এ বারের সংক্ষিপ্ত আইএসএলের টিভি সম্প্রচার নিয়ে শেষ মুহর্তের কোনও নাটক কি অপেক্ষা করছে? রিলায়্যান্স সংস্থার জিয়োস্টার, যারা এ বারের লিগের সঙ্গে যুক্ত হতে চাইছিল না, তাদের নিয়ে জোরাল চর্চা শুরু হয়েছে রবিবার রাতের দিকে। গত কয়েক দিন ধরে চলতে থাকা ঘটনাবলীর ব্যাপারে ওয়াকিবহাল কারও কারও ইঙ্গিত, জিয়ো এ বারের আইএসএলের টিভি সম্প্রচারের জন্য ‘বিড’ করলেও করতেও পারে। অনেকে আবার এই জল্পনায় খুব একটা গা ভাসাতে রাজি নয় কারণ কয়েক দিন আগে প্রাক-বিড প্রক্রিয়াতেও জিয়োস্টারের তরফে আগ্রহ প্রকাশ করতে দেখা যায়নি।
এ বারের আইএসএলের ‘মিডিয়া রাইট্স’ সংক্রান্ত টেন্ডারের শেষ সময়সীমা পেরিয়ে গেল রবিবারই। অর্থাৎ, আগ্রহী সংস্থাদের দরপত্র জমা পড়ে গিয়েছে। আজ, সোমবার সকাল এগারোটা নাগাদ বন্ধ খাম খোলা হবে। তার আগে পর্যন্ত জানার উপায় নেই, কারা ‘বিড’ করেছে। তাই জিয়োস্টার সত্যিই দরপত্র জমা দিয়েছে কি না, তা জানা যাবে সোমবার দুপুরেই। তবে এটা ঠিক, এ বারের লিগ নিয়ে এতদিন ততটা উৎসাহী না হলেও কুড়ি বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রিলায়্যান্স সংস্থার এফএসডিএল আগের চেয়ে কম বাজেটে আইএসএলের বাণিজ্যিক সঙ্গী হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। এফএসডিএল-ই প্রথম দশ বছর আইএসএল পরিচালনার দায়িত্বে ছিল এবং তাদের অধীনেই জিয়োস্টার চ্যানেল এবং ওটিটি।
এর আগে প্রাক-বিড প্রক্রিয়ায় পাঁচটি সংস্থা আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। এর মধ্যে তিনটি ভারতীয় সংস্থা। সোনি, জি এবং ফ্যানকোড। সঙ্গে দু’টি বিদেশি ওটিটি আগ্রহ দেখিয়েছিল। সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের (এআইএফএফ) সঙ্গে বৈঠকে এই সংস্থাগুলি নানা প্রশ্ন রেখেছিল। সেদিন জিয়োস্টার না এলেও গত কয়েক দিন ধরে তারা আগ্রহ প্রকাশ করতে শুরু করে বলে সূত্রের খবর। শোনা যাচ্ছে, সেদিন উপস্থিত থাকা অন্য দুই ভারতীয় চ্যানেল সোনি ও জি ‘বিড’ না-ও করতে পারে। যদিও নিশ্চিত করে কেউ এ নিয়ে বলতে পারলেন না রবিবার রাত পর্যন্ত। তবে ফ্যানকোড এবং অন্যান্য আরও কয়েকটি সংস্থা ডিজিটাল স্বত্বের জন্য দরপত্র জমা দিয়ে থাকতে পারে বলে অনুমান। ফ্যানকোড সম্প্রতি আফ্রিকা কাপ অব নেশন্সের লাইভ স্ট্রিমিং করেছে। কাফা নেশন্স কাপ, যেখানে খালিদ জামিলের কোচিংয়ে ভারত তৃতীয় হয়েছিল, তার অনলাইন সম্প্রচার করেছিল।
প্রসঙ্গত, আইএসএলের প্রথম দশ বছরে রিলায়্যান্স সংস্থার এফএসডিএলের হাতেই লিগ পরিচালনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছিল। এর পর তারা জানায়, দশ বছরে দু’হাজার কোটি টাকা লগ্নি করে শুধু ক্ষতি ছাড়া এক বিন্দু লাভের মুখ দেখেনি। তাই এ বার থেকে আইএসএল পরিচালনার দায়িত্ব নিলেও তারা অনেক কম টাকায় লিগ চালাতে চায়। বছরে দু’শো কোটি টাকা আর খরচ করতে পারবে না, অনেক কম বাজেটে আইএসএল করতে চায়। ফেডারেশন তাদের পরিবর্তিত প্রস্তাব সেই সময় মেনে নিতে চায়নি। কর্তারা ভেবেছিলেন, ভারতীয় ফুটবলের বাজার এতটা খারাপ হয়নি যে, অন্যরা কেউ আগ্রহ দেখাবে না। শেষে যদিও টেন্ডার ডাকার পরেও কেউ ‘বিড’ না করায় উল্টে অপদস্থ হতে হয়েছিল।
তাই এ বারের সংক্ষিপ্ত লিগ নিয়ে কারও কারও বেশ আশঙ্কা হচ্ছিল, ভারতীয় ফুটবলের এমন অন্ধকার দশার মধ্যে আদৌ কেউ টিভি সম্প্রচার নিয়ে আগ্রহী হবে? তার উপর ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে আইএসএল। সেই সময় দেশের মাঠে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চলবে। তার পরে শুরু হবে আইপিএল। এই দু’টি মেগা ইভেন্টের মধ্যে তিন মাস ধরে চলা আইএসএল দেখতে কেউ টিভির সামনে বসবে? তার উপর ম্যাচ শুরুর সময়ও মোটামুটি এক— সাতটা থেকে সাড়ে সাতটা। এই কারণেই আরও জিয়োস্টার এ বারের লিগে আগ্রহ দেখাবে না বলে মনে করা হচ্ছিল, যে-হেতু কুড়ি ওভারের বিশ্বকাপ ও আইপিএল দু’টো বড় প্রতিযোগিতাই তারা সম্প্রচার করবে।
বিশ্বের সর্বত্র যে কোনও খেলায় এখন প্রধানত টাকা আসে টিভি সম্প্রচার স্বত্ব থেকে। সে আইপিএল হোক কী ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ কী লা লিগা বা এনবিএ। অথবা দেশের খেলায় বিশ্বকাপ ফুটবল, বিশ্বকাপ ক্রিকেট বা অলিম্পিক্স। আইএসএল বা আই লিগ যদি কোনও টিভি সংস্থা দেখাতে রাজিও হয়, দেখতে হবে কত টাকায় স্বত্ব বিক্রি হচ্ছে। বিশেষ করে ক্লাবগুলি যখন তীব্র আর্থিক সঙ্কটে ভুগছে, সেই সময় টিভি স্বত্বের লক্ষ্মী যদি হাতছাড়া হয়, ফেডারেশন ও ক্লাবগুলির মাথার উপর আর্থিক বোঝা আরও চাপবে। কারও কারও কথায়, ‘‘টিভি স্বত্ব হচ্ছে লিগের মেরুদণ্ড। ওটা ঠিক না থাকলে সব কিছু একেবারে ভেঙে পড়বে।’’ এঁদের আরও বক্তব্য, ‘‘শুধু টিভিতে দেখানোর ব্যাপার হলে তো দূরদর্শনও দেখিয়ে দেবে। সঙ্গে ক্লাবগুলির ইউটিউব চ্যানেল আছে। সেখানে যথেষ্ট ভাল পরিমাণ ফলোয়ার্স থাকে। ঘটা করে কোনও চ্যানেল বা ওটিটিকে এনে কী হবে যদি ক্লাবগুলি আর্থিক সমর্থনই না পায়?’’
‘মিডিয়া রাইট্স’-এ নানা ধরনের ‘প্যাকেজ’ রেখেছে এআইএফএফ। কেউ একই সঙ্গে টিভি চ্যানেল ও ওটিটি-তে প্রোডাকশন ও টেলিকাস্টের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিতে পারে। অর্থাৎ, সে ক্ষেত্রে একটি সংস্থাকে পুরো স্বত্ব দিয়ে দেওয়া যেতে পারে, আর কোনও ভাগাভাগির হ্যাপা থাকল না ফেডারেশন বা ক্লাবগুলির। আবার কেউ শুধু চ্যানেলের স্বত্ব কিনতে পারে, অন্য কেউ নিল ডিজিটাল রাইট্স। অথবা কেউ শুধু টেলিকাস্ট রাইট্স নিতে পারে, তখন অন্য কাউকে নিতে হবে প্রোডাকশনের দায়িত্ব।
রবিবার রাত পর্যন্তও ওয়াকিবহাল মহলে আশা ও আশঙ্কার স্রোত। আইএসএলের টিভি স্বত্ব ফয়সালার দিনে কি মেঘাচ্ছন্ন আকাশই থাকবে? নাকি মেঘ কেটে রোদ্দুরের দেখা মিলবে? ক’টা ‘বিড’ জমা পড়ল? কারা জমা দিল? আদৌ কি কেউ জমা দিল? জিয়োস্টারের আগ্রহ প্রকাশ করার খবর কতটা সত্যি? ফুটবলপ্রেমীদের মনে নানা প্রশ্ন। উত্তর জানা যাবে বন্ধ খাম খোলা হলে, তবেই। অপেক্ষা এখন সোমবার দুপুরের!
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)