E-Paper

কালবৈশাখীর তাণ্ডব, রাজ্যে মৃত ছয়

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, ঝড়, বজ্রপাত এবং বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃতদের পরিবারকে চার লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। আহতদের চিকিৎসাও সরকার করাবে। পরে তাঁদেরও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ৩০ মে ২০২৬ ০৭:৩৭
কালবৈশাখীর জেরে দুপুর ২টো ৪২ মিনিটে অদ্ভুত আঁধার শহরে। শুক্রবার বাইপাসে (খবর: কলকাতা)।

কালবৈশাখীর জেরে দুপুর ২টো ৪২ মিনিটে অদ্ভুত আঁধার শহরে। শুক্রবার বাইপাসে (খবর: কলকাতা)। ছবি: সুমন বল্লভ।

প্রবল কালবৈশাখীর তাণ্ডবে শুক্রবার রাজ্যে দুই কিশোর-সহ ৬ জনের প্রাণ গেল। এর মধ্যে দু’জন কলকাতার বাসিন্দা, দু’জন পশ্চিম মেদিনীপুরের গোয়ালতোড়ের বাসিন্দা এবং বাকি দু’জন পুরুলিয়ার। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। ঝড়ে এবং বজ্রপাতে প্রবল ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। প্রচুর গাছ ভেঙে পড়ার পাশাপাশি ব্যাহত হয়েছে ট্রেন এবং বিমান চলাচল। আবহাওয়া দফতরের খবর, রাজ্যের পশ্চিম প্রান্ত থেকে বিরাট আকারের বজ্রগর্ভ মেঘ তাণ্ডব চালাতে চালাতে ধেয়ে এসেছে কলকাতায়। মহানগরী পেরিয়ে তা চলে গিয়েছে সুন্দরবনের দিকে। কলকাতার আলিপুরে ঝড়ের সর্বোচ্চ বেগ ছিল ঘণ্টায় ৮৮ কিলোমিটার এবং দমদমে ঘণ্টায় ৭৪ কিলোমিটার। সাধারণত, কালবৈশাখীতে এত তীব্র গতির হাওয়া দেখা যায় না।

এ দিন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, ঝড়, বজ্রপাত এবং বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃতদের পরিবারকে চার লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। আহতদের চিকিৎসাও সরকার করাবে। পরে তাঁদেরও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে স্থানীয় বিধায়কদের নিয়ে জেলাশাসকদের পদক্ষেপ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, কলকাতা, হাওড়া, বিধাননগর পুরসভা এবং পুলিশ একসঙ্গে কাজ করছে। দুই ২৪ পরগনা, হাওড়া,হুগলি, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং পুরুলিয়ায় অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দুর্যোগে গাছ ভেঙে পড়ে ক্ষয়ক্ষতি ঠেকাতে বন, পরিবেশ দফতর এবং কলকাতা পুরসভাকে নিয়ে মুখ্যসচিবকে একটি পরিকল্পনা করতে বলা হয়েছে।

এ দিন কলকাতায় উট্রাম ঘাটের কাছে চক্ররেলের লাইনে এক জনের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মৃতের নাম-পরিচয় ঠিক জানা যায়নি। তবে রেললাইনের পাশের ঝুপড়ির বাসিন্দা ওই ব্যক্তি স্থানীয়দের কাছে গিরি নামে পরিচিত ছিলেন। প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, ঝড়ের সময় ওই ব্যক্তি রেললাইনের পাশের গাছ থেকে পড়া আম কুড়োতে গিয়েছিলেন। সে সময় গাছ ভেঙে রেলের ওভারহেড তারে পড়ে এবং গাছেও আগুন ধরে যায়। ওই ব্যক্তিও রেললাইনে পড়ে যান। পরে রেলের চিকিৎসক এসে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। যদিও বজ্রপাতে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে না কি রেল লাইনে পড়ে মাথায় চোট পেয়ে— কী ভাবে মৃত্যু হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। পুলিশ ও রেল জানায়, ময়না তদন্তের পরেই মৃত্যুর কারণ স্পষ্ট হবে। এ দিকে, দক্ষিণ কলকাতার চেতলায় ঝড়বৃষ্টির সময় বাড়ির ছাদের অংশ ভেঙে পড়ে মারা যান প্রবীণকুমার ঠাকুর (৩৬)। পুলিশ সূত্রের খবর, বিকেল ৪টে নাগাদ প্রবীণ একটি বাড়ির সামনে নিজের অটো রাখতে গিয়েছিলেন। সেই সময়েই ওই ঘটনা ঘটে। সূত্রের খবর, শুধু কলকাতায় এ দিন ৩৬টি গাছ ভেঙেছে। প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে একটি গাছ ভেঙে পড়েছিল। বাইরের পাঁচিলও সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরে পুরসভা গিয়ে গাছটি কেটে সরিয়ে নেয়।

প্রশাসনের খবর, এ দিন পশ্চিম মেদিনীপুরের গোয়ালতোড়ের আগরবাঁধে একদল স্কুল পড়ুয়া স্থানীয় জঙ্গলে পিকনিক করতে গিয়েছিল। তুমুল বৃষ্টি নামলে তারা বাঁশবাগানে আশ্রয় নেয়। সে সময় বজ্রপাতে অয়ন গোস্বামী (১৫) ও রূপম চৈরা (১৫) লুটিয়ে পড়ে। তারা নবম শ্রেণির ছাত্র। পুরুলিয়ার বরাবাজারে বাজ পড়ে নিমাই গড়াই (৪৫) নামে এক জন মারা গিয়েছেন। দু’জন আহত হন। সে সময় বাড়ির পাশেই কাজ করছিলেন তাঁরা। পুরুলিয়ার সাঁতুড়ি থানার কাঁকুড়কিয়ারিতে সাইকেলে চেপে গ্রামের পুকুরে স্নান করতে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে চৈতন ধীবর (৫৬) নামে একজন মারা যান। প্রবল ঝড়বৃষ্টির সময় গঙ্গায় মাছ ধরতে গিয়ে ডিঙি নৌকা উল্টে নিখোঁজ হয়েছেন অমিত মণ্ডল নামে হুগলির চকবাজারের এক যুবক। নদীর ও পারে, নৈহাটি থানার পুলিশের তত্ত্বাবধানে রাতে ডুবুরি নামানো হয়।

আবহাওয়া দফতরের খবর, গত ক’দিন ধরেই বঙ্গোপসাগর থেকে প্রবল জলীয় বাষ্প গাঙ্গেয় বঙ্গের পরিমণ্ডলে ঢুকছিল। এ দিন পুরুলিয়া এবং লাগোয়া ঝাড়খণ্ডের উপরে একটি বিরাট মেঘপুঞ্জ তৈরি হয় এবং সেটি পশ্চিম মেদিনীপুর, হাওড়া, হুগলি হয়ে কলকাতা ও লাগোয়া জেলায় ঢোকে। আবহবিজ্ঞানীদের মতে, জলীয় বাষ্পের আধিক্য এবং বায়ুমণ্ডলের নীচের ও উপরের স্তরের মধ্যে তাপমাত্রার হেরফেরের ফলে কখনও কখনও অতিকায় মেঘপুঞ্জ তৈরি হয়। তার ফলে এমন প্রবল কালবৈশাখী দেখা যায়। ২০১৯ সালের এপ্রিলে কলকাতায় একটি কালবৈশাখীর সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৮৩ কিলোমিটার।

এ দিন কলকাতায় ঝড়ের দাপট এমনই ছিল যে উত্তর-দক্ষিণ মেট্রোর মাটির উপরের অংশে প্রায় আধ ঘণ্টা পরিষেবা বন্ধ রাখতে হয়। ঝড়ে শহিদ ক্ষুদিরাম মেট্রো স্টেশনে শেডের ক্ষতি হয়েছে। ওই স্টেশনের লিফট এবং এসক্যালেটর বন্ধ করে দিতে হয়। গাছ ভেঙে ওভারহেড তারে পড়ায় চক্ররেল চলাচল ব্যাহত হয়েছে। শিয়ালদহ-বনগাঁ লাইনের বিশরপাড়া কোদালিয়া স্টেশনের কাছে ট্রেন লাইনে গাছ পড়ে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। মধ্যমগ্রামের কাছেও লাইনে গাছ পড়েছে। কল্যাণী-রানাঘাটের মাঝেও গাছ পড়ে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয। রেলের দাবি, বিকেলের পরে বিভিন্ন শাখায় ট্রেন চলাচল শুরু হয়।

ঝড়ে কলকাতা বিমানবন্দরে প্রায় কুড়ি মিনিট উড়ান পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে ঝড়ের পূর্বাভাস থাকায় এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল আগে থেকেই পরিস্থিতি সামলানোর পরিকল্পনা করেছিল। প্রবল বৃষ্টিতে রানওয়ে-সহ বিমানবন্দরের বিভিন্ন অংশে জল জমেছিল। পরে তা বার করে দেওয়া হয়।

দুর্যোগ মোকাবিলা নিয়ে শাসক-বিরোধী চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। দুর্যোগের পরে রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রীর কাছ থেকে ফোন আসেনি বলে দাবি করেছেন কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম। পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, “ঘটনার এক ঘণ্টার মধ্যে নিজে মাঠে নেমেছি। গোটা দফতরও নেমেছে। কলকাতার ৩৬টি জায়গায় গাছ ভেঙেছে। তৃণমূলের পুর প্রতিনিধিরা নিষ্ক্রিয়।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Weather

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy