‘উৎসব’ দিয়ে প্রশ্ন শুরু হয়েছিল। আনন্দবাজার ডট কমের সেই প্রশ্ন থামিয়ে দিয়ে ফোনে এক নিঃশ্বাসে চেতন যাদব বলে গেলেন, ‘‘কিসের উৎসব! এমন কোনও পরিকল্পনা নেই। সবে তো ছোটদের বিশ্বকাপ জিতল। অন্তত ২০ বছর দেশের হয়ে খেলতে হবে। এখনই মাতামাতির কী আছে? আমার কোচিং সেন্টারে কোনও ব্যানারও লাগাইনি। দেখলেন না হৃষিকেশ কানিতকর ফাইনালের পর বলেছেন, ছেলেরা রাতের খাবার খেয়ে ঘুমোতে চলে যাবে। এটাই ঠিক।’’
ছাত্রের সাফল্যে খুশি অভিজ্ঞান কুন্ডুর ‘ছাত্র’! নিজের ছাত্রকে ‘গুরু’ বলছেন চেতন! কী বলছেন? আপনিই তো ওকে তৈরি করেছেন। চেতন বলতে শুরু করলেন, ‘‘অনূর্ধ্ব-১৪ ক্রিকেটে ওর ১০০টা শতরান রয়েছে। ১৬ বছর বয়সে অভিজ্ঞান ১২৫টা শতরান করেছে। আমি ৪৪ বছর ধরে খেলছি। এখনও মুম্বইয়ে ক্লাব ক্রিকেট খেলি। এখনও পর্যন্ত ওর অর্ধেক শতরানও নেই আমার। এখন আর ও আমার ছাত্র নয়। আমিই এখন ওর ছাত্র। অভিজ্ঞান আমার গুরু।’’
বিশ্বজয়ী ছাত্রকে প্রথম কবে হাতে পেয়েছিলেন? চেতন বললেন, ‘‘তখন ওর পাঁচ বছর বয়স। খুব দুরন্ত ছিল। খালি ছুটত। ১ মিনিট বসানো যেত না। ও আমার কাছে ক্রিকেট শিখতে আসেনি। আমার একটা সেন্টার আছে। সেখানে অনেক বাচ্চা থাকে। যাদের বাবা-মা দু’জনেই কাজ করে, তারা আমার কাছে থাকে। সকাল ৯-১০টার সময় আমার কাছে রেখে বাবা-মা’রা কাজে চলে যান। সন্ধে ৬-৭টায় এসে বাচ্চাকে বাড়ি নিয়ে যান। অভিজ্ঞানও সে রকম থাকতে এসেছিল। আমার কাছে একটা সময় সকাল সাড়ে ৯টা থেকে রাত প্রায় ১১টা পর্যন্ত থাকত।’’
দুরন্ত অভিজ্ঞানকে সামলাতেন কী করে? চেতন বললেন, ‘‘দুরন্ত হলেও ছোট থেকেই ও খুব বাধ্য। দুষ্টুমি করলেও জ্ঞান ছিল টনটনে। কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল বা কোনটা ভাল, কোনটা খারাপ— সব বুঝত। আমি নিজে ক্রিকেটার। রমাকান্ত আচরেকরের কাছে ক্রিকেট শিখেছি। শৃঙ্খলা মেনে চলতে পছন্দ করি।’’ আরও বললেন, ‘‘অভিজ্ঞানদের আর্থিক সমস্যা নেই। বেশ স্বচ্ছ্বল পরিবার। আমি কয়েক জন দরিদ্র বাচ্চার দায়িত্ব নিয়েছি। ওদের সঙ্গে অভিজ্ঞানকে রাখতাম। ওদের সঙ্গে খেলত, খেত, ট্রেনের সাধারণ কামরায় উঠত। জীবনের পাঠ ছোট বয়সেই পেয়েছে ও। ওর বাবা-মা আমায় কখনও বাধা দেননি। আমার কাছে যে বাচ্চারা থাকে, ওদের খেলার ছলে ক্রিকেট শেখাই। শৃঙ্খলার পাঠ দিই। ধৈর্য বাড়ানোর চেষ্টা করি। আমার কাছে খেলা শিখতে এসে ৪৪জন ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে। পাঁচ জন ডাক্তার হয়েছে। কেউ ক্রিকেটার হয়নি। এই আক্ষেপটা থাকলেও ওদের নিয়েও আমি গর্বিত। কারণ শৃঙ্খলা, ধৈর্য না থাকলে কিছুতেই সাফল্য পাওয়া যায় না। সে পড়াশোনা হোক, খেলা হোক বা অন্য কিছু।’’
অভিজ্ঞান কুন্ডু। ছবি: পিটিআই।
অভিজ্ঞান তো ক্রিকেটার হয়েছে। চেতন বললেন, ‘‘হ্যাঁ হয়েছে। সব করতে পারে। উইকেট রক্ষা করতে পারে। এক থেকে আট নম্বর পর্যন্ত ব্যাট করতে পারে। মুম্বইয়ের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে আট নম্বরে খেলে ওর ছ’টা অর্ধশতরান আছে। আপনারা হয়তো জানেন না, ও খুব ভাল স্পিনার। বাঁ হাতে দারুণ অফ স্পিন করে। বলতে পারেন, অভিজ্ঞান আমার স্বপ্নপূরণ করেছে। আমি দেশের হয়ে খেলতে পারিনি। সচিন তেন্ডুলকরের কথা ছেড়ে দিন। আচরেকর স্যরের অ্যাকাডেমি থেকে বিনোদ কাম্বলি, প্রবীণ আমরে, সমীর দিঘেরা দেশের হয়ে খেলেছে। এক বছর কলকাতায় ক্লাব ক্রিকেট খেলতে গিয়েছিলাম। রোহন গাওস্কর বাংলার হয়ে খেলত তখন। ওখানে লক্ষীরতন শুক্লর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল। রোহন, লক্ষ্মীও ভারতীয় দলের হয়ে খেলেছে। আমার সুযোগ হয়নি। অভিজ্ঞান সেই আক্ষেপ মিটিয়ে দিয়েছে।’’
আপনি এখন বিশ্বজয়ী ক্রিকেটারের কোচ। ফাইনালের পর ছাত্রের সঙ্গে কী কথা হল? চেতন বললেন, ‘‘তেমন একটা কথা হয়নি। তবে বলে দিয়েছি, ফিরেই অনুশীলন শুরু করতে হবে। ওর স্কুলের পরীক্ষা রয়েছে। জানি না পরীক্ষা দেবে কি না। পরীক্ষা দিলেও অনুশীলন করবে। যে দিন পরীক্ষা থাকবে না, সে দিন ২ ঘণ্টা ব্যাটিং করবে নেটে। অনুশীলন বাদ দিলে হবে না। যত দিন খেলবে, তত দিন অনুশীলন করতে হবে। কোনও শর্ট কার্ট নেই।’’
আপনি তো বেশ কঠোর কোচ? বিশ্বজয়ী ছাত্রের জন্য উৎসব করবেন না। অনুশীলনেও ছাড় দিতে নারাজ! হেসে ফেললেন চেতন, ‘‘না না, অভিজ্ঞান আমার বন্ধু হয়ে গিয়েছে এখন। আরে স্থানীয় ক্রিকেটে আমরা এক সঙ্গে ওপেন করি। বললাম না, এখন অভিজ্ঞান আমার গুরু। অনেক এগিয়ে গিয়েছে। এখন বয়স ১৭। অনেক দিন খেলতে হবে। এমন কিছু চাই না, যাতে ওর মাথা ঘুরে যায়। এই সময় শৃঙ্খলা আরও বেশি প্রয়োজন। আর ওকে অনুশীলন করতে বললে এক বারও আপত্তি করবে না। সারা দিন অনুশীলন করতে পারে। এই বয়সে এত পরিশ্রম করতে কাউকে দেখিনি।’’
কেমন ওর অনুশীলনের পদ্ধতি? অভিজ্ঞানের কোচ বললেন, ‘‘দিনে ৫০০০ বল খেলে। সকালে আমার কোচিং সেন্টারে বাচ্চাদের সঙ্গে অনুশীলন করে। তখন আড়াই-তিন হাজার বল খেলে। ওর বাড়ির নিচে একটা সেট আপ তৈরি করেছি। সেখানে বিকালে আরও দু’আড়াই হাজার বল খেলে। বাউন্সার খেলে দিনে ৫০০টা। সঙ্গে বোলিং, উইকেট কিপিং সব। অন্তত ৫০ লাখ বল খেলে বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েছে। ১৬ বছর বয়সের মধ্যে ৭০০-র বেশি ছয় মেরেছে। সব স্বীকৃত ম্যাচে। ও যতগুলো শতরান করেছে, সবগুলোর প্রতিটি বল রেকর্ড করে রেখেছি। ওর ৬০০০ জিবি ডেটা আছে আমার কাছে। সমস্ত পরিসংখ্যান লেখা রয়েছে। কবে কোন ম্যাচে কী ভুল করেছে সব লেখা রয়েছে। অসাধারণ প্রতিভাবান। আমার বিশ্বাস এক দিন ও দেশের অধিনায়ক হবে। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো অধিনায়ক হবে। আযুষ মাত্রে না খেলায় একটা ম্যাচে ও অধিনায়ক ছিল। ভারতকে জিতিয়েছে। ফিল্ডিং সাজানো, বোলিং পরিবর্তন খুব ভাল পারে।’’
এখনই এত বড় দাবি করছেন? সবে তো ছোটদের বিশ্বকাপ জিতল। চেতন বলছেন, ‘‘যা বলছি লিখে রাখুন। আরে আপনাদেরও তো গর্বিত হওয়া উচিত। ও তো বাঙালি। আমি কলকাতায় খেলেছি। ময়দানের অনেকের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ রয়েছে। অসম্ভব ফিট ক্রিকেটার অভিজ্ঞান। ৮৬ ওভার উইকেট কিপিং করার পর ৩২০ রানের ইনিংস খেলেছিল। ৯৬ বলের ইনিংস ছিল ওটা। আর একজনের দেখান এমন পারফরম্যান্স। বিশ্বকাপের আগে পর্যন্ত ৭২২টা ক্লাব ম্যাচ খেলেছে। এই বয়সেই। ১৫টা দ্বিশতরান, দুটো ত্রিশতরান রয়েছে ওর। ৪০০ রানের বেশি দুটো ইনিংসও আছে। দ্বিতীয় উদাহরণ দেখান। একটাও বানানো নয়। সব রেকর্ড রয়েছে। কখনও বড় চোট পায়নি। প্রথম বল থেকে ছয় মারতে পারে। আমরা দু’জনে বৃষ্টির মধ্যেও অনুশীলন করি। তার মধ্যেও ছয় মারতে পারে। আপনারা বৈভব সূর্যবংশীকে দেখছেন। ও খুব ভাল ক্রিকেটার। বয়স আরও কম। অভিজ্ঞান অনেক বেশি মারতে পারে। ভারতীয় দলে ওকে আটকে রাখা হয়েছে। হাত খুলে মারতে দেওয়া হয়নি। ভিভিএস লক্ষ্ণণ, কানিতকরেরা অভিজ্ঞানকে একটা বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ম্যাচ শেষ করার দায়িত্ব। সে ভাবে খেলতে হয়েছে।’’
(ডান দিকে) চেতন যাদব এবং অভিজ্ঞান কুন্ডু (ডান দিকে)। ছবি: সংগৃহীত।
আপনি চান, অভিজ্ঞান ২০ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলুক। এখনকার খেলাধুলো অনেক বিজ্ঞানসম্মত। ফিটনেসের ব্যাপার থাকে। ডায়েট থাকে। অভিজ্ঞানের এই দিকগুলো কী ভাবে সামলান?
অবাক করলেন চেতন। বললেন, ‘‘আমাদের এখানে ও সব কিছু নেই। আমরা বড়া পাও খেয়ে ক্রিকেট খেলি। সব খাই। যত খিদে পায়, তত খাই। শুনুন, আমার গুরু আচরেকর। স্যর আমাদের এ ভাবেই তৈরি করেছেন। সচিন, কাম্বলি, আমরে, অমল মুজুমদারেরা এ ভাবেই তৈরি হয়েছে। ইয়ো ইয়ো পরীক্ষায় অভিজ্ঞানের স্কোর ১৭.২। ভারতীয় দলের অনেকের নেই। আমাদের অত আধুনিক ব্যাপার নেই। আমরা পুরনো পদ্ধতিতে বিশ্বাসী। স্যরের কাছে যেমন শিখেছি, ছাত্রদের তেমনই শেখাই। তা ছাড়া নবি মুম্বইয়ে আমার অ্যাকাডেমি খুবই ছোট। আমি মালিক, আমিই মালি। অভিজ্ঞান আর আমি মিলে জঞ্জাল পরিষ্কার করি। অনেক সময় জায়গার অভাবে আন্ডার হ্যান্ড বোলিংয়েও অনুশীলন করে অভিজ্ঞান।’’
অভিজ্ঞান এখন ভারতীয় ক্রিকেটে পরিচিত মুখ। ছোটদের বিশ্বকাপে একাধিক ভাল ইনিংস খেলেছে চাপের মুখে। আইপিএল খেলার প্রস্তাব এলে ছাড়বেন? চেতনের বক্তব্য, ‘‘অবশ্যই। এখন যেখানে খেলতে চাইবে, সেখানেই খেলতে পাঠাব। তা ছাড়া অনূর্ধ্ব-১৯ ভারতীয় দলে খেলায় এখন মূলত ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে থাকবে ও। ওরাই ঠিক করবে সব কিছু। আইপিএলের দু’তিনটে দলে ট্রায়াল দিয়েছে। হয়তো আগামী বছর কোনও দলে সুযোগ পাবে। চেন্নাই সুপার কিংসের হয়ে খেলার সম্ভাবনাই বেশি। ওদের ওকে পছন্দ হয়েছে। এটা কিন্তু আপনাকেই প্রথম বললাম।’’
ছাত্রের জন্য কোনও লক্ষ্য ঠিক করেছেন? চেতন চমকে দিলেন, ‘‘অবশ্যই। যে কোনও ক্রিকেটার বিশ্বকাপ জিততে চায়। এটা স্বাভাবিক লক্ষ্য। ছোটদেরটা জিতেছে। বড়দের বিশ্বকাপও জিততে হবে ওকে। আমি চাই ও এমন একজন খেলোয়াড় হোক যাতে ভারতরত্ন পায়। অভিজ্ঞানকে ওই উচ্চতায় পৌঁছোতে হবে। এক মাত্র সচিন স্যর ভারতরত্ন পেয়েছেন ক্রীড়াজগৎ থেকে। আমার বিশ্বাস অভিজ্ঞানও পাবে। বিশ্বকাপ জেতার লক্ষ্যে থামলে হবে না। দুর্দান্ত ক্রিকেট প্রতিভা। পড়াশোনাতেও ভাল। ক্লাস টেনের পরীক্ষায় ৮০ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়েছে। ভীষণ ভাল ছেলেও। সব কথা শোনে। অসম্ভব বিনয়ী। ওর বাবা-মাও অসম্ভব ভাল মানুষ। পরিবারের সকলেই। না মিশলে বোঝা যায় না।’’
আরও পড়ুন:
অভিজ্ঞানের কি কোনও দুর্বলতা নেই? চেতন বললেন, ‘‘ব্যাটিংয়ে সব ঠিক আছে। কোনও সমস্যা নেই। অভিজ্ঞতা যত বাড়বে, তত ধার বাড়বে। কিপিংয়ে একটু সমস্যা রয়েছে। দ্রুত ঠিক হয়ে যাবে। আমি নিজেও তো উইকেটরক্ষক-ব্যাটার। আচরেকর স্যরও তাই ছিলেন। সমস্যা হবে না। যা যা শিখেছি, সব দিয়ে দেব ওকে।’’ আপনি ছাত্রকে নিয়ে এত আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু ওর বয়সের তো আরও উইকেটরক্ষক-ব্যাটার দেশে রয়েছে। ভারতীয় দলেই তো এখন তিন-চার জনের লাইন। সুযোগ পাওয়া কি এত সহজ? একটু মেজাজ হারালেন চেতন, ‘‘আপনাদের এই সমস্যা। সব সময় প্রতিপক্ষ খোঁজেন। আপনারা খুঁজুন। আমি বলছি, অভিজ্ঞানের কাছাকাছি বয়সের কোনও প্রতিপক্ষ এ দেশে নেই। চ্যালেঞ্জ রইল। যে কারও পরিসংখ্যান ওর রেকর্ডের পাশে ফেলুন। ও-ই সেরা।’’
বিশ্বকাপ জয়কে গুরুদক্ষিণা হিসাবে দেখছেন চেতন। তবে প্রিয় ছাত্রের কাছ থেকে আগেই পেয়েছেন উপহার। চেতনের ২৫ বছরের পুরনো স্কুটারটা আর চলছিল না। কোচকে একটা বাইক কিনে দিয়েছেন তরুণ উইকেটরক্ষক-ব্যাটার।