ডাইনোসর যুগের সবচেয়ে হিংস্র শিকারিদের মধ্যে টির্যানোসরাস রেক্স। সংক্ষেপে টি-রেক্স। আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি বছর আগে পৃথিবীর স্থলভাগে দাপিয়ে বেড়াত ওরা। তবে শুধু স্থলভাগেই নয়, ডাইনোসর যুগের মহাসমুদ্রেও রাজত্ব করত অন্য এক প্রজাতির ‘টি-রেক্স’। পুরো নাম টাইলোসরাস রেক্স। সম্প্রতি এক গবেষণায় সন্ধান মিলেছে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া সেই প্রজাতির জীবাশ্মের।
মহাসমুদ্রের এই টি-রেক্সেরা ছিল স্থলচর টি-রেক্সের মতোই হিংস্র শিকারি। বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো টি-রেক্সের আবির্ভাবের অনেক আগেই টাইলোসরাস রেক্স এসে গিয়েছিল পৃথিবীতে। কিন্তু এমন কোনও প্রাণীর যে এককালে অস্তিত্ব ছিল, তা এত দিন জানাই ছিল না। জীবাশ্ম আবিষ্কার হলেও তা অন্য প্রজাতির বলে মনে করা হত। সেই ভ্রান্ত ধারণা ভাঙল সাম্প্রতিক গবেষণায়।
ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষ পর্বে (আজ থেকে প্রায় ৮.২০-৬.৬৬ কোটি বছর আগে। এই সময়েই পৃথিবীতে ডাইনোসরদের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি ছিল) সমুদ্রে ঘুরে বেড়াত মোসাসরেরা। এরা ঠিক ডাইনোসর নয়। এরা ছিল বিশালাকার সামুদ্রিক সরীসৃপ প্রাণী। ডাইনোসরদের যেমন বিভিন্ন প্রজাতি রয়েছে, মোসাসরেদেরও রয়েছে। তার মধ্যেই একটি হল টাইলোসরাস রেক্স। বিশাল চেহারার এক সামুদ্রিক শিকারি। লম্বায় ছিল প্রায় ৪৩ ফুট, যা বড় বড় গ্রেট হোয়াইট শার্কের চেহারার দ্বিগুণেরও বেশি (এখনও পর্যন্ত সন্ধান পাওয়া সবচেয়ে বড় চেহারার গ্রেট হোয়াইট শার্কটি লম্বায় প্রায় ২০ ফুট)। নিজেদের সময়ের অন্যতম বড় সামুদ্রিক জীব ছিল এই টি-রেক্সেরা।
সম্প্রতি আমেরিকান মিউজ়িয়াম অফ ন্যাচরাল হিস্ট্রির বুলেটিনে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদলের নেতৃত্বে ছিলেন উইসকনসিনের হিস্ট্রি মিউজ়িয়ামের গবেষক অ্যামেলিয়া জ়িয়েটলো। তিনি যখন ‘আমেরিকান মিউজ়িয়াম অফ ন্যাচরাল হিস্ট্রি’র রিচার্ড গিল্ডার গ্র্যাজুয়েট স্কুল থেকে পিএইচডি করছিলেন, তখনই তাঁর মনে প্রথম খটকা লাগে। জাদুঘরে রাখা কিছু জীবাশ্মকে ‘টাইলোসরাস প্রোরিগার’ (ডাইনোসর যুগের এক ভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক জীব)-এর বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু জ়িয়েটলোর মনে হয়েছিল, সেগুলি ভুল ভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
সেই খটকা থেকেই গবেষণার সূত্রপাত। আমেরিকান মিউজ়িয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি, ডালাসের পেরোট মিউজ়িয়াম অফ নেচার অ্যান্ড সায়েন্স এবং সাদার্ন মেথডিস্ট ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা যৌথ ভাবে এই গবেষণাটি করেন। যে জীবাশ্মগুলির উপর তাঁরা গবেষণা করেন, সেগুলি মূলত পাওয়া গিয়েছে উত্তর টেক্সাস থেকে। যেগুলি প্রায় ৮ কোটি বছরের পুরনো। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মিউজ়িয়াম অফ কম্পারেটিভ জ়ুলজিতে আগে থেকেই ‘টাইলোসরাস প্রোরিগার’ কিছু জীবাশ্ম রাখা ছিল। সেগুলির সঙ্গে গবেষণায় ব্যবহৃত নমুনা তুলনা করে জ়িয়েটলো এবং তাঁর সঙ্গীরা নিশ্চিত হন— তাঁদের সন্দেহই ঠিক। সেটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রজাতির জীবাশ্ম। এত দিন ধরে জাদুঘরে ভুল পরিচয়ে সংরক্ষিত ছিল পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া এই হিংস্র জলজ শিকারিদের জীবাশ্ম। ভুল ধরা পড়ার পরে জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রায় এক ডজনেরও বেশি জীবাশ্মকে সংশোধিত পরিচয়ে চিহ্নিত করা হয়।
গবেষকেরা ‘টাইলোসরাস প্রোরিগার’ এবং জলচর টি-রেক্সের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন। নতুন আবিষ্কৃত মোসাসর প্রজাতিটি ছিল ‘টাইলোসরাস প্রোরিগার’-এর তুলনায় আকারে অনেকটা বড়। এদের দাঁতগুলি ছিল করাতের মতে খাঁজকাটা। যা অন্য মোসাসরদের মধ্যে খুব একটা দেখা যায় না। তা ছাড়া জীবাশ্মগত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, এরা ভিন্ন ভিন্ন সময়কালে এবং ভিন্ন স্থানে থাকত। গবেষণায় ব্যবহৃত ‘টাইলোসরাস প্রোরিগার’-এর জীবাশ্মগুলির বেশির ভাগ পাওয়া গিয়েছে আমেরিকার কানসাস প্রদেশে। সেগুলি প্রায় ৮ কোটি ৪০ লক্ষ বছরের পুরনো। অন্য দিকে ‘টাইলোসরাস রেক্স’-এর জীবাশ্মগুলি প্রায় ৮ কোটি বছরের পুরনো। সেগুলির বেশির ভাগ মিলেছে টেক্সাস থেকে।
উল্লেখ্য, এই জীবাশ্মগুলি যে ‘টাইলোসরাস প্রোরিগার’-এর নয়, বরং অন্য কোনও প্রাণীর— তা নিয়ে গত পাঁচ-ছয় দশক ধরে আলোচনা চলছিল। কিন্তু তা নিয়ে কোনও প্রামাণ্য তথ্য ছিল না এত দিন। ১৯৬০-এর দশকে জীবাশ্মবিদ জন থারমন্ড প্রথম লক্ষ্য করেছিলেন, ‘টাইলোসরাস প্রোরিগার’ বলে চিহ্নিত কিছু জীবাশ্ম বাকিগুলির তুলনায় অস্বাভাবিক ভাবে বড়। সেগুলি যে সম্ভবত ভিন্ন কোনও প্রজাতির, সেই আভাস তখনই দিয়েছিলেন তিনি। থারমন্ড ওই জীবাশ্মগুলির নাম রেখেছিলেন ‘টাইলোসরাস থ্যালাসোটাইর্যানাস’, যার অর্থ ‘সমুদ্রের স্বৈরাচারী শাসক’। যদিও তাঁর সেই নামকরণ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি। এ বার তাঁর ভাবনাকে শ্রদ্ধা জানাতে এবং এই প্রজাতির হিংস্র আচরণের কথা মাথায় রেখে গবেষকেরা এই নতুন প্রজাতির নামকরণ করেছেন ‘টাইলোসরাস রেক্স’।
গবেষকদের মতে, টাইলোসরাস রেক্সের শারীরিক গঠন ছিল শক্তিশালী এবং আগ্রাসী। এদের চোয়াল এবং ঘাড়ের পেশি ছিল উল্লেখযোগ্য ভাবে মজবুত। ফলে নিজেদের সময়ের দুর্ধর্ষ সামুদ্রিক শিকারী হয়ে উঠেছিল এরা। গবেষকদলের অন্যতম সদস্য রন টাইকোস্কির কথায়, “এরা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গ্রেট হোয়াইট শার্কের চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ লম্বা। এই বিশাল চেহারার পাশাপাশি টি-রেক্স অন্য মোসাসরদের চেয়ে অনেক বেশি হিংস্র ছিল বলে অনুমান করা হচ্ছে। আমরা এই প্রজাতির মধ্যে এমন মাত্রায় হিংস্রতার প্রমাণ পেয়েছি যা এর আগে অন্য কোনও টাইলোসরাসের নমুনায় দেখা যায়নি।” এর কিছু উদাহরণ তুলে ধরেছেন গবেষকেরা। যেমন একটি জীবাশ্মে থুতনির সামনের অংশ নেই। চোয়ালের নীচের অংশও ভঙা। গবেষকদের দাবি, সম্ভবত অন্য কোনও টি-রেক্সের হামলা করেছিল ওই টি-রেক্সটির উপরে। তার জেরেই ওই ক্ষতগুলি তৈরি হয়েছিল বলে মনে করছেন গবেষকেরা।