Advertisement
E-Paper

মাছ খাওয়া বেড়ে যায় উল্লেখযোগ্য হারে! ৭৪,০০০ বছর আগের সেই অগ্নুৎপাতেই অনেকটা বদলে যায় মানুষের খাদ্যাভ্যাস

৭৪ হাজার বছর আগের ওই অগ্নুৎপাত বিশ্বের অন্যতম বড় অগ্নুৎপাতের মধ্যে একটি। ওই অগ্নুৎপাত প্রভাব ফেলেছিল বিশ্বের জলবায়ুতেও। সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, ওই অগ্নুৎপাতই বদলে দিয়েছিল মানুষের জীবনযাত্রা। অনেকটা বদলেছিল শিকারের ধরনও।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬ ০৮:৫৯
আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত।

আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত। — প্রতীকী চিত্র।

ইন্দোনেশিয়ার টোবা পর্বত। উত্তর সুমাত্রার এই আগ্নেয়গিরি একটা সময়ে আদিম মানব সভ্যতাকে বিলুপ্তির প্রায় দোরগোড়ায় নিয়ে গিয়েছিল বলে দাবি করেন অনেকে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, এই আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতই অনেকটা বদল এনেছিল মানুষের জীবনযাত্রায়। বদল এনেছিল খাদ্যাভ্যাওসে। ওই সময়ে মাছ খাওয়ার চল উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে দাবি গবেষকদের।

আজ থেকে প্রায় ৭৪ হাজার বছর আগের কথা। ওই সময়ে টোবা আগ্নেয়গিরি থেকে এক বড় ধরনের অগ্নুৎপাত হয়েছিল। সেই আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত ছাই ছড়িয়ে পড়েছিল এশিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশ-সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, যা বদলে দিয়েছিল বিশ্বের জলবায়ু। ওই মহা-অগ্নুৎপাতের ফলে গোটা পৃথিবীর তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গিয়েছিল। তৈরি হয়েছিল ‘ভলকানিক উইন্টার’ (অগ্নুৎপাতের ফলে সৃষ্ট শীতকাল)। দাবি করা হয়, ওই অগ্নুৎপাতের পরে মানবগোষ্ঠীর জনসংখ্যাও উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গিয়েছিল। এই তত্ত্বের অন্যতম সমর্থক হলেন নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাইকেল র‌্যামপিনো এবং ইউনিভার্সিটি অফ হাওয়াইয়ের স্টিভেন সেল্‌ফ।

তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, আগ্নেয়গিরির ওই অগ্নুৎপাত পরবর্তী সময়ে মানুষের মধ্যে খাদ্যাভ্যাসে দ্রুত বদল এসেছিল। মাছ এবং অন্য নদীভিত্তিক খাবার বেশি খাওয়া শুরু করেছিল মানুষ। গবেষকদের দাবি, জলবায়ু এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে মানুষ ভেঙে পড়েনি। তারা ক্রমাগত স্থান পরিবর্তন করতে করতে গিয়েছে।

৭৪ হাজার বছর আগে যে অগ্নুৎপাত হয়েছিল, তার ছাই পাওয়া যায় পূর্ব আফ্রিকার ইথিয়োপিয়াতেও। এই দেশেরই উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে শিনফা মেতেমা-১ নামে একটি অঞ্চল। অতীতে এখানে আদিমানবদের ব্যবহার করা বিভিন্ন সরঞ্জাম, উনুন এবং হাড়ের সন্ধান মিলেছে। সেই নমুনাগুলি পরীক্ষা করে দেখেন ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস অ্যাট অস্টিনের বিজ্ঞানী জন ক্যাপেলম্যান এবং তাঁর সঙ্গীরা। তাতে তাঁরা নিশ্চিত, অগ্নুৎপাতের সময়ে এবং তার পরেও ওই অঞ্চলে মানুষের বাস ছিল। ক্যাপেলম্যানের কথায়, “এই অবশিষ্টাংশগুলি এমন এক সম্প্রদায়কে তুলে ধরে যারা বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। বরং পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছিল।”

গবেষকদের দাবি, পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ শিকারের ধরন এবং রান্নার পদ্ধতিতে বদল এনেছিল। প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগে শিনফা মেতেমা-১ অঞ্চলে বসবাসকারী আদিমানবেরা হরিণ, বানর এবং অন্য ছোট প্রাণী খেতে থাকত। মাছও খেত। তবে অগ্নুৎপাতের পরবর্তী সময়ে মানুষের খাবারের তালিকায় স্থলচর প্রাণীর পরিমাণ কমে গিয়েছিল। এবং, মাছ খাওয়া উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। সেখান থেকে পাওয়া জীবাশ্মের নমুনা বিশ্লেষণ করে গবেষকদের দাবি, আগে ওই অঞ্চলে মাছ খাওয়ার হার ছিল প্রায় ১৪ শতাংশ। পরিবেশ প্রতিকূল হওয়ার পরে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৫২ শতাংশ হয়ে যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন কাটা দাগ এবং পোড়া হাড় বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা মনে করছেন, যেখানে শিকার ধরা হত, সেখানেও ওই খাবারগুলি বানানো হত। সম্ভবত আগুন ধরিয়ে সেই রান্না করা হত। এই তথ্যগুলিই ইঙ্গিত দেয়, অগ্নুৎপাত পরবর্তী সময়ে ওই অঞ্চলের মানুষেরা বরাতজোরে রক্ষা পায়নি। বরং, তারা প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নিজেদের জীবনযাত্রা এবং খাদ্যাভ্যাসকে অনেকাংশে বদলে ফেলেছিল।

ওই এলাকায় পাথরের যে সব সরঞ্জাম পাওয়া গিয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল— কিছু ত্রিভুজাকার ফলা। অনেকটা তিরের ফলার মতো। বিজ্ঞানীদের অনুমান, এই পাথরের ফলাগুলিকেই তিরের মতো ব্যবহার করা হত। দক্ষিণ আফ্রিকায় মহাদেশে এই ধরনের তিরের ফলার মতো অস্ত্র ব্যবহারের চল ছিল। তবে এর আগে তার সবচেয়ে প্রাচীন উদাহরণ মিলেছিল, আজ থেকে প্রায় ৭১ হাজার বছর আগে। ইথিয়োপিয়ায় এই নতুন সন্ধান সেই সময়সীমাকে আরও কিছুটা পিছিয়ে নিয়ে গেল বলে মনে করা হচ্ছে। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিও সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে। অগ্নুৎপাত পরবর্তী ওই সময়ে শিকারের অভাব তৈরি হয়েছিল। এ অবস্থায় শিকার ধরার ক্ষেত্রে পেশিবলের তুলনায় দূরত্ব এবং নির্ভুল নিশানা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তিরের ফলার মতো ওই অস্ত্র সে ক্ষেত্রে কার্যকর ছিল বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

অগ্নুৎপাত পরবর্তী সময়ে নদীগুলি অনেক ক্ষেত্রে শুকিয়ে ছোট ছোট জলাশয়ে পরিণত হয়েছিল। পানীয় জলের জন্য তখনও বিভিন্ন প্রাণী ওই জলাশয়গুলিতে আসত। ফলে ওই জলাশয়ের আশপাশে শিকারের গতিবিধিতে নজর রাখা সুবিধাজনক হত। তা ছাড়া জল কমে যাওয়ায় মাছ ধরাও সহজ হয়ে যেত। কোনও জলাশয়ে এবং আশপাশের এলাকায় খাবার ফুরিয়ে গেলে মানুষ আবার নতুন কোনও জলাশয়ের কাছে গিয়ে বাসা বাঁধত। এই ভাবে নদীখাত বরাবর এগিয়ে চলত ওই অঞ্চলের মানুষ। খাদ্যের জোগান ফুরিয়ে এলে এই অঞ্চলের মানুষেরা আর বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করত না। তা স্থান বদলাতে বদলাতে একের পর এক জলাশয়ের কাছে আস্তানা বাঁধতে শুরু করত। সম্প্রতি নেচার জার্নালে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।

Volcano Volcanic Eruption Food Habit
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy