আইপিএলে হারের হ্যাটট্রিক চেন্নাই সুপার কিংসের। পাঁচ বারের ট্রফিজয়ীরা এ বার হারল বেঙ্গালুরুর কাছে। আইপিএলে এই ম্যাচ দক্ষিণী ডার্বি নামে পরিচিত। দু’দলের কাছেই সম্মানের লড়াই। সেই দ্বৈরথে একপেশে ভাবে জিতল বেঙ্গালুরু। প্রথমে ব্যাট করে বেঙ্গালুরু তুলেছিল ২৫০/৩। জবাবে চেন্নাই থেমে গেল ২০৭ রানে। টানা দ্বিতীয় ম্যাচ জিতল বেঙ্গালুরু।
ম্যাচের পর রুতুরাজ গায়কোয়াড় আক্ষেপ করতেই পারেন, কেন টসে জিতে প্রথমে ব্যাটিং নিলেন না। বেঙ্গালুরুর পিচ এবং মাঠের ছোট আয়তন কাজে লাগিয়ে যে ভাবে ফিল সল্ট, দেবদত্ত পডিক্কল, টিম ডেভিডরা রান করে গেলেন, তার ছিটেফোঁটাও দেখা গেল না চেন্নাইয়ের খেলায়। সরফরাজ় খান এবং প্রশান্ত বীর ছাড়া কাউকে পাওয়া গেল না, যিনি বেঙ্গালুরুর পাহাড়প্রমাণ রানের বিরুদ্ধে ন্যূনতম লড়াই করতে পারেন।
আইপিএলের আগে ঘটা ঘরে রাজস্থান থেকে সঞ্জু স্যামসনকে ছিনিয়ে নিয়েছিল চেন্নাই। ১৮ কোটি টাকার ক্রিকেটারকে নিয়ে উৎসাহের কমতি ছিল না। নতুন দলের হয়ে সেই সঞ্জুর অবদান ৬, ৭ এবং ৯। এখনও দু’অঙ্কের রানে পৌঁছতে পারেননি। যে ম্যাচে তাঁর সবচেয়ে বেশি অবদান দরকার ছিল, যে ম্যাচ তাঁকে রাতারাতি নায়ক করে দিতে পারত চেন্নাই জনতার মনে, সেই ম্যাচেই তিনি ক্রিজ়ে টিকলেন মাত্র ৫ বল। একটি ছয় ছাড়া কোনও অবদান নেই।
চলতি প্রতিযোগিতায় কলকাতার বোলিংয়ের ভঙ্গুর দশা দু’টি ম্যাচেই বোঝা গিয়েছে। দেখা যাচ্ছে, তাদের টক্কর দিতে পারে চেন্নাই। টানা দু’টি ম্যাচে ২০০-র উপর রান হজম করল তারা। রবিবার তাদের বোলিং নিয়ে ছেলেখেলা করলেন সল্ট, পডিক্কল, ডেভিডেরা। অস্ট্রেলীয় ডেভিড এত বড় বড় ছক্কা মারলেন (১০৬ মিটার) যে একটি বল স্টেডিয়ামে বাইরে চলে গেল! খলিল আহমেদ, ম্যাট হেনরি, অংশুল কম্বোজ, নূর আহমেদদের দিয়ে একটি ম্যাচ জেতা যেতে পারে, প্রতিযোগিতা কখনও জেতা যায় না। কলকাতার মতো চেন্নাইয়ের হাতেও বিকল্প খুব কম। ফলে আইপিএলে তাদের পারফরম্যান্স যে ভবিষ্যতে উন্নত হবে সেই ভরসা অন্তত এখনই করা যাচ্ছে না।
২৫১ রান তাড়া করতে নামা এখনও যে কোনও টি-টোয়েন্টি ম্যাচে কঠিন কাজ। সেই ম্যাচে যদি কোনও দল পাওয়ার প্লে-র মধ্যে ৩০ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলে, তা হলে আর কিছু পড়ে থাকে না। সেটাই হল। সঞ্জুর (৯) পাশাপাশি ব্যর্থ রুতুরাজ (৭), আয়ুষ মাত্রে (১), কার্তিক শর্মা (৬)।
সরফরাজ় খান একটু লড়াই করার চেষ্টা করেছিলেন। আটটি চার এবং দু’টি ছয়ের সাহায্যে ২৫ বলে ৫০ করেন। পরের দিকে প্রশান্ত বীর ২৯ বলে ৪৩ করেন। কিন্তু জয়ের জন্য কখনওই তা প্রয়োজনীয় ছিল না। এত বড় রান তুলতে গেলে দরকার ছিল বড় জুটি। সেটাই হল না চেন্নাইয়ের।
এ দিন চিন্নাস্বামীতে শেষ বেলায় টিম ডেভিডের ঝড় দেখা যায়। সঙ্গে পডিক্কল, পাটীদার এবং সল্টের আগ্রাসন। বিরাট কোহলি বড় রান পেলেন না ঠিকই। কিন্তু যিনিই ক্রিজ়ে নামলেন তিনিই রান করলেন। বেঙ্গালুরুর শুরুটা মোটেই ভাল হয়নি। প্রথম তিন ওভারে ওঠে মাত্র ১৭ রান। একটিও বাউন্ডারি মারতে পারেননি ফিল সল্ট এবং বিরাট কোহলি। পাওয়ার প্লে-র অর্ধেক পেরিয়ে যাওয়ার পরেও তা কাজে লাগাতে না পেরে কিছুটা দমে গিয়েছিলেন দুই ওপেনার।
পরিস্থিতি বদলায় চতুর্থ ওভারে। ম্যাট হেনরির দ্বিতীয় বলে ছয় মেরে শুরু করেন কোহলি। সেই ওভারে একটি চারও মারেন। মোট ১৬ রান আসে সেই ওভার থেকে। পঞ্চম ওভারেই অবশ্য চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামকে চুপ করিয়ে দেন কম্বোজ। একটু বাউন্স রেখে বল করেছিলেন। কোহলি (২৮) পুল করতে চেয়েও ব্যাটের ঠিকঠাক জায়গায় বল লাগাতে পারেননি। লং অনে ক্যাচ ধরেন শিবম।
কোহলি ফিরে গেলেও রানের গতি কমতে দেননি সল্ট। যোগ্য সঙ্গত দেন পডিক্কল। বেঙ্গালুরুতে আসার পর থেকেই বদলে গিয়েছে পডিক্কলের খেলা। টানা দ্বিতীয় ম্যাচে অর্ধশতরান করলেন কর্নাটকের ব্যাটার। শুধু তাই নয়, তাঁর খেলার মধ্যে বাড়তি আত্মবিশ্বাসও লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রতিটি শটের মধ্যে ছিল প্রতিভার ছাপ।
সল্টের অবশ্য নতুন করে কিছু চেনানোর নেই। চিন্নাস্বামী এখন চেনেন হাতের তালুর মতোই। ছোট মাঠ হওয়ায় সল্টের পক্ষে বড় শট খেলতেও সুবিধা হচ্ছিল। ভুল করলেন এক বারই। তাতেই আউট হলেন। শিবমের উঁচু হয়ে আসা বল পুল করতে গিয়েছিলেন। নূর আহমেদ ক্যাচ ধরেন ডিপ ফাইন লেগে। আউট হওয়ার পরেই সল্টের মুখভঙ্গি দেখে বোঝা যায় তিনি নিজের উপরেই রেগে গিয়েছেন। তিনটি চার এবং দু’টি ছয়ের সাহায্যে ৩০ বলে ৪৬ করেন সল্ট।
পডিক্কলের মতো চলতি মরসুমে ফর্মে রয়েছেন রজত পাটীদারও। এ দিন তাঁর খেলাতেও পাওয়া গেল আগ্রাসন। অবলীলায় বল উড়িয়ে দিচ্ছিলেন মাঠের বাইরে। চেন্নাইয়ের কোনও বোলারকে দাঁড়াতে দেননি। হায়দরাবাদ ম্যাচের পর আবার অর্ধশতরান করেন পডিক্কল। তার পরেই আউট হন। তাঁর ২৯ বলে ৫০ রানের ইনিংসে রয়েছে পাঁচটি চার এবং দু’টি ছক্কা।
বেঙ্গালুরু সবচেয়ে বেশি মজা পেয়েছে ডেভিডের খেলায়। দীর্ঘদেহী ডেভিড যে দিন ফর্মে থাকবেন সে দিন বিপক্ষকে সুযোগ দেবেন না বিশেষ। রবিবার মনে হল, এটাই সেই দিন। ১৭তম ওভারে নূরকে তিনটি ছক্কা হাঁকালেন। তাঁর মধ্যে একটি ৮২ মিটার গেল। পরের ওভারেই কম্বোজের বলে ছিটকে গিয়েছিল ডেভিডের স্টাম্প। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাড়া করল চেন্নাইকে। লাইনের বাইরে পা থাকায় সেটি ‘নো বল’ ডাকেন আম্পায়ার। ‘ফ্রি হিট’ আবার দর্শকাসনে পাঠিয়ে দেন ডেভিড।
আরও পড়ুন:
সবচেয়ে নির্মম ছিলেন জেমি ওভার্টনের উপরে। ১৯তম ওভারে বল করতে এসেছিলেন ওভার্টন। তাঁর ওভারে চারটি ছয় ও একটি চার মারেন ডেভিড। একটি ছয় স্টেডিয়ামের বাইরে বেরিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তিনি ২৫ করে ৭০ করে থামলেন। মেরেছেন তিনটি চার এবং আটটি ছয়। পাটীদারের ১৯ বলে অপরাজিত ৪৮ রানের ইনিংসে রয়েছে একটি চার এবং ছ’টি ছয়।