×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৪ মার্চ ২০২১ ই-পেপার

তোমার ইলিশ, আমার ইলিশ...

রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়
১৯ অগস্ট ২০১৫ ০০:০০

গোলাপ যেমন সুন্দর, ইলিশও তেমনই সুন্দর। গাছ থেকে গোলাপ তুলতে গিয়ে কেউ যদি অসাবধান হয়, তা হলে যেমন কাঁটা লাগার সম্ভাবনা থাকে, তেমনই নিয়ম না জেনে ইলিশ খেতে গেলেও সেই একই ভাবে কাঁটা ফুটে যাওয়ার সম্ভাবনা। আর সত্যি কথা বলতে কী, বসন্ত চৌধুরী মশাইয়ের মতো তেমন অভিজাত মানুষেরাই বা আজ কোথায়, যাঁরা হাতে করে কাঁটা না বেছে, ইলিশের গাদার একখানি বড়সড় টুকরো ভেঙে মুখে পুরে, আনমনে খানিকক্ষণ চিবোনোর পর, তার চুলের মতো সমস্ত কাঁটা একসঙ্গে মুখ থেকে বার করে দিতে পারবেন! আসলে যে কোনও সুন্দর জিনিসের মধ্যেই যেমন একটু অহংকার, একটু তাচ্ছিল্য, একটু মাটিতে পা-না-পড়া গোছের ব্যাপার জড়িয়ে থাকে— ইলিশও তার বাইরে নয়।


অঙ্কন: দেবাশীষ দেব

Advertisement



স্কুলজীবনের শেষ থেকেই দেখে আসছি— বেশ একটু সুন্দরী, পড়াশোনা করা, সিনেমা-গানবাজনা-নাটক নিয়ে বেশ ভাল জ্ঞানগম্যি থাকা মেয়েদের এক ধরনের আশ্চর্য দেমাক থাকে। পেট্রলের গন্ধের মতো কড়া দেমাক নয়। গাড়ি বা আলমারি রং-করার দোকানের সামনে দিয়ে হেঁটে গেলে, যে মায়াবী অথচ একটু চড়া এক ধরনের গন্ধ ভেসে আসে— অনেকটা সেই ধরনের দেমাক। আর তাকে ভালবাসে যে ছেলেটি, সে তার এই দেমাকের টানেই আগাপাশতলা মজে থাকে। ওরা যে, যা-তা কোম্পানির ডটপেন ব্যবহার করে না বা একটা নির্দিষ্ট দোকান ছাড়া ফুচকা বা এগরোল খায় না— সেটা তারা, প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া আমার বন্ধুবান্ধবদের ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিত। এক বার ওদেরই এক জন, চাঁদের আলোভেজা এক সন্ধেবেলায়, দেশপ্রিয় পার্কের সিমেন্টের বেঞ্চিতে পাশাপাশি বসে, ওর বাবার জন্মেরও দু-চার বছর আগে তালাত মামুদের রেকর্ড করা, ‘চাঁদের এত আলো’ গানখানি নিখুঁত ভাবে শেষ করে, সরু ছিপছিপে হাতঘড়িতে পৌনে সাতটা বেজে গেছে দেখে, টিউশনের খাতাপত্র বুকে আঁকড়ে ধরে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে গিয়েছিল। আর এর বছর সাত-আট পরে এক বার রূপনারাণের মাঝদরিয়ায় ভাসতে ভাসতে, ইলিশ-শিকারি মুনতাজ আলমের মুখে যখন শুনেছিলাম, তরুণী ইলিশ মাছেরা পূর্ণিমার রাত্তিরে শুধু চাঁদের আলোকে ভালবেসে নদীর জলতলে উঠে আসে— সে দিন দেশপ্রিয় পার্কের সেই ফেলে আসা সন্ধেবেলার গানখানি অত ভাল লাগার কারণটি যেন অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। এখন ইলিশেরা প্রধানত রমণীপ্রধান। আর স্বীকার করতে বাধা নেই যে, দেমাকি চলনে তারা হয়তো অনেক নারীকেও হার মানিয়ে দেবে। পুরুষ-ইলিশের কিন্তু এই দেমাকের ছিটেফোঁটাও নেই। গ্ল্যামারে তারা মহিলা ইলিশদের ধারেকাছেও আসে না। মহিলা ইলিশেরা এমনিতে বড়সড়। চেহারাটি গোলগাল। গা-টা বেশ তেলতেলে। তুলনায় পুরুষদের চেহারাটি ছোটখাটো। ছিপছিপে ও লম্বাটে। গায়ের ওপরটা অশথপাতার মতো খসখসে। এদের মধ্যে আরও একটা বড় তফাত হল, মেয়ে ইলিশের পায়ুছিদ্রটি বড়ো আর চ্যাপ্টা কিন্তু পুরুষদের পায়ুছিদ্রটি সবসময় ছোট এবং গোল। হাতে নিলে বোঝা যায় পুরুষ ইলিশদের পায়ুছিদ্রের মুখের প্যাপিলি বা ব্রণ-র মতো ছোট্ট অঙ্গটি অনেক বেশি স্পষ্ট। তাই পদ্মার ইলিশেরা গোলালো হবে আর গঙ্গার ইলিশেরা লম্বাটে— এ ধরনের বাছাই ডায়লগ, শুধুমাত্র হাবলা-শিরোমণি খরিদ্দারদের পুরুষ মাছটি গছানোর জন্যই হয়তো চতুর ইলিশ বিক্রেতারা সযত্নে স্টক করে রাখেন।
স্বাদের দিক থেকেও পুরুষেরা, মহিলা ইলিশদের থেকে অনেকখানি পিছিয়ে। তারা যেন দশটা-পাঁচটা আপিস-করা এক-এক জন ছাপোষা কেরানি। সারাদিন মুখ গুঁজে ফাইল-ঘাঁটা আর ছুটি হলেই ঘেমো-মিনিবাসে চড়ে বাড়ি ফিরে, মুদিদোকান কিংবা বড়জোর পাড়ার কোনও ফাস্টফুডের দোকানে বউকে নিয়ে গিয়ে চিকেন-মোমো খাওয়াতেই তার মুক্তি। হঠাৎ রাত সাড়ে ৮টার সময় ব্যাগ গুছিয়ে বিনা বুকিং-এ মন্দারমণির জন্য বেরিয়ে পড়ার মতো হুজুগ তার ধাতে নেই। সে জন্য রয়েছে কেবল মেয়ে-ইলিশরাই। সমুদ্র থেকে বহু দূরের কোনও অজানা নদীর উদ্দেশে, প্রতি বছর বাড়ির সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ার প্ল্যানিং করে তারাই। পুরুষেরা তাদের একা ছাড়তে না পেরে গম্ভীর গম্ভীর মুখে পিছু নেয় মাত্র। অন্তত এই দিক থেকে ইলিশদের নারী-সমাজ পুরুষদের থেকে অনেক বেশি এগিয়ে। আর কে না জানে— যে কোনও সমাজেরই উন্নতি হয় সেই সমাজে বাস করা মেয়েদের উন্নতির মধ্য দিয়ে।
ইলিশরা ভ্রমণপ্রিয় জাত। তারা মাছ হয়ে যে সময়ে যতটা পথ ট্রেক করে, মানুষ তা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারে না। ইলিশরা যে প্রতি বছর স্রোতের উল্টো দিকে একটানা মাইলের পর মাইল সাঁতার কেটে যায়, সেটা কি তারা সমুদ্রে ফিরে গিয়ে পাড়ার ক্লাবে মানুষের মতো গল্প করে? নোনতা সমুদ্রপথে ঝাঁক-বেঁধে ভেসে যাওয়ার সময় এরা খাওয়া-দাওয়াও প্রায় কিছুই করে না। ফলে তখন চেহারাটাও বেশ খারাপ হতে থাকে। তার পর মিষ্টি জলের নদীতে পড়ার পর তারা শ্যাওলা জাতীয় খাবারদাবার খেতে শুরু করে। তখন ওদের স্বাস্থ্য আস্তে আস্তে ভাল হতে থাকে। শরীরে তেল ও চর্বি বাড়তে থাকে। স্বাদও বাড়তে থাকে হু হু করে। এই কারণে সমুদ্রে বা মোহনার মুখে ধরা পড়া ইলিশের স্বাদের চেয়ে, ভরা-নদীতে জালে-পড়া ইলিশের স্বাদ আরও সরেস। নদীতে পড়ে এরা প্রচুর জল খায় আর রেচন অঙ্গ দিয়ে প্রচুর জল বের করে। ফলে তাদের তলপেটের পেশিগুলির ব্যবহার অনেক বেড়ে যায়। আর ঠিক এই কারণেই গাদার থেকে ইলিশের পেটির পিসগুলিকে অনেক বেশি সুস্বাদু লাগে।
যদি, ডিম হওয়ার আগের মহিলা মাছ বেছে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, ভোঁতা মাথা আর ধারালো পেট, এই দুটি বৈশিষ্ট্য দেখে কেনা যায়, তবে ইলিশটির স্বাদ সম্বন্ধে অনেকটাই নিশ্চিন্ত হওয়া যেতে পারে। আর এই সব দেখেশুনে আমার কেন জানি না মনে হয়— মানুষের মতো ইলিশের মেয়েরাও আসলে মায়েরই জাত, তা-নইলে তাদের মনে ও শরীরে অত স্নেহ থাকবে কী করে! নদীপথে অনেকটা রাস্তা পেরিয়ে এসে মা-ইলিশেরা, তুলনায় কম জল থাকা জায়গায়, অনেক অনেক ডিম ছাড়ে। বাবা-ইলিশেরা যত্ন করে সেই ডিম ফোটায়। তার পর ছানাপোনাদের একটু বড়ো করে নিয়ে, গলায় রঙিন ওয়াটার-বটল ঝুলিয়ে, আবার নদীপথ ধরে নিজেদের বাড়ির দিকে, মানে মাঝ-সমুদ্রে ফিরে যায়। আর তখন, কলকাতার ফুটপাথ-বিহীন রাস্তা ধরে হেঁটে যাওয়ার সময়, বাইরের গাড়ি-চলাচলের দিকটায় যেমন থাকে টি-শার্ট আর জিনস-পরা বাবা, মাঝখানে থাকে ফুটফুটে ছেলে-মেয়ে,আর একবারে ভেতরের দিকটি দিয়ে তরুণী-মা, লখনউ-চিকনের হালকা গোলাপি সালোয়ার-কামিজ পরে স্নিগ্ধ ভঙ্গিতে হেঁটে যায়— তেমনই ইলিশদের বেলাতেও নদীর জলের একদম ওপরের দিকে থাকে বাবারা, মাঝখানে থাকে খোকা-খুকিরা, আর মা-ইলিশেরা— নদীজলের অনেকটা নীচ দিয়ে ভেসে যেতে থাকে।
মানুষের সঙ্গে ইলিশের তফাত একটাই— মানুষ যেমন তার ট্রেক করার অভিজ্ঞতা সাজিয়ে-গুছিয়ে রঙিন ছবি সমেত, কোনও না কোনও ভ্রমণ পত্রিকার পুজোসংখ্যায় ছেপে বার করে— ইলিশদের বেলায় তেমনটা কোনও দিনও ঘটে না। আর চন্দনার বেলায় তো সেটা ঘটার কোনও সম্ভাবনাই নেই। চন্দনারা ইলিশের আত্মীয় হলেও এরা মাপে একটু ছোট। লেজ-পাখনাটি লম্বা। রূপোলি আঁশে, হলুদ ও লালচে-বেগুনি আভা থাকে। পিঠটা সামান্য কালচে। স্বাদও অনেক কম। এদের ক্যাম্বে ও মুম্বই উপকূলে বেশি দেখা যায়। বর্ষাকালে এরা ইলিশের মতো নদীতে ঢুকে এলেও, ইলিশের যাত্রাপথটি সম্বন্ধে হয়তো একটা হালকা আন্দাজ করা যায়। কিন্তু চন্দনার সমুদ্র–নদী–সমুদ্র— এই গতিপথটি সম্বন্ধে কোনও রকম আন্দাজই পাওয়া যায় না। কারণ চন্দনা হল মাছের জগতের সেই উমাপ্রসাদ, যে নিজের পুরনো রুটটি ধরে বারবার হিমালয়-ভ্রমণে যায় না। প্রতি বার একটি নতুন যাত্রাপথ খুঁজে বার করার চেষ্টা করে।
গঙ্গার ইলিশের গা চকচকে রুপোলি আর রান্না করলে সুগন্ধ বড় বেশি। কিন্তু পদ্মার ইলিশের গা হালকা গোলাপি। আর তাতে সুগন্ধের থেকেও তেলের ভাগ বেশি। তবে এই বিষয়টি আর.পি (মানে রাধাপ্রসাদ গুপ্ত), কমলকুমার মজুমদার বা কল্যাণী দত্ত থেকে শুরু করে হালের দিগেন বর্মন অবধি এত রকম ভাবে আলোচনা করে গেছেন যে, ভেবেচিন্তেও আর নতুন কিছু বলার নেই। চিত্তরঞ্জনের মানুষ দিগেনদা, প্রায় তিরিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইলিশ শিকার, ইলিশ শিকারি, ইলিশের সংস্কার-লোকসাহিত্য-রান্নাবান্না, ইলিশের অর্থনীতি ও বিপর্যয়— এমন নানা বিষয় নিয়ে ভালবেসে কাজ করে চলেছেন। ইলিশ নিয়ে লেখালিখির খোঁজখবর করতে গিয়ে আমার এটাই মনে হয়েছে যে, ‘ইলিশ পুরাণ’-ই বাংলা ভাষায় এখনও পর্যন্ত লেখা একমাত্র নির্ভরযোগ্য বই— যেটিকে ইলিশপ্রেমীরা স্বচ্ছন্দে তাঁদের ‘ভাগবৎ’ বলে ভরসা করতে পারেন। ইলিশ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দিগেন বর্মন পূর্ববাংলার প্রত্যন্ত কিছু গ্রামে ঘুরে ঘুরে, ইলিশ নিয়ে সেখানকার কিছু প্রচলিত হেঁয়ালি ও ছড়াও সংগ্রহ করে এনেছেন। কুমিল্লা জেলার সাইটনল গ্রাম থেকে তাঁর সংগ্রহ করা এমনই একখানি বহু প্রাচীন হেঁয়ালির কথা এখানে উল্লেখ না-করে পারছি না। জামাই শ্বশুরবাড়ি গিয়ে, সকালে বাজার করতে যাওয়ার আগে শাশুড়িকে জিগ্যেস করছে, ‘কিগো পণ্ডিতের-ঝি, মুরুখখের মা/আমি তো বাজারে যাব, কিছু তো কইলেন না?’ মানে জামাই তার শাশুড়িকে পন্ডিতের মেয়ে এবং তার মুর্খ স্ত্রীর মা বলে সম্বোধন করল। এ বার শাশুড়ি জানতে চাইছেন জামাই-ই বা কতটা চালাক-চতুর! তাই তিনি উত্তরে বলছেন, ‘হাটের আইন্যো আট কলই (সুপুরি)/সুনার (সোনার) আইন্যো পাত/জলের আইন্যো রূপার ফসল/হাতির আইন্যো দাঁত।’ (অবশ্য এই প্রবাদটি চিংড়িমাছের অনুসঙ্গেও নাকি প্রচলিত আছে। সে ক্ষেত্রে, ‘রূপার ফসল’-এর জায়গাটিতে বলতে হবে ‘ছটর মটর’।) আমরা সকলেই জানি প্রিয়তম কবি ও প্রাবন্ধিক বুদ্ধদেব বসু, তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘ইলিশ’-এ, এই মাছটিকে ‘জলের উজ্জ্বল শস্য’ বলে উল্লেখ করেছেন। জানবার কোনও উপায় নেই জেনেও, খুব জানতে ইচ্ছে করে— বুদ্ধদেব কি কোনও ভাবে এই হেঁয়ালিটি জানতে পেরে, তার এমন চমৎকার একটি বিনির্মাণ করতে চেয়েছিলেন নিজের কবিতায়? দিগেনদাকে ধন্যবাদ, তিনি আবিষ্কার না-করলে এই চমৎকার প্রাচীন হেঁয়ালিটি তো কোনও ভাবেই আমাদের চোখে পড়ত না। হ্যাঁ, এখানে আবিষ্কার কথাটি আমি জেনেশুনেই ব্যবহার করলাম। কারণ কত আলো, কত রং, কত গন্ধ, কত সুরই তো আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে— আমরা চোখের সামনে দেখেও সেগুলোকে ঠাহর করতে পারি না। যেমন ধরুন না কেন, বাঁশদ্রোণী কাঁচা-বাজারের সব্জিবিক্রেতা বাবু দাস-এর কথায়, বাজারে বেলডাঙার লঙ্কা ওঠা মানেই হল নদীতে ইলিশের ঝাঁক আসতে শুরু করেছে। বাজারে এ বার ইলিশের দেখা পাওয়া যাবে। মানে, লঙ্কা এখানে ইলিশ মাছ আসার খবরটি বয়ে আনে। বাবু হল স্বভাব কবি। তাই লঙ্কা ও ইলিশের এই যোগসূত্রটি নিয়ে সে একটা চমৎকার ছড়া বেঁধেছিল। অবশ্য ছড়া না বলে এটাকে হেঁয়ালি বলাই উচিত হবে। যেটি হল, ‘তুমি থাক জলে/আমি থাকি ডালে/দেখা হবে দুজনায়/মরণের কালে।’ মানে গাছের লঙ্কা, জলের ইলিশমাছকে উদ্দেশ করে বলছে যে, দুজনের মরণের সময়, মানে একমাত্র রান্নার সময়েই তাদের দেখা হবে— তার আগে নয়।
আমাদের দেশভাগের সবথেকে খারাপ দিকগুলি নিয়ে এ যাবৎ বহু জ্ঞানী-গুণী পণ্ডিত মানুষ নানা পত্রপত্রিকায় বাঘা বাঘা প্রবন্ধ লিখেছেন। বইও লিখেছেন মোটামোটা। বাড়ির বড়রা, তা তিনি ও বাংলারই হোন বা এ বাংলার, যাঁরা চোখের সামনে দেশভাগ দেখেছেন, তাঁদের গলার সেই চিরকালের হাহাকার এখনও যেন কানে বাজে। অনেক বিরাট বিরাট দুঃখ তাঁরা মনের জোরে পেরিয়ে এলেও, আমার মনে হয় একটা ছোট্ট না-বলতে-পারা দুঃখ তাঁদের সকলের মনেই,অশ্বত্থামার শরীরের না-শুকোনো ঘায়ের মতো সারাজীবন দগদগে হয়ে থেকে যাবে। সেটা হল— পদ্মার ইলিশ আর গঙ্গার ইলিশের মধ্যে একটা রেষারেষির সম্পর্ক। সংসারে এমনটা হামেশাই দেখা যায় যে, একই বাড়িতে পাশাপাশি ঘরে থাকা দুই আত্মীয়ের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি হয়ে কথাবার্তা ,মুখ-দেখাদেখি বন্ধ হয়ে গেল। তখন এ-পরিবারের ইলিশভাজার গন্ধে, ও-পরিবারের মন উদাস হয়ে আসছে। আবার ওদিককার ভাপা-ইলিশের সুবাসে, এদিককার লোকজনের মনে পড়ে যাচ্ছে বালক ও কিশোরবেলার কত সুখস্মৃতি। কিন্তু কারও পক্ষেই আর অন্যের রাঁধা পদটি মুখে তোলার উপায় নেই। তাই তাঁরা নিজের ঘরের খাটে বসে, পাশের ঘরে রাঁধা ইলিশটি যে কত খারাপ— এটাই প্রমাণ করার প্রাণপণ চেষ্টা করে চলেছেন। আসলে পদ্মার মাছটা তোমার বা গঙ্গার মাছটা আমার— এমন ছোটলোকি চিন্তাভাবনার ছিটেফোঁটাও তো ছিল না আগেকার ওই মানুষগুলোর ঝকঝকে মনের কোণে। দুটি নদীর ইলিশই ছিল তাঁদের কাছে সমান আদরের। আর আগেকার সেই মানুষগুলোর মনও ছিল, নদী থেকে সদ্য জালে পড়া ইলিশমাছের মতোই চকচকে আর রুপোলি। আর তাই, তাঁদের মনের সেই সুস্থ ভাবনাগুলিকে, সদ্য-ধরা ইলিশের মতো কড়ার গরম তেলে সামান্য নাড়াচাড়া করলেই, সারা পাড়া এক আশ্চর্য সুগন্ধে ম’ ম’ করত। রান্না হওয়া ইলিশমাছের শরীরের সেই পাগল-করা গন্ধের সঙ্গে সঙ্গে, মধ্যবিত্ত দিনযাপনের সেই ঘরোয়া সুগন্ধগুলিও, এখন যেন আমাদের জীবন থেকে কেমন একটু একটু করে মিলিয়ে যেতে বসেছে। হারিয়ে যেতে বসেছে।

Advertisement