বাংলাদেশকে নিয়ে তৈরি হওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সমস্যা সমাধান করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা (আইসিসি)। বার বার আলোচনা এবং নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বাস দেওয়া পরও ভারতে দল পাঠাতে রাজি হয়নি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। সরকারের কথায় অনড় অবস্থান নেওয়ায় বাংলাদেশের পরিবর্তে স্কটল্যান্ডকে নেওয়া হয়েছে বিশ্বকাপে। এর পরই বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে জয় শাহের আইসিসিকে বিশ্বকাপ বয়কটের হুঁশিয়ারি দিয়ে পরিস্থিতি নতুন করে জটিল করার চেষ্টা করছে পাকিস্তান।
নতুন জটিলতা তৈরি করছে পাকিস্তান
ভারত থেকে বিশ্বকাপের ম্যাচ সরিয়ে দেওয়ার দাবি করেছিল বাংলাদেশ। আইসিসির বোর্ডের কোনও সদস্য সেই দাবিকে আমল দেয়নি। শ্রীলঙ্কাও তাদের গ্রুপে বাংলাদেশকে নিয়ে রাজি হয়নি। পাকিস্তান ছাড়া কাউকে পাশে না পেয়ে ক্রিকেটবিশ্বে কোণঠাসা বাংলাদেশ। এই পরিস্থিতিতে ‘নায়ক’ হওয়ার চেষ্টা করছেন পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) চেয়ারম্যান মহসিন নকভি। আইসিসির বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ তুলে শনিবার নকভি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে যা হয়েছে তা অন্যায়। তাঁদেরও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলার নিশ্চয়তা নেই জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, এ ব্যাপারে যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাকিস্তান সরকার নেবে। তাঁরা প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফের দেশে ফেরার জন্য অপেক্ষা করছেন। তা-ও রবিবার সলমন আলি আঘার নেতৃত্বে বিশ্বকাপের জন্য ১৫ সদস্যের দল ঘোষণা করেছে পিসিবি!
পিসিবির ভূমিকায় ক্ষুব্ধ আইসিসি
নকভি নতুন করে জটিলতা তৈরি করতে চাওয়ায় ক্ষুব্ধ আইসিসি। প্রয়োজনে কড়া ব্যবস্থার কথা ভেবে রেখেছেন জয়রা। পাকিস্তান বিশ্বকাপ না খেললে বিকল্প দল হিসাবে উগান্ডার কথাও তাঁদের মাথায় রয়েছে। ক্রমতালিকার ভিত্তিতেই সুযোগ পাবে আফ্রিকার দেশটি। পাকিস্তান সুর চড়ানোর চেষ্টা করতেই আইসিসি ইঙ্গিত পরিষ্কার করে দিয়েছে। সূত্রের খবর, পাকিস্তান যদি সত্যিই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলে, তা হলে তাদের উপর আইসিসি এমন নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞা জারি করার কথা ভাবছে যা পাকিস্তানকে ক্রিকেট বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। এক, সমস্ত দ্বিপাক্ষিক সিরিজ থেকে নির্বাসন। দুই, এশিয়া কাপ থেকে বহিষ্কার। তিন, অন্য দেশের ক্রিকেট বোর্ডগুলিকে রাজি করিয়ে ‘নো এনওসি’ নীতি কার্যকর করা, যাতে বিদেশি তারকারা পাকিস্তান সুপার লিগে যোগ দিতে না পারেন। এবং পাকিস্তানের ক্রিকেটারেরা যাতে বিদেশের লিগে খেলতে না পারেন। এর পর পাকিস্তান আর কতটা সুর চড়াবে সে দিকে লক্ষ্য থাকবে ক্রিকেট বিশ্বের। একটি বিষয় পরিষ্কার, বাংলাদেশ ছাড়া তাদের সঙ্গে কেউই সম্ভবত থাকবে না।
প্রতিশ্রুতি রাখলেন না বিসিবি কর্তারা
বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ায় চাপে পড়ে গিয়েছেন বিসিবি কর্তারাও। শনিবার রাতেই বিসিবির বোর্ড বৈঠকে বসে। তার আগেই পারিবারিক সমস্যা এবং ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণ দেখিয়ে ইস্তফা দেন বিসিবির অন্যতম ডিরেক্টর ইশতিয়াক সাদেক। তিনি ছিলেন গেম ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান। পরে বোর্ডের বৈঠকে লিটন দাস, নাজমুল হোসেন শান্তদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভুলে গিয়ে পদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে বিতর্কিত ডিরেক্টর এম নাজমুল ইসলামকে। ক্রিকেটারদের সম্পর্কে একাধিক আপত্তিকর মন্তব্য করে বিতর্কে জড়ান নাজমুল। তাঁর ক্ষমা চাওয়া এবং ইস্তফার দাবিতে সব ধরনের ক্রিকেট বয়কটের ডাক দেয় বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সংগঠন। এক দিন বন্ধ থাকে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের খেলাও। চাপের মুখে তাঁকে গত ১৫ জানুয়ারি অপসারিত করে বিসিবি। কিন্তু বিপিএল শেষ হতেই আমিনুল ইসলাম বুলবুলেরা তাঁকে শুধু ফিরিয়েই নিলেন না, পুরনো পদেও বসিয়ে দিয়েছেন। ক্রিকেটারদের সঙ্গে প্রায় প্রতারণাই করলেন তাঁরা।
বিসিবি কর্তাদের ঢাল শাকিব
পরিস্থিতি সামাল দিতে শনিবারের বৈঠকেই সর্বসম্মত ভাবে শাকিব আল হাসানকে জাতীয় দলে ফেরানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিসিবির অন্যতম ডিরেক্টর আমজাদ হোসেন জানিয়েছেন, বাংলাদেশ দলের দরজা শাকিব আল হাসানের জন্য খোলা।তিনি বলেন, ‘‘শাকিবের জন্য জাতীয় দলের দরজা খোলা। দল নির্বাচনের সময় শাকিবের বিষয়টি নির্বাচকেরা অবশ্যই বিবেচনা করবেন। দেশে এবং বিদেশের সব সিরিজ়ের জন্যই শাকিবের কথা ভাবা হবে। শাকিবের ফিটনেস সংক্রান্ত সমস্যা না থাকলে এবং অন্য ব্যস্ততা না থাকলে দলে থাকতেই পারে।’’ বিসিবির আর এক কর্তা শাকিব সম্পর্কে সুর নরম করে বলেছেন, ‘‘আওয়ামী লীগের সাংসদ হওয়ার অনেক আগে থেকেই শাকিব বাংলাদেশের সেরা ক্রিকেটারদের এক জন। বাংলাদেশের ক্রিকেটে শাকিবের অবদান কেউ মুছতে পারবে না। তার জন্য জাতীয় দলের দরজা সব সময় খোলা।’’ অথচ বাংলাদেশের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং খুনের মামলয়া জড়িয়ে দেওয়ার কারণে এক বছরের বেশি সময় দেশে ফিরতে পারেননি বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার। ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর দেশের জার্সি পরে খেলতেও পারেননি। অনেকেই মনে করছেন, বিশ্বকাপ থেকে বাদ যাওয়ায় শাকিবকে ঢাল করে পিঠ বাঁচাতে চাইছেন বিসিবি কর্তারা। সে কারণেই তাঁদের মুখে হঠাৎ শাকিবের নাম শোনা যাচ্ছে।
আরও পড়ুন:
আইসিসিকে দুষছেন আফ্রিদি
গোটা পরিস্থিতি নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন বিরক্ত প্রাক্তন ক্রিকেটারেরা। আইসিসির ভূমিকার সমালোচনা করেছেন শাহিদ আফ্রিদি। পাকিস্তানের প্রাক্তন অধিনায়ক সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘‘প্রাক্তন ক্রিকেটার হিসাবে আইসিসির অসঙ্গতি দেখে আমি হতাশ। গত বছর নিরাপত্তা কারণ দেখিয়ে পাকিস্তানে খেলতে আসেনি ভারত। আইসিসি তখন ভারতের উদ্বেগ মেনে নিয়েছিল। অথচ বাংলাদেশের একই উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া হল না।’’ প্রাক্তন অলরাউন্ডার আরও লিখেছেন, ‘‘নিয়ম সব ক্ষেত্রে একই হওয়া উচিত। আইসিসির দায়িত্ব সম্পর্কের বন্ধন তৈরি করা। সম্পর্ক ভাঙা নয়।’’ আফ্রিদির বোঝাতে চেয়েছেন, আইসিসি ভারতকে বাড়তি সুবিধা দিলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অন্য রকম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
হরভজনের রোষে পিসিবি
পিসিবিকে দুষেছেন হরভজন সিংহ। ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার বলেছেন, ‘‘পাকিস্তান ঘোলা জলে মাছ ধরার চেষ্টা করছিল। পাকিস্তান শ্রীলঙ্কায় খেলবে। আগে থেকেই এটা ঠিক ছিল। নতুন যে সমস্যাটা তৈরি হয়েছিল, তার সঙ্গে ওদের সম্পর্ক ছিল না। তা-ও কেন আগবাড়িয়ে হস্তক্ষেপ করছে? শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশই বিশ্বকাপ থেকে বাদ হয়ে গেল।’’ ভাজ্জি বাংলাদেশেরও সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘‘ভারতে খেলতে আসার আপত্তি নিয়ে ওরা আগে আইসিসির সঙ্গে আলোচনা করতে পারত। তা না করে প্রথমে নিজেরাই ঘোষণা করে দিল। আলোচনার রাস্তা খোলা রেখে এগোনো উচিত ছিল। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়া হলে হয়তো ওদের তেমন সুযোগ থাকত না। কিন্তু এ বার ওরা দ্বিতীয় পর্বে পৌঁছোতে পারত। সুপার এইটে হয়তো একাধিক অঘটনও ঘটাতে পারত। শেষ পর্যন্ত যা হল সেটা আসলে বাংলাদেশেরই পরাজয়। অন্য কারও হার নয়।’’
হরভজনের মতে বাংলাদেশের ক্রিকেট কর্তাদের আরও পরিণত এবং ইতিবাচক ভূমিকা নেওয়া উচিত ছিল। প্রথমেই একতরফা ভাবে নিজেদের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে দিয়ে সমস্যা সমাধানের রাস্তাই তাঁরা প্রায় বন্ধ করে দেন। পাকিস্তানের ইন্ধনে আখেরে ক্ষতি হল বাংলাদেশের ক্রিকেটেরই।