Advertisement
E-Paper

ধসে গিয়েছে সমসাময়িক সব, ৪৬০০ বছরে মিশরের ‘গ্রেট পিরামিডে’ কেন আঁচ লাগেনি! গবেষণায় নতুন হদিস

ফারাও খুফুর সমাধিস্থলে ৪৮১ ফুট উচ্চতার যে কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল, এত বছরেও তাতে কোনও আঁচ লাগেনি। অথচ, মিশরে সমসাময়িক অন্য সমস্ত প্রাচীন নির্দশনই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে কালের নিয়মে।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ ০৯:০০
মিশরের গিজ়া শহরের ‘গ্রেট পিরামিড’ প্রাচীন সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম ছিল।

মিশরের গিজ়া শহরের ‘গ্রেট পিরামিড’ প্রাচীন সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম ছিল। —ফাইল চিত্র।

সাড়ে চার হাজার বছর। মিশরের গিজ়া শহরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে পিরামিড। ফারাও খুফুর সমাধিস্থলে ৪৮১ ফুট উচ্চতার যে কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল, এত বছরেও তাতে কোনও আঁচ লাগেনি। ভূমিকম্পও তাকে টলাতে পারেনি। অথচ, মিশরের সমসাময়িক অন্য সমস্ত প্রাচীন নিদর্শনই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে কালের নিয়মে। গিজ়ার পিরামিড নিয়ে তাই বিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ এবং প্রত্নতাত্ত্বিকদের কৌতূহলের শেষ নেই। সম্প্রতি নতুন এক গবেষণায় এই পিরামিডের নয়া রহস্য উন্মোচিত হয়েছে।

গিজ়ার পিরামিড পৃথিবীর প্রাচীন সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম। সময়ের প্রভাব যে তার উপরে একেবারেই পড়েনি, তা নয়। চকচকে সাদা পাথরের আবরণ ধীরে ধীরে ক্ষয়ে গিয়েছে বেশ খানিকটা। উচ্চতা নেমে এসেছে ৪৫৪ ফুটে। কিন্তু পিরামিডের মূল কাঠামোয় কোনও হেরফের হয়নি। সৃষ্টির সময় থেকে এখনও পর্যন্ত তা একই রকম ভাবে টিকে রয়েছে। যে গ্রানাইট এবং চুনাপাথরের ব্লকগুলি দিয়ে এই পিরামিড তৈরি হয়েছিল, তা এতটুকুও সরেনি কোথাও। এই মহান সৃষ্টির প্রকৌশলগত দক্ষতা নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। নতুন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মিশরের বিখ্যাত এই পিরামিডটিতে এমন কিছু আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা একে ভূমিকম্প প্রতিরোধক করে তুলেছে। পিরামিডের কাঠামো তৈরির সময় নির্মাণশিল্পীরা আদৌ সে কথা জানতেন কি না, জেনে না না-জেনে তাঁরা এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন, স্পষ্ট নয়।

২৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গিজ়ার পিরামিড তৈরি করা হয়েছিল। সেই নির্মাণকার্যকে প্রবল এক কর্মযজ্ঞ বলা যায়। ২৩ লক্ষ পাথরের ব্লক দিয়ে এই পিরামিড গড়ে তোলা হয়েছিল। তার মোট ওজনই ছিল প্রায় ৬০ লক্ষ মেট্রিক টন। হাজার হাজার মাইল দূর থেকে মিশরে নিয়ে আসা হয়েছিল ওই সমস্ত পাথর। ফারাও খুফুর সমাধির উপর পাথরের তৈরি প্রকাণ্ড এই কাঠামো মূলত ছিল নিরেট। তবে এর ভিতরে হাতেগোনা কয়েকটি ফাঁপা কক্ষ ছিল। রহস্য লুকিয়ে রয়েছে সেখানেই।

মূলত নিরেট হওয়ায় পিরামিডটি প্রকৃতিগত ভাবে অত্যন্ত মজবুত। এর সমস্ত ওজন ভূমির দিকে কেন্দ্রীভূত। তবে ভূমিকম্পের হাত থেকে রক্ষার জন্য শুধু এই বৈশিষ্ট্য যথেষ্ট নয়। বিজ্ঞানীরা বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একাধিক নিরেট পিরামিডের উদাহরণ দিয়েছেন। অতীতে এই মিশরেই প্রাচীন মেইডাম পিরামিডের বহিরঙ্গের কাঠামো ধসে পড়েছিল। ইউজারকাফ, উনাসের মতো পিরামিডগুলি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। বর্তমানে তা ধ্বংসস্তূপের শামিল। আমেরিকা মহাদেশেও পিরামিডের নিদর্শন রয়েছে। মেক্সিকো, গুয়াতেমালা, এল সালভাদর, হন্ডুরাসের পিরামিডগুলি এমন পাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল, ভূমিকম্পে যার ভিত নড়ে যেতে পারে। মাটি কাঁপলে সেই সমস্ত পিরামিড চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যেতে পারে মুহূর্তে। কিন্তু মিশরের এই গিজ়ার পিরামিডে ভূমিকম্পের কোনও প্রভাব এখনও দেখা যায়নি।

মনে রাখতে হবে, মিশর ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ নয়। তবে ভূমিকম্প সেখানে একেবারেই হয় না, তা-ও বলা যাবে না। গিজ়ার পিরামিডের ৮০ কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত দু’টি বড় ভূমিকম্প নথিভুক্ত হয়েছে। ১৮৪৭ সালে রিখটার স্কেলে ওই অঞ্চলের ভূমিকম্পের তীব্রতা ছিল ৬.৮। এ ছাড়া, ১৯৯২ সালে ৫.৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল গিজ়ার কাছে। তার অভিঘাত এতই প্রবল ছিল যে, পিরামিডটির উপরের দিকের বেশ কয়েকটি পাথর খুলে পড়েছিল। তবু কেন পিরামিড এখনও টিকে আছে?

মিশরের ন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড জিয়োফিজ়িক্স-এর ভূকম্পবিদ আসেম সালামারের নেতৃত্বাধীন একটি দল গিজ়ার পিরামিডের এই ভূমিকম্পরোধক রহস্যময় ক্ষমতা নিয়ে গবেষণা করেছে। তাদের গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্ট্‌স’ নামক পত্রিকায়। পিরামিডটির ভিতরে এবং চারপাশে কম্পনের সেন্সর বসিয়েছিলেন গবেষকেরা। আশপাশের কর্মকাণ্ডের সাপেক্ষে এই পিরামিড কী ভাবে কম্পিত হয়, তা সেন্সরের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছিল। অ্যাক্সেলেরোমিটার স্থাপন করা হয়েছিল ফারাওয়ের কক্ষ, তাঁর স্ত্রীর কক্ষ, কক্ষের ঠিক উপরে অবস্থিত উল্লম্ব ভাবে সজ্জিত চাপ প্রশমনকারী কক্ষ-সহ মোট ৩৭টি জায়গায়।

পারিপার্শ্বিক সাধারণ উৎস থেকে আসা সূক্ষ্ম কম্পন সেন্সরে ধরা পড়ে গিয়েছিল আগেই। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই সমস্ত উৎস থেকে উৎপন্ন মোট কম্পাঙ্ক ০.৬ হার্ট্‌জ়। তবে পিরামিডের অন্দরে বেশির ভাগ জায়গাতেই কম্পাঙ্ক ২.০ থেকে ২.৬ হার্ট্‌জ়ের কাছাকাছি। গবেষণায় দাবি, ভূমির কম্পনশীল কম্পাঙ্ক এবং পিরামিডের নিজস্ব কম্পাঙ্কের এই পার্থক্যই মূল রহস্যের চাবিকাঠি।

কম্পাঙ্ক আলাদা হওয়ার অর্থ, ভূমি এবং তার উপরে তৈরি মূল কাঠামোর মধ্যে কম্পন সমান ভাবে স্থানান্তরিত হয় না। এর ফলে ভূমিকম্পের অনুরণন প্রসারিত হতে বাধা পায়। তাতে কাঠামোর ক্ষতির সম্ভাবনা কম থাকে। পিরামিডের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অনুরণন বাড়ে। সে ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম গিজ়ার পিরামিডের মধ্যেকার ওই ফাঁপা কক্ষগুলি। বিজ্ঞানীরা বলেন, ফারাওয়ের কক্ষের উপর পাথরের চাপ যাতে বেশি না হয়, তা নিশ্চিত করতে এই ঘরগুলি তৈরি করা হত। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ঘরগুলির মধ্যে কম্পনের অনুরণন অস্বাভাবিক হারে হ্রাস পায়। অর্থাৎ, তা কম্পন প্রসারণেই বাধা দেয়।

গবেষণায় দাবি, পিরামিড নির্মাণকারীরা ভারলাঘবকারী কক্ষ হিসাবেই এই ঘরগুলি তৈরি করেছিলেন। এর ফলে যে ভূমিকম্প প্রতিরোধক ক্ষমতা তৈরি হবে, তা আদৌ কারও জানা ছিল না। অজান্তেই এমন আশ্চর্য সৃষ্টি করে ফেলেছেন তাঁরা। ভূমিকম্পের কথা মাথায় রেখে সচেতন ভাবে এই কাজ করা হয়েছিল বলে কোনও প্রমাণ এখনও মেলেনি। তবে তা নিয়ে আরও গবেষণা চলছে।

Egypt Pyramid Scientific Research
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy