২১০ ওভার! ২০১৮-’১৯ অস্ট্রেলিয়া সফরে একাই ২১০ ওভার ব্যাট করেছিলেন চেতেশ্বর পুজারা। সেখানে চলতি অ্যাশেজ়ে পার্থ ও মেলবোর্ন মিলিয়ে চার ইনিংসে মাত্র ১২৭ ওভার ব্যাট করছে গোটা ইংল্যান্ড দল। এই একটি পরিসংখ্যানই বুঝিয়ে দিচ্ছে, টেস্ট ক্রিকেট বদলেছে। এখন আর পাঁচ দিন ধরে ব্যাট-বলের যুদ্ধ নয়, বদলে দু’-তিন দিনে শেষ হয়ে যাচ্ছে টেস্ট। বার বার।
আরও দু’টি পরিসংখ্যান দেওয়া যাক। ১৯৬৯ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ১৬ বছরে যতগুলি টেস্ট হয়েছে, তার ৪৩.১ শতাংশ অমীমাংসিত থেকেছে। সেখানে গত পাঁচ বছরে অমীমাংসিত টেস্টের শতাংশ ৮.২। ব্যতিক্রম ভারত-ইংল্যান্ডের মধ্যে তেন্ডুলকর-অ্যান্ডারসন ট্রফি। সেই সিরিজ়ের পাঁচটি টেস্টই গড়িয়েছে শেষ দিন পর্যন্ত। মাত্র একটি টেস্ট অমীমাংসিত। কিন্তু সেটা ব্যতিক্রম। ইডেন-মেলবোর্নের সংখ্যাই বেশি। ১৯৪৫ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ৫৪ বছরে একটি টেস্টও দু’দিনে শেষ হয়নি। অথচ, ২০০০ সাল থেকে ২৬ বছরে ১২টি টেস্ট শেষ হয়েছে দু’দিনে। ২০২৪ সালে কেপটাউনে ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্ট মাত্র ১০৭ ওভারে শেষ হয়ে গিয়েছিল। হিসাব করলে যা একটি একদিনের ম্যাচের চেয়ে মাত্র ৭ ওভার বেশি। গত ১২৯ বছরে এই প্রথম অ্যাশেজ়ে দু’টি টেস্ট দু’দিনে শেষ হয়েছে। এখনও একটি ম্যাচ বাকি।
এর নেপথ্যে কি শুধুই ‘কঠিন’ পিচ? না কি এর নেপথ্যে ব্যাটারদের টেকনিক, মানসিকতা, টি-টোয়েন্টির প্রভাব, ঘরোয়া ক্রিকেটকে অবহেলা করার মতো একাধিক কারণ?
ব্যাটারদের মানসিকতা
গত মরসুমে আইপিএল জিতে বিরাট কোহলি বলেছিলেন, “আমি টেস্ট জয়কে আইপিএল জয়ের থেকে পাঁচ ধাপ উপরে রাখব।” বিশ্বের সেরা তারকারা বার বার টেস্ট ক্রিকেট খেলার কথা বলেন। সুনীল গাওস্করের মতে, টেস্টে সাফল্য না পেলে কোনও ক্রিকেটারের কেরিয়ার সফল বলা যায় না। কিন্তু সেই মানসিকতা এখনও কি আছে? গাওস্করের ক্রিকেটীয় দর্শন ছিল ‘টেস্টে প্রথম ঘণ্টা বোলারকে দাও, পরের পাঁচ ঘণ্টা তোমার’। তার প্রতিফলন এখন দেখা যায় না। যেমন বাংলার ক্রিকেটার অনুষ্টুপ মজুমদার বলছিলেন, “হ্যারি ব্রুক নেমে প্রথম বলেই ক্রিজ় ছেড়ে বেরিয়ে মারতে যাচ্ছে। এমন রকম খেলা আমি আগে দেখিনি। বল দেখতে হবে। ধৈর্য ধরতে হবে। টেস্টে ক্রিজ়ে পড়ে না থাকলে রান হবে কী ভাবে? তার জন্যই দু’দিনে ম্যাচ শেষ হয়ে যাচ্ছে।”
অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন ক্রিকেটার স্টুয়ার্ট ল’এর কথায়, “টেস্ট খেলতে সাহস লাগে। সঙ্গে প্রয়োজন দক্ষতা। মানসিক ভাবেও শক্তিশালী হতে হয়। সেটা এখনকার ক্রিকেটারদের মধ্যে নেই। তারা শুধু বিনোদনের কথা ভাবে। প্রথম বল থেকে ব্যাট চালায়। টেস্টে সফল হব, এই ভাবনাটাই কারও মধ্যে নেই।” ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে রানার্স হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। সেই দলের ক্রিকেটার ছিলেন ল। দেশের হয়ে ৫৫টি ম্যাচ খেলা ল অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের ঘরোয়া ক্রিকেটেও দীর্ঘ দিন খেলেছেন। লাল বলের ক্রিকেটে অভিজ্ঞ এই প্রাক্তন ক্রিকেটার এখনকার ক্রিকেটারদের মধ্যে সেই দক্ষতাটাই দেখতে পাচ্ছেন না।
টি-টোয়েন্টির প্রভাব
মেলবোর্নের পিচে বোলারের সামনে অসহায় ব্যাটার। ছবি: রয়টার্স।
কুড়ি ওভারের ধুন্ধুমার ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা যত বেড়েছে, ততই বিভিন্ন দেশে শুরু হয়েছে টি-টোয়েন্টি লিগ। ভারতে আইপিএলে খেলার জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিজ়, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউ জ়িল্যান্ডের ক্রিকেটারেরা দেশের হয়েও খেলতে চান না। টি-টোয়েন্টির রমরমা, টাকার ছড়াছড়ি প্রভাব ফেলেছে ক্রিকেটারদের উপর। তেমনই মনে করেন ল। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ২৭ হাজারের বেশি রান করা ক্রিকেটারের বক্তব্য, “পাঁচ দিনের বদলে ৪০ ওভারের ক্রিকেটে ব্যাটারেরা আগ্রহ দেখাচ্ছে। কেউ যদি দেখে আইপিএল খেলে একজন ক্রিকেটার মার্সিডিজ় নিয়ে ঘুরছে, আর সে শেফিল্ড শিল্ড খেলে পুরনো গাড়ি চালাচ্ছে, তা হলে তার তো মনে হবেই, যে কেন দেশের হয়ে টেস্ট খেলতে যাব? তার বদলে পাঁচ বছর আইপিএল খেললেই সারা জীবনের রোজগার হয়ে যাবে।”
ল’র সঙ্গে একমত ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার অরুণ লাল। তাঁর মতে, এই মানসিকতার নেপথ্যে বাবা-মায়েদের ভূমিকাও রয়েছে। নিজের অ্যাকাডেমি রয়েছে অরুণ লালের। ফলে তিনি এখনকার অভিভাবকদের মানসিকতা সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল। অরুণের কথায়, “ছোট থেকেই বাবা-মায়েরা সন্তানদের টি-টোয়েন্টির দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। সকলের মাথায় ঘুরছে টাকা। কেউ আর লাল বলের কথা ভাবে না। ক’টা অ্যাকাডেমিতে লাল বলে অনুশীলন করানো হয়? যেখানেই যাবেন, দেখবেন প্যাড-গ্লাভস পরে বাচ্চারা শুধু চার-ছক্কা মারার চেষ্টা করছে। এর বাইরেও যে ক্রিকেট হয়, সেটা তাদের শেখানোই হচ্ছে না! গলদ তো গোড়াতেই!”
ঘরোয়া ক্রিকেটে ‘ধ্রুপদী’ ব্যাটার বলা হয় অনুষ্টুপকে। তিনি এখনকার টেস্ট ক্রিকেটারদের পায়ের নড়াচড়া দেখে হতাশ। তাঁর ক্ষোভ, “কারও পা-ই তো নড়ে না। টেস্টে বলের কাছে না গেলে খেলা যায় না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টি-টোয়েন্টি খেলা যায়। টেস্ট নয়।”
ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার শরদিন্দু মুখোপাধ্যায়ও মনে করেন, সাদা বলের ক্রিকেটের ‘কুপ্রভাব’ লাল বলের ক্রিকেটের উপর পড়েছে। তাঁর বক্তব্য, “বছরে সাদা বলের ক্রিকেটে ৪০-৫০টা ম্যাচ খেলছে সকলে। সেখানে টেস্ট খেলছে পাঁচটা। তার উপর সব সিরিজ় গায়ে-গায়ে। সাদা বল থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে টেস্টে নেমে পড়তে হচ্ছে। সাদা বলের উপরেই মনোযোগ থাকছে ব্যাটারদের। টেস্ট যে বাকি সব ফরম্যাটের থেকে আলাদা, তার জন্য যে আলাদা প্রস্তুতি দরকার, সেটাই হচ্ছে না।”
ক্রীড়াবিজ্ঞানের বিপরীত প্রভাব
খেলোয়াড়কে ফিট রাখা, তাঁদের অনুশীলন আরও উন্নত করতে এসেছে ক্রীড়াবিজ্ঞান। কিন্তু তার ফলে উন্নতির বদলে আরও অবনতি হচ্ছে বলে মনে করেন ল। তাঁর অভিমত, “ক্রীড়াবিজ্ঞান পেসারদের বলছে বিশ্রাম নিতে। তার পর ফিরে তারা আর ছন্দে থাকছে না। অস্ট্রেলিয়ায় শুরু হয়েছে ‘নো-ফিট’ ব্যাটিং। অর্থাৎ, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে বড় শট খেলা। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পায়ের নড়াচড়াই আসল। এই অনুশীলন করলে কী ভাবে ব্যাটিংয়ের মান উন্নত হবে।”
ল নিজে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ়, আফগানিস্তানের মতো দলের কোচ ছিলেন। তাঁর কোচিংয়েই ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারিয়েছিল আমেরিকা। এখন তিনি নেপালের কোচ। তাই ল জানেন, কোচেরা কী ভাবে ক্রীড়াবিজ্ঞান কাজে লাগান। কিন্তু তাতে আখেরে ক্ষতি হচ্ছে বলেই মনে করেন তিনি।
আরও পড়ুন:
‘ডগ স্টিক’-এর ব্যবহার
এখন ক্রিকেটে ব্যাটিং অনুশীলনের সময় ডগ স্টিকের ব্যবহার করেন বেশির ভাগ কোচ। এটি একটি লাঠি। যার এক প্রান্ত থেকে বল ছোড়া যায়। ডগ স্টিক ব্যবহার করলে কাঁধের উপর চাপ কম পড়ে। ফলে বেশি বার বল ছোড়া যায়। কিন্তু এই পদ্ধতিতে বল হাত থেকে ছোড়া হয় না। ফলে বলের সিম দেখার কোনও বালাই নেই। টেস্টে বলের সিম পজিশন দেখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেটা দেখেই ব্যাটার বোঝেন, ডেলিভারি আউটসুইং হবে না ইনসুইং। কিন্তু এই কৃত্রিম অনুশীলনে সিম দেখার কোনও সুযোগ না থাকায় ব্যাটারদের মান আরও কমছে।
ঘরোয়া ক্রিকেটকে অবহেলা
ভারতে জাতীয় দলের ক্রিকেটারেরা এখন ঘরোয়া ক্রিকেট প্রায় খেলেন না। বোর্ড নির্দেশ দিলে একটি বা দু’টি ম্যাচে নামেন। চার দিন বা পাঁচ দিনের ম্যাচ না খেলায় টেস্টের ফিটনেসই নেই বেশির ভাগের। ফলে টেস্টে নেমে যেমন পারফরম্যান্স খারাপ হয়, তেমনই চোটও বেশি লাগে। নেটে ৩০-৪০ ওভার বল না করলে কী ভাবে টেস্টে লম্বা স্পেল করবেন বোলারেরা? সেই স্ট্যামিনা কী করে তৈরি হবে তাঁদের? নেটে টানা ২০ ওভার ব্যাট না করলে কী ভাবে টেস্টে লম্বা ইনিংস খেলার টেম্পারামেন্ট তৈরি হবে ব্যাটারদের? শরদিন্দু জোর দিতে চান ঘরোয়া ক্রিকেটের উপর। তাঁর কথায়, “এখন বোলারেরা নেটে মেরেকেটে ১৮-২০টা বল করছে। কারণ, টি-টোয়েন্টিতে ২৪টা বল করতে হয়। এক দিনের ম্যাচে খুব বেশি হলে ৬০টা। ফলে টানা ১০ ওভার বা এক দিনে ২৫-৩০ ওভার বল করার জন্য পেশির যে শক্তি লাগে সেটা তৈরিই হচ্ছে না। কী ভাবে টেস্টে সাফল্য আসবে?”
ইডেনে ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্য়াচের একটি দৃশ্য। ছবি: পিটিআই।
অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারেরা সুযোগ পেলে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেন। একটা সময় ভারতেও তা দেখা যেত। কেরিয়ারের সেরা সময়ে সচিন তেন্ডুলকর, রাহুল দ্রাবিড়েরা রাজ্য দলের হয়ে খেলেছেন। রানও করেছেন। সেই অভ্যাস চলে গিয়েছে। শরদিন্দুর কথায়, “পেস সহায়ক উইকেটে নতুন বল কী ভাবে সামলাতে হবে, বা স্পিন সহায়ক উইকেটে কী ভাবে লম্বা ইনিংস খেলা যাবে, সেই শিক্ষা ঘরোয়া ক্রিকেট দেয়। কয়েক বছর আগেও ভারতে তারকারা ঘরোয়া ক্রিকেট খেলত। এখন বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তি হওয়ার পর বোর্ড না বললে ওরা খেলবে না। তাই যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে।”
কঠিন পিচ
ইডেন এবং মেলবোর্নের উইকেট নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। ইডেনের বিষয়ে তেমন কোনও রায় না দিলেও মেলবোর্নের উইকেটকে ‘অসন্তোষজনক’ বলেছে আইসিসি। মেলবোর্নের উইকেটে ১০ মিলিমিটার ঘাস ছিল। ইডেনে প্রথম ওভার থেকে বল ঘুরেছে। কঠিন উইকেটই কি দু’দিনে টেস্ট শেষ হওয়ার কারণ? ল’র কথায়, “আগে পিচ প্রস্তুতকারকেরা তৃতীয়, চতুর্থ বা পঞ্চম দিনের কথা ভাবতেন। কিন্তু এখন তাঁরাও প্রথম দু’দিনের কথা ভেবে পিচ বানাচ্ছেন। ঘরোয়া দল নিজেদের শক্তি অনুযায়ী পিচ তৈরির চেষ্টা করে। মেলবোর্নে সেই কারণেই ঘাস বেশি রাখা হয়েছিল। কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হয়েছে।”
মেলবোর্নের পিচ দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন সেখানকার পিচ প্রস্তুতকারক ম্যাট পেগ। তিনি জানিয়েছিলেন, পিচ যে বোলারদের অতটা সাহায্য করতে তা বুঝতে পারেননি তিনি। পিচের সমালোচনা করেছিল অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ডও। ৪ জানুয়ারি, রবিবার থেকে সিডনিতে শুরু অ্যাশেজ়ের পঞ্চম টেস্ট। সেই ম্যাচের পিচ প্রস্তুতকারক অ্যাডাম লুইস অবশ্য জানিয়েছেন, পিচ নিয়ে কোনও চিন্তা নেই তাঁর। সিডনি টেস্ট পাঁচ দিনে গড়াবে বলে আশাবাদী তিনি।
কঠিন পিচ কি আগে ছিল না? গাওস্কর, সচিনেরা কি সমস্যায় পড়েননি? পড়েছেন। তাঁরা সামলেওছেন। লড়েছেন। উইকেট ছুড়ে দিয়ে আসেননি। ব্রিসবেনে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে পঞ্চম দিন ২০০-র বেশি বল খেলেছিলেন পুজারা। একাধিক বল লাফিয়ে তাঁর আঙুল, কনুই, বুকে লেগেছিল। খেলাশেষে দেখা গিয়েছিল গোটা শরীরে কালশিটে। সেই কথাটাই শোনা গেল শরদিন্দুর মুখে। তিনি বললেন, “পিচ একটা অজুহাত। আসল হল ক্রিকেটারদের ব্যর্থতা। টি-টোয়েন্টিতে পাটা রাস্তার মতো উইকেটে চোখ বন্ধ করে ব্যাট চালানো আর টেস্টে প্রথম দিন প্রথম সেশনে ব্যাট করা এক নয়। সেটাই বুঝছে না এখনকার ব্যাটারেরা। জো রুটের মতো ধ্রুপদী ব্যাটারও প্রথম বলে রিভার্স স্কুপ মারতে যাচ্ছে। এই একটা দৃশ্যই যথেষ্ট চিন্তার।”