তাঁর জাদু স্পর্শেই ২২ বছরের যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে প্রথমবার আইএসএলে চ্যাম্পিয়ন ইস্টবেঙ্গল। তাঁকে ঘিরেই আগামী মরসুমে সাফল্যের শিখরে আরোহনের স্বপ্ন দেখছে লাল-হলুদ জনতা। অস্কার ব্রুসোর লক্ষ্য কী? শুক্রবার ইস্টবেঙ্গল মাঠে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শেষে দলের নৈশভোজে যোগ দেওয়ার আগে আনন্দবাজারকে একান্ত সাক্ষাৎকার দিলেন ইস্টবেঙ্গলের স্পেনীয় চাণক্য।
প্রশ্ন: ইস্টবেঙ্গলের কোচ হিসেবে সাফল্যের এই যাত্রাকে কী ভাবে বর্ণনা করবেন?
অস্কার ব্রুসো: এই যাত্রা কখনওই এক জন ব্যক্তির নয়। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই আমরা সাফল্যের শিখরে পৌঁছতে পেরেছি। সব ধরনের পরিস্থিতির মোকাবিলা আমরা ঐক্যবদ্ধ ভাবে করেছি। যাত্রা শুরু করার সময়ই ইস্টবেঙ্গলের ঐতিহ্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলাম। সকলেই জানতাম, বিরাট দায়িত্ব আমাদের কাঁধের উপরে রয়েছে। তাই সব সময় লক্ষ্যে স্থির ছিলাম। সাফল্যের শিখরে ওঠার এই পথ তৈরি হয়েছে দৃঢ়তা, ত্যাগ, ফুটবলার, দলের অন্যান্য কর্মী এবং সমর্থকদের বিশ্বাসের উপরে ভিত্তি করেই। প্রত্যেক দিনের পরিশ্রমের ফল অবশেষে আমরা পেলাম। এই অনুভূতি অতুলনীয়।’’
প্র: ইস্টবেঙ্গলের কোচ হওয়া মানেই কাঁটার মুকুট মাথায় পরা। তা সত্ত্বেও কেন দায়িত্ব নিতে রাজি হন?
অস্কার: এই বিশাল চাপ এবং প্রত্যাশার কারণেই ইস্টবেঙ্গল বাকিদের চেয়ে আলাদা। তা ছাড়া আবেগ কখনও সরিয়ে রাখা যায় না। আমি বিশ্বাস করি, কঠিন পরীক্ষাই মানুষকে পরিচিতি দেয়। ইস্টবেঙ্গলের মতো ঐতিহ্যশালী ক্লাব যখন ডাকে, তখন অন্য কিছু ভাবার প্রশ্নই থাকে না। সমস্যার কথাও মাথায় আসে না। নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হয়। সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটানোই একমাত্র লক্ষ্য থাকে।
প্র: ক্রমাগত ব্যর্থতায় ইস্টবেঙ্গলের সমর্থকেরা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথা ভাবতেও ভুলে গিয়েছিলেন। আপনি কী ভাবে আইএসএল জেতার স্বপ্ন দেখার সাহস সঞ্চয় করলেন?
অস্কার: বিশ্বাস এক দিনে তৈরি হয় না। ধীরে ধীরে গড়ে তুলতে হয়। সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল অতীতের মানসিকতা বদলে সম্পূর্ণভাবে বর্তমানের উপর মনোযোগ দেওয়া। সাহস আসে প্রস্তুতি ও ঐক্য থেকে। ফুটবলারেরা যখন উপলব্ধি করল, আমরাও আধিপত্য নিয়ে খেলতে পারি, নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, তখনই মন থেকে ভয় দূর হয়ে গিয়ে স্বপ্ন দেখার সাহস পাওয়া যায়।
প্র: ২২ বছরের অপেক্ষার অবসান। ভারতসেরা ইস্টবেঙ্গল। এখন কি বলতে পারবেন কোচিং করানোর সময় কী ধরনের সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়েছিল?
অস্কার: ২২ বছরের ব্যর্থতায় স্বাভাবিক ভাবেই উদ্বেগের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। আমার কাছে সব চেয়ে কঠিন পরীক্ষা ছিল, বাইরের চাপ সামলে দলের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য অটুট রাখা। দলের মধ্যে একটা সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে তোলার পাশাপাশি জোর দিয়েছিলাম খেলার মানবৃদ্ধিতে। ব্যর্থতাকে আমরা সঙ্কট হিসেবে দেখিনি। বরং, শিক্ষা নিতে চেয়েছি। সব চেয়ে ইতিবাচক হল, কখনওই আমরা লক্ষ্যচ্যুত হইনি।
প্র: ঠিক কোন ম্যাচের পরে আপনার মনে হয়েছিল যে আইএসএলে চ্যাম্পিয়ন হওয়া সম্ভব?
অস্কার: কোনও একটা মুহূর্তে এই বিশ্বাস জন্মায় না। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমাদের ফুটবলারেরা দেখিয়ে দিয়েছে ওরা কতটা দক্ষ। এই মানসিকতাই আমাদের চ্যাম্পিয়ন করেছে।
প্র: আইএসএলে চ্যাম্পিয়ন হলেও ডার্বি জিততে না পারার জন্য আক্ষেপ হচ্ছে না?
অস্কার: আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল আইএসএলে চ্যাম্পিয়ন হওয়া। ফুটবলের বৃহৎ চিত্রে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল আমরা শেষ পর্যন্ত কোথায় থাকলাম। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ডার্বি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের পাখির চোখ ছিল ইস্টবেঙ্গলকে আবার ভারতসেরা করা। আমরা সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছি। দলের প্রত্যেক সদস্যের জন্য আমি গর্বিত ও কৃতজ্ঞ।
প্র: শুক্রবার বিকেলে ইস্টবেঙ্গল মাঠে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের পরেই আপনাকে দেখা গেল গ্যালারির সামনে চলে গিয়ে টি-শার্টের বুকে থাকা ক্লাবের প্রতীক জ্বলন্ত মশালের উপরে হাত রেখে শুধু মাথা দোলাচ্ছিলেন। আপনি ঠিক কী বোঝাতে চাইছিলেন?
অস্কার: লাল-হলুদ জনতার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছিলাম। আমি মনে করি, এই সাফল্য আমরা সকলে একসঙ্গে অর্জন করেছি। ফুটবলারদের মতোই সমর্থকদের অবদান রয়েছে। প্রতীকে হাত রেখে ক্লাবকে সম্মান জানাচ্ছিলাম। বোঝাচ্ছিলাম, এই প্রতীক ভারতীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ স্থানে থাকারই যোগ্য।
প্র: . বৃহস্পতিবার রাত থেকেই সমর্থকেরা আপনাকে থেকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করছেন। আপনি কি সিদ্ধান্ত নিলেন?
অস্কার: সমর্থকদের এই আবেগ ও ভালবাসা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। আমি তাদের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। এখন আমরা একসঙ্গে এই ঐতিহাসিক সাফল্য উদ্যাপন করতে চাই। ইস্টবেঙ্গলের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান জানিয়েই ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেব। কিন্তু এই মুহূর্তে সাফল্য উপভোগ করতে চাই।
প্র: আগের মরসুমের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এ বার ফুটবলার নির্বাচনের সময় কী কী বিষয়গুলির উপরে জোর দিয়েছিলেন?
অস্কার: মরসুমের প্রথম দিন থেকেই আমাদের লক্ষ্য ছিল দলে এমন ফুটবলারদের নেওয়া যারা শুধু দক্ষ হলেই হবে না, দলের প্রয়োজন অনুযায়ী খেলতে সক্ষম। আমরা এমন ফুটবলার চেয়েছিলাম, যারা ইস্টবেঙ্গলের মতো ঐতিহ্যশালী ক্লাবে খেলার মানসিক চাপ সামলাতে পারবে। ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়েও দলের কথা আগে ভাববে। গত কয়েক বছরে দল গড়ার সময় এই বিষয়গুলির উপরেই জোর দেওয়া হয়নি। এ বার আমরা সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করিনি। এটাই আমাদের সাফল্যের অন্যতম কারণ।
প্র: আইএসএলে বেশ কিছু ম্যাচের পরে আপনাকে সমালোচনার তিরে বিদ্ধ হতে হয়েছিল। সেই সময় নিজেকে কী ভাবে শান্ত রেখেছিলেন?
অস্কার: সমালোচনা ফুটবলেরই অঙ্গ। বিশেষ করে ইস্টবেঙ্গলে মতো বড় ক্লাবে। সকলেই জানে, বহু দিন ধরে এই ক্লাবকে দুর্বল করার জন্য পরিকল্পিত ভাবে চেষ্টা চলেছে। আমরা যদিও গুরুত্ব দিইনি। তুচ্ছ ঘটনা হিসেবে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এই মনোভাবই আমাদের মানসিকভাবে শক্তিশালী করে তুলেছিল। আমরা কখনওই আতঙ্কিত হয়ে পড়িনি। নীরবে আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতিতে মগ্ন থেকেছি। নিজেদের উপরে অগাধ আস্থা ছিল। প্রতি মুহূর্তে ফুটবলারদের উদ্বুদ্ধ করে গিয়েছি। ভিডিয়ো বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভুলত্রুটি চিহ্নিত করে তা শুধরে নেওয়ার জন্য প্রচুর পরিশ্রম করেছি। সকলেই উপলব্ধি করেছিল, ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া সব চেয়ে আগে দরকার। অবশ্য কঠিন সময়েই ঐক্য আরও শক্তিশালী হয়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)