রাতের পড়া শেষ করে সে-দিনও রিমো আবার তার জমানো স্ট্যাম্পের খাতাটা দেখতে শুরু করল। ডেনমার্ক, ব্রাজিল, ইংল্যান্ড, ইতালিসহ নানান দেশের সাজানো স্ট্যাম্প বা ডাকটিকিটগুলোর উপর আদর করে হাত বোলাতে লাগল। স্পেনের পাতায় এসে দৃষ্টি আটকে গেল। এই তো সেই স্ট্যাম্পটা, গত বিশ্বকাপ ২০১০-এর। সেই ছবিটা, চকচকে জার্সি আর একটা দারুণ বুট পরে ভলি মারার দুর্দান্ত ছবি। ছোটমামার বন্ধু এনে দিয়েছিল। নয়-নয় করে প্রায় দুশো টিকিট জমিয়ে ফেলেছিল তিন বছরেই। কত না ঘটনা জড়িয়ে আছে এই খাতার স্ট্যাম্প নিয়ে। সেই ঘটনাটা তো রিমোকে আজও আনন্দ দেয়। পুজোর সময় সে বার দেশের বাড়ি আক্নায় বেড়াতে গেছে মা-বাবার সঙ্গে। ওই সময়টা কী যে ভাল যায় ক’দিন! কী সুন্দর একটা গন্ধ! বাবা বলত দেশের গন্ধ। রিমো ঠিক বোঝে না। ধুস, দেশের আবার কী গন্ধ হয়? তবে হ্যাঁ, বিশুদের বাগানমাঠে যখন ফুটবল খেলতে যায়, তখনও এই চেনা গন্ধটা নাকে লাগে। বৃষ্টি হলে আরও বেশি পায়। মা বলে বনজ গন্ধ। মানে, লতা, গুল্ম, ঘাস, মাটি, জল মিলে প্রকৃতির গন্ধ। হ্যাঁ, একদম ঠিক, সে বার থেকে গন্ধটা বেশ চেনা হয়ে গেছিল রিমোর কাছে। আক্না স্কুলের বাবার মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে বাবা পরিচয় করিয়ে দিল বাজারে যাবার সময়। ‘প্রণাম করো রিমো, আমার রমেন স্যর, ভূগোল পড়াতেন।’ কী রকম মোটা গোঁফ, চোখে মোটা কাচের চশমা। ‘কী হে খোকা, কোন ক্লাস?’ ‘ক্লাস সিক্স’— আমি বললাম। ‘বাঃ! এই নাও খাও’ বলে হাত ঘুরিয়ে কোথা থেকে ধাঁ করে একটা সবেদা এনে হাতে দিলেন। ‘দারুণ তো! আপনি ম্যাজিক জানেন?’ ‘হা হা... অনেক কিছু জানি, বাবু।’ ‘আমি খোকাও নই, বাবুও নই, আমি রিমো’ স্যরকে বললাম। ‘ভেরি স্মার্ট’, স্যর গাল টিপে আদর করেছিলেন। ‘এ বার বলো, তুমি কী জানো?’ ‘আমি ফুটবল খেলতে জানি।’ ‘ওমা, তাই নাকি? ব্রাজিল না আর্জেন্তিনা?’ ‘ব্রাজিল, ব্রাজিল। ওদের খেলা খুব ভাল লাগে’ আনন্দে বলেছিলাম। ‘আর কী জানো?’ ‘আমি স্ট্যাম্প জমাই নানান দেশের’। ‘দারুণ শখ তো’, স্যর আমার পিঠে চাপড়ে দেন। ‘আচ্ছা রিমো, আমার শেষ একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তো দেখি। পারলে, দুটো গিফ্ট দেব।’ স্যরের প্রশ্নে বেশ মজা লাগছিল। যতটা রাগী দেখাচ্ছিল, ততটা মোটেও না, বরং বেশ মজার মানুষ। বললাম, ‘বলুন’। ‘ব্রাজিল আর আর্জেন্তিনা দেশ দুটো কোন মহাদেশের অন্তর্গত, পারবে?’ ‘হ্যাঁ, লাতিন আমেরিকা।’ ‘উফ্, দারুণ, তুমি তো দারুণ গোল দিলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে!’ বাবা তখন মুচকি মুচকি হাসছে। বাবার কাছেই তো দেশগুলোর গল্প শুনেছি, জেনেছি। ‘তুমি রিমোকে নিয়ে আমার বাড়িতে বিকেলে এক বার আসবে, স্বপন। উপহারটা ওর হাতে দিয়ে দেব।’
বিকেলে প্রায় নাচতে নাচতে বাবার সঙ্গে স্যরের বাড়িতে। বেশ বড় বাগান ঘেরা বাড়ি। গেট দিয়ে ঢুকতে বাঁ দিকে বিরাট পুকুর, ডান দিকের গোয়ালে অনেক গরু। একপশলা বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। আবার সেই দেশের গন্ধটা নাকে লাগছে। ‘এসো, এসো’ রমেনস্যর ঘরের বাইরে দাওয়াতে বসে আছেন, সামনে ছোট একটা নীল খাম। কাছে যেতেই হাতে দিলেন। উত্তেজনায় ছটফট করছি। বললেন, ‘খোলো’। আরিব্বাস! খামের থেকে দশ-বারোটা রঙিন স্ট্যাম্প বেরিয়ে এল। স্যর বললেন, ‘ওর মধ্যে একটা ব্রাজিল আর আর্জেন্তিনা তুমি বেছে নাও।’ দুটো বড় দেখে স্ট্যাম্প পকেটে নিয়ে খামটা স্যরকে ফেরত দিয়ে, প্রণাম করে ফিরে এসেছিলাম। কলকাতায় ফেরার পর থেকেই সে বার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ল— লাগাতার জ্বর আর কাশি। ডাক্তারবাবু কয়েক মাস টানা চিকিৎসা করলেন। একদম ভারী কাজ করা মানা। নানান ওষুধ, অনেক খরচা। রিমোর কয়েক মাসের ইস্কুলের মাইনে বাকি পড়ে গেল। রিমো সব বুঝেও সে-দিন রাতে মাকে বলেই ফেলল, ‘মা, একটা কথা বলব।’ ‘কী হয়েছে?’ মা-র কেমন গম্ভীর আওয়াজ। রিমো একটু থমকায়। ‘না, মানে, ইয়ে আমাদের ফুটবল টিমের সবার বুট কেনা হয়ে গেছে, শুধু আমারটাই বাকি। কিনে দেবে?’ ‘এখন ও-সব একদম চিন্তা করার সময় নেই, শুতে যাও।’ মা ধমকে দেয়। ছলছল চোখে রিমো উঠে যায়। স্ট্যাম্পের খাতাটা নিয়েই শুতে যায়। বুট পরা প্লেয়ারের ছবিটায় বার বার রিমো আটকে যায়।
সে-দিন ইস্কুল থেকে ফিরে রিমো একছুটে বিশুদের বাগানমাঠে। সবাই জড়ো হয়ে গেছে। রুবেনদা সবাইকে প্র্যাক্টিস করাচ্ছে। আবু রোজকার মতো লেট। খুব বকা খেয়েছে। ‘ধুস, এ সব প্র্যাক্টিস-ট্যাক্টিস ভাল লাগে না।’— রিমোর কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে রাগ দেখায় আবু। বুটের ফিতে বাঁধতে বাঁধতে বলে, ‘এই তুই আজও কেড্স পরে খেলতে এসেছিস? কবে কিনবি বুট?’ ‘জানি না, মা বলেছে এক বছর পর।’— রিমোর কাঁচুমাচু মুখের উত্তর। ‘এক বছর... তত দিনে এই মাঠটা আর থাকবে না, দেখিস।’— আবু হাসতে হাসতে বলেছিল। রুবেনদা ডাকছে। ‘এই রিমো তুই আমার বুটটা নিবি?’ আবুর কথায় রিমো চমকে ওঠে! ‘আমি খেলব না, ভাল লাগে না রে’, আবুর উত্তর। ‘আমার পয়সা নেই, কী করে নেব?’— রিমো এ বার আবুর বুটের দিকে তাকিয়ে বলে। ‘তোর ওই স্ট্যাম্পের খাতাটা দে, আমার বুটটা নিয়ে নে, ব্যস, বদলাবদলি’। রিমো এ বার আরও চমকে ওঠে, হাঁফাতে থাকে, ‘জানি না’ বলে একছুটে রুবেনদার দিকে দৌড় মারে। সারা রাত স্ট্যাম্পের খাতাটা বুকে নিয়ে ভেবেছিল রিমো। খেলতে যায়নি ক’দিন। বাবাকেও বলেছিল, কী করবে। বাবা তখন খুব অসুস্থ। বলেছিল, ‘ভাল কিছু পেতে গেলে কিছু প্রিয় জিনিস ছাড়তে হয় রে রিমো, সময় সময়।’
মাত্র ছ’বছরের মধ্যে কত কী হয়ে গেল। রিমোর ইস্কুল আজ ‘আন্তঃস্কুল প্রতিযোগীতা’য় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, ক্যাপ্টেন রিমোর দু’দুটো দেওয়া গোলে। রিমোর আজ তিন জোড়া বুট। সামনের বছর সে কলকাতা ময়দানে খেলার ডাক পেয়েছে। শুধু দুটো অতি প্রিয় জিনিস আজ আর রিমোর কাছে কোনও দিন ফেরত আসবে না। সেই স্ট্যাম্পের খাতাটা, আর বাবা। চোখের জল মুছে বাবার ছবির সামনে রিমো সেই প্রথম জোগাড় করা বুটটা সযত্নে নামিয়ে রেখে একটা প্রণাম করে।