আইএসএলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা সংশয় এবং মতপার্থক্য চলার মধ্যেই আজ, বৃহস্পতিবার সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সামনে ‘প্রেজ়েন্টেশন’ দেবে জিনিয়াস স্পোর্টস। সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের (এআইএফএফ) শীর্ষ কর্তারা তো থাকবেনই, ফেডারেশনের পক্ষ থেকে ক্লাবগুলির মালিকদের থাকতে অনুরোধ করা হয়েছে। কেউ কেউ উপস্থিত থাকবেন বলেও জানিয়ে দিয়েছেন। যেমন নর্থ ইস্ট ইউনাইটেডের পক্ষ থেকে জন আব্রাহাম আসছেন বৈঠকে। অন্যান্য আরও কয়েকটি ক্লাবের মালিকও আসবেন। আবার কয়েকটি ক্লাব হয়তো তাদের সিইও-কে পাঠাতে পারে।
ভারতীয় ফুটবলের জন্য বৃহস্পতিবার জিনিয়াস স্পোর্টসের প্রেজ়েন্টেশন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে কারণ আইএসএল এবং ফেডারেশন কাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের জন্য সর্বোচ্চ টাকার বিড করলেও এই সংস্থার সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্যতা এখনও পর্যন্ত সর্বসম্মত, জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ক্লাব জোটের একাংশ প্রশ্ন তুলেছে যে, কুড়ি বছরের দীর্ঘমেয়াদি স্বত্ব যাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, তাদের সর্বোচ্চ ফুটবল লিগ পরিচালনার কী অভিজ্ঞতা আছে? ক’দিন আগেই নতুন করে ফেডারেশনকে পত্রাঘাত করেছে ক্লাব জোট। তাতে তারা ফের আর্জি জানিয়েছে, সুপরিকল্পিত ভাবে, আলোচনার মাধ্যমে, স্বচ্ছতা রেখে দীর্ঘমেয়াদি নকশা করা উচিত ফেডারেশনের। যার অর্থ কী দাঁড়ায়? এ বছরের মতো ঠেলে-গুঁতিয়ে কাটছাঁট করে কোনওক্রমে আইএসএল চালু করা গেলেও এখনও দু’পক্ষে মতপার্থক্য অব্যাহত। ১৪টির মধ্যে ১৩টি ক্লাব এই চিঠিতে সই করেছে।
নর্থ ইস্ট ইউনাইটেডের পক্ষ থেকে জন আব্রাহাম আসছেন বৈঠকে। —ফাইল চিত্র।
ফেডারেশন তাই জেনেবুঝে বৃহস্পতিবারের সভায় ক্লাবের মালিকদের আহ্বান জানিয়েছে। যাতে তারা সরেজমিনে সব কিছু দেখে-শুনে নিতে পারেন। সভায় ভারতীয় ফুটবলের এক নম্বর লিগ আগামী দু’দশক ধরে কী ভাবে চালাবেন, তা-ই ব্যাখ্যা করবেন জিনিয়াস স্পোর্টসের কর্তারা। সঙ্গে তাঁদের সংস্থা সম্পর্কে অবহিত করবেন ফেডারেশন কর্তা ও ক্লাব জোটের প্রতিনিধিদের। ফুটবলে কোথায়, কোন দেশ বা দলের সঙ্গে তারা কী কাজ করেছেন, তার বিবরণ দেবেন। যদি ক্লাব মালিক বা প্রতিনিধিদের কোনও প্রশ্ন থাকে, তাঁরা সামনা-সামনি সেগুলি করে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। ফেডারেশনকে দেওয়া চিঠিতে ক্লাবেদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, নতুন একটি কমিটি করা হোক। সেই কমিটি করতে রাজি বলে উত্তর দিয়ে দিয়েছে ফেডারেশন। তবে প্রশ্ন উঠছে, ইতিমধ্যেই গভর্নিং কাউন্সিল এবং ম্যানেজিং কমিটি তো ছিলই। এ বার ওয়ার্কিং কমিটি করা হল। তা হলে আইএসএল পরিচালনার জন্য কতগুলি কমিটি থাকবে?
বৃহস্পতিবারের সভার আগেই সুইস ফুটবল লিগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জিনিয়াস স্পোর্টস। কিন্তু এই চুক্তি আইএসএলের একচ্ছত্র বাণিজ্যিক স্বত্ব কেনার মতো নয়। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ-সহ (ইপিএল) ইউরোপের বিভিন্ন লিগে ডেটা সরবরাহ করে জিনিয়াস স্পোর্টস। সুইস ফুটবল লিগের সঙ্গেও তারা যুক্ত হয়েছে ডেটা এবং এআই পরিকাঠামো সরবরাহকারী হিসেবে। কোনও কোনও দেশে বেটিংয়েও ডেটা সরবরাহ করার ইতিহাস রয়েছে জিনিয়াস স্পোর্টসের। ভারতে যে-হেতু বেটিং অবৈধ এবং অনলাইন গেমিংয়ে যুক্ত সংস্থাদেরও নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেখানে এই যোগাযোগ কোনও অন্তরায় হয় কি না, দেখার। মনে রাখতে হবে, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডকে পর্যন্ত মোটা টাকার চুক্তি ছেড়ে অনলাইন গেমিং সংস্থাদের স্পনসর হিসেবে বাতিল করতে হয়েছিল।
যদিও এই সব বাতিল হওয়া সংস্থাদের সঙ্গে জিনিয়াস স্পোর্টসের তুলনা করা যায় না বলেই প্রাথমিক ভাবে ফেডারেশন কর্তাদের মত। এ ব্যাপারে আইনি পরামর্শও তারা নিচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন, ‘‘সর্বোচ্চ টাকার বিড যারা করেছে, তাদেরই তো প্রথম প্রেজ়েন্টেশনের সুযোগ দিতে হবে। না হলে তারাই তো ফেডারেশনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবে।’’ আইএসএল এবং ফেডারেশন কাপের যৌথ স্বত্বের জন্য জিনিয়াস স্পোর্টসের বিডের মূল্য প্রথম বছরে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা। প্রত্যেক বছরে পাঁচ শতাংশ করে মূল্য বৃদ্ধি করবে বলে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যার ফলে কুড়ি বছরে তাদের প্রস্তাবিত অর্থের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২১৩০ কোটি। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ফ্যানকোডের আর্থিক প্রস্তাব তুলনায় অনেক কম। বছরে ৩৬ কোটি টাকা। প্রত্যেক বছর তারাও মূল্য বাড়াবে কিন্তু তার পরেও কুড়ি বছরের মোট প্রস্তাবিত বিড-অর্থ গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ৭০০ কোটি।
ফেডারেশন থেকে দাবি করা হচ্ছে, রিলায়্যান্সের সঙ্গে চুক্তি থেকে যে টাকা আসত, জিনিয়াস স্পোর্টসের প্রস্তাবিত অর্থ তার তিন গুণ। ক্লাব জোটের একটা বড় অংশ এর সঙ্গে একমত নয় এবং তারা প্রশ্ন তুলছে যে, টাকা বেড়েছে না কমেছে তা সময়ই বলবে। এদের ব্যাখ্যা, লিগ চালাতে কত খরচ করা হচ্ছে, সেটাও হিসাব করা দরকার। রিলায়্যান্সের দাবি ছিল, তারা বছরে দু’শো কোটি টাকা করে খরচ করেছে। নতুন বাণিজ্যিক স্বত্ব যারা কিনবে, তারা যদি বছরে ৬৫ কোটি দেয়, তা হলে তার মধ্যে কত টাকা লিগের খরচের জন্য বরাদ্দ করা হবে? খুব বিলাসবহুল লিগ কি সেই টাকায় করা সম্ভব হবে?
ক্লাব কর্তাদের আরও প্রশ্ন, যদি বছরে ৬৫-৭০ কোটি টাকা নতুন বাণিজ্যিক সঙ্গী দেয়, তা হলে সেই টাকা থেকে লিগ চালিয়ে ক্লাবদের কী মুনাফা দেওয়া হবে আর ফেডারেশনই বা কী লাভ করবে? ক্লাব কর্তাদের কারও কারও আশঙ্কা, এর ফলে লিগের মান ধাক্কা খাবে। ভাল বিদেশি ফুটবলার, কোচ আনা সম্ভব হবে না। এখন যে প্রচুর স্প্যানিশ ফুটবলার বা কোচকে দেখা যাচ্ছে আইএসএলে, ব্রাজিলীয়, অস্ট্রেলীয়রা আছেন বা প্রাক্তন বিশ্বকাপারদের নিয়ে আসা হচ্ছে, তা হয়তো সম্ভব হবে না। তখন আইএসএল না আই লিগের দিনে ফিরে যায়, সেই আতঙ্ক রয়েছে। অনেক ক্লাব ইতিমধ্যেই আর্থিক সঙ্কটের মুখে পড়েছে, ক্লাবগুলির জন্য বরাদ্দ টাকা যদি সত্যিই কমে যায়, তা হলে তাদের অস্তিত্ব আরও বেশি করে বিপন্ন হবে। ফেডারেশনের তরফেও পাল্টা যুক্তি রয়েছে যে, রিলায়্যান্স থাকার সময়েই বা ক্লাবদের কী এমন টাকা দেওয়া হত? দু’শো কোটি টাকা খরচ করার দাবি জানানো হলেও আদতে একটা ভাল লিগ চালাতে কত খরচ করা দরকার, সেই সঠিক হিসাবটা থাকাও তো জরুরি। প্রসঙ্গত, বছরের পর বছর ধরে তারা আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে জানিয়ে রিলায়্যান্স সংস্থা নিজেরাই সরে দাঁড়িয়েছিল আইএসএল পরিচালনার দায়িত্ব থেকে। এ বারে তারা বিডও করেনি। এই মুহূর্তে জিনিয়াস স্পোর্টস বা ফ্যানকোড ছাড়া বিকল্পও হাতে নেই।
সব মিলিয়ে ফেডারেশন এবং ক্লাব জোট— দু’পক্ষে শিঙা ফোঁকাফুঁকি চলছে। এই আবহে বৃহস্পতিবারের বৈঠক। আগুনের ফুলকি উড়লে অবাক হওয়ার নেই!
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)