আগামী কুড়ি বছরের জন্য আইএসএলের বাণিজ্যিক সতীর্থ হওয়ার জন্য দু’টি বিড জমা পড়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ বিড জিনিয়াস স্পোর্টসের। তারা প্রথম বছরে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা মতো দেবে, পরের বছর থেকে পাঁচ শতাংশ করে বৃদ্ধি পাবে টাকার অঙ্ক। সব মিলিয়ে ২০ বছরের জন্য তাদের প্রস্তাবিত মূল্য ২১৩০কোটি টাকা মতো।
দ্বিতীয় বিড ফ্যানকোডের, যারা এ বছরে আইএসএলের স্বত্ব কিনেছে। তাদের প্রস্তাব যদিও জিনিয়াস স্পোর্টসের প্রায় অর্ধেক। প্রথম বছরে তারা ৩৬ কোটি টাকা দেবে, পরের বছর থেকে একই ভাবে পাঁচ শতাংশ করে টাকার অঙ্ক বৃদ্ধি পেয়ে কুড়ি বছরের জন্য প্রস্তাবিত মূল্য ১২০০ কোটি টাকা মতো।
শুক্রবার ক্লাব জোটের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের (এআইএফএফ) শীর্ষ কর্তারা দরপত্র খোলেন এবং দেখা যায়, জিনিয়াস স্পোর্টসের আর্থিক প্রস্তাবই সব চেয়ে বেশি। এই বিডের মধ্যে এআইএফএফ পরিচালিত দু’টো প্রতিযোগিতা রয়েছে। আইএসএল এবং ফেডারেশন কাপ (আগে যা ছিল সুপার কাপ, সম্প্রতি নাম পরিবর্তন হয়েছে)। এ ছাড়া মেয়েদের লিগের জন্য একটি বিড জমা পড়েছে, কেপ্রি স্পোর্টসের। তারা ২০ বছরের জন্য ১৫০ কোটি টাকা মতো দেবে বলে প্রস্তাব দিয়েছে। যে-হেতু আর কোনও বিড নেই, তারাই মেয়েদের ফুটবলের স্বত্ব পেতে পারে বলেমনে করা হচ্ছে।
আগামী ২৯ মার্চ, রবিবার, নয়াদিল্লিতে সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের এগজ়িকিউটিভ কমিটি বৈঠকে তিনটি বিড নিয়েই আলোচনা হবে। ক্লাবগুলিকে বলা হয়েছে, দিন দুইয়ের মধ্যে তাদের মতামত জানাতে। জানা গিয়েছে, ক্লাব জোটের মধ্যে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। জিনিয়াস স্পোর্টস সর্বোচ্চ বিড করেছে, হিসাব মতো তাদেরই এগিয়ে থাকা উচিত। কিন্তু তাদের সম্পর্কে আরও খোঁজখবর নেওয়া উচিত বলে কোনও কোনও ক্লাবের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। এই সংস্থা ইপিএল, স্কটিশ লিগ-সহ নানা প্রতিযোগিতায় সরকারি ভাবে তথ্য সরবরাহকারী মাধ্যম (ডেটা ফিড প্রোভাইডার) হিসেবে কাজ করে। কিন্তু এর পাশাপাশি বেটিংয়েও তারা তথ্য সরবরাহ করে, যা নিয়ে কথা উঠতে পারে। ভারতে বেটিং বেআইনি এবং অনলাইন গেমিং সংস্থাদের খেলার স্পনসর হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে রবিবার ফেডারেশনের বৈঠকে কী আলোচনা হয়, তা দেখার। আইনি পরামর্শও নিতে পারেনফেডারেশন কর্তারা।
ফুটবল জনতার মনে যদিও আসল প্রশ্ন আসবে, কতটা উৎসাহিত হওয়ার মতো এই টাকার অঙ্ক? কেউ যদি ক্রিকেটের সঙ্গে তুলনা করতে যান, ধাক্কা খেতে হবে। ক’দিন আগেই আইপিএলের দু’টি দল বিক্রি হয়েছে চোখ কপালে তোলার মতো টাকার অঙ্কে। রাজস্থান রয়্যালস বিক্রি হয়েছে ১৫,২৯০ কোটি টাকায়, রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু ১৬,৬০০ কোটিতে। সেখানে কুড়ি বছরে ২১৩০ কোটি টাকা নস্যি। কিন্তু ভারতীয় ফুটবলের বিচারে এই অঙ্ক মোটেও উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়, বরং এআইএফএফ বেশ চমকেই দিয়েছে বলতে হবে এমন দর আদায় করতে পেরে। তার কারণ, আইএসএল নিয়ে অচলাবস্থায় একটা সময় মনে হয়েছিল, রিলায়্যান্স সংস্থার এফএসডিএল মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার পরে ২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে কেউ এই লিগের কমার্শিয়াল পার্টনার (বাণিজ্যিক সতীর্থ) হওয়ার ব্যাপারে হয়তো আগ্রহই দেখাবে না। দীর্ঘ দিন ধরে স্থগিত থাকার পরে অনেক কষ্টে এ বারের আইএসএল শুরু করা গিয়েছে, লিগ হচ্ছেকাটছাঁট করে।
ফেডারেশন প্রেসিডেন্ট কল্যাণ চৌবে এ দিন বললেন, ‘‘ভারতীয় ফুটবল নিয়ে যে আগ্রহ মিলিয়ে যায়নি, তা প্রমাণ হল। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য সুখবরের দিন আজ। আগের চেয়েও বেশি টাকার বিড জমা পড়েছে। এবং, এটা শুধুই আইএসএল, ফেডারেশন কাপের জন্য। মেয়েদের ফুটবলের জন্য, আরও অন্যান্য লিগ, বিভাগের বিড আলাদা ভাবে জমা পড়বে।’’ আগে যারা আইএসএল পরিচালনা করত, সেই রিলায়্যান্স সংস্থার এফএসডিএল প্রথমে বছরে ৩৫ কোটি টাকা করে দিত ফেডারেশনকে। তার পরে দিয়েছে ৩৭.৫ কোটি করে। শেষে দিত ৫০ কোটি করে। সর্বোচ্চ ছিল সেটাই, ৫০ কোটি। এ বারে সর্বোচ্চ বিড যারা করেছে, সেই জিনিয়াস স্পোর্টস বছরে ৬৫ কোটি দিচ্ছে, পরের বছর থেকে যা বাড়তে থাকবে। তা ছাড়া ফেডারেশন কর্তারা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘‘এফএসডিএলের হাতে ভারতীয় ফুটবলের সব কিছুই ছিল, এ ক্ষেত্রে এই ৬৫ কোটি শুধু আইএসএল ও ফেডারেশন কাপের জন্য। এ ছাড়া মেয়েদের ফুটবল লিগের জন্য ২০ বছরে আরও ১৫০ কোটি, ভারতের জাতীয় ফুটবলের জন্যও আলাদা চুক্তি করার রাস্তা খোলা থাকছে।’’ এফএসডিএল অবশ্য দাবি করেছিল দশ বছরে তারা ২০০ কোটি টাকা লগ্নি করেছিল আইএসএলে। অর্থাৎ বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা করে। ২০২৭ থেকে ২০ বছরের নতুন বৃত্তে লিগ চালাতে গিয়ে টাকা হাতে পেয়ে লিগ চলানোর জন্য কত টাকা খরচ করা সম্ভব হচ্ছে, সেটাও অপেক্ষা করে দেখতেচান কেউ কেউ।
ক্রিকেট নিশ্চয়ই এখনও অনেক দূরের, ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা গ্রহ। কিন্তু ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৪১ নম্বরে ধুঁকতে থাকা দেশ, যাদের এক নম্বর ফুটবল লিগ অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল, তাদের জন্য এই সওদা মোটেও খারাপ নয়!
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)