Advertisement
E-Paper

কী ভাবে, কিসের প্রভাবে বিলুপ্ত হয় নিয়ানডারথাল মানুষ? ৫৫০০০ বছরের প্রাচীন ভ্রূণ বদলে দিচ্ছে অনেক ধারণা

দক্ষিণ জার্মানির সেসেলফেল্‌সগ্রোট রক শেল্টার। ছোট্ট গ্রামের মাটি খুঁড়ে চমকে গিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে সেখানে পর পর কয়েকটি হাড়ের টুকরো আবিষ্কৃত হয়। মানুষের হাড়। কিন্তু আধুনিক মানুষ নয়!

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৮ মার্চ ২০২৬ ০৮:৫৭
৫৫ হাজার বছরের পুরনো নিয়ানডারথাল মানুষের ভ্রূণ আবিষ্কার করা হয়েছে জার্মানিতে।

৫৫ হাজার বছরের পুরনো নিয়ানডারথাল মানুষের ভ্রূণ আবিষ্কার করা হয়েছে জার্মানিতে। —প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

আধুনিক মানুষের (হোমো স্যাপিয়েন্স) বাড়বাড়ন্তের মধ্যেই আদিম নিয়ানডারথালদের সংখ্যা কমতে শুরু করেছিল ধীরে ধীরে। ইউরোপের বিস্তীর্ণ অংশ, পশ্চিম এবং মধ্য এশিয়ার কিছু কিছু এলাকায় নিয়ানডারথালদের যে ঘনবসতি গড়ে উঠেছিল, প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে তা বিলুপ্ত হতে শুরু করে। কিন্তু ঠিক কী কারণে মানুষের এই প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেল, কেন বদলে যাওয়া পৃথিবীর সঙ্গে তারা মানিয়ে নিতে পারল না, বিজ্ঞানীদের মধ্যে তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। প্রাচীন নিয়ানডারথাল মানুষের একটি ভ্রূণ বিলুপ্তির কারণ সম্পর্কে নতুন হদিস দিচ্ছে। বিজ্ঞানীদের দাবি, নতুন গবেষণা অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর বলে দিতে পারে।

দক্ষিণ জার্মানির সেসেলফেল্‌সগ্রোট রক শেল্টার। ছোট্ট গ্রামের মাটি খুঁড়ে চমকে গিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে সেখান থেকে পর পর বেশ কয়েকটি হাড়ের টুকরো আবিষ্কৃত হয়। প্রতিটিই মানুষের হাড়। তবে আধুনিক মানুষ নয়! প্রথমে এই সমস্ত হাড়ের গুরুত্ব বুঝতে পারেননি কেউ। বছরের পর বছর ধরে হা়ড়গুলি সংগ্রহশালায় রাখা ছিল। নব্বইয়ের দশকে বিজ্ঞানীরা তা নিয়ে ফের গবেষণা শুরু করেন। জানা যায়, সেগুলি নিয়ানডারথাল প্রজাতির আদিম মানবের হাড়। তবে একটিও সম্পূর্ণ ভাবে গড়ে ওঠেনি। গঠন সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই হা়ড়গুলি মাটি চাপা পড়ে যায়। মৃত্যু হয় সংশ্লিষ্ট নিয়ানডারথালের।

জার্মানিতে আবিষ্কৃত হাড়গুলির মধ্যে ছিল ফিমার, ফিবুলা, মাথার খুলির অংশ এবং ছোট্ট ছোট্ট কয়েকটি বুকের পাঁজরের হাড়। কোনওটির আকার কয়েক সেন্টিমিটারের বেশি নয়। বিজ্ঞানীরা জানান, পূর্ণাঙ্গ শিশুর হাড়ের চেয়েও আকারে ছোট এই সমস্ত হাড় আসলে নিয়ানডারথালের ভ্রূণ থেকে এসেছে। ভ্রূণ অবস্থাতেই ওই হাড়গুলি মাটির নীচে চাপা পড়ে গিয়েছিল। ২০০৬ সালে জার্মানির বিজ্ঞানীরা সরকারি ভাবে ঘোষণা করেন, নিয়ানডারথাল ভ্রূণটির জন্ম হয়েছিল ৫৫ হাজার বছর আগে। পর্তুগাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ আলভিস বারবিয়েরির কথায়, ‘‘হাড়ের নমুনাগুলি অত্যন্ত অল্পবয়সি কোনও নিয়ানডারথাল শিশুর। তা প্রসবের আগের অবস্থাও হতে পারে। আবার প্রসবের অব্যবহিত পরের অবস্থাও হতে পারে। তবে এগুলি সত্যিই খুব বিরল।’’ ভ্রূণের সঙ্গে প্রসবকারী মা-নিয়ানডারথালের কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

নিয়ানডারথাল ভ্রূণ থেকে প্রাচীন ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে তার মাইটোকন্ড্রিয়াল জিনোমের ক্রম নির্ণয় করেছেন বারবিয়েরিরা। তা থেকে বোঝা গিয়েছে, ইউরোপ জুড়ে নিয়ানডারথালদের যে প্রজাতি বিলুপ্তির ঠিক আগে রাজ করত, তার সঙ্গে এই ভ্রূণের কিছু তফাৎ রয়েছে। এই ভ্রূণ আরও আগের। তাকে নিয়ানডারথালদেরও একটি প্রাচীন প্রজাতি হিসাবে চিহ্নিত করেন বিজ্ঞানীরা। এর থেকেই জানা যায়, হাজার হাজার বছর আগে আচমকা নিয়ানডারথালদের জনসংখ্যা হ্রাস পেতে শুরু করেছিল। তাদের জিনগত বৈচিত্র্য সংকুচিত হয়ে এসেছিল।

বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জার্মানি, সার্বিয়ায় প্রাপ্ত অন্যান্য নিয়ানডারথালের অবশিষ্টাংশের সঙ্গে এই ভ্রূণের মাইটোকন্ড্রিয়াল জিনোমের তুলনা করে দেখা হয়েছে। এর আগে নিয়ানডারথালদের ৪৯টি মাইটোকন্ড্রিয়াল জিনোমের কথা বিজ্ঞানীরা জানতেন। ভ্রূণ-গবেষণায় নতুন আরও ১০টি মাইটোকন্ড্রিয়াল জিনোমের হদিস মিলেছে। এই আবিষ্কার থেকেই বিজ্ঞানীদের অনুমান, প্রায় ৬৫ হাজার বছর আগে নিয়ানডারথালেরা এক প্রবল জনসংখ্যা বিপর্যয়ের শিকার হয়েছিল। তাতে তাদের জিনগত বৈচিত্র্যের অধিকাংশই নিশ্চিহ্ন করে দেয়। জার্মানিতে আবিষ্কৃত ভ্রূণ নিয়ানডারথালদের জনসংখ্যা বিপর্যয় সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত প্রাপ্ত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ।

মনে করা হচ্ছে, তুষার যুগের প্রভাবই ধীরে ধীরে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিল নিয়ানডারথালদের। দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের তুলনামূলক বরফহীন অংশে সেই সময় নিয়ানডারথালেরা জড়ো হয়েছিল। তুষার যুগ কেটে যাওয়ার পরে অবশ্য নিয়ান়ডারথালের সংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করে। কিন্তু এই পর্বে তাদের মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্য প্রায় ছিল না বললেই চলে। সকলেই জিনগত ভাবে একরকম হয়ে প়ড়েছিল। বিলুপ্তি যে ঘনিয়ে আসছে, তা থেকেই ইঙ্গিত মেলে। ৪৫ হাজার থেকে ৪২ হাজার বছর আগের সময়কালে নিয়ানডারথালদের জনসংখ্যা চূড়ান্ত বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয় এবং শেষ পর্যন্ত তারা সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই চূড়ান্ত পর্যায়ের বিলুপ্তির নেপথ্যে ছিল আবহাওয়ার বড়সড় কোনও পরিবর্তন। তাতে তাদের শিকার এবং খাদ্যাণ্বেষণের এলাকাও সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। যদিও তত দিনে আধুনিক হোমো স্যাপিয়েন্সের সঙ্গে নিয়ানডারথালের প্রজনন ঘটে গিয়েছে। মিশ্রিত প্রজাতির আবির্ভাব ঘটেছে। বিজ্ঞানীদের একাংশ বলেন, উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা (মরক্কো) এবং দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপের (স্পেন) ভূখণ্ডের মাঝে অতলান্তিক মহাসাগর ও ভূমধ্য সাগরের সংযোগকারী জিব্রাল্টার প্রণালীর কাছে নিয়ান়়ডারথালদের বিশেষ এক প্রজাতি দীর্ঘ দিন অস্তিত্বশীল ছিল। অন্যত্র নিয়ানডারথাল বিলুপ্ত হয়ে গেলেও ওই অংশে এবং আশপাশে আরও কয়েক হাজার বছর তারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল।

Neanderthal Mass Extinction Homo Sapiens
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy