গাছের সঙ্গে শিকল দিয়ে বাঁধা দেহাবশেষ। শিকড়বাকড়ের সঙ্গে অধিকাংশই প্রায় মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। সময়ের ভারে তা এতটাই জীর্ণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত যে, আলাদা করে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে লিঙ্গ নির্ধারণও সম্ভব নয়। জেরুসালেম শহরের এক প্রাচীন বাইজেন্টাইন মঠ থেকে প্রাপ্ত সেই নিদর্শনই খ্রিস্ট ধর্মের প্রাচীন রীতিনীতি সম্পর্কে ধারণা বদলে দিচ্ছে। প্রচলিত ধারণা নিয়ে তুলে দিচ্ছে নানা প্রশ্ন। কারণ, সহস্রাধিক বছরের পুরনো সেই দেহাবশেষের ‘গতি’ করা গিয়েছে অবশেষে। এত দিনে হয়েছে লিঙ্গ নির্ধারণ!
দীর্ঘ দিন ধরেই জেরুসালেমে প্রাপ্ত প্রাচীন মানবদেহের নিদর্শনগুলি নিয়ে গবেষণা চলছিল। সম্প্রতি তার ফলাফল ‘জার্নাল অফ আর্কিয়োলজিক্যাল সায়েন্স’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। দাবি, ওই মানবদেহ কোনও পুরুষের নয়। আসলে তা এক নারীর দেহাবশেষ। তা থেকে প্রমাণিত হয়, প্রাচীন খ্রিস্টধর্মাবলম্বী সমাজে নারীরাও কঠোর তপস্যায় রত ছিল। সেই তপস্যার অন্যতম অঙ্গ ছিল আত্মনির্যাতন!
আরও পড়ুন:
শিকলে বাঁধা দেহাবশেষের তিন টুকরো হাড় এবং একটি দাঁত সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা। মৃত্যুর পর কেটে গিয়েছে প্রায় ১৬০০ বছর। যে বাইজেন্টাইন মঠ থেকে সেগুলি পাওয়া গিয়েছে, আনুমানিক ৩৫০ থেকে ৬৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তার অস্তিত্ব ছিল। জানা যাচ্ছে, মঠের ভিতরে সমাধিকক্ষে একাধিক নারী এবং পুরুষের শ্রেণিবদ্ধ দেহাবশেষ রাখা ছিল। তাদের মধ্যে কিছু শিশুর দেহাবশেষও মিলেছে। তবে একটি দেহাবশেষই ছিল সবচেয়ে আলাদা। কারণ, তাতে শিকল জড়ানো ছিল। গাছের শিকড়ের সঙ্গে মিলে তা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছিল। চোখে দেখে ওই দেহাবশেষের লিঙ্গ নির্ধারণ সম্ভব হয়নি। কোমরের পর থেকে নীচের অংশে প্রয়োজনীয় প্রধান শনাক্তকারী হাড়গুলিই হয়ে উঠেছিল দুর্বোধ্য।
তবে এই দেহাবশেষ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট করতে পেরেছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা। মৃত্যুটি স্বাভাবিক নিয়মে হয়নি। বরং তাতে প্রবল কৃচ্ছ্রসাধন, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং নির্যাতনের ছাপ রয়েছে। মনে করা হচ্ছে, নিজেকেই নিজে গাছের সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধেছিলেন তিনি। দীর্ঘ দিন না খেয়ে থেকেছিলেন। ডেকে এনেছিলেন মৃত্যুকে। প্রাচীন খ্রিস্টধর্মে এই রীতি একেবারে অচেনা নয়। এর আগেও খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী তপস্বীদের মধ্যে প্রবল আত্মপীড়ন ও আত্মসংযমের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। নিজেকে শাস্তি দেওয়া ছিল তপস্যারই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, যা নিয়ে পরবর্তী সময়ে একাধিক বই লেখা হয়েছে। তৈরি হয়েছে সিনেমাও। খ্রিস্ট সমাজের ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের একাংশ এই চরমপন্থার বিরোধিতাও করেছেন। খ্রিস্টীয় তপস্যায় উপোস, ধ্যানের মতো সংযম প্রচলিত ছিল। ইতিহাস বলছে, আত্মপীড়নের চরম পন্থা প্রথম নথিভুক্ত হয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে।
আরও পড়ুন:
জেরুসালেমের দেহাবশেষ থেকে দাঁতের সঙ্গে যে তিন টুকরো হাড় মিলেছে, সেগুলি মেরুদণ্ডের কশেরুকা। দাঁতের এনামেলে থাকা অ্যামেলোজেনিন নামক প্রোটিনের মাধ্যমে এই দেহাবশেষের লিঙ্গ নির্ধারণ করা হয়েছে। নারী এবং পুরুষের দেহে এই প্রোটিনের ধরন কিছুটা আলাদা হয়। লিঙ্গ নির্ধারণের এই পদ্ধতির আবিষ্কারক পলা কোটলি জানান, আমাদের দেহে অ্যামেলোজেনিন জিনের দু’টি কপি রয়েছে। একটি এক্স ক্রোমোজ়োমের উপরে এবং অন্যটি ওয়াই ক্রোমোজ়োমের উপরে। মেয়েদের শরীরে দু’টি এক্স ক্রোমোজ়োম থাকে। তাই তাদের দেহে কেবল এক্স-যুক্ত অ্যামেলোজেনিনই মিলবে। কোনও দাঁতে ওয়াই-যুক্ত অ্যামেলোজেনিন থাকার অর্থ সেটি পুরুষদেহ। এ ক্ষেত্রে অ্যামেলোজেনিনে ওয়াই ক্রোমোজ়োমের কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তাই গবেষকেরা প্রায় নিশ্চিত, এটি নারীর দেহাবশেষ।
যদিও এ ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ নিশ্চয়তা সম্ভব নয়। একাংশের মতে, ১৬০০ বছরের পুরনো দেহাবশেষ থেকে প্রাপ্ত দাঁতের প্রোটিনে কেবল ওয়াই ক্রোমোজ়োমের অনুপস্থিতি লিঙ্গ নির্ধারণ করে দিতে পারে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কালের প্রতিকূলতায় ওয়াই-যুক্ত অ্যামেলোজেনিন নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে— এই সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে দেহাবশেষটি কোনও নারীর হওয়ার সম্ভাবনাই জোরালো। সে ক্ষেত্রে খ্রিস্টধর্মে ভক্তিচর্চা, তপস্যা এবং লিঙ্গ নির্বিশেষে তাতে যোগদানের নতুন তত্ত্ব তৎকালীন সমাজের একটি অচেনা দিককে ইতিহাসের পাতায় তুলে ধরছে। প্রত্নতাত্ত্বিকেরাও তা নিয়ে কৌতূহলী হয়ে উঠেছেন।