E-Paper

এখনও অশান্ত যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত গিরিপথ

অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াং এবং চিনের সোনা প্রদেশের সীমান্তে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম দুর্গম গিরিপথ বুমলা। এখানকার মন্দির, সেতু, অরণ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পরতে পরতে মিলেমিশে আছে আকর্ষক কিংবদন্তি। সীমান্ত রক্ষার জন্য রয়েছেন অতন্দ্র সেনা জওয়ানরাও।

বিতস্তা ঘোষাল

শেষ আপডেট: ১৭ মে ২০২৬ ০৮:৪৯
দুর্গম: বুমলা-র সর্বোচ্চ সীমান্তে ভারতের পতাকা। ডান দিকে, তাওয়াং মঠের বুদ্ধমূর্তি। ছবি: লেখক

দুর্গম: বুমলা-র সর্বোচ্চ সীমান্তে ভারতের পতাকা। ডান দিকে, তাওয়াং মঠের বুদ্ধমূর্তি। ছবি: লেখক

উত্তর পূর্বাঞ্চলের অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যটি নিয়ে কম আলোচনা হয়— ভ্রমণপিপাসু মানুষও বহু দিন পর্যন্ত জায়গাটি সম্পর্কে আগ্রহ দেখাননি। ভারত-চিন যুদ্ধের পর অরুণাচল প্রদেশ প্রচারের আলোয় আসে ‘কোয়লা’ সিনেমার মাধ্যমে। শাহরুখ খান-মাধুরী দীক্ষিতকে ছাপিয়ে এর নৈসর্গিক সৌন্দর্য দর্শককে মুগ্ধ করে। তবু যাতায়াত ব্যবস্থার অসুবিধেই হয়তো সে ভাবে মানুষকে আকৃষ্ট করেনি। কিন্তু গত কয়েক বছরে ইতিহাস, রাস্তা, হোটেল এবং সৌন্দর্য সব মিলেমিশে মানুষকে আগ্রহী করেছে এই অঞ্চল।

গুয়াহাটি থেকে তেজপুর হয়ে অরুণাচল প্রদেশের প্রবেশদ্বার ভালুকপং। প্রবেশের মুখে রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়ার মতো লোহার গার্ডরেল। বাঁ দিকে বড় হোর্ডিংয়ে লেখা, ‘বেঙ্গল ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রেগুলেশনের সেকশন তিন ধারা অনুযায়ী এই রাজ্যে প্রবেশ করার আগে ইনার লাইন পারমিট দেখাতে হবে।’ অন্য কোনও প্রদেশে না লাগলেও এখানে কেন লাগবে, তার উত্তরে প্রবেশরক্ষী জানালেন, এখানকার জনজাতি সংস্কৃতি, পরিবেশ যেন অন্য রাজ্যের বাসিন্দারা এসে নষ্ট করে দিতে না পারে, তাই।

উদিত সূর্যের দেশ অরুণাচল প্রদেশ। ভারতে প্রথম সূর্যকিরণ ভোর সাড়ে চারটেয় এসে পড়ে অতীতের উদয়গিরি, উদয়াচলে। মহাভারত তথা পৌরাণিক নানা আখ্যানে চিত্রিত এই অঞ্চলের এক দিকে তুষারশুভ্র হিমালয়, অপর দিকে আদিম অরণ্যে আচ্ছাদিত পাহাড়ি উপত্যকা। বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও অরণ্যচারী উপজাতির বাস। ‘প্যারাডাইস অব অর্কিড’ও বলা হয় একে। চিন, মায়ানমার, ভুটান সীমান্ত রাজ্যটির গা ঘেঁষে। চিনের আগ্রাসন নীতি নিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানরা হুঙ্কার না ছাড়লেও, এখানকার সীমান্ত যে প্রায়ই অশান্ত, তা নানা ভাবে জানা গেল।

“এখানে দোকান তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে যায়?” জিজ্ঞেস করামাত্র ফুটবল খেলা থামিয়ে বাচ্চার দল মনপা আর হিন্দি মিশিয়ে বলে উঠল, “সন্ধে হলেই যুদ্ধ শুরু।”

মনে পড়ল, ১৯৪২ সালে জাপানিদের বোমা ফেলার গল্প, সন্ধে নামলেই সব অন্ধকার, দোকান-বাজার বন্ধ। জাপানি যুদ্ধবিমান থেকে বোমা পড়ছে। আর তখন ব্রিটিশ-অধ্যুষিত ভারতের বন্ধু চিন।

অঝোর বৃষ্টিতেই ভালুকপং থেকে বাসে দিরাং। পথে টিপ্পি অর্কিড রিসার্চ সেন্টার। পশ্চিমবঙ্গ থেকে ২২৫টি প্রজাতির অর্কিডও এই বাগানে স্থান পেয়েছে। পিছনেই বইছে খরস্রোতা কামেং নদী। এর পর আছে এক ঝুলন্ত সেতু। কে এই সেতু তৈরি করেছেন, জানতে চাইলে চা-মোমো বিক্রেতা বললেন, সেতুটি ভীমের তৈরি। আগে ছিল দড়ির, এখন কাঠের। দশ জনের বেশি মানুষের সেতুতে ওঠা বারণ। ছিঁড়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবল। নীচে বইছে দুরন্ত নদী টেঙ্গা।

এখান থেকেই রাস্তার দু’পাশে, নীচে সারি সারি আর্মি কোয়ার্টার। বিভিন্ন ফলকে লেখা কোন যুদ্ধে এখানকার কোন রেজিমেন্টের সেনার মৃত্যু হয়েছে। সে সব মন ভার করলেও পথে সুন্দরী ঝর্নার ডাকে খানিক সাড়া দিয়ে নাগরাজ মন্দির। সালটা ১৯৬০। জনশ্রুতি, তখনও এখানে এখনকার মতো রাস্তা তৈরি হয়নি। ঘন জঙ্গল। সেখানে দু’টি নাগ-নাগিনী বাস করত। একটি কোনও ভাবে মারা গেলে অপরটি এই জঙ্গলে কাঠ কাটতে আসা মানুষকে ছোবল দিচ্ছিল ক্রমাগত। কোনও ভাবে সাপটাকে কেউ দেখতে পাচ্ছিল না, কাজেই ধরতে বা মারতেও পারছিল না। তখন গ্রামবাসীরা ঠিক করল নাগদেবতা দেবাদিদেব মহেশ্বরের মন্দির যদি নির্মাণ করা যায়, তবে হয়তো এই উপদ্রব শান্ত হবে। খুব প্রতিকূল পরিবেশে মৃত্যুর দংশন এড়িয়ে তাঁরা এই নাগরাজ মন্দির তৈরি করেছিলেন ১৯৭৩ সালে। সেই মন্দির ছোট ছিল। এখন আকারে অনেকটাই বড়। পাশেই একটি হোর্ডিংয়ে লেখা অরুণাচলের সবচেয়ে বড় শিবমন্দির এটাই।

অসাধারণ নৈসর্গিক দৃশ্য। মেঘে ঢাকা নদী আকাশ পাহাড় দেখতে দেখতে পৌঁছালাম দিরাং বা ডিরাং। পশ্চিম কামেং জেলার ডিরাং নদীর তীরে অবস্থিত এই স্থান প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই বিখ্যাত। এখানকার প্রধান বাসিন্দা মনপা উপজাতি। কিংবদন্তি অনুসারে, মনপা শব্দ ‘ডি-রাং-সা’ থেকে এর নাম এসেছে, যার অর্থ এমন একটি জায়গা যেখানে মানুষ শপথ গ্রহণ করতেন বা যেখানে কুকুরের ডাক শোনা যায়। তিব্বত ও ভুটানের মনপা গোষ্ঠীরই অংশ এঁরা। এঁদের উত্তর-পূর্ব ভারতের একমাত্র যাযাবর জনজাতি বলে মনে করা হয়, এঁরা মূলত তিব্বতি মহাযান বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। কৃষিকাজ ও পশুপালনই এঁদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান পথ। বর্তমানে বাঁশ ও কাঠের হস্তশিল্পও অনেকটা উন্নত। এদের ‘আচে লামো’ নৃত্য বিশ্ববিখ্যাত।

শহরের গা বেয়ে ডিরাং নদীকে পাশে রেখে সাংতি উপত্যকা ও দলাই লামার আশীর্বাদধন্য বৌদ্ধ মঠ ‘থুপসুং ধার গে’ দেখার পর গন্তব্য মুন্না ক্যাম্প, সাপের হয়ে ১১,২৪৬ ফিট উচ্চতায় সেলা। এখানে সবটাই সেনা-নিয়ন্ত্রিত। চা-পানের সময় এক ফৌজির মুখে শোনা গেল যুদ্ধের দিনগুলোর কথা। তিনি বলছিলেন, “ভারতীয় রেজিমেন্টকে প্রাথমিক ভাবে নিষ্ক্রিয় থাকতে বলা হয়েছিল এখানে। আমাদের হাতে তখন ‘পিএলএ’র সঙ্গে লড়ার উপযুক্ত কোনও অস্ত্র ছিল না। চিনারা ভিতরে ঢুকে বমডিলা আর সেলা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল, যাতে তাওয়াং থেকে সেনারা সাহায্য করতে আসতে না পারে। এই অবস্থায় যশওয়ন্ত সিংহ রাওয়াত নামে এক সিপাই স্থানীয় অধিবাসীদের নিয়ে এক অসম লড়াইয়ে নামেন। দুই স্থানীয় মনপা নারী সেলা আর নুরা তাঁকে সব রকম ভাবে সাহায্য করেছিলেন। তাঁদের সহায়তায় একাই ৭২ ঘণ্টা চিনা বাহিনীকে আটকে রেখেছিলেন তিনি। এক স্থানীয় অধিবাসী চিনাদের জানিয়ে দেয়, আসলে এক জন সেনাই এখানে লড়ছেন। আর কেউ নেই। তার বিশ্বাসঘাতকতায় চিনারা জানতে পারে যশওয়ন্ত কোথা থেকে বন্দুক ছুড়ছেন। তারা দ্রুত সেখানে পৌঁছলে তিনি শহিদ হন। তাঁকে যে-সব গ্রামবাসী সাহায্য করেছিলেন, তাঁদের উপর অমানুষিক অত্যাচার নেমে আসে। সেলাকে মেরে ফেলা হয়, আর নুরাকে…” তাঁর অনুক্ত শব্দ বুঝিয়ে দেয় মেয়েগুলোর পরিণতি।

অরুণাচল আবার ভারতের হাতে ফিরে এলে এখানে তাঁদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলা হয়েছে। সেলা— এই ‘লা’-র তিব্বতি অর্থ গিরিপথ। স্থানীয়দের মতে এই টানেল এবং পথের নাম সেলার নামে, আর সেলা লেকের পাশে ঝর্না, নুরানাং জলপ্রপাতের নাম নুরা-র নামে। কথিত আছে এখানে রয়েছে ১০১টি সরোবর, যা এখন বরফ-আচ্ছাদিত।

এর পর নুরাং, যশওয়ন্ত গড়, জং হয়ে তাওয়াং। এখান থেকেই যেতে হবে বুমলা। ‘তাওয়াং’ অর্থ ঘোড়া দ্বারা নির্বাচিত জায়গা। তিব্বতি ভাষায় ‘তা’ মানে ঘোড়া আর ‘ওয়াং’ মানে নির্বাচিত। সপ্তম শতকে বৌদ্ধ ধর্মগুরু মেরা লামা লোড্রে গায়াৎসো শান্তির বার্তা নিয়ে এখানে এসে গড়ে তুলেছিলেন তাঁর ঘোড়ার দ্বারা নির্বাচিত এই স্থান, যা আজকের তাওয়াং নগরী। ষষ্ঠ দলাই লামার জন্ম এখানেই। ১৯৫৯ সালে চতুর্দশ দলাই লামা লাসা থেকে এখানকার খেঞ্জিমান হয়েই ভারতে প্রবেশ করেছিলেন খাম্পা যোদ্ধার ছদ্মবেশে।

ইতিহাস বলছে, এই অঞ্চল ছিল তিব্বতের অংশ। ১৯১৪ সালে সিমলা অধিবেশনে তিব্বত আর ব্রিটিশ অধিকৃত ভারতের মধ্যে এক চুক্তি অনুযায়ী ম্যাকমোহন লাইন অনুসারে এই অংশ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়। ব্রিটিশরা তিব্বতকে ম্যাকমোহন লাইন মেনে চলার নির্দেশ দিলে, তিব্বত তা মানতে অস্বীকার করে, কারণ এখানেই তাদের পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম উপাসনা কেন্দ্র। চিন এই বিষয়ে তিব্বতকে সমর্থন জানায়।

“এই থেকেই যে বিরোধের সূচনা, তারই ফলশ্রুতি ইন্দো-চিন যুদ্ধ, তত দিনে তিব্বত তার সার্বভৌমত্ব হারিয়েছে চিনের হাতে। এবং তাওয়াং-সহ অরুণাচল তাদের— এই দাবিতে চিন অটল। এই যুদ্ধ ক্রমশ একতরফা হয়ে দাঁড়াল। কারণ এক দিকে সেনাদের হাতে যুদ্ধ করার মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রী নেই, অন্য দিকে সেই সময়ের রাষ্ট্রনায়কদের ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল দিতে হল সেনাদের। ভারত অপেক্ষা করছিল রাশিয়া থেকে অস্ত্র আসার, আর চিন সেই সুযোগটা নিয়ে একের পর এক অঞ্চল দখল করে নিল...” তাওয়াং থেকে ৩৭ কিলোমিটার এবং চিনের সোনা জং থেকে ৪৩ কিমি দূরে ১৫,২০০ ফিট উঁচুতে বুমলায় দাঁড়িয়ে গ্যারিসন কম্যান্ডার শোনাচ্ছিলেন সেই দিনগুলোর কথা। ব্রিগেডিয়ার জে পি ডালভির ‘হিমালয়ান ব্লান্ডার’ বা মৃণাল তালুকদারের ‘১৯৬২’ বইয়ের কথাও উল্লেখ করলেন এই বিষয়ে বিশদে জানার জন্য।

ঠান্ডায় বরফের পুরু আস্তরণে মোড়া পূর্ব হিমালয়ের কোলে এই দুর্গম গিরিপথ ভারতীয় পর্যটকদের জন্য কিছু সময় খোলা থাকে। কড়া নজরদারি ও আর্মি থেকে অনুমতিপত্র নেওয়ার পর আর্মি-স্বীকৃত এসইউভি গাড়িতে এখানে যেতে হয়। ভারত-চিন দুই দেশের ‘বর্ডার পার্সোনেল মিটিং পয়েন্ট’ এখানে। ১৯৬২-র পর ২০০৬ সালে এই সীমান্ত দুই দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য সাময়িক ভাবে খোলা হয়েছিল, যদিও তা এখন বন্ধ।

অক্সিজেনের অভাব, তুষারঝড়ে নাক ঠোঁট গাল ফেটে চৌচির, তবু কর্তব্যে অচল শিখ রেজিমেন্টের সেনা জওয়ানরা। তাঁরা যখন ভারতের পতাকাকে স্যালুট জানিয়ে ওই উচ্চতায় যাবতীয় সিকিয়োরিটি চেক, মোবাইল ক্যামেরা জমা করে বরফের মধ্যে দিয়ে হেঁটে পৌঁছনো গুটিকয়েক দেশবাসীর উদ্দেশে বলে ওঠেন, “এই দেশ, এই মাটি আমাদের। শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে মাতৃভূমিকে রক্ষা করব আমরা। জোরগলায় সর্বশক্তি দিয়ে এমন ভাবে বলুন— ‘ভারতমাতা কি জয়, জয় হিন্দ’, যাতে আমাদের শত্রুদের কানে এই আওয়াজ পৌঁছে যায়, তারা বুঝতে পারে আমরা কাউকে ভয় পাই না, দেশের স্বার্থে আমরা প্রাণ দিতে পারি, নিতেও পারি…” তখন প্রতিটি মানুষের কণ্ঠে তীব্রভাবে ধ্বনিত হয় ‘বন্দে মাতরম্‌!’ ‘জয় হিন্দ!’ জাতি, ধর্ম, ভাষা ভুলে সেই মুহূর্তে আমরা ভারতবাসী— এই আবেগ যেন আকাশ ছোঁয়।

ভূমিকম্পে পাথর, নুড়ি এবং গাছপালা ধসে সৃষ্ট, বরফাবৃত সাঙ্গেতসার সো বা মাধুরী হ্রদ-সহ একাধিক লেক দেখতে না পাওয়ার দুঃখ তখন আর অতটা বড় মনে হয় না। অন্য রকম এক তৃপ্তিতে মন পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Arunachal Prsdesh Sino-Indian War

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy