেবার কাছে ট্রাম-শ্রমিকদের জন্য কিছু সাহায্য চান সোমনাথ। আলাপের সেই শুরু, বাকিটুকু ইতিহাস। ১৯৫৪ সালে সোমনাথের সঙ্গে বিবাহ। রেবা দাশগুপ্ত হয়ে উঠলেন রেবা হোর।
পার্ক সার্কাসের ছোট্ট দু’কামরার বাসায় নতুন জীবন শুরু, সেখানেই দু’জনের মশগুল হয়ে কাজ করে চলা। আর্থিক অনটন থাকলেও তা বাধা হয়নি পথ চলায়, বরং সৃষ্টিসুখের নব নব উদ্ভাবনে মেতে থেকেছেন তাঁরা। ১৯৫৪-তেই ওঁদের যৌথ প্রদর্শনী যতীন মজুমদারের চৌরঙ্গি টেরেসে। বিয়ের আগেই, ১৯৫১ সাল থেকে রেবা ডায়োসেশন স্কুলে আর্ট টিচার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এদিকে ১৯৫৮ সালে সোমনাথ পেলেন দিল্লি পলিটেকনিক কলেজে চাকরির নিয়োগপত্র, অতঃপর দিল্লি যাত্রা, সোমনাথের সামনে তখন নতুন দিনের চ্যালেঞ্জ। আর রেবার কলকাতা ছাড়ার কোনও বাসনাই ছিল না, বরং এই স্থানান্তর তাঁর ভিতর সঞ্চারিত করল বেদনার। ১৯৫৮ সালেই ললিতকলার জাতীয় পুরস্কার পান রেবা, সেই প্রথম বাংলা থেকে কেউ এই পুরস্কার পেয়েছিলেন। এই সময়পর্ব থেকেই একটি নিভৃত সংগ্রাম যেন রচিত হচ্ছিল, রেবা দাশগুপ্তের সঙ্গে রেবা হোরের।
এরই মাঝে ১৯৫৭ সালে পার্ক সার্কাসের বাড়িতে এক দিন শ্রদ্ধেয় শিল্পী জয়নুল আবেদিন প্রাঞ্জল করে ছবির ‘স্পেস’ ও ‘মাস’ বোঝান রেবাকে, যা তাঁর দৃষ্টিপ্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করে দিয়েছিল সারা জীবনের জন্য। দিল্লিতেও গিয়েও আর্ট স্কুলের চাকরি করেন রেবা, সোমনাথ দিনমান ব্যস্ত দিল্লি পলিটেকনিক কলেজের গ্রাফিক্স ডিপার্টমেন্ট গড়ে তোলায়। এই পর্বে চিরদিন তাঁর অন্তরে প্রোথিত নিঃসঙ্গতা বোধটি আরও বিস্তার লাভ করে। এক সময় স্কুলের চাকরি ছেড়ে দেন কাজের পরিবেশ পছন্দ না হওয়ায়। অবিরাম চিত্ররচনায় নিজেকে ও জগৎকে আবিষ্কার করতে থাকেন রেবা হোর— “...মাঝে মাঝেই সোমনাথকে বলতাম, চলো চলে যাই; ফিরে যাই কলকাতায়। সে অবশ্য আমল দিত না। তার তখন আমার ঘ্যানঘ্যান শুনবার সময়ও নেই।... তখন নিজেকে কষিয়ে ঝাঁকিয়ে নিতে হল। ছবি তো আঁকতে হবে। কারণ সেটার তাগিদ আমার শরীরে মনে। সুতরাং তার জন্য যা দরকার তা করতে হবে। আর তা করতে হবে নিজেকেই।”
দিল্লিতেই ১৯৬৪ সালে কন্যা চন্দনার জন্ম। আবারও এক নতুন পৃথিবীর মুখোমুখি, জীবনে নতুন আনন্দের উদ্ভাস। কিন্তু ওই যে বলেছিলেন, “করতে হবে নিজেকেই”— এই প্রতিজ্ঞা থেকে কখনও সরে আসেননি। আজীবন রেবা দাশগুপ্ত রেবা হোরের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। যাঁর পাশে সোমনাথ হোরের মতো শিল্পী-ব্যক্তিত্ব, সেই পরিসর থেকে নিজের অস্তিত্বকে দাপটের সঙ্গে প্রকাশ করে চলা ছিল অত্যন্ত দুরূহ। ফলে এক আশ্চর্য আড়াল তুলে নিয়েছিলেন তিনি, সাধনা হয়ে উঠেছিল তাঁর সেই আড়াল রচনার অস্ত্র। ১৯৯২ সালে যোগেন চৌধুরীকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে সোমনাথ হোর বলেন, “...সেই আমাদের বিয়ের পর থেকে আমরা দু’জন মিলে সবসময় চেষ্টা করেছি কীভাবে আমাদের সমস্ত শক্তি ছবি আঁকার দিকে নিয়োজিত করতে পারি।... আপনি হয়তো শুনে অবাক হবেন যে, আমাদের যে সঞ্চয়, তার মধ্যে এখনো পর্যন্ত এক গ্রাম সোনা আমাদের বাড়িতে পাবেন না। কারণ, রেবা কখনো সেটা চাননি এবং এই ধরনের জিনিস রাখা অপছন্দ করেছেন। রেবা সংসারের সমস্ত দায়িত্ব পালন করেন, কারণ, আমাদের কাজের লোকের ব্যাপারে আমরা সবসময়ই আংশিক সময়ের কর্মী নিয়োগ করেছি। সর্বসময় করার মতো ব্যবস্থা আমাদের ছিল না। তার মধ্যেও প্রায় প্রতিদিন ছবি আঁকার চর্চা চালিয়ে গেছেন এবং এখনো যাচ্ছেন। এমনকী, চন্দনা যখন হল— স্বভাবতই তার আগে-পরে কিছু দিন তো ওর দিকে নজর দিতে হয়েছে। কিন্তু তার মধ্যেও ছবি আঁকাটা, সত্যি বলতে কী, বন্ধ করেননি।” আর, কন্যা চন্দনা হোর তাঁর ‘জীবনবন্ধনে’ গ্রন্থে লেখেন, “মায়ের প্রতিদিনের জীবনে প্রচুর মানুষ ছিল। শুধু মানুষই নয়, খোঁড়া কুকুর, চড়াই পাখি, ঘুঘু, নিজের একাকিত্ব, দিদিমার পুরোনো জামা, এরা সব মা-কে ছেয়ে থাকত। আসলে, মা ছিল নিজের আত্মা দিয়ে প্রকৃতিকে আঁকড়ে থাকা মানুষ।” এভাবেই চিত্রযাপনের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে ২০০৯ সালে তিনি মরপৃথিবী থেকে ছুটি নেন। রয়ে যায় এক নিরাসক্ত এবং সংগ্রামী শিল্পীর নিজস্ব সঞ্চয়।
আত্মজীবন ও পৃথিবীর সঙ্গে এক অভাবনীয় সেতু রচনা করে নিয়েছিলেন তিনি। যত বেদনা, যত নিঃসঙ্গতা, ততই রঙের আগুন নিয়ে জ্বলে উঠেছে তাঁর দৃশ্যপট। তাঁর ছবি ‘চরৈবেতি’ মন্ত্রে প্রাণিত, সকল অসহায়তা, দুঃখ, আনন্দ নিয়ে এক দল মানুষ যাত্রা করছে, কোথাও চলেছে তারা, এই চলাই ধর্ম। আমাদের চিত্রপৃথিবীতে রেবা হোর তাঁর জীবনপাত করে রচনা করে গেছেন এক মহাকাব্য। সংস্কৃতির ইতিহাসে যেমন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে এই দুই সাধক সহযোদ্ধার একত্র নির্মল দাম্পত্য-সহাবস্থান, তেমনই ইতিহাস অবিলম্বে এই নির্ণয়ও প্রদান করবে, আধুনিক চিত্রকলায় কী ভাবে রেবা হয়ে ওঠেন একক এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ অস্তিত্ব। সৃজনশীলতার পটভূমিতে তাঁর একমাত্র নিকটজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি ছবির মাধ্যমে স্থিতাবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিকতাকে রেখায় রঙে আকারে মূর্ততায় বিমূর্ততায় অভিব্যক্তি ও নিসর্গলোক রচনার মধ্য দিয়ে ভাঙতে ভাঙতে চলেছিলেন। রেবা হোর সেই ভাবেই ভাঙতে থাকেন স্থিতাবস্থা ও যাবতীয় প্রাতিষ্ঠানিকতাকে। ছোটবেলার মতোই খাঁচা খুলে রেবা হোর উড়িয়ে দেন পাখি, জীবনের শেষ লগ্ন অবধি-— তাঁর এই মুক্তি আলোয় আলোয়, আকাশে আকাশে।
তথ্যঋণ: ‘আমার কথা—কিছু মিছু’: রেবা হোর, ‘জীবনবন্ধনে’: চন্দনা হোর। ‘যোগেন চৌধুরী রচনাসমগ্র (দ্বিতীয় খণ্ড)’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)