Advertisement
২৯ জানুয়ারি ২০২৩
blind cricket

আঁধারের বাউন্সার থেকে আলোর ওভার বাউন্ডারি

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে একটি কারখানায় দু’জন দৃষ্টিহীন শ্রমিক টিনের ক্যানে পাথর ভরে শ্রবণ আর অনুমানের সংমিশ্রণে এক মজার খেলায় মেতে ওঠেন।

বিজয়ী: ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে পাকিস্তানকে হারিয়ে বিশ্বজয়ী ভারতীয় দল। ডান দিকে, ভারতীয় দলের অন্যতম ভরসা শুভেন্দু মাহাত

বিজয়ী: ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে পাকিস্তানকে হারিয়ে বিশ্বজয়ী ভারতীয় দল। ডান দিকে, ভারতীয় দলের অন্যতম ভরসা শুভেন্দু মাহাত

নিজস্ব প্রতিবেদন
কলকাতা শেষ আপডেট: ০৪ ডিসেম্বর ২০২২ ১০:২৯
Share: Save:

যদি প্রশ্ন করা হয়, পঞ্চাশ রান করলেই ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরি পাবেন কোন ক্রিকেটে? কোথায় ব্যাটসম্যান এক রান করলেই যোগ হবে দু’রান? কোথায় ফিল্ডিং-এও ওয়ান ড্রপ ক্যাচে তারা ফেরাতে পারেন বিপক্ষের ব্যাটসম্যানকে? এমন প্রশ্নে থমকে যেতেই হয়, যদি না খেলাটার সঙ্গে জানাশোনা থাকে। এগারো জনের একটি দলে অন্তত চার জন এই সুবিধে পেয়ে থাকেন। এমনিতেই ক্রিকেট খেলায় নানা নিয়মকানুন, তার উপর একই ম্যাচে ক্রিকেটারদের মধ্যে প্রাপ্তির এই প্রভেদ আরও কঠিন করে তুলেছে এই বিশেষ ক্রিকেটকে। খেলার মধ্যেও হাজার বিস্ময়। যে ক্রিকেটার বলের রং জানেন না, স্পর্শে উইকেটের পরিমাপ করেন, হাঁক দিয়ে ফিল্ডারদের অবস্থান জানেন, সারা মাঠ যাঁর কাছে শুধুই অন্ধকার, তিনি শুধু বলের বিয়ারিং-এর শব্দ শুনে বাউন্ডারি ওভারবাউন্ডারি মারছেন, এমন আশ্চর্য শুধু দৃষ্টিহীনদের ক্রিকেটেই সম্ভব।

Advertisement

আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে, ১৯২২ সালের এমনই এক শীতের সকালে এই বিস্ময়-ক্রিকেটের উদ্ভাবন। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে একটি কারখানায় দু’জন দৃষ্টিহীন শ্রমিক টিনের ক্যানে পাথর ভরে শ্রবণ আর অনুমানের সংমিশ্রণে এক মজার খেলায় মেতে ওঠেন। একে একে জড়ো হন অন্য শ্রমিকরাও। কারখানায় লাঞ্চের সময় তাঁরা এই অভিনব ক্রিকেট খেলায় মেতে উঠতেন। খেলাটা ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে স্থানীয় ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন রাজ্যের দৃষ্টিহীনদের মধ্যেও। তৈরি হতে শুরু করে নিয়মকানুন, দ্রুত পৌঁছে যায় প্রতিযোগিতার স্তরে। ১৯২৮ সালে সিডনিতে প্রথম আন্তঃরাজ্য ব্লাইন্ড ক্রিকেট প্রতিযোগিতা হয় নিউ সাউথ ওয়েলস (এনএসডব্লিউ) ও ভিক্টোরিয়ার মধ্যে। এই বছরই এনএসডব্লিউ ক্রিকেট সফরে আসে মেলবোর্নে। ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠা পায় ‘দি অস্ট্রেলিয়ান ব্লাইন্ড ক্রিকেট কাউন্সিল’। তাদেরই তত্ত্বাবধানে শুরু হয় ব্লাইন্ড ক্রিকেট কার্নিভাল।

নিয়মকানুন

Advertisement

ক্রিকেটারদের প্রতি দলকে তিনটি ক্যাটেগরিতে ভাগ করা হয়েছে। বি-১ ক্যাটেগরিতে থাকেন একশো শতাংশ দৃষ্টিহীন। বি-২ ক্যাটেগরিতে ৭৫ থেকে ৯৯ শতাংশ দৃষ্টিহীন, তাঁদের দৃষ্টিশক্তির দূরত্ব ২ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত। ৪০ থেকে ৭৪ শতাংশ দৃষ্টিহীন, যাঁরা ৩ থেকে ৬ মিটার পর্যন্ত দেখতে পান, তারা থাকেন বি-৩ ক্যাটাগরিতে। বি-১ ব্যাটসম্যানদের খেলতে হয় কালো গ্লাসের চশমা পরে। তাঁদের রানার নিয়ে খেলা বাধ্যতামূলক। বি-২ ব্যাটসম্যানদের রানার নেওয়ার সিদ্ধান্তটা তাঁদের নিজেদের, তবে এক বার রানার নিলে তাঁকে সারা ম্যাচে খেলাতে হবে। দ্বিগুণ রান এবং ড্রপ ক্যাচের সুবিধেটা পান কেবল বি-১ ক্রিকেটাররাই। একটি দলে কমপক্ষে চার জন বি-১ ক্রিকেটারকে খেলাতেই হবে। যে দলে বি-১ ক্রিকেটার যত ভাল, সেই দল তত শক্তিশালী। বি-২ তিন জন এবং বি-৩ ক্যাটেগরির সর্বোচ্চ চার জন ক্রিকেটার রাখা যায় একটি দলে। উইকেটরক্ষক থাকেন সাধারণত বি-৩ ক্যাটেগরির ক্রিকেটার। তিনিই ফিল্ডারদের নির্দেশ দেন উইকেটের পিছন থেকে। ব্যাটসম্যানের আহ্বানে বিপক্ষের ফিল্ডাররা হাততালি দিয়ে অথবা মুখে আওয়াজ করে নিজেদের অবস্থান জানান দেন। বোলার তাঁর প্রতিটি বল করার সময় ব্যাটসম্যানের কাছে জানতে চান তিনি প্রস্তুত কি না। সম্মতি পেলে ‘প্লে’ বলে আন্ডার আর্ম বল করেন। বোলারকে ক্রিজ়ে অন্তত দু’বার বল ড্রপ দিতে হয় যাতে ব্যাটসম্যান বলের শব্দ শুনে খেলতে পারেন। গড়ানে বলে নো ডাকা হয়। একটি দলকে তাদের মোট ওভারের অন্তত ৪০ শতাংশ বল বি-১ ক্রিকেটারদের দিয়ে করাতেই হবে। অর্থাৎ ২০ ওভারের খেলায় বি-১ ক্রিকেটারদের কমপক্ষে করতে হবে ৮ ওভার বল। ব্যাটসম্যান বার বার উইকেট স্পর্শ করে নিজের অবস্থান ঠিক করে নিতে পারেন।

বল ও উইকেট

শব্দ হয় এমন বলই ব্লাইন্ড ক্রিকেটের জন্মদাতা। প্রথমে টিনের ক্যানে পাথর ভরে যে খেলার সূচনা হয়েছিল, ১৯৭২-এ সেখানে আসে লাল নাইলন বল। ১৯৭৪-এ লালের পরিবর্তে করা হয় কালো।

নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এখন নিউজ়িল্যান্ডে খেলা হয় সাদা নাইলন বলে। বর্তমানে বলের রং অপরিবর্তিত থাকলেও নাইলনের বদলে এসেছে শক্ত প্লাস্টিকের বল, আকারে সাধারণ ডিউস বলের চেয়ে খানিকটা বড়। বলের ভেতরে রাখা থাকে ১৬টি বিয়ারিং। বলের মধ্যে রাখা এই বিয়ারিং-এর শব্দই ‘ব্লাইন্ড ক্রিকেট’-এর নিয়ন্ত্রক। ডিউস বলের মতো এই বল অতটা বাউন্স করে না।

এই খেলায় উইকেট কাঠের নয়। মেটালের উইকেটের উপর বেল ফিক্সড থাকে।

বিভিন্ন দেশে ব্লাইন্ড ক্রিকেট

নিছক খেলার ছলে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের দুই দৃষ্টিহীন শ্রমিক শতবর্ষ আগে যে ক্রিকেটের জন্ম দিয়েছিলেন, আজ আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে সে স্বমহিমায় জ্বলজ্বল করছে। ১৯২২-এর মাত্র ছ’বছরের মধ্যে, ১৯২৮ সালে এই মেলবোর্নেই প্রতিষ্ঠা পায় ‘ভিক্টোরিয়া ব্লাইন্ড ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন’। তৈরি হয় দৃষ্টিহীন ক্রিকেটারদের জন্য প্রথম ক্লাবহাউস-যুক্ত ক্রিকেট মাঠ। অস্ট্রেলিয়া থেকে খেলাটা ছড়িয়ে পড়তে থাকে বিশ্বের নানা দেশে।

দৃষ্টিহীন জীবনকে স্বাবলম্বী করতে, আত্মবিশ্বাস বাড়াতে, দক্ষতা ও প্রতিভার বার্তা সমাজের কাছে পৌঁছে দিতে চ্যালেঞ্জিং এই খেলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে এগিয়ে আসেন দৃষ্টিমানরাও। ১৯৯৬ সালে ভারতে প্রতিষ্ঠা পায় ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ক্রিকেট ফর দ্য ব্লাইন্ড ইন্ডিয়া’ (এসিবিআই)। তাদেরই উদ্যোগে সারা বিশ্বে ব্লাইন্ড ক্রিকেটের বিস্তার লাভের উদ্দেশ্যে সে বছরই সেপ্টেম্বরে নতুন দিল্লিতে গড়ে ওঠে ‘ওয়র্ল্ড ব্লাইন্ড ক্রিকেট কাউন্সিল’ (ডব্লিউবিসিসি), যার বর্তমান সদস্য দশটি দেশ। ২০১১ সালে এসিবিআই-এর নাম বদলে রাখা হয় ‘ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য ব্লাইন্ড ইন ইন্ডিয়া’ (সিএবিআই)। সারা দেশে দৃষ্টিহীন ক্রিকেটের আয়োজন ও প্রসারের দায়িত্বে থাকা সিএবিআই প্রতিষ্ঠার এক বছরের মধ্যে ২০১২ সালেই টি-টোয়েন্টি ব্লাইন্ড ক্রিকেটের বিশ্বকাপ আয়োজন করতে সমর্থ হয়।

এই ক্রিকেটের বিশ্বকাপ

দুরূহ এই ক্রিকেট প্রথমে অগ্রসর হতে কিছুটা সময় নিলেও অনেক দিন ধরেই তার আন্তর্জাতিক স্তরে বিচরণ। ১৯৯৮ সাল থেকে ইতিমধ্যেই পাঁচটা বিশ্বকাপ সংগঠিত হয়েছে। প্রথম দু’বারের আয়োজক (এসিবিআই)। আয়োজক হিসেবে দক্ষতা দেখাতে পারলেও খেলায় দু’বারই প্রথম দু’টি স্থানে থাকতে ব্যর্থ ভারত। দক্ষিণ আফ্রিকা চ্যাম্পিয়ন ও পাকিস্তান রানার্স হয় ১৯৯৮-তে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত কণিষ্ক বিশ্বকাপে; পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ন ও দক্ষিণ আফ্রিকা রানার্স হয় ২০০২-এ চেন্নাই বিশ্বকাপে। ২০০৬ সালেও ইসলামাবাদে আয়োজিত আয়োজক পাকিস্তানের কাছে ফাইনালে হেরে চ্যাম্পিয়নশিপ অধরা থাকে ভারতের। তবে এই পরাজয়ের মধুর প্রতিশোধ ভারত নিতে পারে ২০১৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায়। কেপটাউনে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্বকাপে ভারত হারাতে সমর্থ হয় আগের দু’বারের চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তানকে। জয় ও প্রতিশোধের ধারা অক্ষুণ্ণ রেখে ভারত শারজাতে ২০১৮ বিশ্বকাপেও চ্যাম্পিয়ন হয় পাকিস্তানকে হারিয়ে।

২০০০ সালে প্রথম ব্লাইন্ড টেস্ট ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান। ৯৪ রানে হারিয়ে দেয় দক্ষিণ আফ্রিকাকে।

টি-২০ বিশ্বকাপে ভারত

বিশ্বকাপের মতো টি-২০ বিশ্বকাপের আয়োজনেও ভারতের আধিপত্য। ২০১২ ও ২০১৭, প্রথম দু’টি টি-২০ বিশ্বকাপের মতো এ বারের তৃতীয় টি-২০ বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে হ্যাটট্রিক করতে চলেছে ভারত। এখন দেখার, ফাইনালে আগের দু’বার পাকিস্তানকে হারানোর ধারা বজায় রেখে এ বার আয়োজনের মতো চ্যাম্পিয়নশিপেরও হ্যাটট্রিকের অধিকারী তারা হতে পারে কি না। ভারতীয় দলের অন্যতম প্রাক্তন ক্রিকেটার যুবরাজ সিংহ হয়েছেন প্রতিযোগিতার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর। জুলাই মাসে বেঙ্গালুরুতে দু’মাসের শিবির থেকে দেশের ৫৬ জন ক্রিকেটারের মধ্য থেকে প্রথমে ২৯ জনকে বাছাই করা হয়। তাদের নিয়ে ভূপালে ১২ দিনের শিবির হয়। সেখান থেকেই সিএবিআই এ বারের টি-২০ বিশ্বকাপের জন্য চূড়ান্ত ১৭ জনের ভারতীয় দল ঘোষণা করেছে। গত বারের মতো এ বারও অন্ধ্রপ্রদেশের অজয়কুমার রেড্ডি অধিনায়ক। গত বারের টি-২০ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ ন’টি উইকেট প্রাপক অজয় ফোনে জানালেন, আগামী ৬-১৭ ডিসেম্বর দেশের নানা শহরে অনুষ্ঠেয় ২৪টি ম্যাচে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বিশ্বের আটটি দেশ। দু’বারের চ্যাম্পিয়ন ভারত-সহ খেলছে পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজ়িল্যান্ড, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং বাংলাদেশ। ইংল্যান্ড এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ এ বারের প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে না। ফরিদাবাদে ৬ ডিসেম্বর ভারত-নেপাল ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে এ বারের টি-২০ ব্লাইন্ড ক্রিকেটের বিশ্বকাপের আসর।

অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে চার জন, কর্নাটক থেকে তিন জন, হরিয়ানা ও দিল্লি থেকে দু’জন করে এবং রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ, পুদুচেরি এবং বাংলা থেকে এক জন করে খেলোয়াড় দলে নেওয়া হয়েছে। বাংলার একমাত্র প্রতিনিধি, ঝাড়গ্রামের শালবনির সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন শুভেন্দু মাহাত বিশ্বকাপের আসরে প্রথম সুযোগ পেয়ে আনন্দে আপ্লুত। পলিটিক্যাল সায়েন্সে স্নাতক, বি এড-এর ছাত্র শুভেন্দু পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই সাইকেল দুর্ঘটনায় দু’টি চোখ হারান। ছাত্রাবস্থাতেই হারিয়েছেন বাবাকে, মা অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী। জঙ্গলমহলের অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের শুভেন্দু মাধ্যমিকের ছাত্র থাকার সময়ই বাংলা দলে সুযোগ পান। টেলিফোনে বললেন, “তখন থেকেই স্বপ্ন দেখেছি ভারতীয় দলে খেলার। এখন স্বপ্ন দেখা শুরু দেশের হয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার।”

প্রতিযোগিতার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর যুবরাজ সিংহ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেছেন, “ব্লাইন্ড ক্রিকেটের টি-২০ বিশ্বকাপের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে আমি গর্বিত। দৃষ্টিহীনদের দৈনন্দিন সংগ্রাম থেকে পাওয়া শক্তি তাঁদের ক্রিকেট খেলার চ্যালেঞ্জ নিতে সাহায্য করেছে। দৃষ্টিহীনদের ক্রিকেট সমাজের প্রত্যেক মানুষকে শিক্ষা দেবে, কী ভাবে লড়াই করতে হয়, জীবনের ব্যর্থতা ঝেড়ে ফেলে কী ভাবে উঠে দাঁড়াতে হয়, এগিয়ে যেতে হয়।” ব্লাইন্ড ক্রিকেটের টি-২০ বিশ্বকাপের আয়োজনের প্রচেষ্টাকে উৎসাহ দিতে সবাইকে আহ্বান জানান যুবরাজ।

বাংলা ও দৃষ্টিহীন ক্রিকেট

ভারতীয় দলের প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং সর্বভারতীয় ব্লাইন্ড ক্রিকেট সংস্থার পূর্বাঞ্চলের প্রতিনিধি, সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন তনুময় ভৌমিকের ক্রিকেট খেলার প্রেরণা সচিন তেন্ডুলকর। জানালেন, “বাবার মৃত্যুর পরের দিনই সচিন ভারতীয় দলের সঙ্গে যোগ দিয়ে তেন্ডুলকর যে ভাবে সেঞ্চুরি করেছিলেন তা অভাবনীয়। এই খেলাটার প্রতি সে দিন থেকেই প্রেমে পড়ে যাই। কিসের টানে এক জন মানুষ এ ভাবে খেলতে চলে আসে জানার চেষ্টা করি। উইকেট কী, বল কেমন, সব কিছুই স্পর্শে অনুভব করি। আমার তো দৃষ্টি নেই। তাই শ্রবণ দিয়ে খেলাটাকে দেখতে শিখি।”

দৃষ্টিহীন ক্রিকেটে বাংলা এক সময় যথেষ্ট শক্তিশালী দল ছিল, বহু ক্রিকেটার এখান থেকে ভারতীয় দলে প্রতিনিধিত্ব করেছেন, এখন শুভেন্দুই একমাত্র সলতে— বললেন ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন ফর ব্লাইন্ড অব বেঙ্গল-এর (সিএবিবি) সভাপতি চিন্ময় মণ্ডল। তাঁর মতে, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্নাটক, হরিয়ানা, ওড়িশার দ্রুত উন্নতি ঘটেছে তাদের পরিকাঠামোর জন্য। সেখানকার দৃষ্টিহীন ক্রিকেটাররা দৃষ্টিমান ক্রিকেটারদের মতোই সুযোগ-সুবিধে পান। বাংলায় অনুশীলনের মাঠই নেই। বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রিকেটাররা বাসে-ট্রামে নিয়মিত যাতায়াত করতে পারেন না। দেখা যায়, এক মাসের শিবিরে পাঁচ-ছ’দিনের বেশি ক্রিকেটাররা আসতে পারছেন না। অন্য রাজ্যের মতো সুযোগ এ রাজ্যে থাকলে ভারতীয় দলে অনেক শুভেন্দুকে খেলতে দেখা যেত। অথচ এ রাজ্যে দৃষ্টিহীন ক্রিকেটার অন্য রাজ্যের তুলনায় অনেক বেশি। অন্ধকার থেকে আলোর সন্ধানে হাত বাড়াতে ক্রিকেটের মতো খেলায় দৃষ্টিহীনরা এত আকৃষ্ট হচ্ছেন কেন? চিন্ময় জানালেন, “যে হেতু বডি কনট্যাক্ট গেম নয়, যে হেতু সব ধরনের দৃষ্টিহীনরা খেলতে পারেন, তাই ক্রিকেটে আগ্রহ এত বেশি। তা ছাড়া অন্য খেলার চেয়ে ক্রিকেট অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং দৃষ্টিহীনদের কাছে।”

দৃষ্টিহীন ক্রিকেটারদের এই মানসিকতাকে আরও উদ্বুদ্ধ করতে প্রতিযোগিতার যে থিম সং তৈরি হয়েছে তার নির্যাস, ‘আমরা দেখতে না-ই পারি, কিন্তু শুনতে তো পারি।/ আমরা দেখতে না-ই পারি, কিন্তু দেখাতে তো পারি!’

(লেখক রাজ্য ক্রীড়া পর্ষদের প্রাক্তন ক্রীড়া সাংবাদিক)

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.