আধুনিক মানুষ বা হোমো সেপিয়েন্সের সঙ্গে মিলন হয়েছিল নিয়ানডারথালেদের। তবে সেই মিলন ছিল একে অন্যকে পছন্দের ভিত্তিতেই। নিয়ানডারথাল মানব সাম্পর্কিত এক জিন গবেষণায় এমনটাই আভাস মিলেছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ মিলনই হয়েছিল নিয়ানডারথাল মানব এবং আধুনিক মানবীর মধ্যে। উল্টোটা ছিল খুবই কম।
আধুনিক মানুষই হল বর্তমান পৃথিবীতে টিকে থাকা একমাত্র মানব প্রজাতি। ‘হোমো’ গণের বাকি আত্মীয়েরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছে পৃথিবী থেকে। তেমনই এক আত্মীয় হল নিয়ানডারথাল। আজ থেকে প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে পর্যন্ত তারা পৃথিবীতে টিকে ছিল। আফ্রিকা মহাদেশের বাইরে বসবাসকারী আধুনিক মানুষের ডিএনএ-তে এখনও নিয়ানডারথালের জিনের ধারা পাওয়া যায়। পাওয়া যায় প্রায় দুই শতাংশ পর্যন্ত নিয়ানডারথাল ডিএনএ। যা থেকে স্পষ্ট, দুই মানব প্রজাতির মধ্যে মিলন হয়েছিল। এ বার জানা গেল, সেই মিলন ছিল পরস্পরকে পছন্দের ভিত্তিতে।
দুই ভিন্ন মানব প্রজাতির মিলন নিয়ে সম্প্রতি একটি গবেষণা করেন পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। ওই জিন গবেষণায় দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আন্তঃপ্রজাতি মিলনে জড়িত ছিল নিয়ানডারথাল মানব এবং আধুনিক মানবীরা। উল্টোটা, অর্থাৎ নিয়ানডারথাল মানবী এবং আধুনিক মানবের মধ্যে মিলন খুব বেশি হয়নি বলেই দাবি গবেষকদের। সম্প্রতি ‘সায়েন্স’ জার্নালে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। জিন বিশ্লেষণে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে গবেষকদের দাবি, মিলনের জন্য সঙ্গীকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু পছন্দ ছিল দুই মানব প্রজাতির। তাঁদের অনুমান, হয় আধুনিক মানবীরা নিয়ানডারথাল মানবদের বেশি পছন্দ করতেন। কিংবা নিয়ানডারথাল মানবেরা পছন্দ করতেন আধুনিক মানবীদের। কিংবা উভয়েই।
আরও পড়ুন:
আধুনিক মানুষের আবির্ভাব হয়েছিল আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ বছর আগে। আফ্রিকা মহাদেশে প্রথম আবির্ভাব হয় আমাদের প্রজাতির। এবং দীর্ঘ সময় ধরে আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল আধুনিক মানুষের জনগোষ্ঠী। অনেক পরে আফ্রিকার বাইরে পা রাখে আধুনিক মানুষ। আনুমানিক ৬০-৭০ হাজার বছর আগে আফ্রিকা থেকে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে তারা। যদিও কিছু জীবাশ্ম প্রমাণ ইঙ্গিত করে আরও আগে আফ্রিকার বাইরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল আধুনিক মানুষ। তবে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়া শুরু হয়নি তখনও।
আধুনিক মানুষ আফ্রিকা ছেড়ে ইউরেশিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করতেই তাঁরা নিয়ানডারথালেদের মুখোমুখি হয়। আধুনিক মানুষ ইউরেশিয়ায় পা রাখার আরও আগে থেকেই সেখানে বাস করে আসছিল নিয়ানডারথাল মানব প্রজাতি। এই দুই প্রজাতির মধ্যে যে মিলন হয়েছিল, সেই প্রমাণ আগেই মিলেছে। অতীত গবেষণায় দাবি করা হয়, আজ থেকে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ হাজার বছর আগে আজকের মানুষ এবং নিয়ানডারথালদের মধ্যে প্রজনন ঘটেছিল। তার পরে আজ থেকে প্রায় ৪১ হাজার বছর আগে নিয়ানডারথালেরা বিলুপ্ত হয়ে যায় পৃথিবী থেকে। তবে তাঁদের ডিএনএ এখনও কিছু মানুষের মধ্যে রয়ে গিয়েছে।
বর্তমানে ‘হোমো’ গণের একটিই প্রজাতি টিকে রয়েছে পৃথিবীতে— আধুনিক মানুষ। গত কয়েক বছরে এই দুই প্রজাতির আন্তঃপ্রজনন নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। অপর এক সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে নিয়ানডারথালদের মধ্যেও সম্ভবত চুম্বনের প্রচলন ছিল। ওই গবেষণায় দাবি করা হয়, আদিমানবদের সঙ্গে নিয়ানডারথালেদের শুধু শারীরিক মিলনই হয়নি। উভয়ের মধ্যে চুম্বনও হয়েছিল। এ বার জানা গেল, দুই প্রজাতি মিলনের সঙ্গীও বাছত পরস্পরকে পছন্দের ভিত্তিতে। পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। বা অল্প সময়ের জন্য এই ‘পছন্দের সঙ্গী’ বাছার চল ছিল না। কয়েক হাজার বছর ধরে এই পরস্পরকে পছন্দের এই ধারা চলে এসেছে। তবে কেন এই পছন্দ শুধু নিয়ানডারথাল মানব এবং আধুনিক মানবীর মধ্যেই সীমিত ছিল, উল্টোটি খুব বেশি হয়নি— সে বিষয়ে কোনও আলোকপাত করেনি ওই গবেষণা।