চলতি আইপিএলে ৪৯টি ম্যাচের মধ্যে ৪০টিতে ২০০-র বেশি রান হয়েছে। এই ৪০টি ম্যাচের মধ্যে ১৩টিতে ২০০-র বেশি রান তাড়া করে জিতেছে দল। এমনকি, ২৬৫ রানও সাফল্যের সঙ্গে তাড়া করা গিয়েছে। ফলে ২২০ রান করেও নিশ্চিন্ত হতে পারছে না দলগুলি। গত বছর পর্যন্তও ঘরের মাঠের সুবিধা নিতে পারত তারা। সেই সুবিধা এ বার আর দেখা যাচ্ছে না। তার নেপথ্যে রয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। এই পরিস্থিতিতে জল্পনা শুরু হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত ব্যুমেরাং হয়ে যাবে না তো।
ঘরের মাঠকে দুর্গ বানানোর দিন শেষ
একটা সময় ছিল, যখন ঘরের মাঠকে দুর্গ বানিয়ে ফেলত বেশ কিছু দল। যেমন চিপক স্টেডিয়ামে চেন্নাই সুপার কিংসকে হারানো প্রায় অসম্ভব ছিল। একটা সময় ইডেন গার্ডেন্সে সুনীল নারাইনদের দাপটে একের পর এক ম্যাচ জিতত কলকাতা নাইট রাইডার্স। ওয়ানখেডেতে মুম্বই ইন্ডিয়ান্সকে হারানোও প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু সেই দিন শেষ। ঘরের মাঠের কোনও সুবিধা নিতে পারছে না দলগুলি।
নিলাম টেবিলে সমস্যা
আগে প্রতিটি দল নিজের ঘরের মাঠের পিচ অনুযায়ী দল তৈরি করত। ঘরের মাঠের সাত ম্যাচকে পাথির চোখ করত প্রত্যেকে। যেমন, চেন্নাই গুরুত্ব দিত মিডিয়াম পেসার ও স্পিনারদের উপর। চিপকের লাল মাটির উইকেটে মন্থর বোলিংয়ে বাজিমাত করতেন মহেন্দ্র সিংহ ধোনিরা। লখনউয়ের মাঠের উইকেট বরাবর বোলিং সহায়ক। ফলে লখনউ সুপার জায়ান্টস পেসারদের দিয়ে ম্যাচ জেতার পরিকল্পনা করত। কেকেআরও বোলারদের উপর নির্ভর করত ম্যাচ জেতার জন্য। ইডেনের উইকেটে পেসারেরা যেমন সুইং পেতেন, তেমনই স্পিনের ভেলকি দেখাতেন নারাইন, বরুণ চক্রবর্তীরা। কিন্তু এখন ঘরের মাঠের সুবিধা না থাকায় যে কোনও পিচে জিততে নিলাম টেবিলে সব রকমের বিকল্প তৈরি রাখতে হচ্ছে দলগুলিকে। তাতে সমস্যায় পড়েছে তারা।
রানের বন্যা চাইছে ভারতীয় বোর্ড
পিচ বদলের নেপথ্যে রয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। তাদের মতে, টি-টোয়েন্টি চার-ছক্কার খেলা। ফলে সেখানে বেশি সুবিধা দেওয়া উচিত ব্যাটারদের। এমন পিচ হোক, যেখানে রানের বন্যা দেখা যাবে। তাতে বেশি বিনোদন হবে। দর্শকদের আগ্রহও বাড়বে। সেটা করতে গিয়েই ঘরের মাঠের সুবিধা শেষ হয়ে গিয়েছে।
পিচ তৈরির দায়িত্ব বোর্ডের হাতে
এ বারের আইপিএল থেকে এক নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বোর্ড। আইপিএলের প্রতিটি মাঠের পিচ তৈরির দায়িত্ব তাদের হাতে। প্রতিটি মাঠে বোর্ডের এক পিচ প্রস্তুতকারক রয়েছেন। তাঁকে সাহায্য করেন স্থানীয় এক পিচ প্রস্তুতকারক। কী ধরনের পিচ তৈরি হবে সেই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ভাবে থাকে বোর্ডের পিচ প্রস্তুতকারকের। ফলে অ্যাওয়ে দলের মতো ঘরের দলও খেলার আগেই প্রথম পিচের দর্শন পান। সেই মতো দল ঠিক করতে হয় তাদের।
আইপিএলের প্লে-অফ ও ফাইনালে তো স্থানীয় পিচ প্রস্তুতকারককেও ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। শুধুমাত্র বোর্ডের নিযুক্ত পিচ প্রস্তুতকারকেরা উইকেট বানান। তাঁদের বলে দেওয়া হয়েছে, কোথাও বাউন্ডারির দূরত্ব যেন ৭৭ মিটারের বেশি না হয়। পিচে যেন বেশি সুইং বা স্পিন কিছু না হয়। ফলে পিচে ঘাসের আস্তরণ বেশি রাখা থাকে। তাতে পিচ শুকিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে।
আরও পড়ুন:
ক্ষোভ দিল্লি ক্যাপিটালসের কোচের
এ বারের আইপিএলে ঘরের মাঠে দিল্লি ক্যাপিটালস, মুম্বই ইন্ডিয়ান্স, লখনউ সুপার জায়ান্টস, চেন্নাই সুপার কিংসের মতো দল সমস্যায় পড়েছে। তবে সবচেয়ে সমস্যায় পড়েছে দিল্লি ক্যাপিটালস। ঘরের মাঠে পাঁচটি ম্যাচের মধ্যে চারটি হেরেছে তারা। পিচ নিয়ে নিজের ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন দলের প্রধান কোচ হেমঙ্গ বাদানি। তিনি বলেছেন, “ঘরের মাঠের পিচ নিয়েও কিছু বলার অধিকার আমাদের নেই। বিসিসিআই স্পষ্ট করে দিয়েছে, পিচ কেমন হবে তা তারা ঠিক করবে। যাতে কোনও দল পিচের সুবিধা বেশি না পায়, সেই জন্যই এই সিদ্ধান্ত। দিল্লির পিচ বুঝতেই আমাদের সমস্যা হচ্ছে।”
পিচে কিছুটা হলেও ভারসাম্য চাইছেন বাদানি। তিনি বলেছেন, “একটা ম্যাচে আমরা ৭৫ রানে অল আউট হয়ে গেলাম। একটা ম্যাচে ২৬৪ রান করেও হারলাম। কিছুটা তো ভারসাম্য দরকার। বুঝতে পারছি, গোটা প্রতিযোগিতা নিরপেক্ষ করার চেষ্টা করছে বিসিসিআই। কিন্তু পিচে একটু ভারসাম্য দরকার।”
পিচ-বিতর্কে জড়িয়েছিলেন রাহানেও
গত বার কলকাতা নাইট রাইডার্সের খারাপ ফলের পর সরাসরি পিচের দিকে আঙুল তুলেছিলেন কলকাতা নাইট রাইডার্সের অধিনায়ক অজিঙ্ক রাহানে। প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন, স্পিন সহায়ক উইকেট চেয়েও পাননি তাঁরা। সেই মন্তব্য নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। এ বারও একটি ম্যাচের পর রাহানে পিচ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে বেশি বিতর্কে জড়াতে চাননি। কিন্তু রাহানের সেই মন্তব্য বুঝিয়ে দিয়েছিল, পিচ খুশি করতে পারেনি তাঁকে।
অজিঙ্ক রাহানে। — ফাইল চিত্র।
গম্ভীর-দর্শনেই সিলমোহর
ভারতীয় দলের প্রধান কোচ হওয়ার পর থেকে টি-টোয়েন্টিতে গম্ভীরের একটিই দর্শন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আক্রমণাত্মক ক্রিকেট। উইকেট পড়লেও তা বদলাবে না। চলতি বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেই তা দেখা গিয়েছে। তার ফলও পেয়েছে ভারতীয় দল। বিশ্বকাপ জিতেছে। গম্ভীর আইপিএলে মেন্টর থাকাকালীনও একই পরিকল্পনায় খেলাতেন। গম্ভীরের এই দর্শনকে সমর্থন করছে বোর্ড। ম্যাচে দুই দলই যাতে সমান সুবিধা পায় তার চেষ্টা হচ্ছে। বিশেষ করে ব্যাটারদের বাড়তি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে বোর্ডের এক আধিকারিক বলেন, “কিছু দলের শক্তি স্পিন। তারা চায় উইকেট একটু মন্থর হোক। আবার কিছু দলের পেস। তাদের দাবি উইকেটে ঘাস থাকুক। কিন্তু এখন আইপিএলে পিচ প্রায় একই ধরনের হচ্ছে। ফলে কার ঘরের মাঠ, কে খেলতে আসছে, সে সব আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। গোটা দেশ জুড়ে একই রকমের উইকেট দেখা যাচ্ছে।”
পিচ খতিয়ে দেখছেন গৌতম গম্ভীর। সঙ্গে সীতাংশু কোটাক। — ফাইল চিত্র।
বোর্ডের সিদ্ধান্ত ব্যুমেরাং হবে না তো!
বোর্ডের এই সিদ্ধান্তের খারাপ প্রভাবও পড়তে পারে। এমনই ক্রিকেট ধীরে ধীরে ব্যাটারদের খেলায় পরিণত হয়েছে। বোলারেরা সুবিধা পাচ্ছেন না। তার প্রভাব বোলারদের মানসিকতায় পড়ছে। বিশ্বকাপের আগে ভয়ঙ্কর দেখানো বরুণকে বিশ্বকাপের সময় খুব সাধারণ দেখিয়েছে। কারণ, ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপে পিচ থেকে তেমন সুবিধা তিনি পাননি। আইপিএলেও দেখা যাচ্ছে বোলারেরা কেমন রান দিচ্ছেন। ওভার প্রতি ১০ রানের কম দিলে তাঁর পিঠ চাপড়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু শুধু ব্যাটারেরা দলকে জেতাতে পারবেন না। দরকার বোলারদেরও । সেটা বুঝতে হবে।
ব্যাটারেরাও ভাবছেন, পিচে কোনও জুজু নেই। ফলে প্রথম বল থেকে চালিয়ে খেলছেন। কিন্তু যে পিচে সামান্য সুবিধা বোলারেরা পাচ্ছেন, সেখানেই ভেঙে পড়ছে ব্যাটিং। এই প্রসঙ্গে বোর্ডের আর এক আধিকারিক বলেছেন, “ব্যাটারেরা শুরু থেকেই বড় শট খেলার চেষ্টা করছে। যে পিচ পাটা সেখানে সমস্যা নেই। কিন্তু যেখানে বল পড়ে একটু থমকাচ্ছে, বা বল পড়ে ঘুরছে, সেখানে ব্যাটারেরা সমস্যায় পড়ছে। পর পর উইকেট পড়ছে। আইপিএলের কয়েকটা ম্যাচে সেই ছবি দেখা গিয়েছে।” ভবিষ্যতে ভারতীয় দলের সঙ্গে বড় ম্যাচে এই ঘটনা ঘটলে কিন্তু হাত কামড়াতে হবে বোর্ডকেই।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- ২৮ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে প্রতিযোগিতা। গত বছর প্রয়াত ১১ সমর্থকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এ বার হয়নি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।
- এখনও পর্যন্ত আইপিএলের গ্রুপ পর্বের ৭০টি ম্যাচের সূচি ঘোষণা হয়েছে। প্রথমে ২০টি ম্যাচের সূচি জানিয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। পরে বাকি ৫০টি ম্যাচেরও সূচি ঘোষণা করেছে তারা। তবে প্লে-অফের সূচি এখনও ঘোষণা করা হয়নি।
- আইপিএলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি, পাঁচ বার করে ট্রফি জিতেছে চেন্নাই সুপার কিংস এবং মুম্বই ইন্ডিয়ান্স। কলকাতা নাইট রাইডার্স জিতেছে তিন বার। গত বছর প্রথম বার ট্রফি জিতেছিল বেঙ্গালুরু।
-
২৩:০৯
টানা চার জয় গুজরাতের, রাজস্থানের জোড়া হার! বৈভবদের হারিয়ে পাঁচ থেকে এক লাফে দুইয়ে শুভমনেরা -
১৭:৪৭
জয়পুরে স্টেডিয়ামের ফ্লাড লাইটের প্রশংসা করলেও খুশি নন সাঙ্গাকারা! ক্যাচ পড়ার জন্য আলোর নতুন ব্যবস্থাকে দুষলেন রাজস্থান কোচ -
১৪:০০
বৈভব নাকি এক বছরের চমক! শুনেই নড়েচড়ে বসে রাজস্থান, সূর্যবংশীকে পরিণত করার চ্যালেঞ্জ নেন দলেরই এক জন -
১২:৫৪
আইপিএলের দলগুলির ক্ষতি ৫৮ কোটি টাকা! শুধু কেকেআরের জলে গিয়েছে ৩১ কোটির বেশি, কী ভাবে, জানা গেল কারণ -
১০:৫৪
কেকেআরের কাছে হেরে প্লেঅফের আশা ছেড়ে দিল দিল্লি, আগামী মরসুমের কথা অধিনায়ক অক্ষরের মুখে