শ্রীলঙ্কা হল ভোজনরসিকদের স্বর্গদ্বার। ফুডিরা প্রথম বার এলে জাস্ট মজে যাবেন।
এখানকার আনারস এত মিষ্টি যে শিলংয়ের আনারস ছাড়া বাকিদের অবস্থা রঙ্গনা হেরাথের বিরুদ্ধে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের মতো করে দেবে। ডাবের রং কখনও সবুজ, তবে বেশির ভাগেরটাই কমলা। সেটাও ভারতীয় ডাবের চেয়ে বেশি মিষ্টি। শ্রীলঙ্কানরা টক দই একটা মিষ্টি সিরাপ দিয়ে খায়। এই সিরাপটা এখানে ছাড়া পাওয়া যায় না। দুটো মিলে একটা অনির্বচনীয় তৃপ্তিসুখ। সমুদ্রের ধারে বলে চিংড়ির জোগানও অফুরন্ত। স্থানীয় অরণ্যপ্রবাদ হল, যদি আপনি শ্রীলঙ্কান মশলা দিয়ে তৈরি এখানকার লবস্টার কারি না খেয়ে থাকেন, তা হলে ধরে নিতে হবে শ্রীলঙ্কায় আপনার ইমিগ্রেশন হয়নি। আর কাঁকড়া? সেও তো এখানকার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ডিশ— দারুণ সুস্বাদু। সঙ্গকারা আর জয়বর্ধনের ভারতীয় টিম হোটেলের কাছাকাছি একটা আস্ত হাই-এন্ড রেস্তোরাঁই আছে— মিনিস্ট্রি অব ক্র্যাবস!
পৃথিবীর আর সব শহরের তুলনায় শ্রীলঙ্কার টিম হোটেলে ব্রেকফাস্ট যে দীর্ঘস্থায়ী হবে, এর মধ্যে আর আশ্চর্যের কী আছে। অঢেল সম্ভার সাজানো। যত খুশি সেই স্প্রেড থেকে বেছে বেছে খাও। অথচ সামনের যে ছিপছিপে তরুণের মাথায় টুপি, তিনি ব্রেকফাস্টে ঢুকলেন কী ঢুকলেন না, দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। সরু দরজাটা দিয়ে তাঁর আসল গন্তব্যের দিকে।
তাজ সমুদ্র হোটেলের জিম।
পেছন থেকেও চিনে নিতে অসুবিধে নেই। টিমে এই দ্রুত নড়াচড়া এক জনেরই হতে পারে। স্বয়ং অধিনায়ক।
তাঁকে বিরাট কোহলিকে এক ঝলক দেখেই বোঝা যাচ্ছে সতীর্থদের যতই বলুন, কেউ আর হার নিয়ে গুমরে রুমে বসে থাকবে না। সামনে নতুন টেস্ট। তোমরাও নতুন দিন মনে করে তৈরি হও। দেখে বোঝা যাচ্ছে নিজেরই সেই প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করতে সমস্যা হচ্ছে। নিজস্ব ফিটনেসে টিমে এক নম্বর। আজও মনে হচ্ছে হতাশা কাটাতে জিমে আরও বেশি সময় দেবেন।
খাওয়াদাওয়া তো এমনই অসম্ভব সংযমী যে টিমে কেউ কেউ উল্টে অনুযোগ করেছে বিরাট সামনে থাকলে চিকেন বাটার মসালা অর্ডার দিতেও অপরাধবোধ হয়। কারণ কোহলি তেল-মশলা একদম এড়িয়ে চলেন। ফ্যাটি ফুড বর্জন। কার্বোহাইড্রেট পরিমিত। বেশির ভাগটাই গ্রিলড। টিম ইন্ডিয়ার সঙ্গে জড়িত এক জন বলছিলেন, টিমে সবার কাছে দৃষ্টান্ত। শুধু মাঠের মধ্যে সেরা ব্যাটসম্যানই নন। মাঠের বাইরে নিজেকে সংযমী রাখতেও সেই তাড়না।
বিরাটের জমানায় ভারতীয় সাপোর্ট স্টাফে দুটো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। নতুন ফিজিও এসেছেন প্যাট্রিক ফারহাত। এসেছেন নতুন বিদেশি ট্রেনার। এসেছেন নতুন ম্যাসিওর। বাদ গিয়েছেন ভারতীয় দলের সঙ্গে দীর্ঘ দিন থাকা অঙ্গসংবাহক মানে কাকা। ইনি প্লেয়ার, সাংবাদিক নির্বিশেষে সবার প্রিয় ছিলেন কিন্তু টিমের একাংশই নিশ্চয়ই ফিডব্যাকটা দিয়েছে যে হাতের জোর কমে গিয়েছে তাঁর। তাঁকে দিয়ে ডিপ টিস্যু মাসাজ হচ্ছিল না, যেটা প্লেয়ারের চাই। এতগুলো পরিবর্তন অবশ্যই বিরাটের সম্মতি না নিয়ে করা হয়নি। সবাই ক্রমশ বুঝতে শুরু করেছে যে ধোনি ফিটনেস নিয়ে যত উদার ছিলেন, ইনি নতুন টেস্ট নেতা ঠিক ততটাই কড়া। আর যাই হোক, ফিটনেসে বিচ্যূতি বরদাস্ত করবেন না।
টেস্ট ক্যাপ্টেন হিসেবে ব্যাটিংয়েও দুর্দান্ত এগোচ্ছেন কোহলি। চার টেস্টে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মোট সেঞ্চুরির সংখ্যা চার। ফিটনেস যদি মন্ত্র হয় এবং ব্যাটিং যদি হয় মাপকাঠি, তা হলে দুটো সাবজেক্টেই তাঁর নম্বর সবচেয়ে বেশি।
সমস্যা হল ক্যাপ্টেন হিসেবে এই দুটোর বাইরেও তৃতীয় ইনপুটের প্রয়োজন হয়। কুশলী অধিনায়কত্ব। যা বিচার হয় মুখ্যত পারফরম্যান্স দিয়ে। সে দিক থেকে মোটেও উজ্জ্বল নয় ক্যাপ্টেন কোহলির মার্কশিট। একটাও জেতেননি। শতকরা পঞ্চাশ ভাগ ম্যাচ হেরেছেন।
মনে করা হচ্ছে যে দুটো টেস্ট হেরেছেন সেই দুটোতেই বিচক্ষণতা দেখালে তিনি হারতেন না। অ্যাডিলেডে তো অনায়াসে ড্র করা যেত। কিন্তু কোহলি যখন ড্রয়ের কথা ভাবলেন তখন টেলএন্ডারদের দ্বিতীয় সারি ক্রিজে। আর কিছু করার নেই। সে দিন ঝাঁপ ফেলার সিদ্ধান্তটা আধ ঘণ্টা আগে নিলে সিরিজের প্রথম টেস্ট ভারতকে অনর্থক হারতে হত না। তারও আগে দল গঠনে তিনি অবিবেচকের মতো অশ্বিনকে বাদ দিয়ে কর্ণ শর্মাকে খেলিয়েছিলেন। গলে যেমন উমেশ যাদবকে হঠাৎ বাদ দিয়ে দিলেন। পূজারার উপমহাদেশে অনবদ্য রেকর্ড জেনেও রোহিত শর্মাকে পাঠিয়ে দিলেন তিন নম্বরে। অশ্বিন ভাল বল করতে করতে হঠাৎ ভাজ্জিকে নিয়ে এলেন। দেখা যাচ্ছে চার টেস্টের বিভিন্ন সময় নিছক ইন্সটিঙ্কট-নির্ভর অধিনায়কত্ব করেছেন কোহলি। যা বড় অধিনায়কের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পড়ে না। বড় টেস্ট অধিনায়ক নিশ্চয়ই এক-আধ বার অনুভূতির দ্বারা চালিত হবে। কিন্তু সে মুখ্যত রাজ করবে বিচক্ষণতার ওপর। তার মাথায় তিন-চার রকম বিকল্প সব সময় মজুত থাকবে। চণ্ডীমল মারলেও সে দিশেহারা হবে না।
এ দিন যেমন মুম্বই থেকে দিলীপ বেঙ্গসরকর বলছিলেন, ‘‘উচিত ছিল রঙ্গনা হেরাথের কথা ভেবে সুরেশ রায়নাকে শ্রীলঙ্কা নিয়ে যাওয়া। শ্রীলঙ্কার তেমন ফাস্ট বোলার নেই। রায়না ঠিক মাঝে সামলে দিত।’’ রায়না নামটা নিয়ে সবাই একমত হন বা না হন, এই ছোট ছোট স্মার্টনেস বা ভাবনা এখনও কোহলির নেতৃত্বে অনুপস্থিত।
যার দায় অনেকটাই তাঁর পূর্বসূরির। মহেন্দ্র সিংহ ধোনি যে হেতু প্রকৃতিগত ভাবে টেস্ট ক্রিকেটের ভক্ত নন, তিনি টিম ইন্ডিয়ায় শেষ ক’বছরে কোনও টেস্ট সংস্কৃতি জারি রাখেননি। টেস্ট তাঁর কাছে ছিল নিছকই ক্রিকেট কফিনে টসের ব্লেজারটা বাড়তি ঢুকিয়ে নেওয়া। ব্লেজার তো আর ওয়ান ডে বা টি-টোয়েন্টিতে লাগে না। ধোনির দৌলতে ভারতীয় ড্রেসিংরুমের গোটা সংস্কৃতি হয়ে গিয়েছে সীমিত ওভার আর আইপিএল মার্কা। যেখানে ফিটনেস ফান্ডার গুরুত্ব স্কিল ফান্ডার চেয়ে অনেক বেশি। যেখানে টেস্ট ম্যাচ স্ট্র্যাটেজির চেয়ে বেশি ডায়েট আর কার্বোহাইড্রেট নিয়ে চর্চা হয়। ক্রিকেটে ফিটনেস অবশ্যই জরুরি কিন্তু আর সব খেলার মতো টেস্ট ক্রিকেটে অন্তত স্কিলকে ছাপিয়ে সর্বগ্রাসী আজও নয়। আজও ট্রেডমিলে বেশি হাঁফালে ম্যাচে গিয়ে বেশি রান করা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরঞ্চ সেই নিশ্চয়তা দিতে পারে নেট প্র্যাকটিস।
কোহলির ভারত সংস্কৃতি পরিবর্তনের এই গুনেগারটাই দিচ্ছে কারণ আগের নেতার শেষ দিক থেকে সেটা দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এই সময়ের মধ্যে টেস্ট ক্রিকেটে একমাত্র অস্ট্রেলিয়াকে দেশে ৪-০ হারানো ছাড়া ভারত কোথাও কিছু জেতেনি। অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে পরপর হেরে এসেছে। ইংল্যান্ডে হেরেছে। নিউজিল্যান্ডে হেরেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় হেরেছে। এমনকী ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের কাছে প্রথম টেস্ট জিতেও সিরিজ হেরেছে ১-২।
কোহলি তখন মোটেও ক্যাপ্টেন ছিলেন না। কিন্তু তিনি তো সেই জমানারই ফসল। চোখের সামনে দেখেননি টেস্ট ক্রিকেটের তীক্ষ্ণ দাবার চাল— যা সেরা অধিনায়ককে তার প্রতিযোগীর থেকে আলাদা করে দেয়। বা দেখেননি টেস্ট ম্যাচ হারের শোকে একটা ড্রেসিংরুমকে বিদীর্ণ হয়ে যেতে।
শিখর ধবনের চোট নিয়ে দেশে ফিরে যাওয়ার খবর এ দিন বোর্ড জানানোর পর ভারত অধিনায়কের আরওই সমস্যা। এই অবস্থা থেকে বিভ্রান্ত ভারতকে মোড় ঘুরিয়ে যদি ২-১ সিরিজ জেতাতে পারেন কোহলি, তার পরেও তাঁর কাজ মোটেও শেষ হচ্ছে না। তাঁকে দ্রুত টেস্ট ম্যাচ-পরিণত-অধিনায়ক হতে হবে। অনেকেরই মনে হচ্ছে পরিণতির প্রশ্নে রবি শাস্ত্রীর পথ প্রদর্শন কী মাপের হয়, সেটা খুব জরুরি হবে। তেন্ডুলকর এত বড় ক্রিকেটার হয়েও তাঁর সময়ে কোচ হিসেবে কোনও ভাল পথ-প্রদর্শক পাননি। শেষ পর্যন্ত রাস্তাও তাই আর খুঁজে পাননি।
ভারতীয় ক্রিকেটে ক্যাপ্টেন্সির দু’টো হাইওয়ে রয়েছে। প্রথমটা সচিন হাইওয়ে। যে অমিতবিক্রমশালী ক্রিকেটার, দারুণ প্যাশন কিন্তু ধূর্ত দাবার চালগুলো দিতে কখনও শেখেনি। তাই সেরা ক্রিকেটার হয়েও বড় ক্যাপ্টেন হয়নি। দুই, গাঙ্গুলি হাইওয়ে। নিজে টিমের বেস্ট প্লেয়ার ছিল না কিন্তু ক্যাপ্টেন্সিতে টিমে অবিসংবাদী এক নম্বর। যে অবস্থায় টিমকে পেয়েছিল আর যে অবস্থায় ছাড়তে বাধ্য হল, তার মধ্যিখানের বিশাল রাস্তাটা হিসেব করলেই তার অবদান বোঝা যাবে।
কোহলি প্রকৃতিগত ভাবে যত না ধোনি, তার চেয়ে অনেক বেশি সৌরভ। কিন্তু ফলের মাপকাঠি আর বিচক্ষণতার মাপ না বদলালে তিনি অন্য হাইওয়েতে গিয়ে পড়তে পারেন এমন আশঙ্কা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। কোথায় আবার, ভারতীয় ক্রিকেটমহলে।
সব খেলাই কমবেশি নিষ্ঠুর। ক্রিকেট একটু বেশি নিষ্ঠুর!