Advertisement
E-Paper

হিমবাহের তলায় ঘুটঘুটে গুহায় ঘড়ি ছাড়া টানা দু’মাস একা কাটিয়েছিলেন! আবিষ্কৃত হয়েছিল অন্য এক ‘ঘড়ি’

মিশেল যে গুহায় ছিলেন, তার প্রবেশের মুখে মোতায়েন ছিল একটি সহায়তাকারী দল। সেই দলের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রাখতেন মিশেল। তিনি চাইলেই ফোন করতে পারতেন, তবে তাঁকে ফোন করার ব্যবস্থা ছিল না।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৭ মে ২০২৬ ০৯:০০

ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।

আল্পস পর্বতের গভীরে হিমবাহের নীচে অন্ধকার এক গুহা। সূর্যের কোনও রশ্মি সেখানে পৌঁছোয় না। সেই গুহাতেই টানা দু’মাস কাটিয়েছিলেন এক ফরাসি যুবক। সঙ্গে ছিল না কোনও ঘড়ি। কোনও ক্যালেন্ডার। বাইরে থেকে কারও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার কোনও সুযোগ ছিল না। যখন খিদে পেয়েছিল, খেয়েছিলেন, যখন ঘুম পেয়েছিল, ঘুমিয়েছিলেন। দীর্ঘ দু’মাস ধরে ওই স্বেচ্ছাবন্দি অবস্থায় বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন তিনি। তাঁকে নিয়েও চলেছিল গবেষণা। আর তাতেই ধরা পড়েছিল মানব শরীরে কিছু তত্ত্ব।

‘স্পেস ডেইলি’ পত্রিকার প্রতিবেন অনুসারে, ১৯৬২ সালের ১৬ জুলাই গবেষণা শুরু হয়েছিল। ২৩ বছরের ফরাসি ওই যুবকের নাম মিশেল সিফরে। তিনি ছিলেন পেশায় স্পেলিয়োলজিস্ট। অর্থাৎ গুহার গঠন, ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করতেন। তা করতেই লিগুরিয়ান আল্পসের স্কারাসন ক্যাভার্নে টানা দু’মাস তিনি ছিলেন। কিন্তু সেই সঙ্গে চলেছিল আরও একটি পরীক্ষা। সেই পরীক্ষা মানুষের মন নিয়ে, শরীরে ভিতরের ঘড়ি নিয়ে। সে সময় ক্রোনোবায়োলজির (জীববিদ্যার একটি শাখা যা জীবদেহের সময়ের উপর ভিত্তি করে চলা কাজের পদ্ধতি, চক্রাকার জৈবিক ছন্দ নিয়ে গবেষণা করে) ধারণা ছিল না। কিন্তু মিশেলের অবস্থা নিয়ে গবেষণা করার পরে ক্রোনোবায়োলজির জন্ম।

মিশেল যে গুহায় ছিলেন, তার প্রবেশের মুখে ছিল একটি সহায়তাকারী দল। সেই দলের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রাখতেন মিশেল। তিনি চাইলেই ফোন করতে পারতেন, তবে তাঁকে ফোন করার ব্যবস্থা ছিল না। ওই দলের সদস্যদের কড়া নির্দেশ ছিল, কোনও ভাবেই যেন মিশেলকে দিনক্ষণ জানানো না হয়। তবে মিশেল যখন খেতেন, ঘুমোতে যেতেন, ঘুম থেকে উঠতেন, তখন ফোন করে সহায়তাকারী দলকে জানিয়ে দিতেন। তারা সেই তথ্য নথিভুক্ত করত। তবে বাইরের দুনিয়ার কোনও খবরাখবর তাঁকে দেওয়া হত না। দিন-রাতের বিষয়েও কিছু জানানো হত না।

দু’মাস পরে যখন সেই সহায়তাকারী দল জানায় যে, গবেষণার জন্য নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হয়েছে, তখন তা বিশ্বাসই করতে চাননি মিশেল। তিনি দাবি করেন যে, গবেষণা শেষ হতে তখনও বেশ খানিকটা সময় বাকি। তাঁর ধারণা ছিল, সেই সময়টা প্রায় সপ্তাহ দুইয়ের কাছাকাছি। অর্থাৎ, দু’সপ্তাহ কী ভাবে কেটে গিয়েছিল, তা খেয়ালই করতে পারেননি তিনি।

মিশেলের এই যে ধারণা হয়েছিল, তা-ই ছিল গবেষণার উপজীব্য। দেখা গিয়েছে, খাওয়া-ঘুমের চক্র ২৪ ঘণ্টায় শেষ হয়নি যুবকের। অর্থাৎ এক দিন যে সময়ে তিনি ঘুমিয়েছিলেন, পরের দিন ওই একই সময়ে তিনি ঘুমাতে যাননি। বরং তা কিছুটা পিছিয়ে গিয়েছে। গুহার বাইরে সহায়তাকারী দল যে সময় সংগ্রহ করেছিল, তাতে দেখা গিয়েছিল, খাওয়া-ঘুমের দৈনিক চক্র মিশেলের সম্পন্ন করতে সময় লেগেছে গড়ে সাড়ে ২৪ ঘণ্টা। তা থেকে বিজ্ঞানীদের ধারণা হয়, মিশেলের শরীর তার নিজের নিয়মে চলেছিল।

দীর্ঘ গবেষণার পরে ওই অবস্থাকে বলা হয়েছিল ‘ফ্রি রানিং সার্কাডিয়ান রিদম’। যখন শরীরের ঘড়ি বাইরের ঘড়ি দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে চলতে থাকে, কেউ তাকে সংশোধন করে দেয় না, তখন এই অবস্থা তৈরি হয়। প্রতিদিন খাওয়া-ঘুমের চক্রে আধ ঘণ্টা ধরে বিচ্যুতি হচ্ছিল মিশেলের। দু’মাস ধরে প্রত্যহ এই আধ ঘণ্টা যোগ করলে তা মাত্র এক দিনের কিছু বেশি সময় হয়। বিজ্ঞানীরা এই গবেষণার থেকে একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয় আবিষ্কার করেছিলেন। গুহার ভিতরে কোনও পরিবর্তনশীল আলো ছিল না, ঘড়ি ছিল না, ক্যালেন্ডার ছিল না, এক বার ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে আবার ঘুমিয়ে ওঠার পর পর্যন্ত আদতে কোনও পার্থক্য ছিল না। সে কারণে মিশেলের অতিবাহিত সময়ের স্মৃতি সঙ্কুচিত হয়ে গিয়েছিল। তিনি সময়ের ব্যপ্তির ধারণাই হারিয়ে ফেলেছিলেন।

মিশেলের এই গুহায় থেকে গবেষণার আগে বিজ্ঞানীদের মনে একটি প্রশ্ন ছিল যে, মানুষের শরীরে কি আদৌ কোনও ঘড়ি রয়েছে, তা মেনেই কি তার দৈনিক ক্রিয়া চলে? অনেকেই মনে করতেন, মানুষের এই শরীর-ঘড়ি সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত, তাঁর পেটের খিদে মেনে হয়। কিন্তু স্কারাসন গুহার ওই গবেষণা অন্য কথা বলে। বাইরের ঘড়ির সঙ্গে মিশেলের কোনও সম্পর্ক ছিল না। তা সত্ত্বেও তাঁর নাওয়া-খাওয়া-ঘুমের মতো দৈনিক অভ্যাস চলেছে একটি ছন্দে। নিজের ছন্দে। সেই ভিতরের ঘড়ি চলে নিজের মতোই। বাইরে থেকে তাকে সময় হিসাব পাঠানো হোক বা না হোক।

অর্থাৎ ওই গবেষণা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, মানুষের শরীর নিজস্ব নিয়মে সময় বজায় রাখে। দেহের ভিতরে একটি ঘড়ি রয়েছে, যা সূর্য ঘড়ির মতো ২৪ ঘণ্টার কাছাকাছি সময়ে চলে, তবে হুবহু ২৪ ঘণ্টায় নয়। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে এই ভিতরের ঘড়ির আলো এবং বাকি দুনিয়ার সঙ্গে মেলানো রুটিনের প্রয়োজন হয়। রোজ সকালে সকলের অজান্তেই সেটা ঘটে চলে। মিশেলের ওই অন্ধকার গুহা। কাটানো দু’মাস আমাদের ওই ঘড়িটির অস্তিত্ব ধরিয়ে দিয়েছিল। তিনি দেখিয়েছিলেন যে, বাইরে থেকে কোনও ভাবে সেটিকে সংশোধিত করা না হলে তা কী ভাবে কাজ করে।

এর পরেই বিভিন্ন গুহায় দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন মিশেল। ১৯৭২ সালে টেক্সাসের এক গুহায় এ ভাবেই একা ছ’মাস কাটিয়েছিলেন। তখন আরও কিছু বিষয় উঠে এসেছিল তাঁর গবেষণায়।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy