বায়ুমণ্ডলের শতকরা ৯৫ ভাগই কার্বন ডাই অক্সাইড, জীবনধারণের ক্ষেত্রে যে গ্যাস খুব একটা কার্যকরী নয়। অথচ, সেই গ্যাসে ঠাসা সৌরজগতের একটি গ্রহেই প্রাণের উপস্থিতির ইঙ্গিত পেলেন বিজ্ঞানীরা! হাজার প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সেখানে প্রাণের অনুকূল কিছু বৈশিষ্ট্য এখনও রয়ে গিয়েছে বলে দাবি। নতুন গবেষণাতেই সেই ইঙ্গিত মিলেছে। ফলে গ্রহটিকে নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহল হঠাৎ বেড়ে গিয়েছে কয়েক গুণ!
পৃথিবীর একেবারে ‘হাতের কাছের গ্রহ’ শুক্র। সৌরজগতের ক্রম অনুযায়ী তার স্থান দ্বিতীয়, বুধের পরেই। প্রতি দিন সন্ধ্যায় পৃথিবীর আকাশে ‘সন্ধ্যাতারা’ হিসাবে দেখা দেয় শুক্র। আবার ভোরের আকাশে তা-ই হয়ে যায় ‘শুকতারা’। মহাকাশে পৃথিবী ছাড়া আর কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব আছে কি না, কিংবা অতীতে ছিল কি না, দীর্ঘ দিন ধরেই বিজ্ঞানীরা তা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। হাজারো পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছে। পৃথিবীর আর এক প্রতিবেশী গ্রহ মঙ্গল থেকে একাধিক ইতিবাচক ইঙ্গিতও মিলেছে। বিজ্ঞানীরা আশাবাদী, লাল গ্রহে অতীতে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল বলে তাঁরা শীঘ্রই প্রমাণ করতে পারবেন। কিন্তু এই সম্ভাবনার দৌড়ে শুক্র গ্রহকে কখনও রাখা হয়নি। শুক্রের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, সূর্য থেকে তার দূরত্বই সেখানে প্রাণের সম্ভাবনার কথা কখনও ভাবতে দেয়নি বিজ্ঞানীদের।
আরও পড়ুন:
আগুনের গোলার মতো তপ্ত শুক্র। সূর্য থেকে তার দূরত্ব ৬.৭ কোটি মাইল। কার্বন ডাই অক্সাইডের উপস্থিতিই শুক্রপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। এই গ্রহের পৃষ্ঠদেশের গড় তাপমাত্রা ৪৬৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কার্বন ডাই অক্সাইড এই গ্রহের উপর পৃথিবীর সমুদ্রতলের চেয়ে প্রায় ৯২ গুণ বেশি বায়ুচাপ তৈরি করে। ফলে আর যাই হোক, শুক্রপৃষ্ঠে কোনও জীবন্ত প্রাণীর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (এমআইটি) বিজ্ঞানীরা শুক্রে অন্য সন্ধান পেয়েছেন। তাঁদের দাবি, শুক্রের পৃষ্ঠে না-হলেও গ্রহটির বায়ুমণ্ডলে প্রাণ থাকা সম্ভব!
শুক্রগ্রহের বায়ুমণ্ডলের উপরের দিকের তাপমাত্রা ০ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। তাই এই অংশ প্রাণের পক্ষে অনেক বেশি সহনীয়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শুক্রকে ঘিরে থাকে সালফিউরিক অ্যাসিডের মেঘ। অতি সাধারণ কার্বন মনোক্সাইডের মাধ্যমেই এখানে জৈব বিক্রিয়া হতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, নিউক্লিক অ্যাসিড বেস, ডাইপেপটাইড এবং অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো প্রাণের গঠনকারী এককগুলি এই ধরনের অম্লীয় পরিবেশে স্থিতিশীল থাকে। তাই শুক্রের মেঘে তেমন কিছুর অস্তিত্ব আছে কি না, খোঁজ নেওয়া দরকার। শুক্রের বায়ুমণ্ডল নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন, মেনে নিয়েছেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা।
আরও পড়ুন:
যদিও প্রাণের গঠনকারী এককের উপস্থিতি বা সালফিউরিক অ্যাসিডের বিক্রিয়া পৃথিবীর প্রতিবেশী গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব নিশ্চিত করে না। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, জৈবিক কার্য সম্পাদনের জন্য আরও অনেক জটিল আণবিক কাঠামো, জটিল পলিমার প্রয়োজন। আরএনএ, ডিএনএ-র মতো জেনেটিক পলিমারের উপস্থিতি প্রাণের অস্তিত্বের অন্যতম শর্ত। একাংশের বক্তব্য, শুক্রে সালফিউরিক অ্যাসিডই প্রধান তরল। তাতে ক্ষয় প্রতিরোধকারী জেনেটিক পলিমার শনাক্ত করার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন। কেউ কেউ এই পদক্ষেপকেই মহাকাশে প্রাণের সন্ধানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন।
২০২০ সালে শুক্র গ্রহের মেঘে ফসফিন নামের একটি যৌগ শনাক্ত করা গিয়েছিল। পৃথিবীতে অবায়বীয় প্রাণের জৈবিক প্রমাণ এই ফসফিন। তা এই গ্রহের বায়ুমণ্ডল অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীদের আরও উৎসাহীত করে তুলেছে। শুক্রকেই এখন এ ক্ষেত্রে অন্যতম সম্ভাবনাময় গ্রহ বলা হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের দাবি, এই জটিল জৈব রসায়ন প্রাণের অস্তিত্বকে নিশ্চিত না করলেও তা অন্যতম পূর্বশর্ত বটে। আগামী দিনে শুক্রের বায়ুমণ্ডল এবং মেঘ নিয়ে গবেষণাগুলিকে আরও উৎসাহ দেবে এই আবিষ্কার।