×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৫ জানুয়ারি ২০২১ ই-পেপার

‘সেঞ্চুরি না করলে তো টিম থেকে বাদ দিয়ে দেবে!’

সৌরাংশু দেবনাথ
কলকাতা১৬ ডিসেম্বর ২০১৯ ১৬:২৮
আক্রমণাত্মক ঋষভ। রবিবার চেন্নাইয়ে ৬৯ বলে ৭১ করলেন তিনি। ছবি: পিটিআই।

আক্রমণাত্মক ঋষভ। রবিবার চেন্নাইয়ে ৬৯ বলে ৭১ করলেন তিনি। ছবি: পিটিআই।

অগস্টে পারিয়া উপসাগরের তীরে পোর্ট অফ স্পেনের পর খেলেননি ওয়ানডে। দিন কয়েক আগে আরব সাগরের তীরের মুম্বইয়ের পর এই মুহূর্তে টি-টোয়েন্টিও নেই। ৫০ ওভারের ফরম্যাট ও ২০ ওভারের ফরম্যাট, দুটোতেই শেষ ইনিংসে অদ্ভুত মিল। ঋষভ পন্থ কোনওটাতেই খাতা খুলতে পারেননি!

দুই ফর্ম্যাটেই শেষ ইনিংসে শূন্য আসলে প্রতীকী। মহেন্দ্র সিংহ ধোনির উত্তরসূরি হিসেবে একসময় চিহ্নিত হয়েছিলেন। এখন প্রায়ই তাঁকে দেখে গ্যালারি থেকে ওঠে ধোনির নামে জয়ধ্বনি। টেস্ট দলে ঋদ্ধিমান সাহার কাছে হারিয়েছেন জায়গা। ছোট ফরম্যাটে তৈরি রাখা হচ্ছে সঞ্জু স্যামসনকে। আলগা শটে বার বার আউট হওয়া, একের পর এক ব্যর্থতা, ক্রমাগত সমালোচনা, ক্রমবর্ধমান চাপ, ধেয়ে আসা বিদ্রুপ— দিল্লির ২২ বছর বয়সি জীবনের ওঠাপড়াকে সহজে গায়ে মাখতে দেননি।

চেন্নাইয়ে বঙ্গোপসাগরের তীরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে অবশেষে ছন্দে ফিরলেন তিনি। যদিও ওয়ানডে সিরিজ শুরুর আগে তাঁকে তাড়া করেছিল অস্থিরতা, সংশয়, উদ্বেগ। কেন রান আসছে না, কোথায় ভুল হচ্ছে, প্রশ্নগুলোর আকার ক্রমশ বড় হচ্ছিল। উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলেন না। আর তাই দ্বারস্থ হয়েছিলেন ছোটবেলার কোচ তারক সিন্‌হার কাছে। জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সমস্যার উৎস কোথায়? কোচের ভোকাল টনিকে ফেরে মানসিক শান্তি। বাইশ গজে ব্যাট হাতে রবিবারের ৭১ কোথাও গিয়ে হয়ে উঠছে তারই ইঙ্গিত।

Advertisement

ঠিক কী বলেছিলেন ছাত্রকে? সোমবার দুপুরে মোবাইলে আনন্দবাজার ডিজিটালকে তারক বললেন, “মানসিক সমস্যা হচ্ছিল ওর। এই ম্যাচের আগেই ফোন করেছিল। ও ভাবছিল, ভালই খেলছি, নেটে ঠিকঠাক ব্যাটে-বলে হচ্ছে, কিন্তু ম্যাচে রান আসছে না। কেন এটা হচ্ছে, তা নিয়েই দিশেহারা ছিল। ওকে তখন বোঝালাম যে, এ বার লম্বা ফরম্যাট, ৫০ ওভারের খেলা। তাই সময় পাওয়া যাবে। প্রত্যেক বলকে মেরিট অনুসারে খেলতে হবে। তাড়াহুড়োর কোনও দরকার নেই। বললাম, শরীরের কাছে খেলতে। মানে শরীর থেকে দূরে যেন শট না নেয়। ক্রিকেটে যাকে ‘ক্লোজড টু বডি’ বলে, সেটাই আর কী। সেগুলোই করে দেখিয়েছে এই ইনিংসে।”

সমস্যা অবশ্য আগে থেকেই চলছিল। গত কয়েক মাস ধরেই চলেছে মানসিক যন্ত্রণা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি সিরিজ শুরু হওয়ার আগে তাই কোচের কাছে বিশেষ প্র্যাকটিস করেছিলেন ঋষভ। কেমন ছিল সেই প্র্যাকটিস? কোচ শোনালেন, “আমার কাছে প্র্যাকটিস করতে এসেছিল। তখন ওঁকে স্পেশ্যাল নেট করিয়েছিলাম। বলেছিলেন, গুটিয়ে থাকার দরকার নেই। নিজের সহজাত খেলাটাই খেল। দেড় ঘণ্টা ধরে পর পর দু’দিন এটা করিয়েছিলাম। প্র্যাকটিসের পর খুব সন্তুষ্ট হয়েছিল। কিছুটা তফাত যে হয়েছে, তা টি-টোয়েন্টি সিরিজেও বোঝা গিয়েছিল। দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে দলের দায়িত্ব নিয়ে ব্যাট করছিল। ধীরে ধীরে আরও উন্নতি করবে। সেটা স্পষ্ট বোঝাও যাবে। আসলে আত্মবিশ্বাস জোগাতে হয় ক্রিকেটারকে। বোঝাতে হয় যে, যাই হোক না কেন, তুমি বাদ পড়বে না। দলে থাকবে। সেই নিশ্চয়তা এখন ও পাচ্ছে। এখন নিজেকে দলের অংশ বলে মনে করছে। ভাল করতে হবে, সেই তাগিদটা তাই জোরালো।”



ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে হায়দরাবাদে প্রথম টি-টোয়েন্টিতে নয় বলে করেছিলেন ১৮। তিরুঅনন্তপুরমে দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে ২২ বলে নট আউট থাকেন ৩৩ রানে। কিন্তু ওয়াংখেড়েতে তো ফের ব্যর্থতা। কোনও রান না করে দ্বিতীয় বলে ফেরা। এবং আউট হওয়ার পরে হতাশা-যন্ত্রণা থেকে হঠাৎই হেসে ফেলা। যেন নিজের কাছেই জানতে চাইছেন, এটা আবার কী করলাম! বার বার সুযোগ কাজে না লাগানোর আক্ষেপ কি বাড়ছিল? কোচের যুক্তি, “দেখুন, ম্যাচের মধ্যে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। নিজের উপর নয়। তবেই সাফল্য আসে। নিজের ইনিংসের উপর বেশি ফোকাস রাখলে সমস্যা হয়। এটা তাই আমারই শিক্ষা যে ম্যাচে যাই হোক, মুখে হাসি রাখবে। ও তাই হাসি মুখেই খেলে। আর রান না পাওয়ার সময়ে মানসিক সাপোর্ট দেওয়া খুব দরকার। আমি সেটাই করে গিয়েছি। যখনই কথা হয়েছে, বলেছি পজিটিভ থাকতে।”

মাঝের এই সময়ে কতটা চাপে ছিলেন ঋষভ? কোথায় গলদ হচ্ছিল? কোচ জানালেন যে, কাঁটা হয়ে উঠছিল প্রত্যাশা। তারকের মতে, “প্রত্যাশা অনেক বেশি হয়ে উঠছিল। সেটাই মেটাতে পারছিল না। এই ম্যাচে কিন্তু দেখুন দায়িত্ব পালন করেছে। কঠিন সময়ে নেমে দলকে টেনেছে। উইকেট সহজ ছিল না। বল থেমে থেমে আসছিল। শট নিতে সমস্যা হচ্ছিল। সেটার মোকাবিলা করল ক্রিজের বাইরে দাঁড়িয়ে।”

টেকনিকে বড় সমস্যা না হলেও শট খেলে ফেলছিলেন আগে। ক্রিকেটীয় ব্যাকরণ অনুসারে চোখের নীচে ব্যাটে-বলে হচ্ছিল না। কোচের ব্যাখ্যা, “আগে কমিট করে ফেলছিল। শট নেওয়ার জন্য এগিয়ে যাচ্ছিল। আগে ‘মিট’ করছিল বল। শরীরের কাছে খেলছিল না। এটা নিয়ে কথা হয়েছিল। বলেছিলাম, বেশি এগিয়ে যেও না। এই ম্যাচে কিন্তু সেই ভুলগুলো করেনি। শরীরের কাছে খেলেছে। ব্যাকফুটে খেলেছে বেশির ভাগ সময়।” স্টান্সেও পরিবর্তন এনেছিলেন ঋষভ। অনেক সময়ই ক্রিজ থেকে এগিয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন। কখনও আবার দাঁড়াচ্ছিলেন ক্রিজের ভিতরে। কেন? কোচ বললেন, “এটা বৈচিত্র। ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে। যখন যেমন দরকার, তখন তেমন দাঁড়িয়েছে ক্রিজে। ওকে যেন আর চাপ দেওয়া না হয়। ও খুব ভাল প্লেয়ার। খুব ভাল ব্যাটসম্যান। রবিবারও তো ক্রিজে জমে যাওয়ার পর রান-রেট বাড়াল। শেষ পর্যন্ত একশোর বেশি স্ট্রাইক-রেট রেখে খেলল।”

ছাত্রের ‘মূর্খামি’ও চোখে পড়েছে কোচের। তারক সিন্‌হার কথায়, “অন্য কেউ হলে ঠিক সেঞ্চুরি করত। কিন্তু বোকামি করে দলের জন্য মারতে গিয়ে আউট হল। এটা ওকে শিখতে হবে। দাঁড়িয়ে গেলে একশোয় পৌঁছতে হবে। টিমের জন্য তো খেলছই, কিন্তু নিজের কথাও একটু ভাবো। সেঞ্চুরি না করলে তো টিম থেকে বাদ দিয়ে দেবে!”

Advertisement