আবার এক দফা পরীক্ষা। নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য ফের একবার পরীক্ষার মুখে নির্বাচন কমিশনের তালিকাভুক্ত ‘সন্দেহভাজন নাগরিক’-রা। সূত্রের মতে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরে ‘সন্দেহভাজনে’র নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রশ্নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক একটি ‘গাইডলাইন’ বা নির্দেশিকা জারির কথা ভাবছে। সেই নির্দেশিকায় থাকা শর্ত পূরণ হলে তবেই ‘সন্দেহভাজন’দের ‘বৈধ’ নাগরিক হিসেবে মেনে নেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। তারপর সেই তথ্য নির্বাচন কমিশনকে জানানো হলে, কমিশন সেই ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকায় জোড়ার প্রশ্নে সবুজ সঙ্কেত দেবে। যাকে আসলে ঘুরপথে এনআরসি প্রক্রিয়া বলেই দাবি করেছেন বিরোধীরা।
ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এর সময়ে নাগরিকত্ব প্রমাণে এক ডজন শর্ত দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। তার পরেও শুধু পশ্চিমবঙ্গে তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে প্রায় ২৭ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছে। তাঁদের সুপ্রিম কোর্টের ট্রাইবুনালে আবেদনের সুযোগ রয়েছে। এঁদের মধ্যে যাঁরা ট্রাইবুনালে ছাড়পত্র পেয়ে যাবেন, তাঁদের বাদ দিয়ে বাকিদের ফের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় যোগ দিতে হবে। যাকে এনআরসি প্রক্রিয়া বলেই দাবি করেছেন বিরোধীরা। কংগ্রেসের দাবি, এ দেশের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও ‘সন্দেহভাজনদের’ নিজেদের নাগরিক হওয়ার প্রমাণ দিতে হবে। পাল্টা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দাবি, বিরোধীদের প্রচার সত্ত্বেও বাংলার মানুষ এসআইআর-কে সমর্থন করেছেন। ভারতীয়দের একমাত্র ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে ওই তত্ত্বকে বৈধতা দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গবাসী।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রের মত, সুপ্রিম কোর্টের আদেশ ও কমিশনের কাছ থেকে ‘সন্দেহভাজন’ নাগরিকদের তালিকা কোনওটাই এখনও মন্ত্রকের হাতে আসেনি। যা হাতে আসার পরেই আদালতের নির্দেশ মেনে পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এক আধিকারিক বলেন, ‘‘সাধারণত জন্ম, বংশসূত্রে, রেজিস্ট্রেশন বা স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে কিংবা সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে কোনও ব্যক্তি এ দেশের নাগরিক হতে পারেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বিষয়টি একেবারেই নতুন।’’ তাই মন্ত্রক সূত্রের দাবি, এ ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব প্রমাণে কী ধরনের শর্তাবলি থাকবে তার একটি বিস্তারিত নির্দেশিকা জারি হবে। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের ‘সন্দেহভাজন’ তালিকায় বহু হিন্দুর নাম রয়েছে। বিজেপি গোড়া থেকেই ঘরোয়া ভাবে বলে এসেছে, গোটা প্রক্রিয়ায় কোনও হিন্দুর নাম বাদ যাবে না। যদি বাদ যায় তা হলে ঘুরপথে তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। শাসক শিবিরের মতে, তাই সব দিক ভেবেই পদক্ষেপ করা হবে, যাতে যাঁরা যোগ্য এবং ধর্মীয় কারণে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন, এমন ‘সন্দেহভাজন’ নাগরিকদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা যায়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সূত্রটি জানিয়েছে, কমিশনের কাছ থেকে মন্ত্রকের কাছে তালিকা আসার পরে প্রথম ধাপে যাঁরা ‘সন্দেহভাজন’ নাগরিক তাঁদের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য বাড়িতে নোটিস পাঠানো হবে। যাতে ‘সন্দেহভাজন’ ওই ব্যক্তি প্রয়োজনীয় প্রমাণ জোগাড় করতে সক্ষম হন, তার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ও দেওয়া হবে। সূত্রের মতে, প্রাথমিক ভাবে যা ঠিক হয়েছে তাতে নাগরিকত্ব প্রমাণে আবেদনকারীকে অনলাইন আবেদন করার পরে নির্দিষ্ট প্রমাণপত্র নিয়ে স্থানীয় জেলাশাসকের দফতরে যোগাযোগ করতে হবে। জেলাশাসক যদি মনে করেন, ওই ব্যক্তির প্রমাণপত্র বৈধ, আবেদনকারী সমস্ত শর্ত মেনে আবেদন করেছেন এবং তিনি ভারতীয় নাগরিক হওয়ার যোগ্য তা হলে পরবর্তী ধাপে জেলাশাসক ওই আবেদন পাঠিয়ে দেবেন সংশ্লিষ্ট রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতরের কাছে। যা পর্যালোচনা করে স্বরাষ্ট্র দফতর যদি মনে করে আবেদনটি যথার্থ, তখন রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতর নিজেদের বক্তব্য ও সুপারিশ লিখে তা কেন্দ্রের কাছে পাঠিয়ে দেবে।যে হেতু নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যাপারে কেন্দ্রই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তাই রাজ্যের পাঠানো আবেদন খতিয়ে দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে নরেন্দ্র মোদী সরকার। শেষ ধাপে কেন্দ্রের ওই সিদ্ধান্ত রাজ্যের মাধ্যমে আবেদনকারীর জেলাশাসকের দফতরকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। যদি সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হয় তা হলে ব্যক্তিকে নাগরিকত্ব শংসাপত্র দেওয়া হবে। যদি সিদ্ধান্ত নেতিবাচক হয়, তা হলে সেই ব্যক্তিকে আটক শিবিরে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)