খেলা শুরুর আগেই গ্যালারি থেকে নেমে এল টিফো। তাতে লেখা, ‘আ সেঞ্চুরি অব রাইভালরি বাউন্ড বাই রেসপেক্ট’— অর্থাৎ শতবর্ষের লড়াই হলেও পারস্পরিক সম্মান থাকবে। সেই টিফোতে দুই ক্লাবের দুই প্রাক্তন কর্তার মুখ। এক জন সদ্য প্রয়াত মোহনবাগানের প্রাক্তন সভাপতি স্বপনসাধন (টুটু) বসু এবং অন্য জন ইস্টবেঙ্গলের প্রাক্তন সচিব দীপক (পল্টু) দাস। সমর্থকদের সেই সম্মান প্রদর্শনের জন্যই বোধ হয় দুই দলই পরের পর সুযোগ নষ্ট করল। দু’তরফে মান বাঁচালেন যথাক্রমে এডমুন্ড লালরিনডিকা এবং জেসন কামিংস। ফলে বৃহস্পতিবার লিগের শেষ ম্যাচেই দুই দলের খেতাবি ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।
ম্যাচ শেষের পরে মোহনবাগানের কোচ সের্খিয়ো লোবেরা সুযোগ নষ্টের কথা বললেও তাঁর মুখে বিশ্বাসের কথাও শোনা গেল। সেই বিশ্বাসকে পাথেয় করেই তিনি বৃহস্পতিবার দিল্লি এফসির বিরুদ্ধে নামতে চান। জেতার পাশাপাশি মোহনবাগানকে মাথায় রাখতে হবে গোল-পার্থক্যের কথাও। সে ক্ষেত্রে ইস্টবেঙ্গল জিতলেই প্রথম বারের মতো আইএসএল চ্যাম্পিয়ন হবে। বহু যুদ্ধের নায়ক প্রাক্তন ফুটবলার অ্যালভিটো ডি’কুনহা ফোনে গোয়া থেকে বলছিলেন, “আমি কিন্তু ইস্টবঙ্গলকেই এগিয়ে রাখছি। কারণ মোহনবাগান প্রথম থেকেই গোল পার্থক্য মাথায় নিয়ে নামবে। সেখানে অস্কার ব্রুসোর মাথায় থাকবে শুধু জয়।”
সাংবাদিক বৈঠকে লোবেরা বলছিলেন, “প্রথম ২০ মিনিট আমরা যথেষ্ট ভাল খেলেছি। ওই সময়ে নিশ্চিত গোলের দু’টি সুযোগ নষ্ট হয়েছে। ম্যাচের একেবারে শেষ দিকেও আমাদের ভুলেই গোলের সুযোগ নষ্ট হয়েছে। আমাদের জেতা উচিত ছিল। ফাইনাল-থার্ডে আরও নিখুঁত হওয়া উচিত ছিল।”
বৃহস্পতিবার দিল্লি এফসির বিরুদ্ধে যুবভারতীতে খেলবে মোহনবাগান। ১২ ম্যাচে ১১ পয়েন্ট নিয়ে এগারো নম্বরে রয়েছে দিল্লি। সেই ম্যাচে তাঁর রণকৌশল রবিবার রাতেই কিছুটা বলে দিলেন লোবেরা। “আমাদের নিজেদের উপরে বিশ্বাস রাখতে হবে। সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপাব। তিন পয়েন্ট ছাড়া অন্য কিছু ভাবছি না। গোল পার্থক্যের কথা এখন মাথায় রাখতে চাই না। ফুটবলারদের পরামর্শ দেব, নিজেদের উপরে বিশ্বাস রাখ। তোমরা পেশাদার ফুটবলার। শেষ বাঁশি বাজার আগে পর্যন্ত হার মানা চলবে না,” বক্তব্য লোবেরার। তবে লোবেরাকে ভাবাচ্ছে জেসন কামিংসের চোট। যুবভারতী থেকে বেরনোর সময়ে কামিংসকে ক্রাচ নিয়ে বেরোতে দেখা যায়। মোহনবাগান দল পরিচালন সমিতির তরফে জানা গিয়েছে, কামিংস শেষ ম্যাচে অনিশ্চিত।
অন্য দিকে কেরল ব্লাস্টার্স এফসির বিরুদ্ধে এগিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তে গোল হজম করে জয় মাঠে ফেলে আসে ইস্টবেঙ্গেল। যার পরে অস্কারকে ‘গো ব্যাক’ ধ্বনিও শুনতে হয়েছিল। রবিবারও ৮৫ মিনিটে এডমুন্ড লালরিনডিকার গোলে এগিয়ে যাওয়ার পরেও পাঁচ মিনিটের মধ্যে গোল হজম করতে হয় ইস্টবেঙ্গলকে। ফলে সাংবাদিক বৈঠকে লাল-হলুদ কোচ অস্কার ব্রুসো নিজের হতাশার কথা লুকোননি। “আমাদের গোল ধরে রাখা উচিত ছিল। কেরল ব্লাস্টার্স ও মোহনবাগানের বিরুদ্ধে শেষ মিনিটে গোল হজম না করলে আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়ে যেতে পারতাম। যথেষ্ট সুযোগ তৈরি করলেও সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারিনি।”, হতাশ কণ্ঠে বলে দিলেন অস্কার।
শেষ ম্যাচের আগে তিনি কোন বিষয়ে উন্নতি করতে চান? অস্কারের উত্তর, “আমাদের ফিনিশিংয়ে আরও নিখুঁত হতে হবে। পাশাপাশি সেট-পিসে আরও উন্নতি করতে হবে। তবে সব দিক মিলিয়ে বলতে পারি ডার্বিতে আমরা জেতার যোগ্য ছিলাম। তা হলে কাশীর বিরুদ্ধে মরণ-বাঁচন ম্যাচ নিয়ে এতটা ভাবতে হত না।” এ দিকে, ম্যাচ শেষ হওয়ার পরে প্রচন্ড গরমে বিপিন সিংহ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে স্ট্রেচারে করে মাঠের বাইরে আনা হয়।
এ দিন ম্যাচ শুরুর আগে প্রয়াত টুটু বসুর স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। ম্যাচ সেরার পুরস্কার জেতেন ইস্টবেঙ্গলের মিগুয়েল ফিগুয়েরা। তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেন বাংলার ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, “খেলায় স্বজনপোষণ বন্ধ করতে হবে।” যুবভারতীর বাইরে যে মূর্তি রয়েছে যা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে, সেই মূর্তি সরিয়ে দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান। ক্রীড়ামন্ত্রী বলেছেন, “ওই মূর্তি সরিয়ে দেওয়া হবে। পাশাপাশি বাইরে ফুডকোর্ট করা হবে।” বাষট্টি হাজার সমর্থকের সামনে ডার্বির স্বাদ নিতে হাজির হয়েছিলেন নিউ জ়িল্যান্ডের প্রাক্তন ক্রিকেটার কেন উইলিয়ামসনও। তিনি লখনউ সুপার জায়ান্টসের রণনীতি সংক্রান্ত পরামর্শদাতা (স্ট্র্যাটেজ়িক অ্যাডভাইসর)। বেরনোর সময়ে বলে গেলেন, “দারুণ অনুভূতি।” ক্রীড়ামন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কল্যাণ চৌবে ও বিজেপি বিধায়ক তাপস রায়।
নিষ্ফলা ডার্বির দিনে মাঠের বাইরে অবশ্য সম্প্রীতির ছবিটাই বিশেষ উল্লেখ্য। ম্যাচ শুরু হওয়ার আধ ঘণ্টা আগে ভিআইপি গেট দিয়ে প্রবেশ করে ছয় জনের এক দল। বিশেষ করে নজর কাড়লেন দু’জন। এক জনের পরনে মোহনবাগানের জার্সি, অন্য জন পরে এসেছেন ইস্টবেঙ্গলের জার্সি।
ডার্বি যেখানে সিংহভাগ সময়ে সাক্ষী থেকেছে রক্তক্ষরণের, কেন সেখানে এই সম্প্রীতি? মোহনবাগানের সমর্থক সৌরভ বসু বললেন, “আমরা চাই বাংলাতেই ট্রফি থাকুক। যে দলই জিতুক না কেন, তাতে অন্তত আমার কোনও অসুবিধা নেই। ট্রফি যেন মুম্বই বা বেঙ্গালুরু নিয়ে না চলে যায়।” তাঁর কথাকে সমর্থন করে লাল-হলুদ সমর্থক অগ্নিজিৎ মল্লিক বলেন, “শিরোপা বাংলায় থাকলেই খুশি হব। আমরা ফুটবলের সমর্থক।” তবে ম্যাচের পরে এই সম্প্রীতির ছবি কিন্তু দেখা গেল না। যুবভারতীর গেটের বাইরে মোহনবাগানের এক মহিলা সমর্থককে চড় মারে ইস্টবেঙ্গলের এক যুবক। সেই ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)