প্রথম বার রঞ্জি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন জম্মু-কাশ্মীর। ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটে তৈরি হল নতুন ইতিহাস। ফাইনালে শক্তিশালী কর্নাটককে তাদেরই ঘরের মাঠে হারিয়ে দিলেন পরশ দোগরা, আকিব নবিরা। ফাইনালের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত লোকেশ রাহুল, ময়ঙ্ক আগরওয়াল, প্রসিদ্ধ কৃষ্ণদের কোণঠাসা করে ট্রফি জিতলেন উপত্যকার ক্রিকেটারেরা। অমীমাংসিত ফাইনালে হার মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকল না কর্নাটকের।
ফাইনালে তো দূরের কথা, অতীতে কখনও রঞ্জি ট্রফির সেমিফাইনালেও উঠতে পারেনি জম্মু-কাশ্মীর। অথচ এ বার নক আউট পর্বে পর পর তিন ম্যাচে মধ্যপ্রদেশ, বাংলা এবং কর্নাটকের মতো দলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হল তারা। ভারতীয় ক্রিকেটে জম্মু-কাশ্মীরের এমন উত্থান বিস্মিত করেছে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের। মাঠে বসে জয় উপভোগ করেছেন জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাও। চ্যাম্পিয়ন দলের জন্য তিনি ২ কোটি টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন।
এ বার রঞ্জি ট্রফিতে অন্যতম শক্তিদল ছিল কর্নাটক। সেমিফাইনাল পর্যন্ত দাপুটে
ক্রিকেট খেলে জিতেছে তারা। কর্নাটক দলে অন্তত ছ’জন ক্রিকেটার রয়েছেন, যাঁরা ভারতের
হয়ে খেলেছেন। তাঁদের মধ্যে রাহুল, প্রসিদ্ধের মতো ক্রিকেটারেরাও রয়েছেন। অথচ ঘরের
চেনা পিচে জম্মু-কাশ্মীরকে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়ই করাতে পারেননি তাঁরা। ফাইনালে
জম্মু-কাশ্মীরে এমন একপেশে জয়ও অবাক করার মতো। শূন্য থেকে একেবারে শিখরে পৌঁছোল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) সভাপতি মিঠুন মানহাসের রাজ্য। যে যাত্রায় অবদান রয়েছে তাঁরও।
প্রথম ইনিংসে জম্মু-কাশ্মীরের ৫৮৪ রানের জবাবে কর্নাটকের প্রথম ইনিংস শেষ হয় ২৯৩ রানে। প্রথম ইনিংসে ২৯১ রানে লিড পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জম্মু-কাশ্মীরের রঞ্জি জয় এক রকম নিশ্চিত হয়ে যায়। কর্নাটককে তাদের ঘরের মাঠে ফলো অন করিয়ে আরও লজ্জায় ফেলতে পারতেন পরশেরা। কিন্তু সে পথে না হেঁটে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। প্রথম ইনিংসে লিড পেয়ে ট্রফি প্রায় নিশ্চিত করে ফেলা জম্মু-কাশ্মীর শিবির কোনও ঝুঁকি নিতে চায়নি। প্রতিপক্ষকে লজ্জায় ফেলার থেকে নিজেদের ঐতিহাসিক সাফল্যকে সুরক্ষিত করার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা।
দ্বিতীয় ইনিংসে ১১ রানে ২ উইকেট হারিয়ে সাময়িক চাপেও পড়ে যায় জম্মু-কাশ্মীর। ম্যাচে ফেরার আশা তৈরি করেছিলেন দেবদত্ত পাড়িক্কলেরা। কিন্তু সেই আশায় জল ঢেলে দেন উপত্যকার ওপেনার কামরান ইকবাল। ২২ গজের অন্য প্রান্তে উইকেট পড়লেও একটি প্রান্ত তিনি আগলে রাখেন। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন ছ’নম্বরে নামা সাহিল লোতরা। শেষ পর্যন্ত ২২ গজে থাকেন তাঁরা। ইকবাল অপরাজিত থাকলেন ১৬০ রানে। লোতরার ব্যাট থেকে এল ১০১ রানের অপরাজিত ইনিংস। তাঁদের অসমাপ্ত জুটিতে উঠল ১৯৭ রান। জম্মু-কাশ্মীর দ্বিতীয় ইনিংস ছাড়ল ৪ উইকেটে ৩৪২ রান তুলে। ৬৩৩ রানে এগিয়ে গিয়ে পঞ্চম দিনের চা পানের বিরতির অল্প কিছুক্ষণ আগে। সে সময় আর রান তাড়া করা সম্ভব ছিল না কর্নাটকের। চেষ্টাও করেননি পাড়িক্কলেরা। হার মেনে নেয় কর্নাটক।
জম্মু-কাশ্মীরের রঞ্জি সাফল্যের কারিগরদের মধ্যে পরশ, নবি ছাড়াও রয়েছেন
আব্দুল সামাদ, কানাহাইয়া ওয়াধাবন, সুনীল কুমার, যুধবীর সিংহের মতো ক্রিকেটারেরা।
সামাদ ১০টি ম্যাচে ৫৭.৫৩ গড়ে ৭৪৮ রান করেছেন। একটি শতরান এবং পাঁচটি অর্ধশতরান
করেছেন। অধিনায়ক পরশ ১০টি ম্যাচে ৪৯.৫৩ গড়ে করেছেন ৬৩৭ রান। ২টি শতরান এবং ৪টি
অর্ধশতরান করেছেন পরশ। উইকেটরক্ষক-ব্যাটার কানাহাইয়া ১০টি ম্যাচে ৩৬.৪৬ গড়ে ৪৭৪
রান করেছেন। ১টি শতরান এবং ২টি অর্ধশতরান করেছেন তিনি। বোলারদের মধ্যে নবি এ বারের
রঞ্জি ট্রফিতে সফলতম। ১০টি ম্যাচ খেলে ৬০ উইকেট নিয়েছেন। ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছেন
সাত বার। সুনীল ৯টি ম্যাচ খেলে ৩১টি উইকেট নিয়েছেন। দু’বার ইনিংসে ৫ উইকেট
নিয়েছেন। যুধবীর ৭টি ম্যাচ খেলে নিয়েছেন ২১টি উইকেট। এক বার ইনিংসে ৫ উইকেট
নিয়েছেন। দলের বাকিরাও ধারাবাহিক ভাবে পারফর্ম করেছেন।
জম্মু-কাশ্মীরের এই জয়ের নেপথ্যে রয়েছে দলগত প্রচেষ্টা এবং সাফল্য। দু’এক জনের উপর নির্ভর করেননি উপত্যকার ক্রিকেটারেরা। একসঙ্গে স্বপ্নকে তাড়া করেছেন। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পরিশ্রম করেছেন। লড়াই করেছেন। প্রতিপক্ষ দলগুলিতে তাদের ঘরের মাঠে গিয়ে হারিয়েছেন। পিচ বা আবহাওয়া নিয়ে না ভেবে নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিয়েছেন।
আরও পড়ুন:
জম্মু-কাশ্মীরে ক্রিকেটের অত্যাধুনিক পরিকাঠামো নেই। কোচিং ক্যাম্প বা অ্যাকাডেমিও বেশি নেই। খুব বেশি ক্লাব ক্রিকেটও হয় না। বছরের কয়েক মাস খেলার মতো আবহাওয়া থাকে না। নানা প্রতিবন্ধতা মোকাবিলা করেই এই জায়গায় উঠে এসেছে জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেট। নিজেদের প্রমাণ করার তাগিদ, হার না মানা মনোভাব এবং সীমিত পরিকাঠামো-সুযোগকে সম্বল করেই এগিয়েছেন পরশ, নবিরা। বলা ভাল, ভারতীয় ক্রিকেটের শীর্ষে চড়েছেন। দীর্ঘ ৬৭ বছরের চেষ্টায় এল সাফল্য।