Advertisement
E-Paper

জিতেই দাবি, ক্রিকেট ফিরুক পাকিস্তানে

পঁচিশ বছর আগে মেলবোর্নে ইমরান খানের হাতে বিশ্বকাপ ওঠার পরে এই প্রথম কোনও বিশ্ব মানের কাপই জিতল না পাকিস্তান। সমস্বরে ওভালে দাঁড়িয়ে সরফরাজ আমেদ এবং তাঁদের ক্রিকেট ভক্তরা দাবি তুলে দিলেন, আমরা চ্যাম্পিয়ন।

সুমিত ঘোষ

শেষ আপডেট: ১৯ জুন ২০১৭ ০৪:৪০
রবিবার ওভালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির চূড়ান্ত লড়াইয়ে এই ছবিই দেখা গেল বারবার। ছবি: গেটি ইমেজেস

রবিবার ওভালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির চূড়ান্ত লড়াইয়ে এই ছবিই দেখা গেল বারবার। ছবি: গেটি ইমেজেস

অপ্রত্যাশিত ভাবে আন্ডারডগ হিসেবে কোহালির ভারতকে শুধু উড়িয়ে দিল না পাকিস্তান।

পঁচিশ বছর আগে মেলবোর্নে ইমরান খানের হাতে বিশ্বকাপ ওঠার পরে এই প্রথম কোনও বিশ্ব মানের কাপই জিতল না পাকিস্তান।

সমস্বরে ওভালে দাঁড়িয়ে সরফরাজ আমেদ এবং তাঁদের ক্রিকেট ভক্তরা দাবি তুলে দিলেন, আমরা চ্যাম্পিয়ন। ক্রিকেট ফেরানো হোক পাকিস্তানে। যা নিয়ে ছোটখাটো বিতর্কও শুরু হয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে কাপ জেতার পর পাক অধিনায়ক সরফরাজ আমেদ যে ভাবে সাংবাদিক সম্মেলন কক্ষকে ব্যবহার করে বলে গেলেন, ‘‘আমরা আশা করব এ বার পাকিস্তানে ক্রিকেট ফিরবে। আশা করব, সব দল আমাদের দেশে খেলতে আসবে,’’ তা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে।

পাল্টা প্রশ্ন উঠেছে যে, ইংল্যান্ডে জেতার সঙ্গে পাকিস্তানে ক্রিকেট ফেরার কী প্রশ্ন থাকতে পারে? পাকিস্তানে ক্রিকেট বন্ধ হয়েছিল শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটারদের উপর ভয়ঙ্কর জঙ্গি হানার জেরে। ২০০৮-’০৯ মরসুমের পর আর কোনও দেশ পাকিস্তানে খেলতে যায়নি। এমনকী, আইপিএলের ঢংয়ে তাদের নিজেদের ক্রিকেট লিগ, পাকিস্তান সুপার লিগও দুবাইয়ে করতে হয়েছে যেহেতু বিদেশি ক্রিকেটারেরা পাকিস্তানে খেলতে যেতে রাজি নন।

প্রথম এমন দাবির কথা শোনা গেল ম্যাচের শেষে মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে। পাক ক্রিকেট জনতার গর্জন আর তাঁদের জাতীয় পতাকায় তখন ওভালের রংই সবুজ। গ্যালারি থেকে পাক ক্রিকেটারদের নামে নানা জয়ধ্বনিমূলক পোস্টার তুলে ধরা হয়েছে। একটিতে যেমন লেখা— উই লাভ ইউ পাকিস্তান ক্রিকেট। একটি পোস্টারে দেখা গেল লেখা রয়েছে— ফখর জমান আর হাসান আলি। আমাদের পারমাণবিক অস্ত্র লন্ডনে সফল ভাবে টেস্টিং হল।

আরও পড়ুন: পাকিস্তানের কাছে হেরেও হতাশ নন ভারত অধিনায়ক

খেলার মাঠে সাধারণত হিংসাত্মক বা বর্ণবৈষম্যমূলক পোস্টার ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকে। ওভালের ক্রিকেট মাঠে ‘নিউক্লিয়ার টেস্টিং’ ব্যানার নিয়ে কেউ আপত্তি তুললেন কি না, জানা নেই। তবে শুধুই ক্রিকেটীয় আবহ যে রবিবারের লন্ডনে ছিল না, সেটা পরিষ্কার। সকালে ম্যাচ শুরুর আগে ওভালের বাইরে কাশ্মীর নিয়েও উত্তেজক স্লোগান দিতে শোনা গিয়েছে পাক জনতাকে। ক্রিকেট মাঠে কোহালিরা খুব আগ্রাসী কিছু না করলেও হকিতেও ভারত-পাক ম্যাচ ছিল এ দিন। ক্রিকেটে যেমন একপেশে ভাবে জিতেছে পাকিস্তান, হকিতে তেমনই একপেশে ভাবে জেতে ভারত। ৩৫ বছর অাগে, ১৯৮২ সালের এশিয়ান গেমস হকি ফাইনালে ভারতকে ৭-১ চূর্ণ করেছিল পাকিস্তান। যে ম্যাচে গোলকিপার ছিলেন মিররঞ্জন নেগি। যাঁর জীবন অবলম্বনে তৈরি হয়েছিল শাহরুখ খানের ‘চক দে ইন্ডিয়া’। ভারতীয় হকি দল এ দিন সাত গোল দিয়ে সেই হারের বদলা নিল। ওভালে অবশ্য ‘চক দে’ আওয়াজ শোনা গেল একবারই। যখন হার্দিক পাণ্ড্য পর পর তিনটে ছয় মারলেন। কিন্তু রবীন্দ্র জাডেজা-র অপদার্থতায় পাণ্ড্য রান আউট হয়ে গেলে, সেই আওয়াজও থেমে যায়।

হকিতে পাকিস্তানকে চূর্ণ করার দিনে বেশি আলোচনা হচ্ছে ভারতের কালো আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নামা নিয়ে। ভারতীয় সেনার উপর আক্রমণ এবং জঙ্গি হানার প্রতিবাদেই কালো আর্মব্যান্ড পরে নেমেছিলেন হকি খেলোয়াড়রা।

কাপ জিতে উল্লাসে মাতল পাক ক্রিকেটাররা।

লন্ডনে তাই রবিবার চাপা টেনশনের আবহেই ক্রিকেট এবং হকি ম্যাচ হল। ক্রিকেটে অবশ্যই পাকিস্তানের জয়জয়কার। ফখর জমান এবং হাসান আলি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ের দুই নায়ক। জমান ফাইনালের ম্যান অব দ্য ম্যাচ। হাসান টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেটসংগ্রাহক এবং ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট। ভারতীয়দের মধ্যেও একমাত্র শিখর ধবন পেলেন সর্বোচ্চ স্কোরারের সম্মান। বাকি সব ব্যক্তিগত পুরস্কারও নিয়ে গেল পাকিস্তান।

ও দিকে, সাংবাদিক সম্মেলনে কোনও প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগে পাক অধিনায়ক নিজে বিবৃতি পেশ করে বললেন— আমাদের অনেক শুনতে হয়েছে যে, আমরা ভারতকে হারাতে পারি না। আশা করি, এ বার দেশের মানুষ বিশ্বাস করবেন যে, আমরাও ভারতকে হারাতে পারি। এটা মোটেও একপেশে দ্বৈরথ নয়। আশা করব, এই জয় আমাদের দেশে ক্রিকেটকে ফিরিয়ে আনবে।

কোহালিদের বিরল এক বিবর্ণ দিনের সুযোগ নিয়ে মহম্মদ আমির-রা গর্জে উঠলেন। এক-একটা করে উইকেট তুলছিল পাকিস্তান আর যে ভাবে সকলে মিলে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের মুখের উপর চড়াও হয়ে উৎসব করছিলেন, তা দেখে কে বলবে এটা সেই এজবাস্টনে খেলা একই পাকিস্তান দল। তফাত বলতে শুধু ফখর জমান। যাঁদের নিয়ে কুৎসিত টুইটার জোক্‌স চালু হয়ে গিয়েছিল প্রথম ম্যাচে হারার পরে। পাক ক্রিকেটে ইমরান, আক্রম বা শাহিদ আফ্রিদিদের পর এমন আক্রমণাত্মক শরীরী ভাষা উধাও হয়ে গিয়েছিল।

কোহালি হারের যন্ত্রণার মধ্যেও সৌজন্য হারাননি। পাকিস্তান দলকে কৃতিত্ব দিয়ে বললেন, ‘‘সমস্ত বিভাগে আমাদের হারিয়ে দিয়েছে ওরা। এমন দিনও যায় যখন অন্য টিমটা আমাদের চেয়ে ভাল খেলবে। আজ সে রকমই একটা দিন। আমরা পারিনি।’’ বললেন, ‘‘আমি এই টুর্নামেন্টের দিকে তাকিয়ে হতাশার চেয়ে বেশি স্বস্তিই পাচ্ছি যে, ফের ফাইনাল পর্যন্ত উঠেছি। আমরা ধারাবাহিক হতে চাই। সেটা ঘটছে। ফাইনাল খেলাটা নিশ্চয়ই ধারাবাহিকতার লক্ষণ। তবে হ্যাঁ, ফাইনালে একদম দাঁড়াতে পারিনি। সেটা নিয়ে ভাবতে হবে।’’

বরাবরের হার-না-মানা তিনি ১৮০ রানের মতো বড় হারকে সহজ ভাবে মেনে নেবেন বলে মনে হয় না। খুব সম্ভবত লন্ডন থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজে রওনা হওয়ার আগেই পোস্টমর্টেমে বসবেন দল নিয়ে। গোটা টুর্নামেন্টে কোচ-ক্যাপ্টেনের সম্পর্ক ভেঙে পড়েছিল। কারও কারও মতে, কোচ ছাড়াই খেলে গিয়েছে ভারতীয় দল। অনিল কুম্বলে দলের সঙ্গে থাকলেও তাঁকে খুব বেশি কিছু করতে দেখা যায়নি। কোচ ছিলেন আলাদা একটা দ্বীপের মতো। এ বার সৌরভ, সচিন, লক্ষ্মণদের অ্যাডভাইসরি কমিটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা।

ওভালে সরফরাজদের নামে যখন ‘দিল দিল পাকিস্তান’ জয়ধ্বনি উঠেছে, সাংবাদিক সম্মেলন সেরে টিম নিয়ে বেরিয়ে গেলেন কোহালি। পরাভূত অধিনায়ক হিসেবে। ওভালে রবিবার সকালে যখন তিনি ঢুকছিলেন, কেউ যদি সে কথা বলত পাক ক্রিকেট ভক্তরাই হয়তো বিশ্বাস করতে পারতেন না।

ক্রিকেট সেই মহান অনিশ্চয়তার খেলাই হয়ে থাকল!

Pakistan India Final পাকিস্তান সরফরাজ আমেদ Pakistan Cricket চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ICC Champions Trophy 2017 Champions Trophy Cricket
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy